তুর্কমিনিস্তান (Turkmenistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

তুর্কমিনিস্তান (Turkmenistan)

নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর অধিবাসী তুর্কমেনদের বসবাসরত ভূখণ্ডকে বলা হয় তুর্কমেনিস্তান। সোগডিয়ান (Sogdian) তুর্কমেন বা তার্কির-মতো শব্দ হতে তার্কমেন বা তুর্কমনে শব্দের উৎপত্তি। তুর্কি সাম্রাজ্যের বাইরে এ নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল কিন্তু তুর্কি সাম্রাজ্যের প্রভাব বলয়ের বাইরে যেতে পারত না এবং এমন ইচ্ছাও তাদের ছিল না। তুর্কিদের ন্যায় তারা প্রাত্যহিক জীবন পরিচালনা করতেন। এজন্য তাদের নাম হয় তুর্কমেন বা তুর্কিদের মতো। অনেকে মনে করেন বিশুদ্ধ তুর্কি বা “pure Turk” হতে তুর্কিমেনিস্তান শব্দের উৎপত্তি। আবার অনেকের মতে, তুর্কি ও ইমান শব্দের মিলনে তুর্কিমিন এবং এ তুর্কিমিন জনগোষ্ঠীর লোক যেখানে বসবাস করেন তা তুর্কিমিনিস্তান নামে পরিচিত। উল্লেখ্য তুর্ক শব্দের অর্থ সৃষ্ট এবং ইমান মানে বিশ্বাস। এ তুর্কিরা অত্যন্ত বিশ্বাসী ছিল। বিশ্বস্তভাবে সৃষ্ট এ জনগোষ্ঠীর নাম তুর্কি।

তুর্কমেনিস্তানের মোট আয়তন ৪,৯১,২১০ বর্গকিলোমিটার বা ১,৮৮,৪৫৬ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ৪.৯। জনসংখ্যা ৫,১৭১,৯৪৩ এবং প্রতিবর্গ কিলোমিটারে জনসংখ্যা ১০.৫। আয়তনের দিক হতে তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের ৫৩-তম কিন্তু জনসংখ্যার দিক হতে ১১৭-তম আবার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ২০৮-তম জনবহুল দেশ। জনসংখ্যার মধ্যে ৮৫% তুর্কমেন, ৫% উজবেক, ৪% রাশিয়ান, ৬% অন্যান্য। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে জিডিপি(পিপিপি) ৮২.১৫১ বিলিয়ন ইউএস ডলার, সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১৪,১৭৪ ইউএস ডলার। জিডিপি নমিনাল ৪৭.৫৪২ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৮,২০৩ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম তুর্কমেন নিউ মানাত। রাজধানী আসগাবাত। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ অক্টোবর দেশটি রাশিয়া হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ ডিসেম্বর স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি তুর্কমেনিস্তানের বর্তমান পতাকা গৃহীত হয়।
২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কমেনিস্তান ৫২.৫ ৩৫ মিটার আয়তনের একটি পতাকা উন্মোচন করে। এ পর্যন্ত নির্মিত পতাকার মধ্যে এটি সর্ববৃহৎ। পতাকাটি তুর্কমেনিস্তানে ১৩৩ মিটার দীর্ঘ একটি পতাকদণ্ডের উপর স্থাপিত। এটি এ পর্যন্ত নির্মিত বিশ্বের দীর্ঘতম পতাকদণ্ড হিসাবে স্বীকৃত।

তুর্কমেন বর্ণমালার বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে বর্তমান অবস্থায় উন্নীত হয়েছে। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত এটি আরবি ভাষায় লেখা হতো। ১৯২৯-১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত লেখা হয়েছে ল্যাটিন বর্ণমালায়। ১৯৩৮-১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সরকালি লিখন পদ্ধতি ছিল সাইরিলিক (Cyrillic) ভাষায়। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ হতে তুর্কমেন ভাষা লেখার জন্য নতুন- ল্যাটিনেট বর্ণমালা প্রবর্তন করা হয়। তুর্কমেনিস্তানের অধিকাংশ লোক ইসলাম ধর্মাবলম্বী এবং সুন্নি মতাদর্শের অনুসারী। দ্বিতীয় সংখ্যালঘু হচ্ছে অর্থডোক্স খ্রিষ্টান।

তুর্কমেনিস্তানের প্রায় ৮০% এলাকাব্যাপী কারাকুম মরুভূমি (Black sand) বিস্তৃত। এটাকে কালো বালি বলা হয়। এটি পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম মরুভূমি। তুর্কমেনিস্তানের আহলা প্রদেশের কারাকুম মরুভূমির মাঝখানে আশগাবাত থেকে ২৬০ কিলোমিটার দূরে ডারবাজ (Derweze) এলাকায় একটি জলন্ত গ্যাস ফিল্ড রয়েছে। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ হতে এর গ্যস অনবরত জ্বলছে। এজন্য এটাকে ডোর টু হেলা বা নরকের দরজা (Door to hell) বলা হয়। পোড়া সালফারের তীব্র কটুগন্ধ বহুদূরব্যাপী ছড়িয়ে আছে। গ্যাসফিল্ডটি গ্যাসের পরিমাণ বিবেচনায় পৃথিবীর বৃহত্তম গ্যাস ফিল্ডের অন্যতম। আগুন, ফুটন্ত কাদা, আগুনের শিখা প্রভৃতি চারিদিকে বহুদূর পর্যন্ত এক ভয়ঙ্কর দৃশ্যের সৃষ্টি করে রেখেছে। এজন্য এলাকাবাসী এর নাম দিয়েছে ডোর টু হেল। ২৩০ মিটার ব্যাসার্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত এ অগ্নিকুণ্ডের তপ্ততা ঊর্ধ্বে ২০০ ফুট এবং গভীরে ৬৬ ফুট পর্যন্ত ছড়িয়ে।

প্রাকৃতিক গ্যাসের মওজুদ বিবেচনায় তুর্কমেনিস্তান পৃথিবীতে চতুর্থ। তবে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের এক হিসাবে দেখায় যায়, এ দেশের ৬০% লোক দরিদ্র সীমার নিচে বাস করে। তবে তুর্কমেনিস্তানে ১৫ বছরের অধিক বয়স্ক জনগণের মধ্যে শিক্ষিতের হার ৯৯.৬%। লোকসংখ্যা ৫ মিলিয়ন হলেও তুর্কমেনিস্তানে ২৬টি বেসরকারি বিমানবন্দর রয়েছে। এটি জনসংখ্যার তুলনায় একটি দেশের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত। আর একটি বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, তুর্কমেনিস্তানের ৯০% কর্মী সরকারিভাবে নিয়োজিত।

তুর্কমেনিস্তান প্রাচীন কার্পেট শিল্পের জন্য বিখ্যাত। এদেশে একটি কার্পেট মিউজিয়াম আছে। যেখানে বিভিন্ন শতকে তৈরি ১০০০ এর অধিক রকমের কার্পেট রয়েছে। একদল লোক ৩১৩ বর্গ মিটারের একটি কার্পেট তৈরি করে। গিনিস বুক রেকর্ড অনুযায়ী এটি বিশ্বে এ পর্যন্ত হাতে-তৈরি বৃহত্তম কার্পেট।

অনেকে ডাইনোসর ভালবাসেন কিন্তু এখন জীবন্ত ডাইনোসর দেখার কোনো উপায় নেই। তবে ডাইনোসরের বাস্তব পদচিহ্ন দেখতে হলে আপনাকে কিন্তু কুগিতাঙ নেচার রিজার্ভে যেতে হবে। এখানে এখনও ডাইনোসরের বাস্তব পদচিহ্ন অক্ষত রয়েছে।

আকাল-টেকে ঘোড়া তুর্কমেনিস্তানের জাতীয় প্রতীক। তুর্কমেনিস্তান অতি প্রাচীনকাল হতে এ ঘোড়া উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত। অতীতে এ ঘোড়া যুদ্ধে ব্যবহার করা হতো। বিশ্বের প্রায় সব বড় বড় সাম্রাজ্যের সম্রাট ও সেনাপতিরা এ ঘোড়া ব্যবহার করেছেন। বর্তমানে এ ঘোড়া ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হয়।

থাইল্যান্ড (Thailand) : ইতিহাস ও নামকরণ

পূর্ব-তিমুর বা তিমুর লেস্টে (Timor-Leste) : ইতিহাস ও নামকরণ

তুরস্ক (Turkey) : ইতিহাস ও নামরণ

তুর্কমিনিস্তান (Turkmenistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!