তোটক, তোটক ছন্দ: বিষের বাঁশী, জাগৃহী এবং নজরুল

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/তোটক-তোটক-ছন্দ-বিষের-বাঁশ/
তোটক একটি ছন্দের নাম। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, সংস্কৃত ত্রোটক হতে উদ্ভূত  খাঁটি বাংলা তোটক অর্থ (বিশেষ্যে)— বারো অক্ষরের সংস্কৃত ছন্দ।
দ্বিজ ভারত তোটক ছন্দে ভনে— ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর)
সংস্কৃত ছন্দ সৃষ্টি হয় লঘু ও গুরু অক্ষরের  বিন্যাসদ্বারা। লঘু অক্ষর উচ্চারণে সময় কম লাগে। তাই এটাকে ধরা হয় ১ মাত্রা, আর গুরু অক্ষর উচ্চারণের সময় বেশি লাগে। তাই তাকে ধরা হয় ২ মাত্রা। সাধারণত সংস্কৃত ছন্দের যা লঘু অক্ষর বাংলা ছন্দে তা মুক্তাক্ষর এবং সংস্কৃত ছন্দে যা গুরু অক্ষর, বাংলা ছন্দে তা রুদ্ধাক্ষর।
সংস্কৃত তোটক ছন্দের গঠন —  (লঘু+লঘু+গুরু)+(লঘু+লঘু+গুরু)+(লঘু+লঘু+গুরু)+(লঘু+লঘু+গুরু)।
বাংলা তোটক ছন্দের গঠন — (মুক্ত+মুক্ত+বদ্ধ)+(মুক্ত+মুক্ত+বদ্ধ)+(মুক্ত+মুক্ত+বদ্ধ)+(মুক্ত+মুক্ত+বদ্ধ)।
অর্থাৎ, তা তা ধিন্ তা তা ধিন্ তা তা ধিন্ তা তা ধিন্।
                                  তোটক ছন্দের কবিতা
           জাগৃহী (কাজী নজরুল ইসলাম, বিষের বাঁশী)
‘হর        হর হর শংকর হর হর ব্যোম’—
একী      ঘন রণ-রোল ছায়া চরাচর ব্যোম!
হানে     ক্ষিপ্ত মহেশ্বর রুদ্র পিনাক,
ঘন        প্রণব-নিনাদ হাঁকে ভৈরব-হাঁক
ধু ধু        দাউ দাউ জ্বলে কোটি নর-মেধ-যাগ,
হানে     কাল-বিষ বিশ্বে রে মহাকাল-নাগ!
আজ     ধূর্জটি ব্যোমকেশ নৃত্য-পাগল,
ওই       ভাঙল আগল ওরে ভাঙল আগল!
বোলে    অম্বুদ-ডম্বুর কম্বু বিষাণ,
নাচে     থই-তাতা থই-তাতা পাগলা ঈশান!
দোলে    হিন্দোলে ভীম-তালে সৃষ্টি ধাতার,
বুকে     বিশ্বপাতার বহে রক্ত-পাথার!
ঘোর     নির্ঘোষে ‘মার মার’ দৈত্য, অসুর,
প্রেত,    রক্ত-পিশাচ, রণ-দুর্মদ সুর।
করে     ক্রন্দসী-ক্রন্দন অম্বর রোধ –
ত্রাহি     ত্রাহি মহেশ হে সম্বরো ক্রোধ!
সুত      মৃত্যু-কাতর, হাহা অট্টহাসি
হাসে     চণ্ডী চামুণ্ডা মা সর্বনাশী।
কাল-    বৈশাখী ঝঞ্ঝারে সঙ্গে করি –
রণ-     উন্মাদিনী নাচে রঙ্গে মরি!
উর-     হার দোলে নরমুণ্ড-মালা,
করে    খড়্গ ভয়াল, আঁখে বহ্নি-জ্বালা!
নিয়া    রক্তপানের কী অগস্ত্য-তৃষা
নাচে    ছিন্ন সে মস্তা মা, নাইকো দিশা!
‘দে রে    রক্ত দে রক্ত দে’ রণে ক্রন্দন,
বুঝি   থেমে যায় সৃষ্টির হৃৎ-স্পন্দন!
জ্বলে   বৈশ্বানরের ধু ধু লক্ষ শিখা,
আজ   বিষ্ণু-ভালে লাল রক্ত-টিকা!
শুধু    অগ্নি-শিখা ধু ধু অগ্নি-শিখা,
শোভে    করুণার ভালে লাল রক্ত-টিকা!
রণ-   শ্রান্ত অসুর-সুর-যোদ্ধৃ-সেনা,
শুধু   রক্ত-পাথার, শুধু রক্ত-ফেনা!
একী    বিশ্ব-বিধ্বংস নৃশংস খেলা,
কিছু   নাই কিছু নাই প্রেত-পিশাচে মেলা।
আজ   ঘরে ঘরে জ্বলে ধু ধু শ্মশান মশান –
হোক   রোষ অবসান, ত্রাহি ত্রাহি ভগবান!
আজি    বন্ধ সবার পূতি-গন্ধে নিশাস,
বিষে    বিশ্ব-নিসাড়, বহে জোর নাভিশ্বাস!
দেহো   ক্ষান্ত রণে, ফেলো রঙ্গিণী বেশ,
খোলো   রক্তাম্বর মাতা সম্বরো কেশ!
এ তো    নয় মাতা রক্তোন্মত্তা ভীমা!
আজ   জাগৃহি মা, আজ জাগৃহি মা।
তব    চরণাবলুণ্ঠিত মহিষ-অসুর,
হল    ধ্বংস অসুর, লীন শক্তি পশুর।
তবে    সম্বরো রণ, হোক ক্ষান্ত রোদন–
হোক    সত্য-বোধন আজ মুক্তি-বোধন!
এসো   শুদ্ধা মাতা এই কাল-শ্মশানে
আজ   প্রলয়-শেষে এই রণাবসানে!
জাগো    জাগো মানব-মাতা দেবী নারী!
আনো   হৈম ঝারি, আনো শান্তি-বারি!
এসো   কৈলাস হতে মা গো মানস-সরে,
নীল   উৎপল-দলে রাঙা আঁচল-ভরে।
এসো   কন্যা উমা, এসো গৌরী রূপে,–
বাজো    শঙ্খ শুভ, জ্বালো গন্ধ ধূপে!
আজ   মুক্ত-বেণি মেয়ে একাকী চলে,
ওই    শেফালি-তলে হেরো শেফালি-তলে।
ওড়ে    এলোমেলো অঞ্চল আশ্বিন-বায়,
হানে    চঞ্চল নীল চাওয়া আকাশের গায়!
ঘোষে    হিমালয় তার মহা হর্ষ-বাণী, –
এল    হৈমবতী, এল গৌরী রানি।
বাজো    মঙ্গল শাঁখ, হোক শুভ-আরতি,
এল    লক্ষ্মী-কমলা, এল বাণী-ভারতী।
এল     সুন্দর সৈনিক সুর কার্তিক,
এল     সিদ্ধি-দাতা, হেরো হাসে চারিদিক!
ভরা      ফুল-খুকি ফুল-হাসি শিউলির তল,
আজ     চোখে আসে জল, শুধু চোখে আসে জল!
নিয়া      মাতৃ-হিয়া নিয়া কল্যাণী-রূপ
এল       শক্তি স্বাহা, বাজো শাঁখ, জ্বালো ধূপ!
ভাঁজো     মোহিনী সানাই, বাজো আগমনি-সুর,
বড়ো     কেঁদে ওঠে আজ হিয়া মাতৃ-বিধুর।
ওঠে      কণ্ঠ ছাপি বাণী সত্য পরম –
বন্-      দে মাতরম্। বন্‌দে মাতরম্!

‘বিষের বাঁশী’  কাব্যগ্রন্থটি  ১৩৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই শ্রাবণ (আগস্ট ১৯২৪) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। কবি নিজেই হুগলি থেকে এটি প্রকাশ করেছিলেন। নাম পৃষ্ঠায় মুদ্রণসংখ্যা ২২০০  ছিল এবং লেখা ছিল, “গ্রন্থাকার কর্তৃক সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত”। গ্রন্থের পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪+৬০, মূল্য: এক টাকা ছয় আনা এবং সোল এজেণ্ট ও প্রাপ্তিস্থান— ডি. এম. লাইব্রেরি, ৬১ কর্ণওয়ালিশ ষ্ট্রিট, কলিকাতা। প্রকাশের অব্যবহিত পরে ২২শে অক্টোবর ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় সরকার বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয় ২৭শে এপ্রিল ১৯৪৫। ‘বিষের বাঁশী’ কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়— নূর লাইব্রেরি, ১২/১ সারেঙ্গ লেন, তালতলা, কলিকাতা থেকে, ১৩৫২ বঙ্গাব্দের শ্রাবণ মাসে। ‘জাগৃহি’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের ৩০শে শ্রাবণ প্রথম বর্ষ দ্বিতীয় সংখ্যার ‘ধূমকেতু’তে ‘জাগরণী’ নামে প্রকাশ হয়েছিল।

error: Content is protected !!