তৎসম বিদেশি শব্দ নয় কেন? সংস্কৃত ছাড়া অন্য ভাষা হতে আগত শব্দ বিদেশি কেন

ড. মোহাম্মদ আমীন
তৎসম বিদেশ শব্দ নয় কেন? সংস্কৃত ছাড়া অন্য ভাষা হতে আগত শব্দ বিদেশি কেন
সংযোগ: https://draminbd.com/তৎসম-বিদেশি-শব্দ-নয়-কেন-সং/

ড. মোহাম্মদ আমীন

ইংরেজি, ফারসি, আরবি, হিন্দি, গ্রিক, ফরাসি, লাতিন, উর্দু, তামিল প্রভৃতি ভাষা হতে বাংলায় আগত/আত্মীকৃত/ ব্যবহৃত/ বাংলা অভিধানে অন্তর্ভুক্ত শব্দকে বিদেশি উৎসের শব্দ বলা হয়। কিন্তু সংস্কৃত হতে আগত ভাষাকে তৎসম বলা হয় কেন?

সংস্কৃত হতে আগত এবং বাংলায় অবিকল বানানে গৃহীত ও ব্যবহৃত শব্দকে তৎসম শব্দ বলা হয়। অর্থাৎ, তৎসম নামে পরিচিত শব্দসমূহ সংস্কৃতে যেভাবে লেখা হয় বাংলাতেও অবিকলে সেভাবে লেখা হয়। এদের গঠন-প্রকৃতি সংস্কৃতের অনুরূপ। বাংলা ভাষার ব্যাকরণ ও সংস্কৃত ভাষার ব্যাকরণ প্রায় অভিন্ন এবং তৎসম শব্দসমূহের জন্য সম্পূর্ণ  অভিন্ন। সংস্কৃত শব্দ/পদ  ও বাংলা শব্দ/পদ একই বর্ণে একই চিহ্নে এবং বাক্যাদি অভিন্ন ব্যাকরণ অনুসরণে লেখা হয়। তৎসম শব্দগুলো সংস্কৃত ভাষায় যেভাবে লেখা হয় বাংলা ভাষাতেও অবিকল সেভাবে লেখা হয়। বাংলার বর্ণ, বাক্য ও ব্যাকরণ সংস্কৃতের অনুরূপ। সংস্কৃতের নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। এটি উপমহাদেশের যে ভাষায় যায় সে ভাষার বর্ণে/ব্যাকরণে লেখার মতো উপযুক্ত একটি ভাষা। তাই ওই ভাষার বর্ণে লেখা হতো হয়েছে এবং হচ্ছে।  বাংলায় তৎসম হিসেবে ব্যবহৃত শব্দ বা পদ-সমূহ সংস্কৃত বর্ণ/চিহ্ন ও ব্যাকরণে অবিকল লেখা হয়। বাংলায় তৎসম নামে পরিচিত শব্দগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী চয়িত। তাদের যুক্তবর্ণের গঠন-প্রকৃতি সব সংস্কৃত ব্যাকরণ অনুসারে নির্মিত। তাই  সংস্কৃত হতে আগত এবং বাংলায় অবিকল বানানে গৃহীত ও ব্যবহৃত তৎসম নামে পরিচিত শব্দসমূহকে বিদেশি উৎসের শব্দ বলা হয় না।

কিন্তু অন্যান্য উৎসের শব্দকে সংশ্লিষ্ট ভাষায় যেভাবে কিংবা যে বর্ণে লেখা হয় বাংলায় সেভাবে লেখা যায় না। ওভাবে লিখতে গেলে উচ্চারণ, বর্ণ, ধ্বনি, ব্যাকরণ ও বাগ্‌-সজ্জায় অবোধ্য ভিন্নতা এসে যায়। সৃষ্টি হতে পারে হাস্যকর পরিস্থিতি। যেমন: দাম শব্দটি রোমান বর্ণ দিয়ে অভিন্ন উচ্চারণে লিখলে হয় dam, যার বাংলা উচ্চারণ হবে ডাম। দাম আর ডাম এক নয়।  সংস্কৃত ছাড়া অন্য ভাষা হতে আগত শব্দসমূহকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল ভাষার উচ্চারণে ধ্বনিত করা যায় না।  

আরবি  ভাষার عيد শব্দকে বাংলা বর্ণ দিয়ে অবিকল কখনো লেখা যায় না। লিখতে হবে ইদ বা ঈদ। ইদ বা ঈদ যেটাই লোক হোক না, বাংলায় তার উচ্চারণ হবে অভিন্ন। কারণ, বাংলায় উচ্চারণগত দীর্ঘস্বর নেই। তাহলে বলতে পারেন, দীর্ঘস্বর রাখা হয়েছে কেন?

বাংলায়  অভিধানভুক্ত শব্দের সংখ্যা প্রায় ১,৬০০০০ (যদিও মোট শব্দ সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ)। অভিধানভুক্ত এই ১,৬০০০০ শব্দের মধ্যে তৎসম প্রায় ২৫ভাগ এবং অর্ধ-তৎসম ৫ ভাগ ও তদ্ভব ৬০ ভাগ।  মূলত,  তৎসমের অর্থগত পার্থক্য দ্যোতিত করার জন্য সংস্কৃতের অনুরূপ বানান হিসেবে তৎসম শব্দের জন্য বাংলায় দীর্ঘস্বর রাখা হয়েছে। তৎসম তুলে দিলেই কেবল বাংলায় দীর্ঘস্বরের প্রয়োজনীয়তা পুরিয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে বাংলায় ব্যবহৃত প্রায় প্রায় ৪০.০০০ হাজার এবং অভিধান বহির্ভূত আরও ১০,০০০ মোট ৫০,০০০ তৎসম শব্দে সরাসরি বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। পরোক্ষ বিপর্যয় ঘটবে ১,০৪০০০  সংস্কৃতজাত (অর্ধ-তৎসম ও তদ্ভব) শব্দে । উল্লেখ্য, প্রায় অভিন্ন চরিত্রের বলে অর্ধ-তৎসম নামটি বাদ দিয়ে শব্দগুলোকে তদ্ভবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।  আগে যেগুলো অর্ধ-তৎসম ছিল এখন সেগুলোও তদ্ভব নামে পরিচিত। বাংলাদেশের বাংলায় দীর্ঘস্বর তুলে দেওয়া হলে  পশ্চিমবঙ্গ তা করবে এমনটি বলা যায় না। যদি না করে তো কী হবে? অভিধানভুক্ত ১,৬০,০০০ শব্দের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১,৪৪,০০০  শব্দের বানান বিপর্যয় ঘটব। তাই যদি হয় তো বাংলাদেশের বাংলা আর পশ্চিমবঙ্গ ও পৃথিবীর অন্যান্য দেশের বাংলা ভিন্ন  ভাষায় পরিণত হবে। তাই দীর্ঘস্বর তুলে দেওয়া এত সহজ কাজ নয়। প্রসঙ্গত, বাংলায় ব্যবহৃত অভিধানভুক্ত বিদেশি শব্দের সংখ্যা ৮ ভাগ হিসেবে ১২,৮০০ এবং দেশি শব্দের সংখ্যা ২ ভাগ হিসেবে ৩,২০০।  প্রশ্ন আসতে পারে, বাংলার প্রাচীন লোকজন কি তাহলে মাত্র ৩২০০ শব্দ দিয়ে আলাপ করত? না। বারবার আগ্রাসনের কবেল পড়ে বিজেতা জাতির ভাষার থাবায় সমৃদ্ধ দেশি শব্দ ক্রমশ লুপ্ত হতে হতে এ পর্যায়ে  পৌঁছেছে। এভাবে আগ্রাসনের কবলে পড়ে অনেক সমৃদ্ধ ভাষাও লুপ্ত হয়ে গেছে। বাংলার ভাগ্য ভালো যে, অন্তত বাংলা নামে টিকে আছে। (বিস্তারিত দেখুন: বাংলা ভাষায় কতটি দেশের কতটি শব্দ আছে।)

বাংলায় ব্যবহৃত ও বিদেশি নামে পরিচিত শব্দগুলো অন্য বর্ণমালা দিয়ে লেখা হলেও তার উচ্চারণ ভিন্ন হয়ে যায়। অধিকন্তু, বাংলায় তৎসম নামে পরিচিত শব্দসমূহ ছাড়া অন্যকোনো শব্দ সংস্কৃতের মতো অভিন্ন ব্যাকরণ বা বানানবিধি অনুসরণ করে না। তাই সংস্কৃত হতে আগত এবং বাংলায় সংস্কৃতের মতো অবিকল বানানে গৃহীত  ও ব্যবহৃত শব্দসমূহকে বিদেশি শব্দ বলা হয়।

অনেকে বলেন, “সংস্কৃত বাংলার মা। ”এখন এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, সংস্কৃত বাংলার ‘মা’ নয়।  আবার অনেকের মতে, “বাংলাই সংস্কৃতের মা।”  কে কার মা এটি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে একই বর্ণে গঠিত এবং প্রায় অভিন্ন ব্যাকরণের অনুসারী হিসেবে উভয় ভাষা  নিঃসন্দেহে পরস্পর রক্তসম্পর্কের আত্মীয়। ধরুন আপনার বাসায় তিনজন মেহমান এসেছে। একজন বাংলাদেশ থেকে, একজন পারস্য থেকে এবং একজন যুক্তরাজ্য থেকে। বাংলাদেশে থেকে যে এসেছে সে আপনার   ভাইয়ের মেয়ে। কাজেই সে আপনার রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়। তাকে কি বিদেশি মেহমান বলবেন? না কি পরিচয় উদ্ধৃত করে বলবেন সে আমার ভাতিজি? অন্যদিকে পারস্য ও যুক্তরাজ্য থেকে আগত অনাত্মীয়দের বলবেন, বিদেশি।   তাই সংস্কৃত বিদেশি ভাষা নয়।
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!