তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে: বাংলা বানান: ব্যাকরণ ভাষা শব্দ উৎস ব্যুৎপত্তি অভিধান

খুরশেদ আহমেদ
 
 
তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে
[প্রথম অভিযান]
 
‘পরিদেবন’? না কি ‘পরিদেবনা’? না কি ‘পরিবেদন’? না কি ‘পরিবেদনা’?
‘দেবন’? না কি ‘দেবনা’? না কি ‘বেদন’? না কি কেবলই ‘বেদনা’?
না কি সবগুলো রূপই সম্ভব?
 
১.১। অভিধানে ‘পরিদেবন’ আছে, স্ত্রীলিঙ্গে ‘পরিদেবনা’-ও আছে।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান ও অন্যান্য অভিধান থেকে পাই, ‘পরিদেবন’ ও ‘পরিদেবনা’ মানে আক্ষেপ/অনুতাপ/বিলাপ/শোক।
বঙ্গীয় শব্দকোষ বলেছে, ‘পরিদেবন’ ক্লীবলিঙ্গ ও ‘পরিদেবনা’ স্ত্রীলিঙ্গ এবং এদের মানে ‘বিলাপ’
[‘পরিদেবন’ যে ব্যাকরণিকভাবে ক্লীবলিঙ্গ তা জেনে আমার কি কোনো লাভ বা জ্ঞানবৃদ্ধি হল?]
১.২। অভিধানে ‘পরিবেদন’ আছে, স্ত্রীলিঙ্গে ‘পরিবেদনা’-ও আছে।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান বলেছে, ‘পরিবেদন’ মানে বড়োভাই বিয়ে করার আগেই ছোটো ভাইয়ের বিয়ে করা, যেখানে ‘পরিবেদনা’ মানে, প্রথমত, ‘তীব্র বেদনা বা যন্ত্রণা’, এবং, দ্বিতীয়ত, ‘বিবেচনা।’
বঙ্গীয় শব্দকোষ বলেছে, বড়োভাই বিয়ে করার আগেই যে ভাই বিয়ে করল, সে হল ‘পরিবেত্তা’ আর তার বউ হল ‘পরিবেদিনী’ বা ‘পরিবেদনীয়া’। [তবে এই ‘পরিবেদিনী’ এখনকার ‘পরি’-ও নয়, ‘বেদেনি’-ও নয় নিশ্চয়ই!]
১.৩। অভিধানে ‘দেবন’ আছে, স্ত্রীলিঙ্গে ‘দেবনা’-ও আছে; আবার, ‘বেদন’ আছে, স্ত্রীলিঙ্গে ‘বেদনা’-ও আছে।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান থেকে মনে হয়, ‘কষ্ট’ অর্থে ‘দেবন’, ‘বেদন’ ও ‘বেদনা’ সমার্থক।
জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান বলেছে ‘দেবনা’-র একটি মানে ‘আক্ষেপ’।
১.৪। পরি+দেবন/দেবনা=পরিদেবন/পরিদেবনা; এবং পরি+বেদন/বেদনা=পরিবেদন/পরিবেদনা। সংস্কৃত উপসর্গ ‘পরি’ মূল শব্দটির অর্থের ব্যাপ্তি ঘটায়।
১.৫। ebanglalibrary.com লিখেছে:
“পরিদেবন, পরিদেবনা [pari-dēbana, pari-dēbanā ] বি. 1 খোদোক্তি, বিলাপ (বালীর মৃত্যুতে তারার পরিদেবনা); 2 অনুতাপ, অনুশোচনা।
[সং. পরি + √ দিব্+ অন, আ]।”
১.৬। triratnasangha.org থেকে পড়ি:
“বুদ্ধ মহানিদান সূত্রে আনন্দ স্থবিরকে বলছেন, … জরা-মরণ হতে শোক, পরিদেবনা, দুঃখ, দৌর্মনস্য, অশান্তির উৎপত্তি হয়।”
 
 
 
তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে
[দ্বিতীয় অভিযান]

 
‘তত্র কা পরিদেবনা’?

২.১।
 রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘সোনার তরী’-র ভাবার্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গীতা থেকে উদ্ধৃত করে বলেছেন:
“অব্যক্তাদীনি ভূতানি ব্যক্তমধ্যানি ভারত।
অব্যক্তনিধনান্যেব তত্র কা পরিদেবনা।”
২.২। Bhakti Rakshak Sridhar-এর The Bhagavadgita: Bengali Edition থেকে গীতায়-লেখা কৃষ্ণের এ-উক্তিটির অনুবাদ পড়ি:
[হে] ভারত (হে অর্জ্জুন!) ভূতানি (প্রাণিগণের) অব্যক্তাদীনি (জন্মের পূর্ব্বাবস্থা অজ্ঞাত) ব্যক্তমধ্যানি (জন্মবধি মৃত্যু পর্যন্ত মধ্যকাল জ্ঞাত) অব্যক্তনিধনানি এব (এবং মৃত্যুর পরবর্ত্তী কালও অজ্ঞাত) তত্র (তদ্বিষয়ে) কা পরিদেবনা (শোকের কারণ কি আছে?) ।।২৮।।
“হে ভারত! যখন ভূতসকল উৎপত্তির পূর্ব্বে অপ্রকাশিত ও জন্ম হইতে মরণ পর্য্যন্ত প্রকাশিত, এবং নিধন প্রাপ্ত হইলেই আবার অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত হইয়া থাকে, তখন তাহার জন্য পরিবেদনা [যদ্দৃষ্ট; (এখানে ‘পরিদেবনা’ হবে না?)] কি আছে?
[উদ্ধৃতির ভেতরে তৃতীয় বন্ধনীতে আমার মন্তব্য সংযোজিত।]
২.৩।‘ভারত’ শব্দটির অনেক অর্থের মধ্যে একটি অর্থ ‘অর্জ্জুন’।
 
তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে
[তৃতীয় অভিযান]
‘কা কস্য পরিদেবনা’? অথবা, ‘কাকস্য পরিদেবনা’?
অথবা, ‘কা কস্য পরিবেদনা’? অথবা, ‘কাকস্য পরিবেদনা’?
৩.১ বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান জানাচ্ছে:
“ ‘কাকস্য পরিদেবনা।’ শিবরাম, ১৯৭০।”
৩.২। অভিগম্য অভিধান লিখেছে:
“ ‘কা কস্য পরিদেবনা’ – সংস্কৃত বাক্য বাংলায় ব্যবহৃত; অর্থ-কার (বিশেষ্য) বিবেচনা বা চিন্তা।
{(তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ) ‘কিম্‌’ (পুং)+ষষ্ঠী একব}”।
৩.৩। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান লিখেছে:
“কা কস্য পরিবেদনা … কে কাহার জন্য বেদনা অনুভব করে?”
৩.৪। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ লিখেছে:
ক) ‘পরিবেত্তা’ ভুক্তিতে রামমোহন রায়কে উদ্ধৃত করে, “ক্ষণমাত্র পরিচয় কা কস্য পরিবেদনা।”
আবার,
খ) ‘অভিনয়’ ভুক্তিতে, ‘পাগলা ঝোরা। ললিতকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় ১৩২৮’ রেফারেন্সে, “যার যখন হ’তেছে সাঙ্গ রঙ্গভূমির অভিনয়, কাকস্য পরিবেদনা, আর তখন সে কারও নয় পা. ঝো ২৫৯।”
৩.৫। ‘শ্রীকান্ত’/তৃতীয় পর্ব/বার/পৃ৪৮৭৩-এর ৪৫৯৯-এ শরৎচন্দ্র লিখেছেন:
“ম্যালেরিয়া, কলেরা হর্‌-রকমের ব্যাধি পীড়ায় লোক উজোড় হয়ে গেল, কিন্তু কা কস্য পরিবেদনা! কর্তারা আছেন শুধু রেলগাড়ি চালিয়ে কোথায় কার ঘরে কি শস্য জন্মেছে শুষে চালান করে নিয়ে যেতে।”
৩.৬। নীলরত্ন হালদার তাঁর কবিতারত্নাকর/৮৭ নম্বর পর্যায়সারণিতে ‘কা কস্য পরিবেদনা’ প্রকাশটি বাংলায় লিখেছেন ‘কাহার প্রতি কি বেদনা আছে’  ‘কাহার প্রতি কি বেদনা’।
৩.৭।https://bn.quora.com/ থেকে পাই:
ক)অরূপম সান্যাল (Arupam Sanyal), স্নাতকোত্তর সংস্কৃত, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, বলছেন:
“… কা কস্য পরিবেদনা। এর অর্থ কস্য (কার) কা ( কী) পরিবেদনা ( পরিবেদনা ) মানে= কার কী মাথাব্যথা।“
খ)আদিত্য কবির (Aditya Kabir) রম্যরসযোগে লিখেছেন:
“পরিবেদন [পরি+বিদ+অন] অর্থ হতে পারে অধিক ক্লেশ, জ্ঞান বা বড় ভাইয়ের আগে ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়া।
“কাকস্য পরিবেদনা”র ক্ষেত্রে অধিক ক্লেশ অর্থটিই প্রচলিত
ওদিকে “কাকস্য” বলতে দু’রকম হতে পারে – (১) কা কস্য; (২) কাকস্য।
যদি প্রথমটি হয় তবে “কা” অর্থ “কি” বা “কে” এবং “কস্য” অর্থ “কার”। “কা” যেমন “কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ” (কে তোমার স্ত্রী, কে তোমার পুত্র)। “কস্য” শব্দের ব্যবহার আদালতি ভাষায় সুপ্রচলিত ছিলো, যেমন – “কস্য কবুলতি পত্রমিদং কার্যঞ্চাগে”।তাহলে কাকস্য পরিবেদনা অর্থ দাঁড়ালো “তোমার কষ্টে কার বা কি আসে যায়”।
কিন্তু, “কাকস্য” মানে “কাকের”ও হতে পারে। যেমন “দেবস্য” (গায়ত্রী মন্ত্রের “ভর্গো দেবস্য ধীমহি”), “গৃহস্য” (“গৃহস্য পতিঃ ভক্তং গৃহপতি ভীষিকরে নান্তাদেশ”) ইত্যাদি।
সেক্ষেত্রে কাকস্য পরিবেদনা অর্থ দাঁড়ায় “কাকের কষ্ট”।
“তা কাকদের কষ্টের শেষ নেই। দূষিত বর্জ্য খেয়ে শহরের কাকরা প্রতিদিন মারা পড়ছে। ডিম পাড়ার নিরাপদ জায়গা কমে আসছে। শহরে শহরে কমে যাচ্ছে কাক। গাছ থেকে পড়ছে কাক, তারপর মরছে। আজকাল আর কাক দেখা যায় না, সেটা লক্ষ্য করেছেন কি?
কিন্তু তাতে কার বা কি মাথাব্যথা। মানুষেরই গ্যারান্টি নেই। কাকের আবার কষ্ট।“
 
তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে
[চতুর্থ ও শেষ অভিযান]

“পরিদেবনা … [স. পরিদেবন+আ (টাপ্‌)]” এবং
“পরিবেদনা … [স. পরিবেদন+আ (টাপ্‌)]”।
‘টাপ্‌’ মানে কী?
৪.১। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান ‘পরিবেদনা’-র ব্যুৎপত্তি দেখাতে প্রত্যয় ‘আ’-এর পাশে ‘(টাপ্‌)’ লিখলেও, অভিধানটিতে নেই ‘(টাপ্‌)’-এর ব্যাখ্যা। প্রকৃতপক্ষে বাংলা একাডেমির বা অন্য কারো বাংলা-বাংলা কোনো অভিধানেই প্রত্যয় অর্থে ‘(টাপ্‌)’ আমি পাইনি।
৪.২। ‘(টাপ্‌)’ আমাকে ব্যাখ্যা করেছে অশোক মুখোপাধ্যায়ের সংসদ ব্যাকরণ অভিধান:
“টাপ্‌ (আ) : সংস্কৃত স্ত্রী-প্রত্যয়। এই প্রত্যয় থেকে স্ত্রীলিঙ্গ শব্দশেষে ‘আ’ হয়।”
আবার,
“ডাপ্‌ (আ) : সংস্কৃত স্ত্রী-প্রত্যয়। এই প্রত্যয় থেকে শব্দের শেষে ‘আ’ যোগ হয়।”
তাহলে একই প্রত্যয় ‘আ’-র জন্য নাম দুটো কেন?
৪.৩। সংসদ থেকে আমি যেটুকু বুঝলাম:
“রূপ + আ (টাপ্‌) = রূপা;”
কিন্তু
“অনামন্‌ + আ (ডাপ্‌) = অনামা।”
টাপ্‌ মূলশব্দ অটুট রেখেছে, কিন্তু ডাপ্‌ মূলশব্দের প্রান্তিক ‘ন্‌’ বিলোপ করেছে। এ-পার্থক্যের জন্যই কি প্রত্যয় ‘আ’-র দুটি আলাদা পরিচয়?
৫। তৎসম কণ্টকারণ্য থেকে আহরিত পুষ্প-সম্ভার তথা তথ্য-কোলাজ আপনার সঙ্গে এখানে শুবাচের পাঠশালায় শেয়ার করতে পেরে আমি আনন্দিত; এখন আপনি চাইলে আপনার পছন্দ অনুযায়ী বাছাই-করা ফুল নিয়ে মালা গাঁথতে পারেন!

আপনার মনোযোগ, ধৈর্য ও সময়ের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, প্রিয় শুবাচি!
 
 
 
তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে-৫
 
৫.০। তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে আমার পঞ্চম অভিযানের পটভূমি ও প্রণোদনা:
ক) ১৫ এপ্রিল ২০২০ শুবাচে প্রকাশিত তাঁর পোস্টে মিনহা সিদ্দিকা প্রশ্ন করেছেন:
“… জাতি+ঈয়= জাতীয়, ভারত+ঈয়= ভারতীয়, সম্পর্ক+ঈয়= সম্পর্কীয়, ধর্ম+ঈয়= ধর্মীয়, কেন্দ্র+ঈয়= কেন্দ্রীয় কিন্তু, ইন্দ্র+ঈয়= ইন্দ্রিয়, কেন?”
এবং
খ) ৩০ এপ্রিল ২০১৮ শুবাচে প্রকাশিত তাঁর পোস্টে মিঠুন সরকার প্রশ্ন করেছেন:
“লেখক হায়াৎ মামুদ উনার “বাংলা লেখার নিয়ম কানুন” বইটির ২২ পৃষ্ঠায় নিচের নিয়মটির কথা বলেছেন।
“আমার প্রশ্ন হলো উনার উল্লেখিত নিয়মটি “ইন্দ্রিয়” শব্দটি মানছে না। তাহলের বানানটি আসত ইন্দ্রীয়। কিন্তু কেন মানছে না? এখানে কি অন্য বিশেষ কোন নিয়ম ব্যবহৃত হয়েছে?”
[বাংলা লেখার নিয়মকানুন/বানান ও ভাষারীতির গাইড-বুক (হায়াৎ মামুদ; পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ ২০০৩; প্রতীক) থেকে সংশ্লিষ্ট নিয়মের ছবি এ-পোস্টের সঙ্গে সংযোজন করেছি।]
গ) এ-পটভূমিতে আমি ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি ও অর্থ বোঝার চেষ্টা করছিলাম। বর্তমান পোস্টটি আমার সে-অনুসন্ধানেরই ফসল।
৫.১। ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি কোনটি:
(অ) ‘ইন্দ্র+ইয়’?
(আ) না কি, ‘ইন্দ্র+ঈয়’?
(ই) না কি, তৃতীয় কোনো প্রত্যয়-যোগে, ‘ইন্দ্র+ময়’?
(ঈ) না কি, ওপরের তিনটিই?
৫.২। ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি হিসেবে ‘ইন্দ্র+ইয়’-এর পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে:
ক) জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান; দ্বিতীয় সংস্করণ; প্রথম ভাগ; কলিকাতা, ১৩৪৪, ১৯৩৭: ‘[ইন্দ্র (আত্মা, স্বয়ং)+ইয়। আত্মা যাহার উপর প্রভুত্ব করে]’;
খ) কাজী আবদুল ওদুদ সংকলিত ও প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী কলিকাতা থেকে প্রকাশিত ব্যবহারিক শব্দকোষ [বহুল সংশোধিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ]: ‘ইন্দ্র+ইয়’;
গ) আশুতোষ দেব সংকলিত ও দেব সাহিত্য কুটীর, কলিকাতা থেকে প্রকাশিত শব্দবোধ অভিধান/শব্দাভিধান ও সাইক্লোপিডিয়া (পঞ্চম সংস্করণ ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ, পুনর্মুদ্রণ ২০০১): ‘ইন্দ্র (ঈশ্বর)+ইয় সৃষ্টার্থে’;
ঘ) আশুতোষ দেব সংকলিত ও দেব সাহিত্য-কুটীর, কলিকাতা থেকে প্রকাশিত নূতন বাঙ্গালা অভিধান; সংশোধিত ৩য় সংস্করণ, ১৯৫৯: ‘ইন্দ্র (ঈশ্বর)+ইয় সৃষ্টার্থে’;
ঙ) বিশিষ্ট পণ্ডিত ও অধ্যাপকমণ্ডলী কর্তৃক সম্পাদিত ভারতী/বাঙলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ: মহালয়া, ১৯৫৯]: ‘ইন্দ্র+ইয়’;
চ) বিধুভূষণ মিত্র সংকলিত বৃহৎ সচিত্র প্রকৃতিবোধ অভিধান; কলিকাতা, ১৮৮৪: ‘ইন্দ্র+ইয়—লিঙ্গার্থে’;
ছ) দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও পূর্ণচন্দ্র চক্রবর্ত্তী সংকলিত ও ১৮৮০ সালে কলিকাতা থেকে প্রকাশিত প্রকৃতিনির্ণয় অভিধান:‘ইন্দ্র=আত্মা, স্বয়ং+ইয়—লিঙ্গার্থে। আত্মা যাহার উপর প্রভুত্ব করে।’
এবং
জ)A Dictionary, Bengali and Sanskrit, explained in English, by Haughton, London, 1833: ‘ইন্দ্র+ইয়’।
৫.৩। অন্যদিকে, ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি হিসেবে ‘ইন্দ্র+ঈয়’-এর পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে:
ক) বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০১৬]: ‘[স. ইন্দ্র+ঈয়]’;
খ) হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ; [প্রথম খণ্ড।। অ-ন; ১৩৩৯; কলিকাতা]: ‘[ইন্দ্র+ঈয় (ঘ), ‘তাহার লিঙ্গ’ অর্থে, পা ৫ ২.৯৩; ছান্দস]’;
গ) সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত ও নিউ বেঙ্গল প্রেস লিমিটেড, কলকাতা থেকে প্রকাশিত আদর্শ বাঙ্গালা অভিধান (তৃতীয় সংস্করণ, ১৩৫০ বঙ্গাব্দ): ‘ইন্দ্র+ঈয় সৃষ্টার্থে’;
ঘ) সুবলচন্দ্র মিত্র সংকলিত ও নিউ বেঙ্গল প্রেস লিমিটেড, কলকাতা থেকে প্রকাশিত সরল বাঙ্গালা অভিধান (অষ্টম সংস্করণ, ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দ): ‘ইন্দ্র শব্দ+ঈয় লিঙ্গার্থে।’
এবং
ঙ)ভারতীয় বাঙলা ভাষার অভিধান: ‘[সং. ইন্দ্র+ঈয় (ঘ) ]।’
৫.৪।আবার, ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটির ব্যুৎপত্তি হিসেবে ‘ইন্দ্র+ময়’-এর পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছে:
রসিকচন্দ্র কাব্যরত্ন সংকলিত ও ১৩১৯/১৯১২ সালে আলবার্ট লাইব্রেরী, ঢাকা থেকে প্রকাশিত ভাষাশিক্ষা-অভিধান: ‘ইন্দ্র+ময়’।
৫.৫। অশোক মুখোপাধ্যায় সংকলিত ও সাহিত্য সংসদ, কলকাতা কর্তৃক প্রকাশিত সংসদ ব্যাকরণ অভিধান [প্রথম প্রকাশ ১৯৮৯; পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ ২০০৫, দ্বিতীয় মুদ্রণ ২০০৯] ‘ইয়’ ও ‘ঈয়’ প্রত্যয়ের প্রয়োগ ও পার্থক্য স্পষ্ট করেছে:
ক) “ঘ৩ (ইয়) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। এই প্রত্যয় থেকে শব্দের শেষে ‘ইয়’ যোগ হয়। … ইন্দ্র+ইয় (ঘ)=ইন্দ্রিয়।”
খ) “ছ৩ (ঈয়) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। সম্পর্কিত কিংবা মানানসই বোঝাতে এই প্রত্যয়ের ব্যবহার হয়। ছ-প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে ‘ঈয়’ হয়। … জাতি+ঈয় (ছ)=জাতীয়; …।”
এবং
গ) “ছণ্ (ঈয়) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। এই প্রত্যয় থেকে শব্দ শেষে ‘ঈয়’ হয়। তৈত্তিরি+ঈয় (ছণ্)=তৈত্তিরীয়।”
৫.৬। ওপরে ৫.১গ-এ রেফারেন্স-করা শব্দবোধ অভিধান থেকে পাই: পাণিনি মতে যা প্রত্যয় ‘ঘ’, তা-ই ওই অভিধানে অনুবন্ধহীন প্রত্যয় ‘ইয়’; যা ‘ছ’, তা-ই ‘ঈয়’; এবং, যা ‘ছণ্’ তা-ই—এবং তা-ও—‘ঈয়’।
৫.৭। এ-অবস্থায়, এটা কৌতূহলজনক যে, বঙ্গীয় শব্দকোষ বলছে ‘ঈয় (ঘ)’ [দেখুন: ৫.২খ], এবং ভারতীয় বাঙলা ভাষার অভিধান বলছে ‘[সং. ইন্দ্র+ঈয় (ঘ) ]’ [দেখুন: ৫.২ঙ], যেখানে সংসদ ব্যাকরণ অভিধান বলেছে: ‘ঘ৩ (ইয়)’ [দেখুন: ৫.৫ক]।
৫.৮। আপনি কার কথা এবং কোন কথাটি মানবেন?
অনুবন্ধযুক্ত ‘ঘ’=অনুবন্ধহীন ‘ইয়’? না কি, অনুবন্ধহীন ‘ঈয়’?
৫.৯। বাংলার পণ্ডিতগণ যখন কোনো বিষয় নিয়ে—যেমন আমাদের আলোচ্য ‘ইন্দ্রিয়’-এর ব্যুৎপত্তি নিয়ে—বিতণ্ডা করেন, তখন আমি আমার বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করি ও আমার বোধ অনুযায়ী সহজতম ও যৌক্তিক জবাবটি বেছে নিই, যা এক্ষেত্রে ‘ইন্দ্রিয়=ইন্দ্র+ইয়’, এবং এটা ছাড়া অন্য কিছু নয়।
৫.১০। তবে, চূড়ান্ত কথা, ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দের ব্যুৎপত্তি—৫.১-এ উল্লেখ-করা অ-আ-ই-ঈ যেটিই হোক না কেন—একজন গড় বাংলাভাষী হিসেবে বা বাংলার শৌখিন ছাত্র হিসেবে আমাকে তা ‘ইন্দ্র’ ও ‘ইন্দ্রিয়’—এ-দুয়ের মধ্যে আদৌ কোনো প্রকার সংযোগ আছে এমনটি বোঝাতে ব্যর্থ হয়।
সেদিক থেকে ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দের ব্যুৎপত্তি-অনুসন্ধান একটি অর্থহীন অনুশীলন ও সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।
তার চেয়ে বরং ‘ইন্দ্রিয়’ শব্দটিকে ভোক্তার ব্যবহারের জন্য সর্বতোভাবে প্রস্তুত সংস্কৃত ব্যাকরণের কারখানায় নির্মিত একটি চূড়ান্ত প্রোডাক্ট—যেমন কফি-গুঁড়োদুধ-চিনি-মেশানো ইনস্ট্যান্ট কফি—সেভাবে গণ্য করা, এবং—বাংলাভাষী আমার জন্য—একটি কৃতঋণ বিদেশি শব্দ রূপে তার অর্থসহ শব্দটি শিখে নেওয়া অনেক বাস্তবসম্মত, প্রায়োগিক ও ফলপ্রসূ।
৫.১১। আপনার মনোযোগ, ধৈর্য ও সময়ের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, প্রিয় শুবাচি!

 

তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে_৬
কনীনিকা-কনীয়ান-কনীয়সী সমাচার
 
৬.১। পড়ছিলাম ‘পরবাস’-এ উদয় চট্টোপাধ্যায়ের ‘বাংলা বানান সমস্যা’, যেখানে প্রথম অনুচ্ছেদেই তিনি পাঠকের প্রতি—পরোক্ষভাবে যদিও—চ্যালেঞ্জ ছুড়েছেন, “ ‘কনীনিকা কিরীটী পিপীলিকা শারীরিক’ বানান করতে অনেকেরই হ্রস্বদীর্ঘ জ্ঞান কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হবে।” আমি আবিষ্কার করে কুণ্ঠিত হলাম আমিও তো ‘কনীনিকা’ বানান সম্পর্কে নিশ্চিত নই, এবং, এর অর্থও তো আমি ঠিক জানি না!
৬.২। নিশ্চিত হওয়ার জন্য এবং অজ্ঞতা দূর করে আলোকিত হওয়ার জন্য আমি বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান খুললাম এবং পেলাম:
“কনীনিকা … বি. ১ চোখের তারা। ২ কনিষ্ঠাঙ্গুলি, কড়ে আঙুল। ৩ ছোটো বোন।”
৬.৩। সেসঙ্গে আমি দেখলাম অভিধানটিতে ‘কনীনিকা’-র ঠিক লাগোয়া পরবর্তী ভুক্তি ‘কনীয়সী’ ও ‘কনীয়ান’। ভুলে-যাওয়া স্মৃতি ঝলসে উঠল, জানিয়ে দিল স্কুলে পড়েছি, লিঙ্গ প্রকরণে, কনীয়ান-কনীয়সী। সে-বয়সে, তখন, কনীয়ান-কনীয়সীর অর্থের কথা বোধ করি আদৌ চিন্তা করিনি।
৬.৪। পড়লাম: ‘কনীয়ান’ মানে ‘বিণ. ১ দুইয়ের মধ্যে ছোটো বা অল্পবয়স্ক। ২ অতি ক্ষুদ্র।’ এবং ‘কনীয়সী’ মানে ‘বিণ. কনিষ্ঠা। বি. অল্পবয়স্কা নারী।’
৬.৫। বোঝার চেষ্টা করলাম, আরও গভীরে, কোত্থেকে ও কীভাবে এলো ‘কনীয়ান’ ও ‘কনীয়সী’; এবং বিমূঢ় হলাম; অভিধানটি লিখেছে:
“কনীয়ান … [স. যুবন্+ঈয়স্]”
এবং
“কনীয়সী … [স. যুবন্+ঈয়স্+ঈ]”
যুবন্+ঈয়স্=কনীয়ান? যুবন্+ঈয়স্+ঈ=কনীয়সী? বাংলা ধ্বনিতত্ত্বে মনে হয় এমনটি সম্ভব নয়। সংস্কৃত ধ্বনিতত্ত্বেই বা কীভাবে সম্ভব?
৬.৬। ‘যুবন্’ প্রাতিপদিক দিয়ে ‘যুবক’-‘যুবতি’ নির্মাণ আমি বুঝতে পারি:
“যুবক … [স. যুবন্+ক (স্বার্থে)]”;
“যুবতি … [স. যুবন্+তি]”।

কিন্তু, ‘যুবন্’ থেকে ‘কনীয়ান’? সে তো এক আপাত-অসম্ভব উল্লম্ফন!
৬.৭। বঙ্গীয় শব্দকোষ লিখেছে:
“কনীয়ান্ … [যুবন্, অল্প+ঈয়স্ …; দ্র কনিষ্ঠ; …]”
এবং
“কনিষ্ঠ … [যূবন্, অল্প+ইষ্ঠ (ইষ্ঠন্) …; যুবন্, অল্প > কন (বিকল্পে), …; তু ‘কনা’—কনিষ্ঠা (ঋগ্বেদ ১০.৬১.৫)]”।
৬.৮। বাঙ্গালা ভাষার অভিধান লিখেছে:
“কনীয়ান্ … [অল্প+ঈয়ন্স্ (অত্যর্থে) অল্প=কন্=কনীয়ন্স্ ১মা, ১ব, স্ লোপ]”।
এবং বাংলায় এর প্রয়োগ দেখিয়েছে:
“ “রুক্মমালি রুক্মকেশ কনীয়ানে গণি ।
পঞ্চভাই মধ্যে একা রুক্মিণী ভগিনী ।।” ”
৬.৯। আমার বোঝবার জন্য সহজতম ভাষায় কনীয়ান-কনীয়সীর ব্যুৎপত্তি দিয়েছে অভিগম্য অভিধান:
“কনীয়ান … {(তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ) কন্ (অল্প)+ঈয়স্}”
এবং
“কনীয়সী … {(তৎসম বা সংস্কৃত শব্দ) কন্ (অল্প)+ঈয়স্+ঈ}”।
অভিগম্য অভিধান ‘কনীয়সী’-র প্রয়োগ দেখিয়েছে:
“(লোকের গতিবিধি অধিক না থাকায় কনীয়সী কথোপকথন আরম্ব [যদ্দৃষ্ট] করিলেন—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।”
৬.১০। যদি সংস্কৃতে ‘কন্’ অর্থ ‘অল্প’ হয়ে থাকে, তাহলে কনীয়ান-কনীয়সীর ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করতে ‘যুবন্’ আমদানি করার কী দরকার ছিল?
৬.১১। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় তার ‘ইউনিট ৪ পদ-প্রকরণ’ পাঠে তৎসম শব্দের অতিশায়ন প্রসঙ্গে লিখেছে:
“অল্প—কনীয়ান (দুয়ের তুলনায়)—কনিষ্ঠ (বহুর তুলনায়)।”
৬.১২। জ্যোতিভূষণ চাকী তাঁর বাংলা ভাষার ব্যাকরণে লিখেছেন:
“ ‘কনিষ্ঠ’ মানে সবচেয়ে ছোট, কিন্তু বাংলায় তা দুয়ের মধ্যে ছোট বোঝায় ; বয়সে শ্যামের কনিষ্ঠ । সংস্কৃতে এক্ষেত্রে ‘কনীয়ান্’ হত।”
৬.১৩। বাংলায় ‘কনীয়ান’ শব্দটি চমৎকারভাবে প্রয়োগ করেছেন দেবাশিস মজুমদার তাঁর ‘দোস্তি’ স্মৃতিচারণে, যেখানে তাঁর দোস্তটি প্রবাদপ্রতিম নবারুণ ভট্টাচার্য যাঁর প্রতিবাদী উচ্চারণ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ পাঠকমাত্রেরই কোনোদিন ভুলবার নয়:
“সত্যি বলছি, সাধুসঙ্গ করার মতো সাহিত্যিক সঙ্গ করার নেশায় ঘুরতে ঘুরতে পথের মাঝে এক ‘দোস্ত’-এর দেখা পেয়েছিলাম। সে ছিল ‘রিয়েলি বৌদ্ধিক’, ‘রিয়েলি বাপের বেটা’, ‘রিয়েল পাঠক’ যার কাছে বয়স কোন ফ্যাক্টর হয়নি। খ্যাতি মাপকাঠির সীমানা দিয়ে দূরত্ব তৈরি করেনি – ফলে আমি কেমন করে যেন হয়ে উঠেছিলাম তার কনীয়ান বন্ধুদের একজন। যাঁর কাছে অনেক কিছু শিখতে যেতাম।“
৬.১৪। themahabharatkatha.blogspot.com তার একটি পোস্টে [https://bit.ly/2W9u53f] রাজা দশরথের তৃতীয় স্ত্রী এবং অযোধ্যার রানি কৈকেয়ীকে আখ্যায়িত করেছে ‘কনীয়সী মহিষী’ বলে:
“মহীপতি দশরথ, ঈদৃশ আলোক সামান্য গুণ সম্পন্ন, অমোঘ পরাক্রম, প্রিয়তম জ্যেষ্ঠ পুত্র রামকে প্রজাগণের হিত সাধনে তৎপর দেখিয়া, প্রীতিপ্রফুল্ল হৃদয়ে প্রজাবর্গেরই শ্রেয়ঃ সাধনের উদ্দেশে, যৌবরাজ্য অভিষেক করিতে কৃতসংকল্প হইলেন। তাঁহার কনীয়সী মহিষী দেবী কৈকেয়ী যখন দেখিনে যে, রামের রাজ্যাভিষেকর আযোজন হইতেছে, তখন তিনি রাজা দশরথকে, পুর্বে অঙ্গীকৃত বরদ্বয় স্মরন করাইয়া দিয়া, এক বরে রামের নির্বাসন ও অপর বরে ভরতের রাজ্যাভিষেক প্রার্থনা করিলেন।“
[এখানে উদ্ধৃত-অংশে অপ্রমিত বানানগুলো মূল পাঠের।]
৬.১৫। ‘অর্ধতৎসম ও শব্দার্থতত্ত্ব’ [08_chapter 4] [https://bit.ly/35fcFXb] পৃ১৫৯ থেকে পাই চমকপ্রদ একটি শব্দ ‘কন্যান’, যা ‘কনীয়ান’ থেকে জাত:
“কন্যান < কনীয়ান। তৎসম অর্থ ‘দুই-এর মধ্যে ছোট, যুবতর’—অর্ধতৎসম অর্থ ‘বহু বিবাহিতের কনিষ্ট [যদ্দৃষ্ট; (কনিষ্ঠ)] বধূ]।”
ছোটো বউকে ‘কন্যান’ বলে আখ্যায়িত করতে শুনেছেন কখনো?
৬.১৬। কনীনিকা-কনীয়ান-কনীয়সী সমাচারের আপাতত এখানে ক্ষান্তি দিই; তবে, শেষ করার আগে বলি, আপনার মনোযোগ, ধৈর্য ও সময়ের জন্য ধন্যবাদ, এবং, শুভ সায়েম, প্রিয় শুবাচি!

 

তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে_৭
পশুর অধম ‘পশ্বধম’? না কি ‘পশ্বাধম’?
 
পশুর অধম ‘পশ্বধম’? না কি ‘পশ্বাধম’? না কি দুটি নির্মাণই শুদ্ধ, দুটিই প্রমিত—একটি তৎসম, অন্যটি অতৎসম?
কোনটি তৎসম, তথা, সংস্কৃত ব্যাকরণ-সমর্থিত?
এবং কোনটি সংস্কৃত ব্যাকরণ-বিদ্রোহী, সুতরাং, অতৎসম?
৭.১। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে ও অনুসন্ধান করতে আমাকে সম্প্রতি প্রণোদিত করেছেন
মিনহা সিদ্দিকা, যিনি ৩০ এপ্রিল ২০২০ শুবাচে প্রকাশিত তাঁর পোস্টে প্রশ্ন করেছেন:
“… সন্ধিতে উ বা ঊ-কার-এর পর উ বা ঊ-কার ছাড়া অন্য স্বর থাকলে উ বা ঊ-এর স্থানে ব-ফলা হয় এবং ব-ফলা প্রথম পদের শেষ বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়। যেমন: পশু+আচার= পশ্বাচার। সু+আগত= স্বাগত। অনু+ইত= অন্বিত। তাহলে, পশু+ অধম= ? [বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান বললে: পশ্বাধম, তা কীভাবে হই?]”
এবং
Md Ridwanullah, যিনি পোস্টের মন্তব্য-জানালায় ওই প্রশ্নের জবাবে বলেছেন:
“পশু+অধম
= পশ্উঅধম।
= পশ্‌বধম। [উঅ=ব]
= পশ্বধম।
‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ এবং ‘সংসদ বাংলা অভিধান’ বানানে ভুল করেছে।
‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ ভুল করেনি।”
৭.২। বাংলা রেফারেন্স বইগুলোতে এবং ব্যাকরণ পাঠের অনলাইন সাইটগুলোতে ‘পশ্বধম’ ও ‘পশ্বাধম’ দুটি রূপই পাই; কেউ সমর্থন করছেন ‘পশ্বধম’, কেউ আবার সমর্থন করছেন ‘পশ্বাধম’।
৭.৩। কেবল ‘পশ্বধম’ অন্তর্ভুক্ত করেছে কিন্তু ‘পশ্বাধম’ অন্তর্ভুক্ত করেনি, অন্যান্যের মধ্যে:
ক) বাংলা একাডেমি বাংলা বানান-অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ ফেব্রুয়ারি ২০০৮];
খ) বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান [পরিমার্জিত সংস্করণ ডিসেম্বর ২০০০]:
“পশ্বধম … পশুর চেয়েও অধম। {স. পশু+অধম}”;
এবং
গ) ভারতীয় বাঙলা ভাষার অভিধান:
“পশ্বধম … পশুর চেয়েও অধম বা নীচ। [সং. পশু + অধম]।”
৭.৪। কেবল ‘পশ্বাধম’ অন্তর্ভুক্ত করেছে কিন্তু ‘পশ্বধম’ অন্তর্ভুক্ত করেনি এবং শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা সম্পর্কে কোনো মন্তব্যও করেনি, অন্যান্যের মধ্যে:
ক) বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬; পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ: এপ্রিল ২০১৬]:
“পশ্বাধম … [স. পশু + অধম] … পশুর চেয়েও অধম”;
খ) শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের বাঙ্গালা ভাষার অভিধান [৩১ চৈত্র ১৩২৩]:
পশ্বাধম “[পশু(র) অধম] … পশুর অধম ; পশুর চেয়েও নীচ, বা অপকৃষ্ট ; অত্যন্ত নীচ ।”
গ) সংসদ বাংলা অভিধান নতুন সংস্করণ:
“পশ্বাধম … পশুর চেয়েও অধম বা নীচ। [সং. পশু + অধম]”;
ঘ) আশুতোষ দেব সংকলিত নূতন বাঙ্গালা অভিধান [সংশোধিত ৩য় সংস্করণ, ১৯৫৯; দেব সাহিত্য-কুটীর; কলিকাতা]:
“পশ্বাধম—পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট ; অত্যন্ত হীন প্রকৃতি । পশু হইতে অধম, ৫মীতৎ। বিণ ।”
এবং
ঙ) Online Bangla Dictionary বাংলা-ইংরেজী অভিধান:
“পশ্বাধম … পশুর চেয়েও অধম বা নীচ। [সং. পশু + অধম]।” 
এবং
“পশ্বাধম … (পশ্বাধম ব্যক্তি)”।
৭.৫। শব্দটির প্রয়োগ সম্পর্কে বা শব্দরূপটির সন্ধির শুদ্ধতা-অশুদ্ধতা সম্পর্কে মন্তব্য-সহ কেবল ‘পশ্বাধম’ অন্তর্ভুক্ত করেছে কিন্তু ‘পশ্বধম’ অন্তর্ভুক্ত করেনি, অন্যান্যের মধ্যে:
ক) শ্রীযোগেশচন্দ্র রায় সংকলিত বাঙ্গালাশব্দ-কোষ (১৩২০):
“পশ্বাধম (গ্রা°) … (পশু + অধম)। পশুর অধম।”
[যেখানে “গ্রা° গ্রাম্য, অশিক্ষিত নরনারীর ভাষায়।”];
এবং
খ) কাজী আবদুল ওদুদ সংকলিত ব্যবহারিক শব্দকোষ
[বহুল সংশোধিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ]:
“পশ্বাধম … পশুর চেয়ে অধম, অতি ঘৃণিত প্রকৃতির । [ পশু + অধম, ভুল সন্ধি ] ।”
৭.৬। দুটি রূপই অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং ‘পশ্বাধম’-কে ‘অপপ্রয়োগ’ বলেছে:
বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান
 [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬, পঞ্চম পুনর্মুদ্রণ জুন ২০০৮]:
“পশ্বাধম (অ-প্র), পশ্বধম … পশুর চেয়েও অধম। [স. পশু+অধম]”।
৭.৭। ব্যাকরণ বইগুলোর মধ্যে ‘পশ্বধম’-‘পশ্বাধম’ প্রসঙ্গে আমি যেটুকু পেয়েছি:
ক) জ্যোতিভূষণ চাকীর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬, তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৩] স্বরসন্ধির প্রযোজ্য সূত্রটি ব্যাখ্যা করে বলেছে:
“• উ, ঊ + উ, ঊ ছাড়া অন্য বর্ণ=উ স্থানে ব্‌ (অন্তঃস্থ) । ওই ব-য়ের পূর্ববর্ণে যুক্তি ।
সু+অল্প=স্বল্প, …, পশু+অধম=পশ্বধম, … ।”
খ) তারিক মনজুর প্রণীত ও আদর্শ থেকে ২০২০ সালে প্রকাশিত ই-বই ‘ব্যবহারিক ব্যাকরণ’-এর যেটুকু অনলাইন পড়া যায়, তা থেকে দেখা যায়, বইটি বলেছে:
পশ্বাধম’ ‘অশুদ্ধ কিন্তু প্রচলিত’, ‘শুদ্ধরূপ’ ‘পশ্বধম’; এবং উদাহরণ দিয়েছে:
অশুদ্ধ: “হীন চরিত্রবান লোক পশ্বাধম।”
শুদ্ধ: “চরিত্রহীন লোক পশ্বধম।”
৭.৮। অনলাইন বাংলা ব্যাকরণের পাঠে বা বিভিন্ন পরীক্ষার প্রস্তুতি-সহায়ক পাঠে দেখা যায় কেউ শেখাচ্ছেন ‘পশ্বধম’ শুদ্ধ, আবার কেউ শেখাচ্ছেন ‘পশ্বাধম’ শুদ্ধ; যেমন:
ক) সনাতন দা’র আড্ডা:
অশুদ্ধ: “হীন চরিত্রবান লোক পশ্বাধম।”
শুদ্ধ: “চরিত্রহীন লোক পশ্বধম।”
খ) Bcs-Effort সন্ধি বিষয়ে তার BCS Model Test-এ ‘পশু+অধম’ সন্ধির সঠিক উত্তর বলেছে ‘পশ্বাধম’।
৭.৯। খোদ বাংলা একাডেমিই যদি
• ১৯৯৬ সালে বলে ‘পশ্বাধম’ ‘অপপ্রয়োগ’ (দেখুন ৭.৬),
• ২০০০ সালে দেখায় [ভুক্তির শীর্ষশব্দ হিসেবে] ‘পশ্বধম’ প্রমিত (দেখুন ৭.৩খ),
• ২০০৮ সালেও বানান-অভিধানে রাখে বিকল্পহীন ‘পশ্বধম’ (দেখুন ৭.৩ক), এবং
• ২০১৬ সালে এসে দাবি করে বিকল্পহীন ‘পশ্বাধম’ ‘স.’ অর্থাৎ সংস্কৃত, এবং প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম-অনুসারী (দেখুন ৭.৪ক ও ৭.১০খii),
তাহলে ছাত্র-শিক্ষক-নির্বিশেষে সকলেই বিভ্রান্ত হবেন তাতে আশ্চর্যের কী আছে?
৭.১০।
ক) ‘পশ্বধম’-‘পশ্বাধম’ প্রমিত বানান নিয়ে দশকের পর দশক জুড়ে বাংলা একাডেমির ব্যাখ্যাহীন দোলাচল চলছে:
‘পশ্বধম’ যদি অন্তত ১৯৯৬ থেকে ২০১৬-র আগ পর্যন্ত বাংলা একাডেমির অভিধানভুক্ত হয়ে থাকে এবং ‘পশ্বাধম’ ‘অপপ্রয়োগ’ হয়ে থাকে,
‘পশ্বধম’ যদি ২০০০ সাল থেকে বাংলা একাডেমির অভিধানে ‘প্রমিত’ বলে আখ্যায়িত হয়ে থাকে,
তাহলে
২০১৬ সালে কেন ও কীভাবে ‘পশ্বধম’ অভিধান থেকে নির্বাসিত হয়ে গেল এবং ‘পশ্বাধম’ প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম-অনুসারী হয়ে অভিধানে ঠাঁই পেল,
আমরা কি আশা করতে পারি না বাংলা একাডেমি তার একটি ব্যাখ্যা দেবে?
খ) লক্ষ করে থাকবেন,
i) ২০০০ সালে বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান
• পৃষ্ঠা ছয়ে বলেছে, “অভিধা অংশ এবং ভুক্তি-উপভূক্তির [যদ্দৃষ্ট; (হওয়ার কথা: ভুক্তি-উপভুক্তির)] শীর্ষশব্দের প্রথমটির বানান বাংলা একাডেমীর প্রমিত বানান অনুযায়ী করা হয়েছে,” এবং
• পৃষ্ঠা বাইশে বলেছে, “… ভুক্তির শীর্ষশব্দ হিসেবে একই শব্দের জন্য একাধিক বানান থাকলে সেক্ষেত্রে প্রথম বানানটির বানান প্রমিত করা হয়েছে, এবং সেই অনুযায়ী ভুক্তিটি বিন্যস্ত করা হয়েছে ।” এবং
ii) ২০১৬ সালে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান তার মুখবন্ধে দাবি করেছে, “এই অভিধানে ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘বাংলা একাডেমি প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ অনুসরণ করা হয়েছে।”
৭.১১। আমার বোধে, ‘পশ্বধম’-‘পশ্বাধম’ সমস্যার সহজ সমাধান:
প্রমিত১: পশ্বধম—সংস্কৃত বা তৎসম প্রমিত শব্দ;
প্রমিত২: পশ্বাধম—অতৎসম প্রমিত শব্দ।
একটি শব্দের প্রমিত রূপ ক্ষেত্রবিশেষে একাধিক হতেই পারে এবং তা দেখানো যেতে পারে ‘প্রমিত১’, ‘প্রমিত২’ ইত্যাদি সংকেত ব্যবহার করে; যেমন, প্রমিত১: আজান, প্রমিত২: আযান; প্রমিত১: মন্ত্রিসভা, প্রমিত২: মন্ত্রীসভা; ইত্যাদি।
৭.১২। কথাবার্তায় আপনি কি কখনো ব্যবহার করেছেন ‘পশ্বধম’ বা ‘পশ্বাধম’, অথবা শুনেছেন কাউকে ওই শব্দ দুটির কোনো একটি ব্যবহার করতে? বরং, প্রকৃতপক্ষে, একই ভাব প্রকাশ করতে আমরা কি ‘পশুর অধম’ বা ‘পশুরও অধম’ শব্দবন্ধ স্বাভাবিক- ও সাবলীলভাবে ব্যবহার করি না?
৭.১৩। শেষকথা:
যে শব্দরূপের সন্ধি ও বানানরূপের ব্যাকরণিক শুদ্ধতা নিয়ে বাংলার দিগ্‌গজদের মধ্যেই মতৈক্য নেই, বাংলা একাডেমির অবস্থানেরই স্থিরতা নেই—বাংলা একাডেমির সাম্প্রতিক অভিধান দুটির একই সম্পাদক ২০০৮-এ বাংলা বানান-অভিধানে অন্তর্ভুক্ত করলেন বিকল্প-না-রেখে কেবল ‘পশ্বধম’ আর ২০১৬-তে আধুনিক বাংলা অভিধানে বিকল্প-না-রেখে কেবল ‘পশ্বাধম’—সে-অবস্থায়, সে-শব্দরূপ নিয়ে শিক্ষার্থীদের বহু-নির্বাচনি প্রশ্ন করাটা শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষা-কর্তৃপক্ষের স্রেফ নিষ্ঠুরতা নয় কি?
আপনার মনোযোগ, ধৈর্য ও সময়ের জন্য ধন্যবাদ, এবং, শুভ সিয়াম, প্রিয় শুবাচি!

 

তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে_৮
‘অক্ষৌহিণী’ শব্দটির অর্থ, ব্যুৎপত্তি, সমাস, সন্ধি ও ণত্ববিধি
৮.১। ১৭ মে ২০২০ শুবাচে প্রকাশিত মিনহা সিদ্দিকা-র একটি পোস্ট ও ওই পোস্টের ওপর বিদগ্ধ শুবাচিদের মন্তব্য পড়ার যুগপৎ সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য সম্প্রতি আমার হয়েছে।
পোস্টদাতা প্রশ্ন করেছেন:
“অক্ষৌহিণী= অক্ষ+ঊহিনী। এটি দুটি শব্দ দিয়ে গঠিত। তাই সাধারণভাবে ণত্ববিধি কার্যকর হওয়ার কথা নয়।
“তবু, অক্ষৌহিণী বানানে ণ কেন?”
সৌভাগ্য এজন্য যে, উপস্থাপিত প্রশ্নটি ণত্ববিধির—বাংলা ব্যাকরণের প্রশ্ন মনে হলেও ওটা প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃত ব্যাকরণের—এবং প্রশ্নটির সমাধান খোঁজায় অংশগ্রহণকারীদের প্রবল আগ্রহ দেখা গেছে, এবং পোস্টটির মন্তব্য-জানালায় আলোচনার পর্যায়ক্রমে কৌতূহলসঞ্চারী অনেক রেফারেন্স উঠে এসেছে।
এবং দুর্ভাগ্য এজন্য যে, আমার মনে হয়েছে, ওখানে শিষ্টাচার—বিশেষ করে শুবাচের নীতিমালায় ঘোষণা-করা শুবাচি শিষ্টাচারবারবার লঙ্ঘিত হয়েছে, এবং সেটা শুবাচেরই একজন অ্যাডমিনের লেখায় স্পষ্টত উন্নাসিক- ও তিরস্কারমূলক ভাষা-ব্যবহারের কারণে:
ক) “অলক দেব বাবুর কথা বিশ্বাস করবেন না। উনি প্রশ্নটিই বুঝেননি, উত্তর দেবেন কী! এরকম কিছু লোক আছেন, প্রশ্ন না বুঝে উত্তর দেন। ভীষণ খারাপ লাগে।”
খ) “আপনার মতো বিজ্ঞ লোকের কাছ থেকে এমন সাধারণ ও ভুল উত্তর আশা করিনি। কীভাবে এমন বিভ্রান্তিকর উত্তর দিলেন, বিশ্বাসই হচ্ছে না, এ উত্তর আপনার। অক্ষৌহিণী সাধিত শব্দ। যেমন: হরিনাম, দুর্নাম, ত্রিনয়ন। এখানে ণ নেই কেন?”
গ) “বিনয়ের সঙ্গে বলছি, প্রশ্ন না বুঝে উত্তর দেবেন না। ভুল উত্তর দিয়ে আপনার কী লাভ হলো?”
ঘ) হরিনাম, ত্রিনয়ন, দুর্নাম কী দোষ করল? বিনয়ের সঙ্গে বলছি, প্রশ্ন না বুঝে উত্তর দেবেন না। ভুল উত্তর দিয়ে আপনার কী লাভ হলো?
ঙ) “অক্ষৌহিণী কি অসমাসবদ্ধ শব্দ? আমি তো প্রশ্নেই লিখে দিয়েছি। অক্ষ+ ঊহিণী। চুপ করে থাকুন। আপনার ধারণা সম্পর্কে আমার ধারণা হয়ে গেছে। ক্ষমা চয়ে নিচ্ছি।”
চ) “এমন বিজ্ঞ লোক সবাই- ভুল উত্তর দিলেন। মহোদয়গণ, ভুল উত্তর দেবেন না। উত্তর দিতে আপনি বাধ্য নন। আমি জানি না বলে প্রশ্ন করি।”
ছ) “আপনিও তো দেখি ভুলভাল উত্তর দিয়ে নিজেকে প্রকাশের জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছেন। না জানলে চুপ করে থাকুন। আমি উত্তর পেয়ে গেছি। আর লাগবে না। দয়া করুন।”
এ-অবস্থায় শুবাচি Md Ridwanullah বললেন, “সেই উত্তরটি আমাকেও জানান।” কিন্তু, হায়, [রবিঠাকুরের ভাষায়,] ‘মেলেনি উত্তর’।
শুবাচের মঞ্চে তথ্য ও জ্ঞান শেয়ার করার শুবাচি সুনীতিটি স্তব্ধ হয়ে রইল।
৮.২। আমাদের আলোচ্য তৎসম তথা সংস্কৃত ‘অক্ষৌহিণী’ শব্দটির সাপেক্ষে ‘অক্ষ’, ‘ঊহিণী’ ও ‘অক্ষৌহিণী’ মানে কী?
—‘অক্ষ’ মানে ‘রথ’; ‘ঊহিণী’ মানে ‘ঊহযুক্তা’; ‘ঊহ’ মানে ‘সমূহ’; ‘সমূহ’ মানে ‘সকলপ্রকার, …, অনেক’; ‘অক্ষৌহিণী’ মানে ‘সংখ্যাবিশেষযুক্ত রথাদি চতুরঙ্গ সেনা।’
সূত্র: সাহিত্য অকাদেমী নিউ দিল্লী থেকে প্রকাশিত হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বঙ্গীয় শব্দকোষ [প্রথম খণ্ড, অ-ন, প্রথম প্রকাশ ১৩৪০-৫৩, ১৯৪৬] এবং [দ্বিতীয় খণ্ড, প-হ, প্রথম প্রকাশ ১৩৪০-৫৩, ১৯৪৬]।
৮.৩। ‘অক্ষৌহিণী’ ও ‘ঊহিণী’ শব্দের ব্যুৎপত্তি কী?
ক) বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান [প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০১৬; পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ: এপ্রিল ২০১৬] বলেছে:
“অক্ষৌহিণী … [স. অক্ষ+ঊহিনী]”; “ঊহিনী … [স. √ঊহ্+ইন্+ঈ]”।
খ) বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান [পরিমার্জিত সংস্করণ ডিসেম্বর ২০০০-এর চতুর্দশ পুনর্মুদ্রণ: আষাঢ় ১৪১৮/জুন ২০১১] একইভাবে বলেছে:
“অক্ষৌহিণী … {স. অক্ষ+ঊহিনী}”; “ঊহিনী … {স. √ঊহ্+ইন্+ঈ}”।
গ) সংসদ বাঙ্গালা অভিধান [শৈলেন্দ্র বিশ্বাস; সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা; চতুর্থ সংস্করণ ১৯৮৪] বলেছে:
“অক্ষৌহিণী … [স. অক্ষ+ঊহিনী]”; “ঊহিনী … [সং]”।
ঘ) চলন্তিকা/আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান [রাজশেখর বসু সংকলিত ও কলিকাতা থেকে প্রকাশিত সংশোধিত ও পরিবর্ধিত নবম সংস্করণ, ১৩৬২ বঙ্গাব্দ] ‘অক্ষৌহিণী’ ও ‘ঊহিণী’ অন্তর্ভুক্ত করলেও অভিধানটি ওদের ব্যুৎপত্তি দেখায়নি।
ঙ) ব্যবহারিক শব্দকোষ [কাজী আবদুল ওদুদ সংকলিত ও প্রেসিডেন্সী লাইব্রেরী কলিকাতা থেকে প্রকাশিত; বহুল সংশোধিত ও পরিবর্ধিত সংস্করণ, ১৩৫৬ বঙ্গাব্দ] বলেছে:
“অক্ষৌহিণী … [ অক্ষ—উহ্+ণিন্]।”
তবে, ব্যবহারিক শব্দকোষ ‘ঊহিণী’-র ব্যুৎপত্তি দেখায়নি।
চ) বঙ্গীয় শব্দকোষ বলেছে:
“অক্ষৌহিণী স্ত্রী [ অক্ষ+ঊহিনী, বৃদ্ধি, ণত্ব ( পা ৬.১.৮৯, বার্ত্তিক ) ; ষ ত ]”; “ঊহিনী স্ত্রী [ উহ্+ইন্ (ইনি) অস্ত্যর্থে+স্ত্রী ঈ ( ঙীপ্ ) ]”।
ছ) বাঙ্গালা ভাষার অভিধান [শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস; ৩১ চৈত্র ১৩২৩] বলেছে:
“অক্ষৌহিণী [ অক্ষ (গজাদি) + উহিনী [যদ্দৃষ্ট] (সংখ্যাকারিণী ; নির্ণয়কারিণী ।=উহ (বিতর্ক করা) + ইন্ (র্ত্তৃ)=স্ত্রীং ঈপ্ । অশ্বগজাদির সংখ্যাকারিণী=৬ তৎ ]”; “ঊহিনী [ উহ=ইন্ (জ্ঞা◦) স্ত্রীং=ঈ) ]”।
জ) বৃহৎ সচিত্র প্রকৃতিবোধ অভিধান (১৮৮৪) বলেছে: “অক্ষৌহিণী, অক্ষ=গজাদিসমূহ+উহিনী [ উহ্+ণিন্ –ঘ ]”।
ঝ) প্রকৃতিনির্ণয় অভিধান [দুর্গাচরণ-পূর্ণচন্দ্র; ১৮৮০] লিখেছে: “অক্ষৌহিণী, (অক্ষ গজাদি সমূহ—ঊহিনী [ ঊহ্ তর্ক করা, পাওয়া + ইন্—ক ] যে পায়, যে গজাদি সমূহ পায়, ২য়া—ষ)”।
৮.৩। ‘অক্ষৌহিণী’ কি সমাসসাধিত শব্দ?
—নিশ্চয়ই সমাসসাধিত। দেখুন: ৮.২চ (ষ ত=‘ষষ্ঠীতৎপুরুষ সমাস’); ৮.২ছ (‘৬ তৎ’); ৮.২ঝ (‘২য়া—ষ’)।
৮.৪। লক্ষ করে থাকবেন, ‘অক্ষৌহিণী’-র ব্যুৎপত্তি ও সমাস রেফারেন্স বইগুলোতে একাধিক মুনি একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
৮.৫। ‘অক্ষৌহিণী’ কি সন্ধিসাধিত?
—নিশ্চয়ই সন্ধিসাধিত: অক্ষ+ঊহিনী; তবে কথা আছে। ‘অক্ষৌহিণী’-তে সন্ধির নিয়ম—অ+ঊ=ও (ও-কার)—রক্ষিত হয়নি।
“অক্ষ+ঊহিনী= অক্ষৌহিণী (হওয়া উচিত অক্ষোহিণী)”।
সূত্র:
 জ্যোতিভূষণ চাকীর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬, তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৩]।
৮.৬। ‘অক্ষৌহিণী’ শব্দটি কি ণত্ববিধির আওতায় আসে?
—জি, আসে।
ক) ‘অক্ষৌহিণী’-র জন্য প্রায় আড়াই হাজার বছর ধরে প্রযোজ্য পাণিনির সূত্র ‘( পা ৬.১.৮৯, বার্ত্তিক )’।
সূত্র: বঙ্গীয় শব্দকোষ।
খ) “যেখানে দুইটি পদ মিলিয়া একটি পদ হইয়াছে,” সেখানে “পূর্বপদে ণত্বের নিমিত্ত থাকিলে ণত্ব হয় :-

“২। সম্পূর্ণ পদটি সংজ্ঞা বা বিশিষ্ট নাম ( Proper Noun ) বুঝাইলে পর-পদের ‘ন’-কারের—রামায়ণম্, নারায়ণঃ, শূর্পণখা, অক্ষৌহিণী।”

সূত্র: সংস্কৃত ত্রিবিদ্যা; অধ্যাপক হিমাংশু প্রসাদ ভট্টাচার্য্য; প্রথম প্রকাশ ১৩৬১ বঙ্গাব্দ, মণ্ডল এ্যাণ্ড সন্স, কলিকাতা।
গ) “পূর্বপদাৎ সংজ্ঞায়ামগঃ ( ৮।৪।৩ )—ণত্বের নিমিত্ত পূর্বপদে থাকিলে সংজ্ঞা বুঝাইলে এবং গকার ব্যবধান না থাকিলে পরপদস্থিত ন ণ হয় । যথা,— দ্রুণসঃ, শূর্পণখা, নারায়ণঃ, অগ্রহায়ণঃ, অক্ষৌহিণী । সংজ্ঞা না বুঝাইলে হয় না — যথা,—দীর্ঘনয়না । গকার ব্যবধানেও হয় না। যথা, —ঋগয়নম্ ।”
সূত্র: পাণিনীয়ম্ A Higher Sanskrit Grammar and Composition [Chapter 1_1-82 p]।
ঘ) পাণিনিঃ/প্রভাখ্য-টীকা-সমেতঃ [অধ্যাপক-শ্রীদেবেন্দ্রকুমার-দেবশর্ম্মণাম্‌; সান্ন্যাল এণ্ড কোং, কলিকাতা, ১৩১৭] [৩৮৪] পৃষ্ঠায় ব্যাখ্যা করেছে ‘অক্ষৌহিণী’-র পাণিনীয় ব্যাকরণিক পরিচয়:
“অক্ষৌহিণী-শব্দস্তু পরিমাণ-বিশেষস্য সংজ্ঞা । অক্ষাদ্‌ ঊহিন্যাম্‌ ইতি তু ব্যুৎপত্তিমাত্রম্‌, ন সংজ্ঞা, অক্ষং প্রশস্তং যেষাং তে অক্ষাঃ (পটু-করণাঃ) যোধাঃ, তেষাম্‌ ঊহঃ (সমূহঃ) যস্যাং সেনায়াং সা অক্ষৌহিণী ।”
৮.৭। “হরিনাম, দুর্নাম, ত্রিনয়ন। এখানে ণ নেই কেন?”
ক) “সমাসবদ্ধ দুই পদেরই অর্থের প্রাধান্য থাকায় নিম্নের শব্দগুলোতে ‘মূর্ধন্য-ণ’-র পরিবর্তে ‘দন্ত্য-ন’ ব্যবহৃত হবে ।
“যেমন : ত্রিনয়ন, সর্বনাম, দুর্নীতি, দুর্নাম ইত্যাদি।”
সূত্র: বাংলা লেখার নিয়মকানুন/বানান ও ভাষারীতির গাইড-বুক 
[হায়াৎ মামুদ; পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত তৃতীয় সংস্করণ ২০০৩; প্রতীক]।
খ) “যেখানে দুইটী পদ মিলিয়া একটী শব্দ, সেখানে উপরের [২] ও [৩]-এর নিয়ম কার্য্যকর হয় না, যথা—<< দুর্নাম ( ‘দুর্+নাম’—‘দুর্ণাম’ নহে ), হরিনাম ( ‘হরিণাম’ নহে ), ত্রিনয়ন, বারিনিধি >> ইত্যাদি ।”
সূত্র: সংক্ষিপ্ত ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ [সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়; বেঙ্গল পাব্‌লিশার্স, কলিকাতা; প্রথম সংস্করণ, শ্রাবণ ১৩৫২ (আগস্ট ১৯৪৫)]।
গ) “ত্রিনয়ন … [ক্ষুভ্নাদি হেতু সংজ্ঞায় ণত্বাভাব]”।
সূত্র: বঙ্গীয় শব্দকোষ।
ঘ) “( ন ) ক্ষুভ্নাদিষু চ ( ৮।৪।৩৯ )— ক্ষুভ্নাদি শব্দের ন ণ হয় না। যথা— ক্ষুভ্নাতি, তৃপ্নোতি, নরীনৃত্যতে, নৃনমনঃ ( কাহারও নাম ), পুনর্নবা হরিনন্দনঃ, দুর্নয়ঃ, দুর্নীতম্ রামমোহনঃ হরিমোহনঃ কিশোরীমোহনঃ, ত্রিনয়না মৃগনেত্রা, সর্বনাম, আচার্যানী ইত্যাদি।”
সূত্র: পাণিনীয়ম্ A Higher Sanskrit Grammar and Composition [Chapter 1_1-82 p]।
ঙ) “ণত্ব নিষেধ
“যুবাদের্ন, ক্ষুভ্নাদিষু চ—ণত্বের নিমিত্ত থাকিলেও যুবন্ প্রভৃতি এবং ক্ষুভ্নাদির অন্তর্গত পরবর্ত্তী শব্দে ণত্ব হয় না । যথা—ক্ষত্রিয়যুনঃ, পরিপক্বানি। ত্রিনয়নঃ, ত্রিনেত্রা, রঘুনাথঃ, সর্বনাম, দুর্নাম, দুর্নীতিঃ, নরীনৃত্যতে, হরিনন্দনঃ, শরাগ্নি ইত্যাদি।”
সূত্র: সংস্কৃত ত্রিবিদ্যা; অধ্যাপক হিমাংশু প্রসাদ ভট্টাচার্য্য; প্রথম প্রকাশ ১৩৬১ বঙ্গাব্দ, মণ্ডল এ্যাণ্ড সন্স, কলিকাতা।
৮.৮। ‘ক্ষুভ্নাদি’ মানে কী?
“ক্ষুভ্নাদি ( পুং ) ক্ষুভ্ন আদির্যস্য বহুব্রী । পাণিনির একটি গণ । ক্ষুভ্ন, নৃনমন, নন্দিন্, নন্দন, নগর, হরিনন্দী, হরিনন্দন, গিরিনগর, যঙন্ত নৃতধাতু, নর্ত্তন, গহন, নিকেশ, নিবাস, অগ্নি ও অনূপ এই কয়টি শব্দ উত্তরপদ হইলে ক্ষুভ্নাদি গণান্তর্গত।”
সূত্র:
 বিশ্বকোষ চতুর্থ ভাগ; শ্রীনগেন্দ্রনাথ বসু; কলিকাতা, ১৩০০ সাল।
৮.৯। আপনার আগ্রহ, মনোযোগ ও ধৈর্যের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, প্রিয় শুবাচি!

 

তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে_৯
৯.১। ‘বিশ’ অতৎসম; ‘বিংশ’ ও ‘বিংশতি’ তৎসম।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (২০১৬) ওদের ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছে এভাবে:
“বিশ … [স. বিংশতি >]”;
“বিংশ … [স. বিংশতি+অ]”; এবং
“বিংশতি … [স. দ্বিদশৎ+শতি]”।
অনুরূপভাবে, ‘ত্রিশ’ অতৎসম; ‘ত্রিংশ’ ও ‘ত্রিংশৎ’ তৎসম।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান ওদের ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছে:
“ত্রিশ … [স. ত্রিংশৎ>]”;
“ত্রিংশ … [স. ত্রিংশৎ+অ]”; এবং
“ত্রিংশৎ … [স. ত্রি+দশৎ]”।
৯.২। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানের পূর্বসূরি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান ওদের ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছে:
“বিশ … {স. বিংশতি, বিংশ>}”;
“বিংশ, বিংশতি … {স. বিংশতি(দ্বি+দশৎ+শতি)+অ (ডট্)>বিংশ}”।
অনুরূপভাবে, ‘ত্রিশ, তিরিশ’ অতৎসম; ‘ত্রিংশ’ ও ‘ত্রিংশৎ’ তৎসম।
ওই অভিধান এ-শব্দগুলোর ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছে:
“ত্রিশ, তিরিশ … { স. ত্রিংশৎ>}”;
“ত্রিংশ … {স. ত্রিংশৎ>}”।
৯.৩। তারও আগে, ১৯৯৬ সালে, বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান বলেছে:
“বিশ … [স. বিংশতি, বিংশ>]”;
“ত্রিশ, তিরিশ … [স. ত্রিংশৎ>]”; এবং
“ত্রিংশ … [স. ত্রিংশৎ>]”।
৯.৪। এটা কৌতূহলজনক যে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান তার পূর্বসূরিদের উল্লেখ-করা ব্যুৎপত্তি সীমিত করে দিয়ে ২০১৬ সালে বলল, ‘বিশ’ এসেছে সুনির্দিষ্টভাবে ‘বিংশতি’ থেকে, এবং ‘বিংশ, বিংশতি’ থেকে নয়।
৯.৫। আমার তো মনে হয়, যেহেতু ‘বিংশ’ ও ‘বিংশতি’ দুটোই সংস্কৃত, আমাদের ‘বিশ’ সংস্কৃত ‘বিংশ’ থেকে এসেছে বলাটাই সংগততর; কেননা, ‘বিংশতি’ থেকে ‘বিংশ’ হয়েই ‘বিশ’ হওয়াটা অধিকতর সম্ভাব্য, ‘বিংশতি’ থেকে সরাসরি ‘বিশ’ হওয়ার চেয়ে।
৯.৬। আমার জন্য আরও কৌতূহলজনক:
ক) বিংশতি+অ=বিংশ; এবং ত্রিংশৎ+অ=ত্রিংশ।
‘অ’ প্রত্যয় যোগ হওয়ায় ‘বিংশতি’-র ‘তি’ ও ‘ত্রিংশৎ’-এর ‘ৎ’ কেন ও কোন নিয়মে হারিয়ে গেল?
এবং,
খ) ‘বিংশতি’-র ব্যুৎপত্তি ‘[স. দ্বিদশৎ+শতি]’ বা ‘(দ্বি+দশৎ+শতি)’-তে ‘শতি’ মানে কী? ‘শতি’ কি কোনো অর্থপূর্ণ সংস্কৃত শব্দ?
এবং,
গ) ‘শতি’-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে ‘দ্বিদশৎ’ বা ‘দ্বি+দশৎ’ কীভাবে ও কোন নিয়মে ‘বিং’ হয়ে গেল?
৯.৭। অশোক মুখোপাধ্যায়ের সংসদ ব্যাকরণ অভিধান [পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, ২০০৫] থেকে পাই:
“ডট্‌ (অ) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। শব্দে যোগ হলে ‘ড্’, ‘ট্’ বাদ যায়, ‘অ’ থাকে। ▷বিংশতি + অ (ডট্) = বিংশ; … ত্রিংশৎ + অ (ডট্) = ত্রিংশ।”
৯.৮। সংসদ ব্যাকরণ অভিধানও কিন্তু আমাদের জানাল না ডট্ (অ) প্রত্যয় যুক্ত হওয়ার ফলে ‘বিংশতি’-র ‘তি’ ও ‘ত্রিংশৎ’-এর ‘ৎ’ কেন ও কোন নিয়মে লুপ্ত হয়ে গেল।
৯.৯। সংস্কৃত-অজ্ঞ বাংলা-শিক্ষার্থী আমাদের জন্য তৎসম বা অন্য কোনো বিদেশি শব্দের ব্যুৎপত্তি জানাটা কি একেবারে অপরিহার্য, বিশেষত এমন শিক্ষার্থী-বৈরী ব্যুৎপত্তি-পাঠের পটভূমিতে?
৯.১০। আপনি কী বলেন? প্রিয় শুবাচি!
 
তৎসম শব্দের কণ্টকারণ্যে_১০

১০.১। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান
 ‘সর্বজনীন’ ও ‘সার্বজনীন’ শব্দ দুটোর ব্যুৎপত্তি দেখিয়েছে অভিন্ন রূপে, যথা:
“সর্বজনীন … [স. সর্বজন+ঈন]”
এবং
“সার্বজনীন … [স. সর্বজন+ঈন]”।

১০.২। এ-প্রেক্ষিতে শুবাচি Rupam Mahmud জানতে চেয়েছেন:
“এখন কোথাও যদি প্রশ্ন করা হয়, “‘সর্বজন’ ধাতুর সাথে ‘ঈন’ প্রত্যয় যুক্ত হলে কী হবে?”- তখন উত্তর কী দেবো? সর্বজনীন, না কি সার্বজনীন?”

১০.২। Rupam Mahmud, স্পষ্টতই, বাংলা শিক্ষার্থীর দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গভীর, বুদ্ধিদীপ্ত ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন।

১০.৩। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান তৎসম ‘সর্বজনীন’ ও ‘সার্বজনীন’ শব্দ দুটোর দৃশ্যত অভিন্ন ব্যুৎপত্তি নির্দেশ করে আমাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করার পরিবর্তে বরং ধূম্রজাল সৃষ্টি করেছে এবং নতুনতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

১০.৪। প্রকৃতপক্ষে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান ‘সর্বজনীন’ ও ‘সার্বজনীন’-এর ব্যুৎপত্তিতে ‘সর্বজন’-এর সঙ্গে যুক্ত যে প্রত্যয় ‘ঈন’ দেখিয়েছে তা অনুবন্ধহীন রূপে অভিন্ন দেখালেও, অনুবন্ধযুক্ত রূপে তাদের প্রকৃত পরিচয় যথাক্রমে ‘খ’ ও ‘খঞ্‌’, যা থেকে বোঝা যায় ওরা দুটি ভিন্ন প্রত্যয়!

১০.৫। তাঁর বাংলা ভাষার ব্যাকরণ [প্রথম প্রকাশ ১৯৯৬, তৃতীয় মুদ্রণ ২০১৩] বইটির ১৩৪ পৃষ্ঠায় জ্যোতিভূষণ চাকী বলেছেন:
“ঈন১ ( <খ) : … হিতার্থে : সর্বজনীন, … ।
“ঈন২ ( <খঞ্‌) : যোগ্য অর্থে : সর্বজন+ঈন=সার্বজনীন, … । আদ্যস্বরে ‘খঞ্‌’ জাত ‘ঈন’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দের বৃদ্ধি হয় (অ > আ) … ।”

১০.৬। অশোক মুখোপাধ্যায়ের সংসদ ব্যাকরণ অভিধান
 [পরিবর্ধিত তৃতীয় সংস্করণ, ২০০৫] থেকে পাই:

“খ২ (ঈন) : সংস্কৃত তদ্ধিতপ্রত্যয়। এই প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে ‘ঈন’ হয়। ▷ … সর্ব-জন + ঈন (খ) = সর্বজনীন; … ।”

১০.৭। ‘সর্বজনীন’ ও ‘সার্বজনীন’-এর ব্যুৎপত্তি বিষয়ে এটুকুইমাত্র আমি জানতে পেরেছি, যা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করে আমি আনন্দিত।

আপনাদের আগ্রহ ও মনোযোগের জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ, প্রিয় শুবাচি!
 
 
কিছু প্রয়োজনীয় সংযোগ
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
 
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
— — — — — — — — — — — — — — — — —
Spelling and Pronunciation
 
error: Content is protected !!