থাইল্যান্ড (Thailand) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

থাইল্যান্ড (Thailand)

থাই জনগোষ্ঠীর ভূমিকে থাইল্যান্ড বলা হয়। অনেক প্রাচীনকাল হতে এ এলাকার কেন্দ্রীয় সমতল ভূমিতে ‘থাই’ নামের এক নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী বসবাস করে আসছিল। ‘থাই’ শব্দের প্রকৃত অর্থ নিয়ে সংশয় থাকলেও অনেকের মতে শব্দটির অর্থ জনগণ বা মানবসমাজ। এখনও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় লোকজন বা মানবসমাজ প্রকাশের জন্য থাই শব্দের প্রতিশব্দ ‘খোন’ ব্যবহার করা হয়। তবে ‘থাই’ নামের অর্থ সম্পর্কে যে প্রবাদটি অধিক প্রচলিত সেটি স্বাধীন প্রবাদ নামে খ্যাত। ‘থাই’ শব্দের অর্থ স্বাধীন। সুতরাং, থাইল্যান্ড অর্থ স্বাধীন ভূমি। অনেকে মনে করেন, দেশটি প্রাচীনকাল হতে কখনও অন্য কোনো বহিঃশক্তির অধীনে ছিল না। তাই এর নাম থাইল্যান্ড বা স্বাধীন ভূমি। থাইল্যান্ডের প্রাচীন নাম শ্যাম দেশ। শ্যাম পালি ভাষার একটি শব্দ। এর অর্থ ল্যান্ড অভ গড বা ঈশ্বরের ভূমি। আবার অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত শান ও আ-হম শব্দ হতে শ্যাম শব্দের উৎপত্তি। যার অর্থ অন্ধকার।

থাইল্যান্ড বা তাইল্যান্ড দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি রাষ্ট্র। সরকারি নাম তাইরাজ্য। এর বৃহত্তম শহর ও রাজধানীর নাম ব্যংকক। থাইল্যান্ড একমাত্র দক্ষিণ-পূর্ব এশীয়র রাষ্ট্র, যা যুদ্ধকালীন ব্যতীত কখনও কোনো ইউরোপীয় বা বিদেশি শক্তির নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ১৭৮২ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশটিতে পরম রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্রোহীরা অভ্যুত্থান ঘটায় এবং দেশে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশটি শ্যামদেশ নামে পরিচিত ছিল। ওই বছর এর নাম বদলে থাইল্যান্ড রাখা হয়। তবে ১৯৪০-এর দশকের শেষের দিকে আবারও একে শ্যামদেশ নামে ডাকা হতো। ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দ্বিতীয় বারের মত থাইল্যান্ড নামটি গ্রহণ করা হয়।

থাইল্যান্ডের আয়তন ৫,১৩,১২০ বর্গ কিলোমিটার বা ১,৯৮,১১৫ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগ ০.৪ বা ২,২৩০ বর্গ কিলোমিটার। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, থাইল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা ৬,৭০,৯১,১২০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার জনসংখ্যা ১৩২। আয়তন বিবেচনায় থাইল্যান্ড পৃথিবীর ৫১-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ২০-তম। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ৮৮-তম।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, থাইল্যান্ডের জিডিপি (পিপিপি) ১.১০৭ ট্রিলিয়ন ইউএস ডলার (২২-তম), সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ১৬,০৮১ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৩৭৩.৫৩৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার (২২-তম), সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৫,৪২৬ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম বাথ।

জনসংখ্যার ৭৫-৭৮% থাই, ১৪% থাই চায়নিজ এবং ১২% অন্যান্য জনগোষ্ঠীর লোক। বুড্ডিজম থাইল্যান্ডের প্রধান ধর্ম। ৯৫% লোক এ ধর্মের অনুসারী। পৃথিবীর কয়েকটি চলমান পতাকার মধ্যে থাইল্যান্ডের পতাকা অন্যতম। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ সেপ্টেম্বর পতাকাটি গৃহীত হয়।থাইল্যান্ডের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ থাই জাতির মানুষ। এরা প্রায় সবাই তেরাভাদা বৌদ্ধধর্ম পালন করে। থাইল্যান্ডে বসবাসকারী অন্যান্য জাতির মধ্যে চীনা, মালয় ও আদিবাসী পাহাড়ি জাতি- মং ও কারেন উল্লেখযোগ্য। থাইল্যান্ডের পরিশীলিত ধ্রুপদী সঙ্গীত ও নৃত্য এবং লোকশিল্প বিশ্ব বিখ্যাত। কৃষিপ্রধান দেশ হলেও ১৯৮০-র দশক থেকে থাইল্যান্ডের অর্থনীতির দ্রুত উন্নতি ঘটছে।

থাইল্যান্ডকে ভৌগোলিকভাবে কয়েকটি অঞ্চলে ভাগ করা যায়। উত্তরাঞ্চল পাহাড়ি। এ দেশের সর্বোচ্চ শিখর দোই ইন্থাননের উচ্চতা ২,৫৭৬ মিটার (৮,৪৫১ ফুট)। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে রয়েছে খোরাত মালভূমি, যার পূর্বসীমা দিয়ে বয়ে চলেছে মেকং নদী। দেশের মধ্যাঞ্চলের বৃহদাংশ জুড়ে আছে চাও ফ্রায়া নদীর প্রধান সমতল উপত্যকা।

থাই ভাষার আদর্শ রূপ থাইল্যান্ডের সরকারি ভাষা। আদর্শ থাই ভাষাতে প্রায় ৪০% লোক কথা বলে। থাই ভাষার অন্যান্য উপভাষায় আরও প্রায় ৫০% লোক কথা বলে। থাইল্যান্ডে আরও প্রায় ৭০টি ভাষা প্রচলিত। তন্মমধ্যে দক্ষিণ মিন, মালয় এবং খমের প্রভৃতি ভাষা উল্লেখযোগ্য।

বার্ষিক বানর বুফে (annual Monkey Buffet) থাইল্যান্ডের একটি ব্যতিক্রমী উৎসব। প্রা প্রাঙ সাম ইয়োট মন্দিরের (Pra Prang Sam Yot) সামনে উৎসবটি অনুষ্ঠিত হয়। এ উৎসবে ৬০০ এর অধিক বানরকে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাদের আপ্যায়নের জন্য দুই টন ভাজা সস, তাজা ফল, আইসক্রিম এবং এরূপ আরও অনেক খাদ্যদ্রব্য স্তূপ করে রাখা হয়। চারিদিক হতে বানরদল এসে মনের সুখে তা আহার করে। পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম স্তন্যপায়ী প্রাণী বাম্বিলিবি বানর (bumblebee bat) এবং সবচেয়ে বড় মাছ হোয়েল শার্ক- দুটোই থাইল্যান্ডের জলে দেখা যায়।

থাইল্যান্ডে ১,৪৩০টি দ্বীপ রয়েছে। তন্মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে কোহ পাই পাই লি। থাইল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে জনপ্রিয় ভ্রমণস্থান হিসাবে পরিচিত। প্রতিবছর গড়ে ১৬ মিলিয়নের অধিক বিদেশি পর্যটক থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন। ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরামের জরিপমতে থাইল্যান্ড বিশ্বের ১১তম বন্ধুত্বপূর্ণ (friendliest) দেশ। এ ক্ষেত্রে আইসল্যান্ড হচ্ছে প্রথম।

থাইল্যান্ডকে মন্দিরের শহর বলা হয়। এখানে প্রায় ৩৫,০০০ মন্দির রয়েছে। থাইল্যান্ডকে হাসির দেশও বলা হয়। এখানকার লোকের মুখে হাসি লেগেই থাকে। তারা সবসময় হাসিমুখে থেকে। তারা বেশ শান্তিপ্রিয় এবং কারও সঙ্গে ঝগড়ায় যেতে চায় না। সবসময় সৌহার্দ্য বজায় রেখে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তুলতে চায়। দেশের মোট জনসংখ্যার এক দশমাংশ ব্যাংককে বাস করে। সবাই জানে, থাইল্যান্ডের রাজধানীর নাম ব্যাংকক। কিন্তু এর আসল নাম পৃথিবীর সবচেয়ে কয়েকটি লম্বা স্থানিক নামের মধ্যে একটি।
ব্যাংককের আসল নাম পালি ও সংস্কৃত ভাষার মিশ্রণে অঙ্কিত। সেটি হচ্ছে –

“KrungthepmahanakhonAmonrattanakosin MahintharayutthayaMahadilokphop Noppharatratchathaniburirom Udomratchaniwetmahasathan Amonphimanawatansathit Sakkathattiyawitsanukamprasit”-এর অর্থ হচ্ছে ‘দেবদূতের শহর, চিরন্তন মহানগর, নবরত্নের মহানশহর, রাজার আসন, রাজকীয় প্রাসাদের শহর, দেবতা দেহধারীগণের শহর, ইন্দ্রের আদেশে বিশ্ববিক্রমণের নির্মিত দুর্গ।’


সিরিয়া (Syria) : ইতিহাস ও নামকরণ

তাইওয়ান (Taiwan) : ইতিহাস ও নামকরণ

তাজিকিস্তান (Tajikistan): ইতিহাস ও নামকরণ

লাইবেরিয়া (Liberia) : ইতিহাস ও নামকরণ

লিবিয়িা (Libya) : ইতিহাস ও নামকরণ

মাদাগাস্কার (Madagascar) : ইতিহাস ও নামকরণ

মালাউই (Malawi) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!