দণ্ড দণ্ডায়মান ও দন্ড: প্রয়োজনানুসারে ইত্যাকার

ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রথমে বলে রাখি, দন্ড বানানটি দণ্ড শব্দের ভুল বানান। তাই এখানে দন্ড বানানের শব্দটি নিয়ে আলোচনা করা হবে না। এবার দেখি দণ্ডায়মান (ড-য়ে মূর্ধন্য-ণ) শব্দের অর্থ ও ইতিহাস।
দণ্ডায়মান শব্দটির অর্থ খাড়া, দাঁড়িয়ে আছে এরূপ। দণ্ড থেকে দণ্ডায়মান শব্দের উদ্ভব। দণ্ড বস্তুটি সাধারণ সোজা ও সটান হয়। ‘দণ্ডায়মান’ অর্থ দণ্ডের মতো সোজা ও সটান। একটি দণ্ডকে খাড়া করে রাখলে যে অবস্থা হয় সেটিই দণ্ডায়মান অবস্থা। কোনও মানুষ যদি দণ্ডের মতো সটান ও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেটিই হচ্ছে দণ্ডায়মান।
‘দণ্ড’ শব্দের মূল অর্থ হচ্ছে—  দমন সাধন, দমন কার্য সম্পাদন। যে বস্তু দিয়ে দমন করা যায় সেটি হচ্ছে দণ্ড। ‘দণ্ড’ হচ্ছে দীর্ঘ, কিন্তু সোজা ও শক্ত অথচ সহজে বহনযোগ্য একটি সরল অস্ত্র, যদ্দ্বারা আঘাত করা যায় এবং আঘাত করলে  আঘাতপ্রাপ্ত জীব দমিত হয়। এটি সাধারণভাবে সবার কাছে লাঠি নামে পরিচিত। এ লাঠি মানুষের আদি অস্ত্র।
লাঠি দিয়ে মানুষ প্রথম সহজে আঘাত করতে শেখে, দমন করতে শেখে, শাস্তি করতে শেখে মানুষ হয়ে মানুষকে কিংবা অন্য জীবকে। তাই বস্তুটির নাম হয় দণ্ড। এজন্য দণ্ড অর্থে সাজা বা শাস্তিও বোঝায়।একসময় এ লাঠি দ্বারা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সাজা দেওয়া হতো। তাই এর নাম দণ্ড এবং সাজাপ্রাপ্তকে বলা হয় দণ্ডিত। যদিও এখন দণ্ড বা দণ্ডিত বলতে লাঠির কথা মনে পড়ে না, মনে পড়ে সাজা ও সাজাপ্রাপ্তের কথা।
এ দণ্ড হতে ক্রমান্বয়ে উৎপত্তি হয় নানা দণ্ডযুক্ত শব্দ। যেমন : অর্থদণ্ড, মৃত্যুদণ্ড, কারাদণ্ড, নির্বাসনদণ্ড। দণ্ডের দণ্ডদানের ক্ষমতার জন্য রাজা বা শাসক কিংবা ক্ষমতাবানদের বলা হতো দণ্ডধর। ভারতীয় পুরাণে যমের অপরনাম দণ্ডদর। কারণ, তার দায়িত্ব প্রাণহরণ। বলা হয়—  যার লাঠি তার মাটি, যার দণ্ড তার ভাণ্ড। প্রাচীনকালে রাজা-বাদশার লাঠির ক্ষমতার উপর তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি নির্ভর করত।
প্রয়োজনুসারে না কি প্রয়োজনানুসারে
প্রয়োজনানুসারে। কারণ, প্রয়োজন ও অনুসারে মিলে শব্দটি গঠিত। এবার শব্দটির গঠন বিশ্লেষণের গাণিতিক বিভাজন করা যাক। প্রয়োজনানুসারে= প্রয়োজন+অনুসারে= (প্রয়োজন্‌+অ)+(অ+নুসারে)= প্রয়োজন্‌+অ+অ+নুসারে = প্রয়োজন্‌+(অ+অ)+নুসারে= প্রয়োজন্+আ+নুসারে= প্রয়োজনা+নুসারে [ যেহেতু, অ+অ= আ]
 ইত্যকার না কি ইত্যাকার
ইত্যাকার।কারণ, ইতি ও আকার মিলে শব্দটি গঠিত। অর্থাৎ ইতি+ আকার= ইত্যাকার। কারণ, সন্ধিবিধি অনুযায়ী প্রথম পদের শেষে ই বা ঈ এবং দ্বিতীয় পদের প্রথমে ই ঈ ছাড়া অন্য কোনো স্বরবর্ণ থাকলে (অ আ উ ঊ ঋ এ এ ও ঔ) তাহলে ই বা ঈ-এর স্থলে য্‌ হবে এবং পরের স্বরটি য্‌/য-ফলার সঙ্গে যুক্ত হবে। যেমন: ইতি+ আদি= ইত্যাদি। ইত্যাকার শব্দটির সঙ্গে ইত্যাদি শব্দের গঠনগত ও অর্থগত মিল রয়েছে। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত ইত্যাদি শব্দের অর্থ— প্রভৃতি, এই, এমন, এবং, আরও, এই প্রকার। অন্যদিকে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ইত্যাকার শব্দের অর্থ- এই প্রকার, এইরূপ।
error: Content is protected !!