দলিলের দুর্বোধ্য সংক্ষিপ্ত শব্দাবলি/ ১

ইউসুফ খান

দলিলের দুর্বোধ্য সংক্ষিপ্ত শব্দাবলি/ ১

কাটমুণ্ডু: কাটাকথা
ইংরেজিতে কোনও শব্দ কেটে বা ছেঁটে ছোটো করা হয়েছে বোঝাতে ফুলস্টপের ডট-টাকেই ব্যবহার করা হয়। Company>Co. এটাতে বডি ছেঁটে মুণ্ডু রাখা হয়েছে, তাই এটা কাটমুণ্ডু truncated শব্দ। Doctor>Dr এটাতে গোটাকথাটাকে গোটানো হয়েছে, গুটিয়ে ছোটো করা হয়েছে, rolled-up, abbreviated। ব্রিটিশরা এখানে ডট দেয় না।
বাংলায় সংক্ষিপ্ত শব্দের মোটামুটি সবগুলোই কাটমুণ্ডু। শব্দটা ছেঁটে ছোটো করা হয়েছে বোঝানোর জন্য আদি চিহ্নটা ছিলো °। নম্বর > ন°, কোম্পানি >

ইউসুফ খান

কো°। এদিকে আবার অনুস্বার বোঝানোর চিহ্নও ছিলো এটা। ১০০ বছর আগে ছাপা মদনমোহন তর্কালঙ্কারের শিশুশিক্ষা প্রথম ভাগের শেষের দিকের সংস্করণেও এটা দেখা গেছে। পরে অনুস্বারটা যাতে সহজে নজরে পড়ে তার জন্য ° এর তলায় একটা আঁচি মানে খোঁচা দিয়ে ং করা হয়েছে।
° এর ব্যবহার কম বলে লেটারপ্রেসওলারা ধীরে ধীরে ° এর ছাঁচ তুলে দিলো। ফলে ° এর জায়গাটাও ং নিয়ে নিলো। এর ফলে ফোন নং, মালের জন্য কোং দায়ী নহে – এসব লেখা চলে এলো।
ঃ দিয়ে শব্দসংক্ষেপ কম হলেও দেখা গেছে। ডাঃ = ডাক্তার; মহঃ = মহম্মদ। একটা সিনেমায় ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় কমিশনার অফ জঙ্গিপুর মিউনিসিপালিটি হয়ে সই করেছিলেন কং জং মিঃ লিখে।
এইসব কাটাকথা ছাঁটাকথাগুলো পড়ার সময় পুরোটাই উচ্চারণ হতো এবং এখনও হয়। শুধু যারা গোটাকথাটা জানেনা তারাই ভুল করে নং = নঙ্‌, ডাঃ = ডাহ্‌ এসব পড়ে। বাংলা গল্পে আছে, পাঁউরুটির গাড়িতে ফোন নং লেখা দেখে একটা বাচ্চা ফোন্নং মানে ফোন্‌নঙ্‌ খাবে বলে বায়না ধরেছিলো।
আজকাল বাংলায় ং ঃ -র জায়গায় ডটও চলছে, ইংরিজির দেখাদেখি।

ফারসি: পর্চী
কোর্ট কাছারিতে কিছু গতে বাঁধা কথা এত পরিচিত এবং এত বার লিখতে হয় যে, সেগুলোকে দলিল লেখকরা সংক্ষেপে লেখে। লাইনের লোকজন সবাই সংক্ষেপের ইঙ্গিত দেখেই গোটাকথাটা বুঝে গিয়ে ফুল ফর্মে পড়ে ফেলে। নবাবি আমলে দলিল দস্তাবেজ ফারসিতে লেখা হতো। ব্রিটিশ আমলে ফারসির জায়গায় বাংলা চালু হলে বাঁধাকথাগুলো থেকে যায়, এবং বাংলাতেই লেখা হতে থাকে ফারসি এবং ফারসির ভেতরে থাকা আরবি লব্‌জোগুলো। ছাঁটাই হয়ে সংক্ষিপ্ত রূপে। আজও সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে, কিন্তু ফারসির দিন গিয়াছে বলিয়া সেই ছাঁটাকথাগুলোর গোটাকথাগুলো লোকে জানে না, বা জানলেও ঠিক মানেটা জানে না।

আং: আহলে
আরবি اهل আহ্‌ল্‌ এর মূল মানে সম্রাট। কিন্তু এর আরও ব্যঞ্জনা আছে – বিরাট সিনিয়ার seigneur স্যার। উর্দু জুবানে জনাব-এ-আহ্‌লী > জনাবে-আলী = স্যার, মহোদয়। এর স্ত্রীলিঙ্গ اهليه জনাব-এ-আহ্‌লিআ = ম্যাডাম, মহোদয়া। মেয়েদের নাম হয় আলিয়া।
দলিল দস্তাবেজে কোনও মহিলার নাম লিখে তার পরিচয় পাকা করে লিখতে স্বামীর নাম লিখতে হতো। মানে ম্যাডামকে সবাই চিনবে না, তাই স্যারের কী নাম সেটা লেখা হতো। জনানা-র কত্তা মানে জনাব-এ-আহ্‌লী কে? এই আহ্‌লী বা আহ্‌লে-টাকেই ছেঁটে আং লেখা হয়। এটার মানে যদিও স্যার, তবে লোকজন আং বলতে স্বামীই বোঝে।

জং: জওজে
আরবি زوج জওজ্‌ এর মানে স্বামী। দলিল দস্তাবেজে কোনও মহিলার নাম লিখে তার পরিচয় পাকা করে লিখতে স্বামীর নাম লিখতে হতো। মহিলার নামের পরেই তার স্বামীর নাম লেখার জন্য زوجی জওজে লিখে হাইফেন দিয়ে স্বামীর নাম লেখা হতো। জওজের কাটা রূপ জং। বিবাদী – মালতী দাসী, জং-পরাণ মণ্ডল।

গং: গয়রহ
ফারসি غیره গয়্‌রহ্‌ মানে অন্য, আরবি و ৱ মানে and। وغیره ৱগয়্‌রহ্‌ মানে ‘এবং অন্যান্য’ et cetera। জমি ক্রেতা বা বিক্রেতা বা আসামী একা নয়, একসঙ্গে আরও কয়েকজন আছে এমন হলে দলিল দস্তাবেজে প্রথমে সবার নাম এক জায়গায় পর পর লেখা হয়। পরের কোনও প্যারাগ্রাফে তাদের রেফারেন্স এলে তখন প্রথম নামটা বা মূল একজনের নাম লিখে ‘এবং অন্যান্যরা’ মানেতে ‘ৱগয়রহ’ লেখা হতো। বাঙালি দলিল লেখক ভুল করে শুধু গয়রহ লিখতো। গয়রহ-র সংক্ষিপ্ত রূপ গং। বিক্রেতা বদরুল বিশ্বাস গং – মানে বদরুল এবং অন্যান্যরা। পরের দিকের লোকজন মানে না বুঝে জনগণ-এর মতো করে বদরুল বিশ্বাসগং এভাবে লিখতে শুরু করে।
[এখানে দুটো কথা বলার আছে। আরবিতে و ৱ কে এর পরের শব্দটার সঙ্গে জুড়ে লিখতে হয়। آمی وابی আম্মি ওআব্বি = আমার মা ও বাবা। আরবি ৱ এর পরে গয়রহ ফারসি হলেও দুটোকে জুড়ে وغیره ৱগয়রহ লেখা হয়। এটাকেই হিন্দি সিনেমার ডায়ালগে বলে ‘বগেরা বগেরা’।
এই আরবি ৱ = ওঅ-টাই বাংলাতে ও = and হয়ে আছে। উত্তর ভারতীয় ভাষাগুলোতে and এর কোনও প্রতিশব্দ নেই। অস্ট্রিক শব্দ ‘আর’ এর আসল মানে – also, আরো, more, other, last (আর বছর)। এটাই আর-আরু-और রূপে বাংলা ওড়িয়া অসমীয়া হিন্দিতে আছে। সংস্কৃতর ‘এবম্‌ = এবং’ এর আসল মানে – এভাবে so, thus; ‘এবম্‌ চ’ মানে – so also. কোথাও and নেই! ইংরিজিতে বলতে হয় – Tom, Dick and Harry are brothers, কিন্তু বাংলায় বলতে হয় – আঁটুল বাঁটুল শাঁটুল তিন ভাই। ‘এবং শাঁটুল’ বলাটা বাংলার ধাত নয়]

তমঃ (তমসুক)
আরবি مسك মসক মানে ধরা, ধরে থাকা, আঁকড়ে থাকা, আটকে রাখা। تمشک তমস্‌সক্‌ মানে যা ধরা আছে, আঁকড়ে রাখা আছে। টাকা ধার নিলে বা জমি বন্ধক নিলে তা ফেরত দেবার অঙ্গীকার করে একটা স্ট্যাম্পড প্রমিসরি বন্ড লেখা হতো এই বলে যে, তোমার এই টাকা আমার কাছে ধরা আছে (ধার, তমস্‌সক্‌) বা তোমার এই জমি আমি ধরে রাখলাম, আটকে রাখলাম, বেঁধে রাখলাম (বাঁধা, তমস্‌সক্‌)। তমস্‌সক হচ্ছে কর্জ.নামা debenture বা বন্ধকনামা বন্ধকী বন্ধকী-খত। দুটোই প্রমিসরি নোট। বাংলায় তমস্‌সক্‌ হয়েছে তমসুক, যার কাটমুণ্ডু ফর্ম – তমঃ।

মং: মবলগ
আরবি بلغ বলগ় মানে পৌঁছনো। কয়েকটা সংখ্যা যোগ বা গুণ করে যে যোগফল বা গুণফলে আমরা পৌঁছই সেটা مبلغ মু.বল্লগ়। যাকে বলে একুনে, সাকুল্যে, মোট, একত্রে। বাঙালি মুবল্লগ-কে বলে মবলগ, যার কাটমুণ্ডু রূপ – মং। মং ৩০০০৲ টাকা।

মোং, মোঃ/ মোকাম
আরবি اقم আক়ম্‌ মানে থাকা। موقام মুক়াম্‌ মানে থাকার-যাবার-দাঁড়ানোর জায়গা, ঠাঞি। সেখান থেকে মানে দাঁড়িয়েছে বাসা বাড়ি বসত-এলাকা ঠিকানা। মুক়াম্‌ বাংলায় হয়েছে মোকাম, যার কাটমুণ্ডু ফর্ম – মোং বা মোঃ।

সাং: সাকিন
আরবি سکن সকানা মানে স্থায়ী ভাবে বাস করা। সকানা-র মধ্যে বসে থাকা, স্থির থাকা, রেস্টে থাকা, পালিয়ে না যাওয়া এই মানেগুলো আছে। ساكن সাকিন মানে স্থায়ী বসবাসের ঠিকানা। সাকিন মানে স্থায়ী বাসিন্দাও হয়। সাকিন এর কাটমুণ্ডু ফর্ম – সাং।

সূত্র: ইউসুফ খান দলিলের দুর্বোধ্য সংক্ষিপ্ত শব্দাবলি/ ১, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)   

ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২০ অগাস্ট ০২।

— — — — — — — — — — — — — — — — — — —
error: Content is protected !!