দহরম কেন মহরম

ইউসুফ খান
সংযোগ: https://draminbd.com/দহরম-কেন-মহরম/
ধরম ও হারাম: আরবিতে ধ নেই বলে ইংরেজির স্টাইলে ধ-কে দহ করে লেখে। তাই ধর্ম ধরম্‌ উর্দুতে লেখা হয় دھرم দহ্‌রম্‌। য়হ শাখ্‌স়্ উসিকা দহরম কি হৈ – মানে এই লোকটা ওর জাতির। আরবিতে হারাম মানে নিষিদ্ধ। যে পুরুষের সঙ্গে অমুক মেয়ের বিয়ে হারাম সে অমুক মেয়েটার মুহর্‌রম মহরম। মানে বাপ চাচা ভাই ইত্যাদি। আপনজন মহরমের সামনে পর্দা লাগে না, মহরমকে দেখে লুকিয়ে পড়তে হয় না, মহরম-পুরুষ বাড়ির মেয়েদের সামনে যেতে পারে। মানে যে মহরম তার অন্দরমহল পর্যন্ত সহজ যাতায়াত আছে। তাই মহরম মানে ঘরের লোক আপন-আপ্তি আত্মীয়-আত্মি। তাই উর্দু কথাটা এ রকম ছিলো – য়হ শাখ্‌স়্‌ তো উসিকা হি দহরম মহরম কি হৈ – এই লোকটা তো ওরই জ্ঞাতি-আত্মী। বাঙালি এই রুট মানেটা বোঝেনি তাই – ‘ও তো ওরই দহরম মহরম’ না বলে, বলে ‘ওর সঙ্গে তো ওর খুব দহরম মহরম আছে।’
বাংলায় দহরম-মহরম মানে দাঁড়িয়েছে – ঘরের লোকের মতো ওঠাবসার সম্পর্ক। আবার বলি, ঘরের লোকের মতো ওঠাবসার সম্পর্ক। কিন্তু বাংলা ডিকশনারিগুলোতে দহরম-মহরম মানে দিয়েছে – গভীর আন্তরিকতা, মাখামাখি ঘনিষ্ঠতা, ঘনিষ্ঠ মেলামেশা, মাখামাখি ও ফুর্তি। যাচ্ছেতাই ব্যাপার! আজকের যুগে কথাগুলো শুনলে খ্যাঁচ্‌ করে কানে লাগে। এই কথাগুলোতে একটু লাগাম পরাতে হবে, সংজ্ঞাগুলোকে এক কোট পালিশ মেরে নিতে হবে।
দ্রুমদ্রাম: অন্নু মালিক যে ইজ়রায়েলি জাতীয় সঙ্গীতের সুর টুকেছে সেটা ২৫ বছর পরে ২০২১এ ওলিম্পিকে ধরা পড়লো। যখন বরফি সিনেমাটাকে অস্কারে পাঠানোর কথা ভাবা হয়েছিলো, তখন ধরা পড়লো যে ওটা তিন-চারটে বিদেশি সিনেমা থেকে টোকা মাল। এইভাবে বিশ্বাসযোগ্যতা হেঁটোয় নেমে আসে।
আরবিতে দহ্‌রম্‌ মানে ড্রাম, মহর্‌রম্‌ মানে নিষিদ্ধ, মর্‌হম্‌ মানে মলম আর বর্‌হম্‌ মানে ব্রাহ্মণ। এগুলো বাংলাকথা দহরম-মহরমের সঙ্গে ফিট করে না। পারসিতে দহ্‌রম্‌ বা বর্‌হম্‌ বলে কিছু নেই। আমরা ছাত্রকে বলি – ঠিক উত্তরটা জানিস না তো বোস, উল্টোপাল্টা দ্রুমদ্রাম বলবি না। বাংলায় যাকে আমরা দ্রুমদ্রাম দুমদাম বলি, উর্দুতে তাকে বলে দর্‌হম্‌-বর্‌হম্‌। একই মানে। অর্থাৎ দর্‌হম্‌-বর্‌হম্‌ পাতি ইণ্ডিয়ান উর্দু কথা, আরবি-পারসিঅলারা শুনলে আকাশ থেকে পড়বে। কিন্তু সাউণ্ডে মিলছে বলে প্রথমে যোগেশ রায় এটাকে ফারসি দেগে দিয়ে দহরম-মহরমের ব্যুৎপত্তিতে জুতে দিলেন। দর্হম-বর্হম মানেটা ঠিক বললেন – উলট-পালট। কিন্তু এই মানে থেকে কী করে যে সুবল মিত্রর দেওয়া মাখামাখি ভাব, আত্মীয়তা, বাধ্যবাধকতা মানেগুলোই বার করলেন তার কোনও ব্যাখ্যা নেই। যদিও বাঙালি পণ্ডিতদের মধ্যে যোগেশ রায়কে চোখ বন্ধ করে ভরসা করা যায়।
এরপর খেলা শুরু হলো। যোগেশ রায়ের পর বাকি সবাই চোখ বন্ধ করে যোগেশ রায় থেকে ব্যুৎপত্তিটুকু টুকে দিলেন। একবার ল্যাজ তুলে দেখলেন না পর্যন্ত পাঁটাবাচ্চা না পাঁটিবাচ্চা। বাংলায় আরবি ফারসি শব্দ নিয়ে তিনটে ডিকশনারি আছে। তাঁরাও যদ্দৃষ্টং তল্লিখিতং করে দিলেন, অন্য পরে কা কথা।
বাংলা ডিকশনারিতে যে কোনও শব্দকে প্রথমেই সংস্কৃতের ঝুড়িতে ফেলে দেয়া হয়। পরে দেখা যায় তার অনেকগুলোই মুণ্ডা বা দ্রাবিড়ে যাচ্ছে। পণ্ডিতরা কোনও শব্দের ব্যুৎপত্তিতে শব্দটা মুণ্ডা দ্রাবিড় আরবি পারসি হলে ব্যাপারটা ঘেঁটে ফেলছেন কিংবা দেশি বা যাবনিক বলে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। ওনাদের ওপর ভরসা করে সব কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বাঙালিকে অনেক পড়াশোনা করতে হবে। বাঙলা ডিকশনারি নতুন করে লিখতে হবে।
(ত্রুটি মার্জনীয় শুদ্ধি প্রার্থনীয়।) ইউসুফ খান, কলকাতা, ২০২১ আগস্ট ১১
ইউসুফ খানের লেখা ওয়েব-লিংক:
এই পোস্টের লিং: https://www.facebook.com/…/shuvas/posts/3352881334733284/
error: Content is protected !!