দাপ্তরিক প্রমিত বাংলা বানান

ক্রিয়াপদের প্রমিত প্রয়োগ

বাংলা ভাষায় চলিতরূপে বাংলা ক্রিয়াপদ ব্যবহারে বাংলাভাষীদের স্বেচ্ছাচারিতা অবিশ্বাস্যমাত্রায় বিপজ্জনক। ব্যাকরণগতভাবে ক্রিয়াপদের মোট ৪৮টি রূপ হতে পারে। বানান তারতম্য করে ৪৮টি রূপকে ৭৯৭টি কিংবা তারও অধিক সংখ্যক রূপে পরিণত করা হয়েছে। এটি স্বেচ্ছাচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়। পৃথিবীর আর কোনো ভাষায় এমন স্বেচ্ছাচারিতা দেখা যায় না। ক্রিয়াপদের মূল তথা ধাতুর সঙ্গে ‘তো, এ, ল, বার, আ, ও, লুম’ কৃৎ-প্রত্যয় যুক্ত করা হলে ক্রিয়াপদের রূপের সংখ্যা এক হাজারের অধিক হয়ে যেতে পারে। বাংলা ভাষার সমতা-বিধান ও আদর্শমান রক্ষার লক্ষ্যে এমন সে¦চ্ছাচারী আচরণ হতে দূরে থাকা উচিত।
ক্রিয়াপদের ব্যবহার ও বানান রীতির সমতা বিধানের লক্ষ্যে চলিত ভাষায় ক্রিয়াপদের বিভিন্নরূপ-দানে নিম্নবর্ণিত সূত্রগুলো মেনে চলা উচিত :
১. ক্রিয়াপদে কোনো অবস্থাতে ‘লুম, লেম, তুম, তেম’ ইত্যাদি প্রত্যয় ব্যবহার করা হবে না। সৈয়দ মুজতবা আলী বা যত বড় সাহিত্যিকই তা ব্যবহার করে থাকুন না কেন, তা আমরা পড়ব, কিন্তু লিখব না। এটি প্রমিত বানান রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বাংলা ভাষার সমতা বিধানের স্বার্থে এমন লেখা পরিত্যাগ করা উচিত।
২. ক্রিয়াপদে সর্বাবস্থায় ঊর্ধ্ব-কমা বর্জনীয়। যেমন ক’রে, ধ’রে লেখা ঠিক নয়। লিখুন : করে, ধরে ইত্যাদি। অনেকে এসব ক্ষেত্রে ঊর্ধ্ব-কমা বসিয়ে থাকেন। এটি সমীচীন নয়। প্রমিত বানান রীতি ঊর্ধ্ব-কমা ব্যবহারকে সমর্থন করে না।
৩. তুমি বা তোমরা প্রভৃতি শব্দ লেখার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎকালে পালনীয় অনুজ্ঞার বেলায় ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও’ কিংবা ‘ও-কার’ বসে। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে প্রয়োজনবোধে ‘য়ো’ বসানো যেতে পারে। যেমন
বইটি টেবিলের উপর রাখো।
আগামী দিন আমি খুলনা যাবো।
৪. ভবিষ্যৎ অনুজ্ঞার বেলায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের রূপ ভিন্নতর হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের প্রথম বর্ণের ‘ও’ বা ‘ও-কার’ পরিবর্তিত হয়ে ‘উ বা উ-কার’ হয়ে যেতে পারে। যেমন ওঠো > উঠো, ছোটা > ছুটা ইত্যাদি।
৫. খাওয়া, যাওয়া, গাওয়া, দেওয়া, নেওয়া ইত্যাদি ক্রিয়াপদের প্রথম বর্ণের ‘আ-কার’, ‘এ-কার’ পরিবর্তিত হয়ে শব্দের শেষে ‘ও-কার’ যুক্ত করে লেখার অভ্যাস পরিহার করা সমীচীন। যেমন খাওয়া > খেয়ো,
গাওয়া > গেয়ো, দেওয়া > দেয়া, নেওয়া > নেয়া ইত্যাদি। কারণ এতে অর্থবিভ্রাট ঘটতে পারে। যেমন দেয়া শব্দের অর্থ দেওয়া না-বুঝিয়ে ‘মেঘ’ বুঝাতে পারে।
৬. কৃদন্ত শব্দ ক্রিয়াপদরূপে ব্যবহৃত হলে সে সকল ক্ষেত্রে ‘ও-কার’ বসানো সমীচীন হবে না। কেউ কেউ আজকাল ‘পাঠান, দেখান, করান’ ইত্যাদির পরিবর্তে ‘পাঠানো, করানো, দেখানো’ লিখে থাকেন। এমন লেখা সমীচীন নয়। কারণ ‘ও-কার যুক্ত করলে শব্দগুলো ক্রিয়াবিশেষ্যজাত বিশেষণে পরিণত হয়। যেমন জাপান হতে ‘আনানো’ জিনিস। কামার দিয়ে ‘বানানো’ পাতিল। এখানে ‘আনানো’ এবং ‘বানানো’ ক্রিয়াবিশেষ্যজাত বিশেষণ, ক্রিয়া নয়।
৭. ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘ছিল’ যুক্ত হলে নিত্য অতীত বা সাধারণ অতীত কাল বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত ‘ছিল’ শব্দটি ক্রিয়াপদের সঙ্গে সেঁটে থাকবে, পৃথক বসবে না। যেমন খেয়েছিল, বসেছিল, গিয়েছিল, গেয়েছিল ইত্যাদি।
৮. ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘না-বাচক’ ‘নি’ শব্দাংশ যুক্ত হলে তা পৃথক বসানোর নিয়ম ছিল। কিন্তু ইদানীং বাংলা একাডেমি এ রীতি পরিবর্তন করে ‘নি’-কে ক্রিয়াপদের সঙ্গে যুক্ত করে লেখার বিধান চালু করেছে। তবে না-বাচক নেই, নাই, না প্রভৃতি ক্রিয়াপদ থেকে ফাঁক রেখে বসবে।
যেমন যাব না, খাব না, দেখি নাই, বলি নাই, দেখিনি, মারিনি প্রভৃতি।
৯. চলিত ভাষায় গদ্য রচনায় ‘সাথে, মাঝে, শোয়া, দেয়া, নেয়া’ ইত্যাদি না লিখে ‘সঙ্গে, মধ্যে, শোওয়া, দেওয়া, নেওয়া’ লেখা উত্তম। এটি গদ্যকে শানিত এবং কবিতাকে সৌকর্যময় করে তোলে।
১০. অর্থ বিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকলে মধ্যম পুরুষ-এর ক্রিয়াপদের শেষে ও-কার যুক্ত করা যায়। যেমন বল = বলো, চল = চলো, হল = হলো ইত্যাদি।
১১. ক্রিয়াপদের সঙ্গে ‘ও-কার’ এর পরিবর্তে ‘ও’ যুক্ত করা অধিক সমীচীন। যেমন খাও, গাও, যাও, নাও, দাও, পাও, লও ইত্যাদি। তবে অর্থবিভ্রান্তি এড়ানোর জন্য ‘ও-কার’ দেওয়া যায়। যেমন হল = হলো, হত = হতো, কর = করো প্রভৃতি।

 

Language
error: Content is protected !!