দারুণ যেভাবে দারুণ হলো

এবি ছিদ্দিক

“আপনার কবিতাটি দারুণ হয়েছে,” খোকন স্যারের কবিতাটি পড়ার পর সামিয়া মন্তব্য করলেন। সামিয়ার মতো অনেকেই ‘চমৎকার’, ‘সুন্দর’, ‘অসাধারণ’ প্রভৃতি অর্থে ‘দারুণ’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকেন। সামিয়ার মন্তব্যটি

এবি ছিদ্দিক

পড়ে খোকন স্যার কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারলেন না। দারুণের এমন ব্যবহারে খোকন স্যার কেন, শব্দের যথাযথ প্রয়োগে সচেতন কোনো ব্যক্তিই প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন না। এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে স্যার বা অন্য কেউ কেন, কোনো প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবেন না, তা ‘দারুণ’ শব্দটির উৎপত্তি, ব্যুৎপত্তিগত অর্থ এবং বর্তমান ব্যাবহারিক অর্থ আলোচনা করলে একেবারেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। তাই, আমি কথা না-বাড়িয়ে ‘দারুণ’ শব্দটির উৎপত্তির পেছনের কাহিনিতে চলে যাচ্ছি।

‘দারুণ’ শব্দটি ‘দৄ’ ধাতু থেকে নিষ্পন্ন হলেও এর সঙ্গে ‘দারু’-র সম্পর্কই বেশি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ‘দারু’ শব্দটির উৎপত্তিও ‘দৄ’ ধাতু থেকে (√দৄ+উ = দারু)। ‘দারু’ শব্দের প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ‘কাঠ’। প্রাচীন বাংলায় যখন লোহা, ইস্পাত প্রভৃতি ধাতব পদার্থের প্রাচুর্য ছিল না, তখন ‘কাঠ’ বস্তুটি অধিক শক্ত জিনিস হিসেবে গণ্য হতো। যেখানে শক্ত কিছু ব্যবহারের দরকার পড়ত, মানুষ সেখানে কাঠ ব্যবহার করত। কাঠের তৈরি লাঙল, বর্শা, গদা, তির, চাকা প্রভৃতির ব্যবহার তারই দৃষ্টান্ত। ঘরের চালা ও খুঁটি হিসেবে কাঠের ব্যবহার আরো বেশি ছিল (এখনো রয়েছে)। এই ‘কাঠ বা দারু দিয়ে নির্মিত’ কথাটি এক শব্দে প্রকাশের দরকার পড়লে বঙ্গের মানুষ নিজেদের মতো করে ‘দৄ’ ধাতুর সঙ্গে ‘ণিচ্’ (ই) প্রত্যয় আর ‘উন’ প্রত্যয় যুক্ত করে ‘দারুণ’ শব্দটি গঠন করে। অর্থাৎ, √দৄ+ণিচ্+উন = দারুণ। এখানে ‘উন’ প্রত্যয়টি ‘কর্তৃত্ব’ বা ‘উপস্থিতি’ অর্থে যুক্ত হয়েছে। তাহলে ‘দারুণ’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— যাতে দারু বা কাঠের কর্তৃত্ব বা উপস্থিতি রয়েছে। এভাবে মানুষ ‘দারু দিয়ে নির্মিত’ অর্থে ‘দারুণ’ শব্দটি ব্যবহার করতে থাকে।

শুরুর দিকে দারু বা কাঠের তৈরি জিনিস বোঝাতে ‘দারুণ’ শব্দটির সৃষ্টি হলেও অতি শীঘ্রই শব্দটির ব্যবহার মূল গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। দারু বা কাঠের উপস্থিতির বিষয়টি বাদ দিয়ে কাঠের ‘অতিশয় শক্ত’ গুণটির উপস্থিতি বিবেচনা করে বঙ্গের মানুষ ‘অতিশয়’, ‘অত্যন্ত’, ‘খুব’ প্রভৃতি অর্থে ‘দারুণ’ শব্দটির আলংকারিক প্রয়োগ শুরু করে দেয়। ফলে দারু বা কাঠ দিয়ে নির্মিত ‘দারুণ’ হয়ে যায় অতিশয়, অত্যন্ত প্রভৃতি অর্থের ধারক ‘দারুণ’। মানুষের লেখায় ‘কাঠের মতো সুঠাম দেহ’-এর অনুকরণে ‘দারুণ গরম পড়ছে’-র মতো প্রয়োগও দেখা দিতে শুরু করে। আরো পরে ‘মারাত্মক’, ‘ভয়ংকর’ প্রভৃতি নেতিবাচক অর্থও ‘দারুণ’ শব্দটির ঘাড়ে চড়ে বসে। আধুনিক যুগের বাংলাভাষী অতিশয় তৃষ্ণার কথা ব্যক্ত করতে ‘দারুণ তৃষ্ণা’-র কথা বলে; মারাত্মকভাবে আঘাত পাওয়ার কথা অন্যকে জানাতে ‘দারুণ আঘাত’-এর প্রসঙ্গ টানে; ভয়ঙ্কর রাতের গল্প করতে গিয়ে ‘দারুণ রাত’-এর জিকির করে। এসবের অনুকরণে যদি বলা হয়, ‘আপনার ছবিটি দারুণ হয়েছে,’ তাহলে পাঠক কী বুঝবেন? ‘আপনার লেখাটি অতিশয়/মারাত্মক হয়েছে,’ এমনটি? কিন্তু অতিশয়/মারাত্মক কী হয়েছে? ভালো, না কি খারাপ? এই দ্ব্যর্থতা দূর করতে কোনোকিছুর প্রশংসায় ‘দারুণ’ শব্দটি ব্যবহার করা হলে সেটির পরে আরও একটি বিশেষণ পদ যুক্ত করা বাঞ্ছনীয়। অর্থাৎ, কোনোকিছুর প্রশংসা করা ক্ষেত্রে ‘দারুণ’ শব্দটি বিশেষণীয় বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত। উদাহরণ হিসেবে সামিয়ার মন্তব্যটি শুধরে দিয়ে আমার এই লেখার ইতি টেনে দিচ্ছি:

‘আপনার কবিতাটি দারুণ উপভোগ্য হয়েছে।’

[ জ্ঞাতব্য: ‘সুন্দর’, ‘চমৎকার’, ‘ভালো’, ‘অনুপম’ প্রভৃতি অর্থে ‘দারুণ’ শব্দটির ব্যবহার পরিহার করাটাই যথার্থ।]

উৎস: এবি ছিদ্দিক, দারুণ যেভাবে দারুণ হলো, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

শুবাচের ওয়েবসাইট: www.draminbd.com

গুরুত্বপূর্ণ লেখা শুবাচগোষ্ঠীর নীতিমালা

শুবাচ-এর ওয়েবসাইট: www.draminbd.com

error: Content is protected !!