দায়িত্ব বনাম কর্তব্য

এবি ছিদ্দিক
শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

 

দুইটি শব্দের অর্থ যত বেশি কাছাকাছি হয়, ওই শব্দ দুটির ব্যাবহারিক প্রয়োগ নিয়ে তত বেশি বিভ্রান্তি দেখা দেয়। এরূপ কাছাকাছি অর্থের দুইটি শব্দ হচ্ছে ‘দায়িত্ব’ আর ‘কর্তব্য’। ব্যাবহারিক প্রয়োগে অনেকেই এই শব্দ দুটির যথাযথ ব্যবহার নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যান। বৃদ্ধ মায়ের সেবা করা, রাস্তার পড়ে থাকা কাঁটা সরিয়ে ফেলা, ভালোভাবে পড়াশোনা করা, বন্ধুকে বিপদে সহায়তা করা প্রভৃতি দায়িত্ব, না কি কর্তব্য, তা নিয়ে ধাঁধায় পড়ে যাওয়া লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে শব্দ দুটির ব্যবহার ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণের আলোকে আয়ত্ত করতে পারলে পরবর্তী সময়ে বিভ্রান্তি অনেকটা কমে যাবে বলে আমার ধারণা। আর তাই, উল্লেখ-করা শব্দ দুটির যথাযথ ব্যাবহারিক প্রয়োগ নিয়ে আমার আলোচনা শব্দ দুটির ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ থেকেই শুরু করছি—

‘কৃ’ একটি ধাতু এবং এই ধাতুটির অর্থ হচ্ছে ‘করা’। এই ‘কৃ’ ধাতুর সঙ্গে ‘তব্য’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘কর্তব্য’ শব্দটি গঠন করে। সাধারণত ‘তব্য’ প্রত্যয়টি কোনো ধাতুর সঙ্গে ‘বিধেয়’, ‘সংগত’, ‘উচিত’, ‘সমীচীন’ প্রভৃতি অর্থে যুক্ত হয়। তাহলে ‘কর্তব্য’ শব্দটির ব্যুৎপত্তিগত অর্থ দাঁড়ায়— ‘করা উচিত’। অর্থাৎ, যেসকল কাজ করা উচিত বা সমীচীন, সেসকল কাজ করাটাই হচ্ছে কর্তব্য। ব্যক্তি চাইলে কোনো উচিত কাজ না-করে এড়িয়েও যেতে পারে। যেমন: রাস্তার ওপর কলার খোসা পড়ে থাকতে দেখলে সেটি কুড়িয়ে নিয়ে পাশের ডাস্টবিনে রাখাটা সংগত কাজ। কিন্তু কেউ ওই কাজটি না-করে চলে গেলেও লোকে তাকে কিছু বলবার অধিকার রাখে না। যেসকল কাজ করার ক্ষেত্রে এরূপ দোষারোপ চলে না; অর্থাৎ, ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকে, সেসকল কাজ করাটাই হচ্ছে ব্যক্তির কর্তব্য।

আবার, ‘দা’ ধাতুর সঙ্গে ‘ইন্’ প্রত্যয় যুক্ত হয়ে ‘দায়ী’ শব্দটি গঠন করে। যার ওপর দোষ বর্তানো যায়, তাকে ‘দায়ী’ বলা হয়। এই ‘দায়ী’ শব্দটিকে প্রাতিপদিক বিবেচনা করে সেটির সঙ্গে ‘ভাবে’ অর্থে ‘ত্ব’ প্রত্যয় যুক্ত করে ‘দায়িত্ব’ শব্দটি পাওয়া যায়। অর্থাৎ, ‘যা কোনো ব্যক্তিকে দায়ী ভাবতে বা দায়ী বানাতে সহায়তা করে, তাই (তা-ই) হচ্ছে দায়িত্ব। মোদ্দা কথা হচ্ছে, দায়িত্ব-এর সঙ্গে দায় জড়িত রয়েছে। দায়িত্ব পালন না-করলে ব্যক্তির ওপর দোষ চাপানো যায়, ব্যক্তিকে দায়ী হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, অনেক সময় শাস্তির আওতায়ও আনা যায়। যেমন: ইশমামকে নির্দিষ্ট বেতনের চুক্তিতে ম্যাগনাম এন্টারপ্রাইজের হিসাবনিকাশের কাজ দেওয়া হলো। মাস শেষে দেখা গেল, ইশমামের হিসেবের মধ্যে দশ হাজার টাকা গোলমাল হয়ে গিয়েছে। হিসেবের কাজটি ইশমামের ছিল বিধায় প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর ইশমামকে তলব করে তার (ইশমামের) ওপর দায় চাপিয়ে দিলেন এবং তাকে হিসাবরক্ষকের পদ থেকে ছাঁটাই করলেন। যেহেতু হিসেবের কাজটি ঠিকঠাক না-করায় ইশমামের কাঁধে দায় চাপানো গিয়েছে, সেহেতু ঠিকমতো হিসেব করাটা ছিল ইশমামের দায়িত্ব।

এবার দায়িত্ব আর কর্তব্য নিয়ে সমান্তরালে আগানো যাক। যেটি বলছিলাম, যে কাজটি না-করলে ব্যক্তির ওপর দায় চাপানো যায়, সে কাজটি করাটা দায়িত্ব এবং যে সংগত কাজটি করা একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, সে কাজটি করাটাই কর্তব্য। পথেঘাটে কোনো শিক্ষকের সঙ্গে কোনো ছাত্রের সাক্ষাৎ হলে ওই শিক্ষকের কুশলাদি জিজ্ঞেস করাটা সমীচীন। কিন্তু কোনো ছাত্র এমনটি না-করলে ওই ছাত্রের ওপর কোনোরূপ দায় চাপানো যায় না। তাই, স্কুলে যাওয়ার পথে খোকন স্যারের সঙ্গে ছাফিয়ার সাক্ষাৎ হলে তাঁর কুশলাদি জিজ্ঞেস করাটা ছাফিয়ার কর্তব্য, দায়িত্ব নয়। কোনো ক্লাবের খেলোয়াড়েরা ভালো পারফর্ম করতে না-পারলে কোচের ওপর দায় চাপিয়ে তাঁকে (কোচকে) ছাঁটাই করা হয়। তাই, খেলোয়াড়দের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং মাঠের খেলায় যথাযথ কৌশল প্রয়োগ করা কোচের দায়িত্ব, কর্তব্য নয়।

ছাত্রকে ভালোভাবে পড়াতে না-পারার দায়ে গৃহশিক্ষকের ছুটির ঘণ্টা বেজে যায়। তাই, ছাত্রকে ভালোভাবে পড়ানোটা গৃহশিক্ষকের দায়িত্ব, কর্তব্য নয়। পড়াশোনায় দুর্বল বন্ধুকে পরীক্ষার হলে দু-একটি প্রশ্নের উত্তর দেখালে সে কৃতকার্য হয়ে পরবর্তী শ্রেণিতে ওঠার অনুমতি পেতে পারে। এমতাবস্থায় ওই বন্ধুকে দু-একটি প্রশ্নের উত্তর লিখতে সাহায্য করাটা আধুনিক বন্ধুর ( ? ) কর্তব্য, দায়িত্ব নয়। কেননা, মেধাবী বন্ধু দু-একটি প্রশ্নের উত্তর না-দেখালেও দুর্বল বন্ধু তার ওপর কোনোরূপ দায় চাপাতে পারবে না।
পূর্বে কোনো সন্তান তার বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল না-করলে এলাকাবাসী মিলে ওই সন্তানের ওপর দায় চাপাত, তার বিচার করত। তাই পূর্বে বৃদ্ধ মা-বাবার দেখভাল করাটা ছিল দায়িত্ব। কিন্তু আধুনিক যুগে বেশ কিছু আধুনিক সন্তান ( ? ) তাদের বৃদ্ধ মা-বাবার কোনো খবরই রাখে না। মাঝেমধ্যে তো স্টেশন কিংবা শপিংমলের পাশে ফেলে যাওয়ার খবরও পাওয়া যায়। এরূপ আধুনিক সন্তানদের ( ? ) বিবেচনায় বৃদ্ধ মা-বাবার দেখাশোনা করাটা কর্তব্য, দায়িত্ব নয়।

শুবাচে ড. মোহাম্মদ আমীনের অনুপম যযাতিগুলো পড়ার পর শুবাচিরা যযাতিগুলোর প্রশংসা না-করলে কিংবা উদ্দীপনামূলক বাক্য ব্যয় না-করলে তিনি কোনোরূপ দোষারোপ করেন না। তাই, তাঁর প্রতি— তাঁর লেখার প্রতি প্রেষণামূলক বাক্য ব্যয় করাটা শুবাচিদের কর্তব্য হিসেবে গণ্য হবে, দায়িত্ব হিসেবে নয়। কোনো ধনী ব্যক্তি দরিদ্রদের সাহায্য না-করলে লোকে ওই ব্যক্তির ওপর দোষারোপের অধিকার রাখে না। তাই, দরিদ্রদের সাহায্য করা ধনীদের কর্তব্য, দায়িত্ব নয়।

কর্তব্য পালনে বিমুখ ব্যক্তির ওপর দোষ চাপানো না-গেলেও তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের অনুযোগ জন্মে। পরীক্ষার হলে এক বন্ধু অন্য বন্ধুকে না-দেখানোর ফলে দায় চাপানো হয় না ঠিক, কিন্তু ভুক্তভোগী বন্ধুর মনে মেধাবী বন্ধুর প্রতি অনুযোগ ঠিকই বাসা বাঁধে। দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলে ব্যক্তির অবস্থান মজবুত হয় আর কর্তব্য ঠিকভাবে পালন করলে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব প্রকাশ পায়। সাধারণ মানুষ দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে বিশ্বাস করে আর কর্তব্যপরায়ণ ব্যক্তিকে শ্রদ্ধা করে। প্রত্যেক মাসে ঠিক সময়ে বাসাভাড়া পরিশোধ না-করলে মালিকপক্ষ বাসা ছেড়ে দিতে বলতে পারেন। তাই, যথাসময় ভাড়া পরিশোধ করাটা ভাড়াটিয়া দায়িত্ব। কিন্তু বিভিন্ন সমস্যার ফলে কোনো কোনো মাসে ভাড়াটিয়া নির্দিষ্ট সময়ে বাসাভাড়া পরিশোধ না-ও করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ওই ভাড়াটিয়াকে বাসাভাড়ার জন্যে চাপ না-দেওয়াটা বাড়ির মালিকের কর্তব্য। এতে বাড়ির মালিকের প্রতি ভাড়াটিয়ার শ্রদ্ধাবোধ জন্ম নেবে।

দায়িত্বের পাশাপাশি কর্তব্যও পালন করা হলে সাধারণের আদর্শে ও শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত হওয়া যায়। তাই, দায়িত্ব আর কর্তব্যের যথাযথ প্রয়োগ নিত্যদিনের লেখালিখির পাশাপাশি বাস্তব জীবনেও ঘটা উচিত।

সূত্র:  দায়িত্ব বনাম কর্তব্য, এবি ছিদ্দিক, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)


All Link

বিসিএস প্রিলি থেকে ভাইভা কৃতকার্য কৌশল

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বইয়ের তালিকা

বাংলা সাহিত্যবিষয়ক লিংক

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/১

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন/২

বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন এবং কেন লিখবেন /৩

কীভাবে হলো দেশের নাম

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

error: Content is protected !!