দি বাহামাস (Bahamas) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম ( উত্তর আমেরিকা)

ড. মোহাম্মদ আমীন

দি বাহামাস (Bahamas)

বাহামাস (Bahamas) ১৫২৩ খ্রিস্টাব্দে তুরিন মানচিত্রে প্রথম বাহামা নামটি কাগজে কলমে লিপিবদ্ধ পাওয়া যায়। অবশ্য এর পূর্বেই বাহামা নামটি প্রচলিত ছিল। তবে কোনো দলিলে তা লিখিত ছিল না। বাহামা নামের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মতবাদ প্রচলিত। বাহামার স্প্যানিশ নাম আর্কিপিলাগো ডি বাহামাস। যা স্পেনিশ বাজা মার শব্দ হতে উদ্ভুদ। ভাষাবিদদের মতে বাজা মার (baja mar ) শব্দের অর্থ অগভীর জল বা অগভীর সমুদ্র অথবা ভাটা। ইতিহাসবেত্তার অভিমত, বাহামা শব্দের অর্থ অগভীর, বা অগভীর সমুদ্র বা ভাটা। অগভীর সমুদ্রে ক্রমাগত পলি জমাট হয়ে জনপদটির সৃষ্টি হয়। তাই এর নাম হয় বাজা মার বা বাহামা।

কেউ কেউ মনে করেন, ল্যুকাইয়ান টাইনু ভাষা বা হা মা (ba ha ma) শব্দ হতে বাহামা নামের উৎপত্তি। বা হা মা শব্দের অর্থ ইরম Big upper middle Land বা বিশাল উচ্চতর মধ্যম- দেশ। ক্যারিবিয়ান ভাষায় যাকে বলা  হয় বিমিনি এবং বনিকা। অনেকে মনে করেন, বিমিনি ও বনিকার যুক্ত শব্দ বাহামা। তবে এমনটি হওয়ার সম্ভাবনা কম। ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় বাহামা যে, অগভীর সমুদ্রের পলির সন্তান সে ব্যাপারে ইতিহাসবেত্তাদের কোন সংশয় নেই। অতএব বলা যায়, বাহামা শব্দের অর্থ অগভীর সমুদ্র। আটলান্টিক মহাসাগরের অগভীর সমুদ্রের পলি বিধৌত সৃষ্টি বলে জনপদটি বাহামা নামে পরিচিতি পায়।

আবার কেউ কেউ বলেন, বাহামা শব্দটি স্থানীয় গুয়ানাহানি (Guanahani) ভাষা হতে উদ্ভুদ। তবে অর্থ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞগণ তেমন জ্ঞাত নয়।  পৃথিবীতে দুটি দেশের নামের আগে ইংরেজি দি শব্দটি লেখা হয়। একটি হচ্ছে বাহামা অন্যটি দি গাম্বিয়া। সাধারণত জাতির নাম উল্লেখ করার আগে দি (the) আর্টিক্যাল বসে। এ বিবেচনায় অনেকে মনে করেন, বাহামা একটি জাতির নাম।

দি বাহামাসের মোট আয়তন ১৩,৮৭৮ বর্গকিলোমিটার বা ৫,৩৫৮ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশের পরিমাণ ২৮%। ২০১৪ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, দেশটির মোট জনসংখ্যা ৩,২১,৮৩৪ জন এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ২৩.২৭ জন। জনসংখ্যার ৮৩% আফ্রো-বাহামির, ১৫% হোয়াইট/মিশ্র, ০.৭% নোটস্টাটেড (notstated), ০.৬% এশিয়ান এবং অন্যান্য ০.৩%। আয়তন বিবেচনায় দি বাহামাস পৃথিবীর ১৬০-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা ও জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় যথাক্রমে ১৭৭-তম ও ১৮১-তম। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুলাই দেশটি যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীনতা লাভ করে। সরকারি ভাষা ইংরেজি। তবে অনেকে বাহামিয়ান উপভাষায় কথা বলেন। জনসংখ্যার ৯৫% খ্রিস্টান, ৩% অজ্ঞাত এবং ২% অন্যান্য। এ অন্যান্যদের মধ্যে ইহুদি, মুসলিম, বাহাই, হিন্দু, রাস্তাপারিয়ান (Rastafarians) প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। রাজধানী নাসাউ পৃথিবীর সুন্দরতম শহরের একটি।

দেশটির জিডিপি (পিপিপি), ২০১২ খ্রিস্টাব্দের হিসাবমতে, ১১.০৫৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার, সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৩১,৩৮২ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ৮.০৪৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ২২,৮৩২ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম বাহামিয়ান ডলার। বাহামিয়ান ডলার ও ইউএস ডলার সমান মূল্যমানের। বাহামার সর্বত্র ইউএস ডলার গ্রহণ করা হয়, তবে যুক্তরাষ্ট্রে বাহামিয়ান ডলার গ্রহণ করা হয় না। যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পর মাথাপিছু আয় বিবেচনায় দি বাহামা পুরো পশ্চিম গোলার্ধে তৃতীয় ধনী দেশ। এ দেশের ৬০% জিডিপি আসে পর্যটন থেকে। ৫০% নাগরিক এ  সেক্টরে জড়িত। বাহামায় কোনো আয়কর, কর্পোরেট ট্যাক্স, মূলধনি ট্যাক্স বা উত্তরাধিকার ট্যাক্স নেই। করমুক্তির সুযোগ নেওয়ার জন্য অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ী বাহামাকে ব্যবহার করে।

দি বাহামাস আটলান্কিট মহাসাগরের লুসাইয়ান দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত ৭০০ এর অধিক দ্বীপ, প্রবালপ্রাচীর ও ক্ষুদ্র দ্বীপ  নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। সরকারি নাম কমনওয়েলথ অব দ্যা বাহামাস। এটি কিউবা, হাইতি ও ডমিনিকান রিপাবলিকের উত্তরে,তুর্কসও কাইকোস দ্বীপপুঞ্জের উত্তর-পূর্বে, যুক্তরাজ্যের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে এবং ফ্লোরিডা কিস-এর পূর্বে অবস্থিত। দি বাহামার সামুদ্রিক এলাকার পরিমাণ ৪,৭০,০০০ বর্গকিলোমিটার।

দি বাহামায়ম ২,৪০০ প্রবাল প্রাচীর রয়েছে। গ্র্যান্ড বাহামা দ্বীপের লুইচাইয়ান ন্যাশনাল পার্কে রয়েছে দীর্ঘতম ডুবন্ত গুহা। বাহামায় রয়েছে বিশ্বের গভীরতম ব্লু হোল বা নীলগর্ত। ডিনস ব্লু হোল নামের এ নীলগর্তটি ২০২ মিটার গভীর। যা পর্যটকদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় একটি স্থান। বাহামায় ৭০০ দ্বীপ রয়েছে। তন্মধ্যে কেবল ৩০টিতে জনবসতি রয়েছে। পশ্চিম গোলার্ধের দুটি দেশের ক্রান্তীয় রেখায় অবস্থিত। তন্মধ্যে একটি বাহামা এবং অন্যটি মেক্সিকো। ক্যাট দ্বীপে অবস্থিত ৬৩ মিটার বা ২০৬ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট মাউন্ট অ্যালভারনিয়া বাহামার সর্বোচ্চ বিন্দু। পৃথিবীর তৃতীয় দীর্ঘতম প্রবাল প্রাচীর রয়েছে বাহামায়। পৃথিবীর ৫% কোরাল দি বাহামার জলে পাওয়া যায়। এখানকার অর্ধেক গাড়ি বাদিকে আবার বাকি অর্ধেক গাড়ি ডানদিকে চালিত।

১৪৯২ খ্রিস্টাব্দে ক্রিস্টোফার কলম্বাস যখন নতুন পৃথিবীতে আসেন, তখন তিনি বাহামার একটি স্থানে অবতরন করেছিলেন। সেটি তখন আদিবাসী লুসাইয়ান ইন্ডিয়ানদের (Lucayan Indians) কাছে গুয়ানাহানি (Guanahani) নামে পরিচিত ছিল। কলম্বাস দ্বীপটি স্পেনের দাবি করেন এবং নাম রাখেন সান সালভেদও San Salvador)।

পৃথিবীর সবচেয়ে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানি দেখতে চাইলে আপনাকে বাহামা যেতেই হবে। বাহামার জল পৃথিবীর সবচেয়ে পরিষ্কার। এর দৃশ্যমানতা ২০০ ফুট বা ৬১ মিটার। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, একজাতীয় শৈবাল, যার বাঁচার জন্য আলো প্রয়োজন, সে ধরণের শেওলা পৃথিবীর অন্যন্য এলাকার চেয়ে বাহামাতে বেশি পাওয়া যায়। এমন সুন্দর দেশ পৃথিবীতে খুব কম আছে। কেমন সুন্দর? ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে জর্জ ওয়াশিংটন বাহামা ভ্রমণের পর বলেছিলেন, বাহামা একটি চিরস্থায়ী জুন দ্বীপপুঞ্জ (Isles of Perpetual June)। বাহামার আটলান্টিস প্যারাডাইস আইল্যান্ডকে বিশ্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্বীপের অন্যতম বলা হয়। এটি পৃথিবীর ভ্রমণ-পিয়াসি মানুষের জন্য স্বর্গ হিসাবে বিবেচিত। যদিও দ্বীপটির প্রকৃত নাম শুকরের দ্বীপ।


সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

All Link

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

ইউরোপ মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

এশিয়া মহাদেশ : ইতিহাস ও নামকরণ লিংক

error: Content is protected !!