দেশের বাণী, বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষা: কায়কোবাদ জীবনী

ড. মোহাম্মদ আমীন

দেশের বাণী 

কায়কোবাদ

কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী?
এ দেশের লোক যারা,
সকলই তো গেছে মারা,
আছে শুধু কতগুলি শৃগাল শকুনি!

সে কথা ভাবিতে হায়
এ প্রাণ ফেটে যায়,
হৃদয় ছাপিয়ে উঠে – চোখ ভরা পানি।
কে আর বুঝিবে হায় এ দেশের বাণী!

এ দেশের লোক যত
বিলাস ব্যসনে রত
এ দেশের দুঃখ কিছু নাহি বুঝে তারা।
দেশ গেল ছারেখারে,
এ কথা বলিব কারে?
ভেবে ভেবে তবু মোর হয়ে গেছে সারা!

প্রাণভরা হাহাকার
চোখ ভরা অশ্রুধার,
এ হৃদি যে হয়ে গেছে মরুভূমি-পারা!

বঙ্গভূমি ও বঙ্গভাষা
কায়কোবাদ 
বাংলা আমার মাতৃভাষা  
বাংলা আমার জন্মভূমি।  
গঙ্গা পদ্মা যাচ্ছে ব’য়ে,  
যাহার চরণ চুমি।  
ব্রহ্মপুত্র গেয়ে বেড়ায়,  
যাহার পূণ্য-গাথা!  
সেই-সে আমার জন্মভূমি,  
সেই-সে আমার মাতা!  
আমার মায়ের সবুজ আঁচল  
মাঠে খেলায় দুল!  
আমার মায়ের ফুল-বাগানে,  
ফুটছে কতই ফুল!  
শত শত কবি যাহার  
গেয়ে গেছে গাথা!  
সেই-সে আমার জন্মভূমি,  
সেই-সে আমার মাতা!  
আমার মায়ের গোলা ছিল,  
ধন ধান্যে ভরা!  
ছিল না তার অভাব কিছু,  
সুখে ছিলাম মোরা!  
বাংলা মায়ের স্নিগ্ধ কোলে,  
ঘুমিয়ে রব আমি!  
বাংলা আমার মাতৃভাষা  
বাংলা জন্মভূমি!
একনজরে কায়কোবাদ

 মহাকবি কায়কোবাদ ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে ফেব্রুয়ারি মতান্তরে ২৫শে মার্চ ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জের আগলা পূর্বপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে অধিকাংশের অভিমত তাঁর প্রকৃত জন্ম তারিখ ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে ফেব্রুয়ারি। তাঁর পিতা শাহামতউল্লাহ আল কোরেশী ছিলেন ঢাকার জেলা-জজ আদালতের উকিল। কবি কায়কোবাদের প্রকৃত নাম: মুন্সি কাজেম আল কোরায়েশী। কায়কোবাদ তাঁর লেখক ছদ্মনাম। অতি অল্পবয়স থেকে কায়কোবাদের সাহিত্য-প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে। মাত্র তেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্য বিরহবিলাপ (১৮৭০) প্রকাশিত হয়। তাঁর অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে: কুসুম কানন (১৮৭৩), অশ্রুমালা (১৮৯৫),  মহাশ্মশান (১৯০৪), শিব-মন্দির (১৯২২), অমিয়ধারা (১৯২৩), শ্মশান-ভস্ম (১৯২৪) ও মহরম শরীফ (১৯৩২)। কবির মৃত্যুর বহুদিন পরে প্রেমের ফুল (১৯৭০), প্রেমের বাণী (১৯৭০), প্রেম-পারিজাত (১৯৭০), মন্দাকিনী-ধারা (১৯৭১) ও গওছ পাকের প্রেমের কুঞ্জ (১৯৭৯) প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি  বাংলা একাডেমী কায়কোবাদ রচনাবলী (৪ খন্ড, ১৯৯৪-৯৭) প্রকাশ করেছে।  হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের কাব্যপ্রভাব  তাঁর উপর প্রবল ছিল। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের প্রভাবও দেখা যায় তাঁর দেশাত্মবোধক কবিতাসমূহে। তের বছর বয়সে ‘বিরহ বিলাপ’ (১৮৭০) প্রকাশের মাধ্যমে তাঁর কবিত্ব শক্তির সুচনা  ঘটে। এটিই তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। তিনি বাঙালি মুসলমান কবিদের মধ্যে  প্রথম সনেট রচয়িতা ও আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রথম মুসলমান কবি।

কায়কোবাদ বাংলার অপর দুই মহাকবি  হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও নবীনচন্দ্র সেনের ধারায় মহাকাব্য রচনা করেন। তবে নবীনচন্দ্রই ছিলেন তাঁর প্রধান আদর্শ। কায়কোবাদের মহাশ্মশান হচ্ছে মহাকাব্য। তৃতীয় পানিপথের যুদ্ধ অবলম্বনে রচিত এ কাব্যে জয়-পরাজয় অপেক্ষা ধ্বংসের ভয়াবহতা প্রকট হওয়ায় এর নাম হয়েছে ‘মহাশ্মশান’। এটি তাঁর শ্রেষ্ঠ রচনা এবং এর দ্বারাই তিনি মহাকবিরূপে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর গীতিকবিতায় প্রেম, প্রকৃতি, স্বদেশ ও আধ্যাত্মিকতা প্রকাশ পেয়েছে।

কায়কোবাদের কাব্যসাধনার মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চাৎপদ মুসলমান সম্প্রদায়কে তার অতীত ঐতিহ্য সম্পর্কে সচেতন করা এবং তা পুনরুদ্ধারে উদ্বুদ্ধ করা। তিনি ছিলেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী, যার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর বিভিন্ন রচনায়। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিষয় নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলিম সাহিত্য সম্মেলনের মূল অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। বাংলা কাব্যসাহিত্যে অসাধারণ অবদানের জন্য নিখিল ভারত সাহিত্য সংঘ তাঁকে ‘কাব্যভূষণ’, ‘বিদ্যাভূষণ ও ‘সাহিত্যরত্ন’ (১৯২৫) উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে জুলাই ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।  

বাংলা ও  বাঙালি নিয়ে একটি বিখ্যাত কবিতা

error: Content is protected !!