ধাতু

উঠ্-আদিগণ ধাতুর বিভিন্ন রূপের যথাযথ বানান
আদ্যবর্ণ হ্রস্ব-‘উ’ বা হ্রস্ব-‘উ’-কারযুক্ত উড়্, শুন্, পুট্, খুঁজ্, ডুব্, তুল্, বুঝ্, ভুল ইত্যাদি ‘উঠ্’-আদিগণ ধাতুর বিভিন্ন রূপের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে আমরা প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়ে যাই। আসলেই ধাতুগুলোর বিভিন্ন রূপে কখন আদ্যবর্ণ হ্রস্ব-‘উ’ বা আদ্যবর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘উ’-কার এবং কখন ‘ও’ বা ‘ও’-কার হবে, সেটি নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে কিছুটা চেষ্টা করলেই বাক্যে উল্লেখ-করা ধাতুগুলোর বিভিন্ন রূপের যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে ঝামেলা থেকে রেহাই পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে প্রথমেই মনে রাখতে হবে— সাধু রীতিতে উল্লেখ- করা ধাতুগুলোর যে-কোনো রূপের বানানে আদ্যবর্ণ হ্রস্ব-‘উ’ বা আদ্যবর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘উ’-কার দিয়ে লিখতে হবে।

যেমন: উঠ, শুনা, খুঁজি, তুলিব, ডুবিতেছে, বুঝিয়াছি, তুলিতেছিলাম, উড়ে ইত্যাদি। অর্থাৎ, উল্লেখ-করা ধাতুগুলোর ব্যবহারে যতসব গণ্ডগোল কেবল চলিত রীতিতে। তবে এক্ষেত্রেও ঝামেলা খুব একটা পোহাতে হবে বলে মনে হয় না, যদি নিচে উল্লেখ-করা নিয়মটি আয়ত্ত করতে পারেন। উল্লেখ-করা উঠ্, শুন্, বুঝ্, খুঁজ্, উড়্ ইত্যাদি ধাতুর কোনো রূপ যখন চলিত রীতিতে ব্যবহার করতে যাবেন, তখন প্রথমেই দেখতে হবে ধাতুগুলোর দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে কোন কার-চিহ্ন যুক্ত হয়েছে। যদি দেখেন দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘ই’-কার বা হ্রস্ব-‘উ’-কার যুক্ত হয়েছে, তবে বানান অবশ্যই আদ্যবর্ণ হ্রস্ব-‘উ’ বা আদ্যবর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘উ’-কার দিয়ে লিখতে হবে।

যেমন : বুঝি, শুনি, উঠুন, খুঁজিস, খুলিনি ইত্যাদি। যদি দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘ই’-কার বা হ্রস্ব-‘উ’-কার ভিন্ন অন্য কোনো কার-চিহ্ন যুক্ত হয় বা কোনো কার-চিহ্নই যুক্ত না-হয়, তবে আপনার বাক্যে প্রয়োগে ওই শব্দটির সাধুরূপ কী হবে, সেটি চিন্তা করতে হবে। যদি সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘ই’ কার বা হ্রস্ব-‘উ’-কার যুক্ত হয়, তাহলে বানান আদ্যবর্ণ হ্রস্ব-‘উ’ বা আদ্যবর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘উ’-কার দিয়ে লিখতে হবে এবং অন্য যে-কোনো কার-
চিহ্ন যুক্ত হলে বা কোনো কার-চিহ্নই যুক্ত না হলে আদ্যবর্ণ ‘ও’ বা আদ্যবর্ণের সঙ্গে ‘ও’-কার দিয়ে লিখতে হবে। নিচে উল্লেখ-করা উদাহরণগুলো পড়লে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে যাবে—

১. চলিত রীতিতে ব্যবহৃত ‘ওঠ’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘উঠ’। যেহেতু শব্দটির সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে কোনো কার-চিহ্ন যুক্ত হয়নি, সেহেতু শব্দটির চলিতরূপ আদ্যবর্ণ ‘ও’ দিয়ে (ওঠ) লেখা হয়েছে।

২. চলিত রীতিতে ব্যবহৃত ‘শোনে’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘শুনে’। যেহেতু শব্দটির সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে ‘এ’-কার যুক্ত হয়েছে, সেহেতু চলিত রীতিতে শব্দটির বানান আদ্যবর্ণের সঙ্গে ‘ও’-কার দিয়ে (শোনে) শুদ্ধ।

৩. চলিত রীতিতে ব্যবহৃত ‘শুনেছি’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘শুনিয়াছি’। যেহেতু শব্দটির সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘ই’-কার যুক্ত হয়েছে, সেহেতু চলিত রীতিতে শব্দটির বানান আদ্যবর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘উ’-কার দিয়ে (শুনেছি) লিখতে হবে।

৪. চলিত রীতিতে ব্যবহৃত ‘বোঝাবে’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘বুঝাইবে’। যেহেতু শব্দটির সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে ‘আ’-কার যুক্ত হয়েছে, সেহেতু চলিত রীতিতে শব্দটির বানান আদ্যবর্ণের সঙ্গে ‘ও’-কার দিয়ে (বোঝাবে) লিখতে হবে।

৫. চলিত রীতিতে ব্যবহৃত ‘খুঁজবে’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘খুঁজিবে’। যেহেতু শব্দটির সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘ই’-কার যুক্ত হয়েছে, সেহেতু চলিত রীতিতে শব্দটির বানান আদ্যবর্ণের সঙ্গে হ্রস্ব-‘উ’-কার দিয়ে (খুঁজবে) লিখতে হবে।

৬. চলিত রীতিতে ব্যবহৃত ‘ওড়াচ্ছিল’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘উড়াইতেছিল’। যেহেতু শব্দটির সাধুরূপে দ্বিতীয় বর্ণের সঙ্গে ‘আ’-কার যুক্ত হয়েছে, সেহেতু শব্দটির চলিতরূপ আদ্যবর্ণ ‘ও’ দিয়ে লিখতে হবে। একইভাবে, শুনিতেছে > শুনছে, উঠাইবে > ওঠাবে, বুঝিয়াছি > বুঝেছি, শুনিত > শুনত, খুঁজিতেছিলেন > খুঁজছিলেন, বুঝিয়াছেন > বুঝেছেন, বুঝিয়াশুনিয়া > বুঝেশুনে ইত্যাদি বানানগুলো লেখা যায়। উল্লেখ্য, শব্দগুলোর সাধুরূপ অবশ্যই বাক্যে প্রয়োগ অনুযায়ী করতে হবে। কারণ, বাক্যে প্রয়োগ অনুযায়ী অনেক শব্দের সাধুরূপ বদলে যায়। নিচে উল্লেখ-করা বাক্য দুটি লক্ষ করলে ব্যাপারটি বুঝতে পারবেন—
১) পাখি আকাশে ওড়ে।
২) পাখি আকাশে উড়ে বেড়ায়।
প্রথম বাক্যের ভাব অনুযায়ী ‘ওড়ে’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘উড়ে’, তাই এক নম্বর বাক্যে ‘ওড়ে’ শব্দটির বানান ‘ও’ দিয়ে লেখা হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বাক্যের ভাব অনুযায়ী ‘ওড়ে’ শব্দটির সাধুরূপ হচ্ছে ‘উড়িয়া’ (পাখি আকাশে উড়িয়া বেড়ায়)। তাই দুই নম্বর বাক্যে ‘উড়ে’ শব্দটির বানান হ্রস্ব-‘উ’ দিয়ে লেখা হয়েছে।

< এবি ছিদ্দিক, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

error: Content is protected !!