নজরুল: জাতীয় কবি নজরুল: একনজরে নজরুল

ড. মোহাম্মদ আমীন

নজরুল: জাতীয় কবি নজরুল: একনজরে নজরুল

জন্ম ও পরিবার:  বাংলাদেশের জাতীয় কবি এবং অবিভক্ত বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব কাজী নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে ( ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ বঙ্গাব্দ) ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া ব্লকে অবস্থিত চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নজরুল, সাহিত্যকর্ম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবিভক্ত বাংলায় পরাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, মৌলবাদ এবং দেশি-বিদেশি শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের জগতে ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত। রবীন্দ্রযুগে  রবীন্দ্রনাথের অনুকরণমুক্ত কবিতা রচনায় তাঁর দুঃসাহসী অবদান ছিল অনবদ্য প্রতিভার প্রমাণ।

নজরুল তাঁর কবিতায় ব্যতিক্রমী এমন সব বিষয় ও শব্দ ব্যবহার করেন, যা  এর আগে কেউ ব্যবহার করেননি। কবিতা ও গানে তিনি আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষার শব্দ, সুর ও ছন্দের সমন্বয়ে সৃষ্টি করেন নতুন ধারা। নজরুলসংগীতকে বলা হয় বাংলা সংগীতের অণুবিশ্ব। তিনি বাংলায় সংযোজন করেন উত্তর ভারতীয় রাগসঙ্গীতের বঙ্গীয় সংস্করণ। 

নজরুলের ডাক নাম ছিল “দুখু মিয়া”। তিনি ছিলেন তাঁর পিতামহ কাজী আমিন উল্লাহর পুত্র কাজী ফকির আহমদের দ্বিতীয় স্ত্রী জাহেদা খাতুনের ষষ্ঠ সন্তান। বাবা ফকির আহমদ ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমামবং মাজারের খাদেম। নজরুলের তিন ভাইয়ের মধ্যে কনিষ্ঠ কাজী আলী হোসেন এবং দুই বোনের মধ্যে সবার বড়ো কাজী সাহেবজান ও কনিষ্ঠ উম্মে কুলসুম। ১৯০৮  খ্রিষ্টাব্দে পিতার মৃত্যুর পর নজরুল হাজী পালোয়ানের মাজারের সেবক এবং মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজে নিযুক্ত হন।  এর আগে তিনি গ্রামের  মকতব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। 

লেটোদল:  মকতব, মাজার ও মসজিদের কর্ম ছেড়ে  নজরুল  রাঢ় বাংলার (পশ্চিম বাংলার বর্ধমান-বীরভূম অঞ্চল) কবিতা, গান আর নৃত্যের মিশ্র আঙ্গিক সৃষ্ট লোকনাট্য লেটোদলে যোগদান করেন।নজরুলের কবি ও শিল্পী জীবনের প্রকৃত সূচনা লেটোদল থেকেই।  লোকনাট্যের দলে বালক নজরুল ছিলেন একাধারে  পালাগান রচয়িতা ও অভিনেতা।  হিন্দু পুরাণের সঙ্গেও নজরুলের পরিচয় লেটোদলে। তাৎক্ষণিকভাবে কবিতা ও গান রচনার কৌশলও নজরুল  লেটো দলে থেকে রপ্ত করেন। এ সময় লেটোদলের জন্য কিশোর কবি নজরুলের সৃষ্টি চাষার সঙ, শকুনিবধ, রাজা যুধিষ্ঠিরের সঙ, দাতা কর্ণ, আকবর বাদশাহ, কবি কালিদাস, বিদ্যাভূতুম, রাজপুত্রের সঙ, বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ, মেঘনাদ বধ প্রভৃতি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।

অধ্যয়ন:  ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল প্রথমে রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং পরে মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুলে (পরে নবীনচন্দ্র ইনস্টিটিউশন) ভর্তি হন।  শেষোক্ত স্কুলের প্রধানশিক্ষক  ছিলেন কবি  কুমুদরঞ্জন মল্লিক। আর্থিক অনটনের কারণে ষষ্ঠ শ্রেণির পর নজরুল মাথরুন স্কুল ছেড়ে প্রথমে বাসুদেবের কবিদলে, পরে এক খ্রিষ্টান রেলওয়ে গার্ডের খানসামা পদে এবং শেষে আসানসোলে চা-রুটির দোকানে কাজ নেন। চা-রুটির দোকানে চাকরিকালীন আসানসোলের দারোগা রফিজউল্লার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। তিনি  ১৯১৪ খ্রিষ্টোব্দে নজরুলকে  ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশালের দরিরামপুর স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন। এক বছর পর তিনি পুনরায় নিজ গ্রামে ফিরে যান এবং ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে আবার রানীগঞ্জ সিয়ারসোল রাজ স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন। এ স্কুলে নজরুল ১৯১৫-১৭ খ্রিষ্টাব্দে অষ্টম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। প্রিটেস্ট পরীক্ষার সময় ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে নজরুল সেনাবাহিনীতে যোগ দেন।

সৈনিক জীবন:  ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিক থেকে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় আড়াই বছর নজরুল সেনাবাহিনীতে ছিলেন। তিনি ৪৯ বেঙ্গলি রেজিমেন্টের সৈনিক থেকে ব্যাটেলিয়ন কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার পদে উন্নীত হন। রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি মৌলবির নিকট তিনি ফারসি ভাষা শেখেন। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন সংগীতানুরাগী সহসৈনিকদের সঙ্গে তিনি দেশি-বিদেশি  বাদ্যযন্ত্র সহযোগে সংগীত ও সাহিত্যচর্চা করতেন। নজরুলের আনুষ্ঠানিক সাহিত্যচর্চার শুরু করাচি সেনানিবাসে। করাচি সেনানিবাসে বসে রচিত এবং কলকাতার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত নজরুলের রচনাবলির মধ্যে  ‘বাউন্ডুলের আত্মকাহিনী’ (সওগাত, মে ১৯১৯) নামক প্রথম গদ্য রচনা, প্রথম প্রকাশিত কবিতা ‘মুক্তি’ (বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, জুলাই ১৯১৯) এবং অন্যান্য রচনা: গল্প ‘হেনা’, ‘ব্যথার দান’, ‘মেহের নেগার’, ‘ঘুমের ঘোরে’; কবিতা ‘আশায়’, ‘কবিতা সমাধি’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। 

সৈনিক জীবনের অবসান:  প্রথম মহাযুদ্ধ শেষে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে নজরুল দেশে ফিরে কলকাতায় সাহিত্যিক-সাংবাদিক জীবন শুরু করেন। কলকাতায় তাঁর প্রথম আশ্রয় ৩২নং কলেজ স্ট্রিটে অবস্থিত  বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির অফিস। সেখানে সমিতির অন্যতম কর্মকর্তা মুজফ্‌ফর আহমদের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। শুরুতেই  মোসলেম ভারত, বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, উপাসনা  প্রভৃতি পত্রিকায় তাঁর  বাঁধন-হারা  উপন্যাস এবং ‘বোধন’, ‘শাত-ইল-আরব’, ‘বাদল প্রাতের শরাব’, ‘আগমনী’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘কোরবানী’, ‘মোহরর্ম’, ‘ফাতেহা-ই-দোয়াজ্দহম্’ প্রভৃতি কবিতা প্রকাশিত হয়। যা বাংলা সাহিত্য জগতে  চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। কবি-সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার মোসলেম ভারত পত্রিকায় প্রকাশিত এক পত্রের মাধ্যমে নজরুলের ‘খেয়া-পারের তরণী’ এবং ‘বাদল প্রাতের শরাব’ কবিতা-দুটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে  বাংলার সারস্বত সমাজে তাঁকে স্বাগত জানান। নজরুল ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; তখন থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দু দশক বাংলার দু প্রধান কবির মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ ছিল।

সাংবাদিক জীবনের সূচনা ও নবযুগ:  এ.কে ফজলুল হকের (শেরে-বাংলা) সম্পাদনায় অসহযোগ ও খিলাফত আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই জুলাই সান্ধ্য দৈনিক  নবযুগ প্রকাশিত হয়। এর মাধ্যমে নজরুলের সাংবাদিক জীবনের সূচনা।  নজরুলের লেখা ‘মুহাজিরীন হত্যার জন্য দায়ী কে?’ প্রবন্ধের জন্য ওই বছর আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে পত্রিকার জামানত বাজেয়াপ্ত হয় ।

নজরুলের গানের প্রথম সুরারোপ: ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে জুন মাসের কথা।  নজরুল তখনো  গান লিখে সুর দিতে শুরু করেননি। এসময়  তাঁর দুটি কবিতায় সুর দিয়ে স্বরলিপিসহ পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেন ব্রাহ্মসমাজের সংগীতজ্ঞ মোহিনী সেনগুপ্তা। কবিতা দুটি ছিল— ‘হয়ত তোমার পাব দেখা’, ‘ওরে এ কোন্ স্নেহ-সুরধুনী’। নজরুলের গান ‘বাজাও প্রভু বাজাও ঘন’ প্রথম প্রকাশিত হয় সওগাত পত্রিকার ১৩২৭ বঙ্গাব্দে (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে) বৈশাখ সংখ্যায়।

কুমিল্লায় নজরুল প্রেম ও বিবাহ: ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল-জুন মাসে  মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে পুস্তক প্রকাশক আলী আকবর খানের সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। তাঁর সঙ্গে নজরুল প্রথম কুমিল্লায় বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে যান। এখানে নজরুলের সঙ্গে  প্রমীলার  পরিচয়, প্রেম এবং অতঃপর পরিণয়। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে এপ্রিল কলকাতায় নজরুল ও প্রমীলার বিবাহ সম্পন্ন হয়। প্রমীলা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজভুক্ত। তাঁর মা গিরিবালা দেবী ছাড়া পরিবারের অন্যরা এ বিবাহ সমর্থন করেননি। নজরুলও নিজের আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলেন। বিবাহের পর বিচ্ছিন্নতা আরও স্থায়ী হয়।  নজরুল হুগলিতে সংসার পাতেন। তবে এর আগে  আলী আকবর খানের ভগ্নী নার্গিস আসার খানমের সাথে নজরুলের বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ের আকদ সম্পন্ন হওয়ার পর নজরুল  নার্গিসকে রেখে পালিয়ে কুমিল্লা শহরে বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে চলে যান। নজরুল-প্রমীলার চার সন্তান। তারা হলেন:  কৃষ্ণ মুহাম্মদ, অরিন্দম খালেদ (বুলবুল), কাজী সব্যসাচী এবং কাজী অনিরুদ্ধ।

কুমিল্লায় নজরুলের রাজনীতিক কর্মকাণ্ড:  কুমিল্লা থেকে নজরুল দৌলতপুর গ্রামে আলী আকবর খানের বাড়িতে গিয়ে কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখান থেকে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে জুন পুনরায় কুমিল্লায় গিয়ে ১৭ দিন অবস্থান করেন। তখন অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। সেসময়  নজরুল বিভিন্ন শোভাযাত্রা ও সভায় যোগ দিয়ে গাইলেন  স্বদেশী গান— ‘এ কোনো পাগল পথিক ছুটে এলো বন্দিনী মার আঙ্গিনায়’, ‘আজি রক্ত-নিশি ভোরে/ একি এ শুনি ওরে/ মুক্তি-কোলাহল বন্দি-শৃঙ্খলে’ প্রভৃতি। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে নজরুল আবার কুমিল্লা যান। ২১শে নভেম্বর ভারতব্যাপী হরতাল ছিল। নজরুল অসহযোগ মিছিলের সঙ্গে শহর প্রদক্ষিণ করে গাইলেন: ‘ভিক্ষা দাও! ভিক্ষা দাও! ফিরে চাও ওগো পুরবাসী।’ 

বিদ্রোহী কবিতা: ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে কুমিল্লা থেকে  কলকাতা ফেরার পর নজরুল  ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ও ‘ভাঙার গান’ সংগীত রচনা করেন। এ দুটি রচনা বাংলা কবিতা ও গানের ধারাকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার জন্য নজরুল বিপুল খ্যাতি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেন এবং বিদ্রোহী কবি নামে খ্যাত হয়ে উঠেন।
নজরুলের মৌলবাদ বিরোধী আন্তর্জাতিক চেতনা: ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের শেষদিকে নজরুল আরেকটি বিখ্যাত কবিতা ‘কামাল পাশা’ রচনা করেন। যার মাধ্যমে তাঁর সমকালীন আন্তর্জাতিক ইতিহাস-চেতনা এবং ভারতীয় মুসলমানদের খিলাফত আন্দোলনের অসারতার পরিচয় পাওয়া যায়। নজরুল তাঁর রাষ্ট্রীয় ধ্যান-ধারণায় সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হয়েছিলেন মোস্তফা কামাল পাশার নেতৃত্ব দ্বারা। তুরস্কের সমাজজীবন থেকে মোস্তফা কামাল যে মৌলবাদ ও পর্দাপ্রথা দূর করেছিলেন, তা নজরুলকে  অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি ভেবেছিলেন, তুরস্কে যা সম্ভবপর, ভারত ও বাংলায় তা সম্ভবপর নয় কেন?  গোঁড়ামি, রক্ষণশীলতা, ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও আচারসর্বস্বতা থেকে দেশবাসী, বিশেষত স্বধর্মীদের মুক্তির জন্য নজরুল আজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। মধ্যযুগীয় সামন্ত শাসন তুরস্কের সালতানাত উচ্ছেদকারী নব্য তুর্কি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা  মোস্তফা কামাল আতাতুর্কের প্রতি নজরুলের ছিল অকুণ্ঠ সমর্থন। নজরুল কামাল আতাতুর্ককে নিয়ে  ‘কামাল পাশা’ কবিতায় লিখেছেন:
ঐ খেপেছে পাগ্লি মায়ের দামাল ছেলে কামাল ভাই,
অসুর-পুরে শোর উঠেছে জোর্সে সামাল সামাল তাই।
            কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!
হো হো   কামাল! তু নে কামাল কিয়া ভাই!

১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবও নজরুলকে  প্রভাবিত করেছিল। নজরুলের  লাঙল ও গণবাণী পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাম্যবাদী’ ও ‘সর্বহারা’ কবিতাগুচ্ছ এবং কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল-এর অনুবাদ ‘জাগ অনশন বন্দী ওঠ রে যত’ এবং ‘রেড ফ্লাগ’ অবলম্বনে রক্তপতাকার গান এর প্রমাণ।

নজরুলের সাহিত্যকর্ম(১৯২২): ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের যেসব সাহিত্যকর্ম প্রকাশিত হয় সেসবের মধ্যে গল্প-সংকলন ব্যথার দান, কবিতা-সংকলন অগ্নি-বীণা ও প্রবন্ধ-সংকলন যুগবাণী অন্যতম। বাংলা কবিতার পালাবদলকারী  অগ্নি-বীণা কাব্যে নজরুলের ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘আগমনী’, ‘খেয়াপারের তরণী’, ‘শাত-ইল্-আরব’, ‘বিদ্রোহী’, ‘কামাল পাশা’ প্রভৃতি সাড়া জাগানো কবিতাগুলো ছিল।

ধুমকেতু: ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। এটি সপ্তাহে দুবার প্রকাশিত হতো। এই পত্রিকাকে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু। আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।”

নজরুলকে গ্রেফতার ও কারাদণ্ড:  ধূমকেতুর ২৬শে সেপ্টেম্বর ১৯২২ সংখ্যায় নজরুলের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ প্রকাশিত হলে ৮ই নভেম্বর পত্রিকার ওই সংখ্যাটি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে নভেম্বর নজরুলের প্রবন্ধগ্রন্থ যুগবাণী বাজেয়াপ্ত হয়। একই দিন নজরুলকে কুমিল্লা থেকে গ্রেফতার করে কলকাতায় আনা হয়।  বিচারাধীন বন্দি হিসেবে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই জানুয়ারি নজরুল আত্মপক্ষ সমর্থন করে চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট সুইনহোর আদালতে যে জবানবন্দি প্রদান করেন, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তা ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ নামে সাহিত্য-মর্যাদা পায়। ১৬ই জানুয়ারি বিচারের রায়ে নজরুলকে এক বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। 

অনশন ধর্মঘট, শাস্তিভোগ  শেষে মুক্তি: ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ওই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you.’ জেল কর্তৃপক্ষের বিরূপ মনোভাবের কারণে নজরুল টেলিগ্রামটি পাননি। জনমতের চাপে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে মে জেল-পরিদর্শক ড. আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী হুগলি জেল পরিদর্শন করেন এবং তাঁর আশ্বাস ও অনুরোধে ওই দিন নজরুল চল্লিশ দিনের অনশন ভঙ্গ করেন। নজরুলকে ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই জুন বহরমপুর জেলে স্থানান্তর করা হয় এবং এক বছর তিন সপ্তাহ কারাবাসের পর ১৫ই ডিসেম্বর মুক্তি দেওয়া হয়। হুগলি জেলে বসে নজরুল রচনা করেন ‘এই শিকল-পরা ছল মোদের এ শিকল-পরা ছল’। বহরমপুর জেলে বসে রচনা করেন ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেল্‌ছ জুয়া’। 

নজরুল ও রবীন্দ্রনাথ: নজরুল ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন; তখন থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দু দশক বাংলার দু প্রধান কবির মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা অক্ষুণ্ণ ছিল।১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই আগস্ট নজরুল ধূমকেতু পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাকে আশীর্বাদ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম কল্যাণীয়েষু, আয় চলে আয়রে ধূমকেতু। আঁধারে বাঁধ অগ্নিসেতু, দুর্দিনের এই দুর্গশিরে উড়িয়ে দে তোর বিজয় কেতন।” ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই এপ্রিল নজরুলকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। রাজবন্দিদের প্রতি ইংরেজ জেল-সুপারের দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে ওই দিন থেকেই তিনি অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। রবীন্দ্রনাথ অনশন ভঙ্গ করার অনুরোধ জানিয়ে নজরুলকে টেলিগ্রাম করেন: ‘Give up hunger strike, our literature claims you.’। নজরুল যখন আলীপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি তখন ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের ২২শে জানুয়ারি রবীন্দ্রনাথ তাঁর বসন্ত গীতিনাট্য তাঁকে উৎসর্গ করেন । এ ঘটনায় উল্লসিত নজরুল জেলখানায় বসে তাঁর অনুপম কবিতা ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ রচনা করেন। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত নজরুল দার্জিলিং সফর করেন। রবীন্দ্রনাথও তখন দার্জিলিং-এ ছিলেন। ওখানে উভয়ের সাক্ষাৎ হয়। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ই আগস্ট (২২ শ্রাবণ ১৩৪৮) রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে শোকাহত নজরুল তাৎক্ষণিকভাবে রচনা করেন ‘রবিহারা’ ও ‘সালাম অস্তরবি’ কবিতা এবং ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’ শোকসংগীত। ‘রবিহারা’ কবিতা নজরুল স্বকণ্ঠে আবৃত্তি করেন কলকাতা বেতারে, গ্রামোফোন রেকর্ডে। ‘ঘুমাইতে দাও’ গানটিও কয়েকজন শিল্পীকে নিয়ে স্বকণ্ঠে গেয়েছিলেন। ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের দিকে নজরুল  পিক্‌স ডিজিজে আক্রান্ত হন এবং ক্রমশ নির্বাক ও চেতনাহীন হয়ে পড়েন।  ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই থেকে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট মৃত্যু পর্যন্ত সুদীর্ঘ  ৩৪ বছর জীবন্মৃত অবস্থায় এক অসহনীয় বাক্‌হীন জীবন নির্বাহ করেন।

নজরুলের গানের প্রথম রেকর্ড : ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই আগস্ট নজরুলের গান ও কবিতা সংকলন বিষের বাঁশী এবং একই মাসে ভাঙ্গার গান প্রকাশিত হয়। দুটি গ্রন্থই ওই বছর অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সরকার বাজেয়াপ্ত করে। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের গানের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয় হিজ মাস্টার্স ভয়েস (এইচএমভি) কোম্পানি থেকে। তবে তিনি ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে  গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সরাসরি সংশ্লিষ্ট হন । শিল্পী হরেন্দ্রনাথ দত্তের কণ্ঠে ‘জাতের নামে বজ্জাতি সব জাত-জালিয়াৎ খেল্‌ছ জুয়া’ ও ‘যাক পুড়ে যাক বিধির বিধান সত্য হোক’ গান দুটি রেকর্ড করা হয়।

সভাসমিতি ও রাজনীতিক কর্মকাণ্ড:  নজরুল লেখালিখির পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক সভা-সমিতি ও অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন এবং স্বরচিত স্বদেশি গান পরিবেশন করে পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রামে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি তাঁর একটি জনপ্রিয় স্বদেশি গান ‘ঘোর্ রে ঘোর্ রে আমার সাধের চরকা ঘোর’ ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে ফরিদপুরে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের অধিবেশনে মহাত্মা গান্ধী ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের উপস্থিতিতে পরিবেশন করেন। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের শেষ দিকে নজরুল প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে যোগদান করেন। তিনি কুমিল্লা, মেদিনীপুর, হুগলি,  ফরিদপুর, বাঁকুড়া এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে অংশগ্রহণ করেন। নজরুল এ সময় বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সদস্য হওয়া ছাড়াও শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের জন্য ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দল’ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

লাঙ্গল, প্রথম শ্রেণি সচেতন সাপ্তাহিক:  রাজনীতিতে যোগদানের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনীতিক মতবাদ প্রকাশের জন্য নজরুল ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর সাপ্তাহিক লাঙ্গল পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি এ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ছিলেন। এর প্রথম সংখ্যাতে নজরুলের ‘সাম্যবাদী’ কবিতাসমষ্টি মুদ্রিত হয়। লাঙ্গল ছিল বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম শ্রেণিসচেতন সাপ্তাহিক পত্রিকা। এতে প্রকাশিত ‘শ্রমিক-প্রজা-স্বরাজ দলে’র ম্যানিফেস্টোতে প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপিত হয়। এ সময় নজরুল পেশাজীবী শ্রমিক-কৃষক সংগঠনের উপযোগী সাম্যবাদী ও সর্বহারা  কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন।

সর্বহারা শ্রেণির গণসংগীত: ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল কৃষ্ণনগরে বসবাস শুরু করেন এবং বাংলা গানে এক নতুন ধারার সংযোজন করেন। তিনি স্বদেশি গানকে স্বাধীনতা ও দেশাত্মবোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সর্বহারা শ্রেণির গণসংগীতে রূপান্তরিত করেন। প্রসঙ্গত, ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে নজরুল কলকাতার প্রথম বামপন্থী সাপ্তাহিক গণবাণীর (১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই আগস্ট থেকে গণবাণী ও লাঙ্গল একীভূত হয়) জন্য রচনা করেন ‘কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল’ ও ‘রেড ফ্লাগ’ অবলম্বনে ‘জাগো অনশন বন্দি’, ‘রক্তপতাকার গান’ ইত্যাদি। ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের প্রকাশনাসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল: গল্প-সংকলন রিক্তের বেদন, কবিতা ও গানের সংকলন চিত্তনামা, ছায়ানট, সাম্যবাদী ও পূবের হাওয়া। হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের অগ্রদূত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের অকাল মৃত্যুতে (১৬ জুন ১৯২৫) শোকাহত নজরুল কর্তৃক রচিত গান ও কবিতা নিয়ে চিত্তনামা গ্রন্থটি সংকলিত হয়।

নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা: ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় আইনসভার উচ্চ পরিষদের সদস্যপদের (মুসলিম সংরক্ষিত) জন্য পূর্ববঙ্গ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ঢাকা, ফরিদপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে ঢাকা বিভাগের মুসলিম প্রার্থীরূপে মনোনয়ন পত্র জমা দেন। নজরুল মনে করেছিলেন ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকায় তাঁর নির্বাচনে জয়লাভ করা সম্ভব হবে।   বন্ধু মুজফ্‌ফর আহমদ ও অন্যান্যরা নিষেধ করেছিলেন। তবে নজরুল তা উপেক্ষা করেন। ঢাকা বিভাগ থেকে দুজন মুসলিম প্রার্থী নির্বাচিত হবেন।  এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৮,১১৬ জন। নির্বাচনে প্রার্থী ছিল বরিশালের জমিদার মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন চৌধুরী,  টাঙ্গাইলের জমিদার আবদুল হালিম গজনবী, ঢাকা নবাব বাড়ীর খাজা আবদুল করিম, কাজী নজরুল ইসলাম ও মফিজউদ্দিন আহম্মেদ। কাজী নজরুল ইসলাম, ডক্টর বিধানচন্দ্র রায়ের দেওয়া তিনশত টাকা নিয়ে নির্বাচনের কাজে নেমেছিলেন। নির্বাচনে নজরুলকে  কাফের, হিন্দু প্রভৃতি আখ্যায়িত করে অপপ্রচার করা হয়। নজরুল তখন ইসলাম ধর্ম ও ঐতিহ্যকে ভিত্তি করে প্রচুর গান গজল ও কবিতা লিখতে শুরু করেন। তারপরও অপপ্রচার চলছিল এবং ভোটারগণ বিশ্বাস করছিল।  এ অবস্থায় নজরুল ফরিদপুরের বিখ্যাত পির বাদশাহ মিঞার কাছ থেকে একটি বাণী আদায় করেন।  পির বাদশাহ মিঞার নিম্নরূপ বক্তব্য-সহ বাণীটি প্রচার করা হয়েছিল, ‘বাংলার শ্রেষ্ঠ বীর, আলেম সমাজের পয়গাম ঢাকা বিভাগের ভারতীয় ব্যবস্থাপক পরিষদের মুসলমান ভোটারদের প্রতি‘ – বাণীটি ছিল নিম্নরূপ : 
“নজরুল ইসলাম নির্ভীক সত্যদর্শী সর্বজনপ্রিয় যুবক। তিনি দেশের জন্য, জাতির জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করিয়াছেন এবং দীর্ঘদিনের জন্য কারাবরণ পর্যন্ত করিয়াছেন। তাঁহার অনেকগুলি পুস্তক গভর্মেন্ট কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হইয়া গিয়াছে। সাহিত্য জগতে তিনি বাংলা দেশের মুসলমানদের গৌরব রক্ষা করিয়াছেন। একমাত্র তাঁহার লেখা দেখাইয়া দিয়াছে যে বাংলার মুসলমান সাহিত্যচর্চা করিয়া বিশ্ব সাহিত্য দরবারে আসন পাইতে পারে। আশা করি মুসলমানগণ জনগণকে দেখাইয়া দিবেন যে বাংলার মুসলমানও তাঁহাদের জাতীয় কবির এবং তাঁর বিদ্যার ও গুণের কদর করিতে পারে। আর যদি… তবে জগতের লোক হাসিবে ও ধিক্কার দিয়া বলিবে যে, বাংলার মুসলমান বিদ্যা ও গুণের কদর করিতে জানে না। অতএব, আশা করি, আপনারা এমন কাজ করিবেন না যাহাতে লোক হাসিতে পারে। তাঁহাকে দিয়া দেশের ও ইসলামের অনেক খেদমত হইবে। আমার মুরিদানদের প্রতি আমার অনুরোধ তাহারা যেন কাজী সাহেবকে জয়যুক্ত করেন“।

কবি মনে করেছিলেন, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই নির্বাচনে জয়লাভের জন্য যথেষ্ট। তবে তিনি বুঝেননি যে, সাহিত্যকর্ম আর নির্বাচন এক জিনিস নয়। নির্বাচনে তিনি এত কম ভোট পেয়েছিলেন যে, জামানতটাও বাজেয়াপ্ত হয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনে মুহাম্মদ ইসমাইল চৌধুরী ও আবদুল হালিম গজনবী জয়লাভ করেছিলেন।

গজল: নজরুল ছিলেন বাংলা  গজল গানের প্রকৃত স্রষ্টা। এর আগে ৭টি গজল লিখেছিলেন অতুলপ্রসাদ সেন। গণসংগীত ও গজলে যৌবনের দুটি বিশিষ্ট দিক সংগ্রাম ও প্রেমের পরিচর্যাই ছিল নজরুলের বাণীর মুখ্য দিক। নজরুল গজল আঙ্গিক সংযোজনের মাধ্যমে বাংলা গানের প্রচলিত ধারায় বৈচিত্র্য আনয়ন করেন। তাঁর অধিকাংশ গজলের বাণীই উৎকৃষ্ট কবিতা এবং তার সুর রাগভিত্তিক। আঙ্গিকের দিক থেকে সেগুলি উর্দু গজলের মতো তালযুক্ত ও তালছাড়া গীত। নজরুলের বাংলা গজল গানের জনপ্রিয়তা সমকালীন বাংলা গানের ইতিহাসে ছিল তুলনাহীন। ১৯২৬-২৭ সালে কৃষ্ণনগর জীবনে নজরুল উভয় ধারায় বহুসংখ্যক গান রচনা করেন। ওই সময়ে তিনি নিজের গানের স্বরলিপি প্রকাশ করতে থাকেন। এসব গান থেকে স্পষ্ট হয় যে, নজরুলের সৃজনশীল মৌলিক সংগীত প্রতিভার প্রথম স্ফুরণ ঘটে ১৯২৬-২৭ সালে কৃষ্ণনগরে। অথচ নজরুলের কৃষ্ণনগর জীবন ছিল অভাব-অনটন, রোগ-শোক ও দুঃখ-দারিদ্র্যক্লিষ্ট। তখনও পর্যন্ত নজরুল কোনো প্রচার মাধ্যমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হননি, তবে  দিলীপকুমার রায় ও সাহানা দেবীর মতো বড়ো মাপের শিল্পী ও সংগীতজ্ঞ নজরুলের গানকে বিভিন্ন আসরে ও অনুষ্ঠানে পরিবেশন করে জনপ্রিয় করে তোলেন।

ইসলামি সংগীত ও শ্যামাসংগীত: নির্বাচনের কারণে তিনি অনেকগুলো ইসলামি সংগীত রচনা করেছিলেন। ইসলামি সংগীতের চেয়ে অনেক বেশি রচনা করেছেন শ্যামাসংগীত। নজরুল ছিলেন শ্যামাভক্ত। 

মৌলবাদী আক্রমণ:  ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে একদিকে সাপ্তাহিক  শনিবারের চিঠি-তে রক্ষণশীল হিন্দু বিশেষত ব্রাহ্মণসমাজের একটি অংশ থেকে, অন্যদিকে মৌলবাদী মুসলমান সমাজের ইসলাম দর্শন, মোসলেম দর্পণ প্রভৃতি পত্রিকায় নজরুল-সাহিত্যের বিরূপ সমালোচনার ঝড় ওঠে। শনিবারের চিঠি-তে নজরুলের বিভিন্ন রচনার প্যারডি প্রকাশিত হতে থাকে। তবে নজরুলের সমর্থনে কল্লোল, কালিকলম প্রভৃতি প্রগতিশীল পত্রিকা এগিয়ে আসে। ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের কবিতা ও গানের সংকলন ফণি-মনসা এবং পত্রোপন্যাস বাঁধন হারা প্রকাশিত হয়।

জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যা: ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ-র মাসিক  মোহাম্মদী পত্রিকায় নজরুল-বিরোধিতা শুরু হয়, কিন্তু মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের সওগাত পত্রিকা বলিষ্ঠভাবে নজরুলকে সমর্থন করে। নজরুল সওগাতে যোগদান করে একটি রম্য বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সওগাতে প্রকাশিত এক প্রবন্ধে  আবুল কালাম শামসুদ্দীন নজরুলকে যুগপ্রবর্তক কবি ও বাংলার জাতীয় কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

ঢাকায় নজরুল:  ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে ২৮শে ফেব্রুয়ারি নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রবক্তা  মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে যোগদান করেন। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নজরুল মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগদানের জন্য পুনরায় ঢাকা আসেন। সেবার তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক  কাজী মোতাহার হোসেন, ছাত্র  বুদ্ধদেব বসু, অজিত দত্ত এবং গণিতের ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে পরিচিত হন। একই বছর জুন মাসে পুনরায় ঢাকা এলে সঙ্গীত চর্চাকেন্দ্রের রানু সোম (প্রতিভা বসু) ও উমা মৈত্রের (লোটন) সঙ্গে কবির ঘনিষ্ঠতা হয়। 

গ্রামোফোন কোম্পানিতে নজরুল:  নজরুল ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে, ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে বেতার ও মঞ্চের সঙ্গে এবং ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি এইচএমভি গ্রামোফোন কোম্পানির সঙ্গে সংগীত-রচয়িতা ও প্রশিক্ষকরূপে যুক্ত ছিলেন। এইচএমভি-তে নজরুলের প্রশিক্ষণে প্রথম রেকর্ডকৃত তাঁর দুটি গান ‘ভুলি কেমনে’ ‘এত জল ও কাজল চোখে’ গেয়েছিলেন আঙ্গুরবালা। নজরুলের নিজের প্রথম রেকর্ড ছিল স্বরচিত ‘নারী’ কবিতার আবৃত্তি। নজরুল কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম অনুষ্ঠান প্রচার করেন ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই নভেম্বর সান্ধ্য অধিবেশনে। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে মনোমোহন থিয়েটারে প্রথম মঞ্চস্থ শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের রক্তকমল নাটকের জন্য নজরুল গান রচনা ও সুর সংযোজনা করেন। শচীন্দ্রনাথ ওই নাটকটি নজরুলকে উৎসর্গ করেন। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে মঞ্চস্থ মন্মথ রায়ের চাঞ্চল্য সৃষ্টিকারী নাটক কারাগার-এ নজরুলের আটটি গান ছিল, নাটকটি একটানা ১৮ রজনী মঞ্চস্থ হওয়ার পর সরকার নিষিদ্ধ করে। ১৯৩২-৩৩ খ্রিষ্টাব্দে  নজরুল এইচএমভি ছেড়ে মেগাফোন রেকর্ড কোম্পানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এ কোম্পানির রেকর্ড করা প্রথম দুটি নজরুলসংগীত ছিল ধীরেন দাসের গাওয়া ‘জয় বাণী বিদ্যাদায়িনী’ ও ‘লক্ষ্মী মা তুই’। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল এক্সক্লুসিভ কম্পোজাররূপে এইচএমভি-তে পুনরায় যোগদান করেন। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ, রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম এবং কাব্য আমপারা অনুবাদ করেন।

চলচ্চিত্রে নজরুল:  ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি প্রথমে যে ছায়াছবির জন্য কাজ করেন সেটি ছিল গিরিশচন্দ্র ঘোষের কাহিনি ভক্ত ধ্রুব (১৯৩৪)। এ ছায়াছবির পরিচালনা, সংগীত রচনা, সুর সংযোজনা ও পরিচালনা এবং নারদের ভূমিকায় অভিনয় ও নারদের চারটি গানের প্লেব্যাক নজরুল নিজেই করেছিলেন। ছবির আঠারোটি গানের মধ্যে সতেরোটির রচয়িতা ও সুরকার ছিলেন নজরুল। এ ছাড়া তিনি অন্য যেসব চলচ্চিত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন সেগুলি হলো: পাতালপুরী (১৯৩৫), গ্রহের ফের (১৯৩৭), বিদ্যাপতি (বাংলা ও হিন্দি ১৯৩৮), গোরা (১৯৩৮), নন্দিনী (১৯৪৫) এবং অভিনয় নয় (১৯৪৫)। বিভিন্ন ছায়াছবিতে ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিভিন্ন ছায়াছবিতে ব্যবহৃত নজরুলের গানের সংখ্যা ছিল ৫২টি। 

মঞ্চনাটক:  মঞ্চনাটকেও নজরুল  সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কলকাতার বিভিন্ন মঞ্চে নিজের রচিত দুটি নাটক আলেয়া ও মধুমালা-সহ প্রায় ২০টি মঞ্চ নাটকের সঙ্গে নজরুল যুক্ত ছিলেন। এসব মঞ্চনাটকে প্রায় ১৮২টি নজরুলসংগীত ব্যবহৃত হয়। এসব নাটকের মধ্যে রক্তকমল, মহুয়া, জাহাঙ্গীর, কারাগার, সাবিত্রী, আলেয়া, সর্বহারা, সতী, সিরাজদ্দৌলা, দেবীদুর্গা, মধুমালা, অন্নপূর্ণা, নন্দিনী, হরপার্বতী, অর্জুনবিজয়, ব্ল্যাক আউট ইত্যাদি।

বেতারে যুক্ত: ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাস থেকে নজরুল কলকাতা বেতারের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন। তাঁর তত্ত্বাবধানে প্রচারিত অনুষ্ঠানসমূহের মধ্যে  ‘হারামণি’, ‘মেল-মিলন’ ও ‘নবরাগমালিকা’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নজরুল বিশিষ্ট সংগীতজ্ঞ সুরেশচন্দ্র চক্রবর্তীর সহযোগিতায় কলকাতা বেতার থেকে অনেক রাগভিত্তিক সংগীতানুষ্ঠান পরিবেশন করেন। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল বেতারের সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িত থাকলেও এইচএমভি, মেগাফোন, টুইন ছাড়াও কলম্বিয়া, হিন্দুস্থান, সেনোলা, পাইওনিয়ার, ভিয়েলোফোন প্রভৃতি থেকেও নজরুলসংগীতের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে নজরুলের এইচএমভি থেকে ৫৬৭টি, টুইন থেকে ২৮০টি, মেগাফোন থেকে ৯১টি, কলম্বিয়া থেকে ৪৪টি, হিন্দুস্থান থেকে ১৫টি, সেনোলা থেকে ১৩টি, পাইওনিয়ার থেকে ২টি, ভিয়েলোফোন থেকে ২টি এবং রিগ্যান থেকে ১টি মিলে প্রায় এক হাজারের অধিক  গানের রেকর্ড প্রকাশিত হয়। 

নজরুল সংবর্ধনা:  ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১০ই ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে বাঙালিদের পক্ষ থেকে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। অভিনন্দন-পত্র পাঠ করেন ব্যারিস্টার  এস ওয়াজেদ আলি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন নেতাজী  সুভাষচন্দ্র বসু  এবং রায়বাহাদুর  জলধর সেন। কবিকে সোনার দোয়াত-কলম উপহার দেওয়া হয়। এ সংবর্ধনা সভায় প্রফুল্লচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘আমার বিশ্বাস, নজরুল ইসলামের কবিতা পাঠে আমাদের ভাবী বংশধরেরা এক একটি অতি মানুষে পরিণত হইবে।’ সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘আমরা যখন যুদ্ধ ক্ষেত্রে যাব তখন সেখানে নজরুলের যুদ্ধের গান গাওয়া হবে! আমরা যখন কারাগারে যাব, তখনও তাঁর গান গাইব।’

চট্টগ্রামে নজরুল:  ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নজরুল  চট্টগ্রাম সফরে যান এবং  হবীবুল্লাহ বাহার ও  শামসুন্নাহার ভাইবোনের আতিথ্য গ্রহণ করেন। তিনি বন্ধু কমরেড মুজফ্‌ফর আহমদের জন্মস্থান সন্দ্বীপও ভ্রমণ করেন।

নজরুলের রাজনৈতিক উপন্যাস:  ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় নজরুলের রাজনৈতিক উপন্যাস মৃত্যুক্ষুধা, গানের সংকলন নজরুল-গীতিকা, নাটিকা ঝিলিমিলি এবং কবিতা ও গানের সংকলন প্রলয়-শিখা ও চন্দ্রবিন্দু। শেষোক্ত গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত এবং প্রলয়-শিখা-র জন্য নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর প্রকাশিত আদালতের রায়ে নজরুলের ছয় মাসের সশ্রম কারাদন্ডের আদেশ হয়, নজরুল হাইকোর্টে আপিল ও জামিন লাভ করেন। ইতোমধ্যে গান্ধী-আরউইন চুক্তির ফলে হাইকোর্ট  নজরুলের বিরুদ্ধে মামলা খারিজের আদেশ দেয়। ফলে নজরুলকে দ্বিতীয়বার কারাবাস করতে হয়নি।

গদ্য রচনা, গল্প ও উপন্যাস: নজরুলের প্রথম গদ্য রচনা ছিল “বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী“। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে এটি সওগাত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সৈনিক থাকা অবস্থায় করাচি সেনানিবাসে বসে এটি রচনা করেছিলেন।  ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের গল্প সংকলন  ব্যথার দান প্রকাশিত হয়। একই বছর প্রবন্ধসংকলন যুগবাণী প্রকাশিত হয়।

সাহিত্যকর্মের বিবরণ: ১৯২৮-২৯ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের প্রকাশিত কবিতা ও গানের সংকলনের মধ্যে ছিল: সিন্ধু-হিন্দোল (১৯২৮), সঞ্চিতা (১৯২৮); বুলবুল (১৯২৮), জিঞ্জীর (১৯২৮) ও চক্রবাক (১৯২৯)। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে কবির তৃতীয় পুত্র কাজী সব্যসাচীর জন্ম হয়, আর মে মাসে চার বছরের প্রিয়পুত্র বুলবুল বসন্ত রোগে মারা যায়। বুলবুলের রোগশয্যায় বসে নজরুল হাফিজের রুবাইয়াৎ অনুবাদ করছিলেন, যা পরে রুবাইয়াৎ-ই-হাফিজ নামে প্রকাশিত হয়।  নজরুলের প্রেম ও প্রকৃতির কবিতার প্রথম সংকলন দোলন-চাঁপা  প্রকাশিত হয় ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে। এতে সংকলিত দীর্ঘ কবিতা ‘পূজারিণী’-তে নজরুলের রোমান্টিক প্রেম-চেতনার বহুমাত্রিক স্বরূপ  প্রকাশিত হয়েছে। 

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় নজরুলের উপন্যাস কুহেলিকা, গল্প-সংকলন শিউলিমালা, গানের স্বরলিপি নজরুল-স্বরলিপি এবং গীতিনাট্য আলেয়া। নজরুলের এ নাটকটি কলকাতার নাট্যনিকেতনে (৩ পৌষ ১৩৩৮) প্রথম মঞ্চস্থ হয়। এতে গানের সংখ্যা ছিল

ড. মোহাম্মদ আমীন

২৮টি। ওই বছর নজরুল আরও যেসব নাটকের জন্য গান রচনা ও সুরারোপ করেন সেসবের মধ্যে ছিল যতীন্দ্রমোহন সিংহের ধ্রুবতারা উপন্যাসের নাট্যরূপের চারটি গান (কেবল সুর সংযোজন), মন্মথ রায়ের সাবিত্রী নাটকের ১৩টি গান (রচনা ও সুরারোপ)। ১৯৩২ সালে কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত মন্মথ রায়ের মহুয়া নাটকের গানগুলির রচয়িতাও ছিলেন নজরুল।

বঙ্গীয় মুসালমান সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান:  ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে নজরুল সিরাজগঞ্জে বঙ্গীয় মুসলমান তরুণ সম্মেলনে এবং ২৫শে ও ২৬শে ডিসেম্বর কলকাতা এলবার্ট হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে যোগদান করেন। সম্মেলনের সভাপতি কবি  কায়কোবাদ নজরুলকে মাল্যভূষিত করেন।  নজরুলের প্রকাশনা (১৯৩২):  ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুলের প্রকাশনার মধ্যে সবকটিই ছিল গীতিসংকলন, যেমন: সুর-সাকী, জুলফিকার ও বন-গীতি। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের নজরুল-প্রকাশনার সবই ছিল সঙ্গীত-বিষয়ক, যেমন: গীতি-শতদল ও গানের মালা গীতিসংকলন এবং সুরলিপি ও সুরমুকুর স্বরলিপি সংগ্রহ।

অসুস্থতা: নজরুলের মেডিকেল রিপোর্ট ভিয়েনার বিখ্যাত চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হয়। জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন অধ্যাপক রোঁয়েন্টগেন ম্যাককিস্ক অপারেশনের বিরোধিতা করেন। ভিয়েনার চিকিৎসকরাও এই অপারেশনের ব্যাপারে আপত্তি জানান। তাঁরা সবাই এক্ষেত্রে অন্য আরেকটি পরীক্ষার কথা বলেন যাতে মস্তিষ্কের রক্তবাহগুলির মধ্যে এক্স-রেতে দৃশ্যমান রং ভরে রক্তবাহগুলির ছবি তোলা হয় (সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি) কবির শুভাকাঙ্খীদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাঁকে ভিয়েনার চিকিৎসক ড. হ্যান্স হফের অধীনে ভর্তি করানো হয়। এই চিকিৎসক নোবেল বিজয়ী চিকিৎসক জুলিয়াস ওয়েগনার-জাউরেগের অন্যতম ছাত্র। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর কবিকে পরীক্ষা করানো হয়। এর ফলাফল থেকে ড. হফ বলেন , কবি নিশ্চিতভাবে পিক্‌স ডিজিজ নামক একটি নিউরনঘটিত সমস্যায় ভুগছেন। এই রোগে আক্রান্তদের মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও পার্শ্বীয় লোব সংকুচিত হয়ে যায়। তিনি  বলেন বর্তমান অবস্থা থেকে কবিকে আরোগ্য করে তোলা অসম্ভব। সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা নেই জানতে পেরে নজরুলের সঙ্গে যারা ইউরোপ গিয়েছিলেন তাঁরা সবাই ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই ডিসেম্বর রোম থেকে দেশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।

বাংলাদেশ আনয়ন: ভারত সরকারের অনুমতিক্রমে ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের  ২৪শে মে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে আনা হয়।  বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক বিশেষ সমাবর্তনে কবিকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে নজরুলকে বাংলাদেশ সরকার বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘একুশে পদকে’ ভূষিত করে। তবে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে জাতীয় কবি ঘোষণা করা হয়নি। 

 ‍মৃত্যু: ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে আগস্ট (১২ ভাদ্র ১৩৮৩) ঢাকার পিজি হাসপাতালে কবি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সমাধি: নজরুল একটি গানে লিখেছেন, “মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিয়ো ভাই / যেন গোরের থেকে মুয়াজ্জিনের আযান শুনতে পাই”। এই ইচ্ছাকে সম্মান করে কবিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে সমাধিস্থ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।  সে অনুযায়ী তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের উত্তর পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

জানাজা:  তার জানাজার নামাজে ১০ হাজারেরও অধিক মানুষ অংশ নেয়। জানাজায় রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমমেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, রিয়াল এডমিরাল এম এইচ খান, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, মেজর জেনারেল দস্তগীর জাতীয় পতাকামণ্ডিত নজরুলের মরদেহ বহন করে সোহরাওয়ার্দী ময়দান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যান। বাংলাদেশে তাঁর মৃত্যু উপলক্ষ্যে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়।  ভারতের আইনসভায় কবির সম্মানে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।

সম্মাননা: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের চুরুলিয়ায় “নজরুল অ্যাকাডেমি” নামে একটি বেসরকারি নজরুলচর্চা কেন্দ্র আছে। চুরুলিয়ার কাছে আসানসোল মহানগরে ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। আসানসোলের কাছেই দুর্গাপুর মহানগরের লাগোয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটির নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় অবস্থিত নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে রাজধানী কলকাতার যোগাযোগ-রক্ষাকারী প্রধান সড়কটির নাম  কাজী নজরুল ইসলাম সরণি। কলকাতা মেট্রোর গড়িয়া বাজার মেট্রো স্টেশনটির নাম

নজরুলের সমাধি

রাখা হয়েছে “কবি নজরুল মেট্রো স্টেশন”। ১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়  বাংলা সাহিত্যের সর্বোচ্চ পুরস্কার জগত্তারিণী স্বর্ণপদক নজরুলকে প্রদান করা হয়। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণে ভূষিত করা হয়।

কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর রচিত “চল্‌ চল্‌ চল্‌, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল” বাংলাদেশের রণসংগীত হিসাবে গৃহীত। প্রতিবছর যথামর্যাদায় নজরুলের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী উদ্‌যাপিত হয়। নজরুলের স্মৃতিবিজড়িত ত্রিশালে (বাংলাদেশের ময়মনসিংহ জেলায়) ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় নামক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় কবির স্মৃতিতে নজরুল একাডেমি, বুলবুল ললিতকলা একাডেমী ও শিশু সংগঠন বাংলাদেশ নজরুল সেনা স্থাপিত হয়। সরকারিভাবে স্থাপিত হয়েছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান নজরুল ইন্সটিটিউট। ঢাকা শহরের একটি প্রধান সড়কের নাম রাখা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ।

বাংলা সাহিত্য এবং সংস্কৃতিতে তাঁর বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই ডিসেম্বর  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ সরকার কবিকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করে। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতে তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। 

অনুকম্পোজ: মিনহা সিদ্দিকা

শুবাচ লিংক: শুবাচে প্রকাশিত কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কয়েকটি লেখার লিংক

——————–
error: Content is protected !!