না না না: না যখন হ্যাঁ

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/না-না-না-না-যখন-হ্যাঁ/
ড. মোহাম্মদ আমীন
বাংলায় তিনটি ভিন্নার্থের ‘না’ দেখা যায়। অভিধানে যাদের তিনটি ভিন্ন ভুক্তিতে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। তন্মধ্যে  প্রথমটি খাঁটি বাংলা ‘না’, দ্বিতীয়টি নঞর্থক বাংলা উপসর্গ (নাবালক) এবং তৃতীয় ‘না’  নৌকার  আঞ্চলিক শব্দ। নিচে তিন ‘না’ শব্দের পরিচয়  দেওয়া হলো:
প্রথম না:  সংস্কৃত ‘ন’ থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে সাধারণত অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত খাঁটি বাংলা ‘না’ অর্থ:
  • ক্রিয়ার অঘটন:  যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে।
  •  নিষেধ: তোমাকে আমি এমন হীন কাজ করতে দেব না।
  • অভাব: না আছে ধন মোর না আছে জন, আমি এক অসহায় অতি অভাজন।
  • অনুরোধ বা অনুজ্ঞা:  না যেও না, রজনি এখনো বাকি, আরও কিছু দিতে বাকি, বলে রাত জাগা পাখি। (সলিল চৌধুরী)
  • আধিক্য: কত না নদীর জন্ম হয় আরেকটা কেন গঙ্গা হয় না; কত মানুষ জন্ম লয়, ওরে একটা কেন জাত হয় না? (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার)
  •  প্রশ্ন: তুমি কি আমায় দেখতে আসবে না?
  • সন্দেহ: হয়তো কিছুই নাহি পাব। (গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার)
  • স্নেহমেদুর আবেদন: তুমি না হয় রহিতে কাছে কিছুক্ষণ আরও না হয় রহিতে কাছে, আরও কিছু কথা না হয় বলিতে মোরে। (সন্ধ্যার গান)
  • বিকল্প: কোনো না কোনো একদিন সে আসবে জানি, আমার হিয়ার টানে দুলিবে, দুলিবে তার পরানখানি।
  • বিনা: না বুঝে কারে তুমি ভাসালে আঁখিজলে (রবীন্দ্রনাথ)।
দ্বিতীয় না: নঞর্থক বাংলা উপসর্গবিশেষ। এর স্বাধীন ব্যবহার নেই। যেমন: নাবালক, নালায়েক, নাহক, নাজায়েজ। নাবালক ছেলেটির সব সম্পত্তি তার কুলাঙ্গার চাচা দখল করে নিল।
তৃতীয় না: নৌকার আঞ্চলিক শব্দ। যেমন: না নিয়ে গেল বোয়াল মাছে। না আমার ভরে গেছে রুপালি ইলিশে।
না যখন হ্যাঁ
সাধারণভাবে ‘না’ শব্দটি ‘হ্যাঁ’ শব্দের বিপরীত অর্থ প্রকাশ করে। তাই বাংলা ভাষায় ‘হ্যাঁ’ অস্তিবাচক ও ‘না’ নেতিবাচক বা নঞর্থক শব্দ হিসেবে পরিচিত। তবে ‘না’ সবসময় নেতিবাচক নয়। এটি অনেক ক্ষেত্রে অস্তিবাচক শব্দের চেয়েও অধিক ইতিবাচক দ্যোতনা প্রকাশ করে। শুধু তাই নয়, প্রশ্ন ও কারণ জানার ক্ষেত্রেও ‘না’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। কয়েকটি বাক্য দিয়ে বিষয়টি বুঝানোর চেষ্টা করা হলো:
১. চুপ কেন? কিছু বলো না গো।
২. তুমি না বলে চলে যাচ্ছ, এখনও তো দেখতে পাচ্ছি।
৩. প্লিজ, যাবেন না, আর একটু থাকুন।
৪. তিনি যতটা না কবি, তার চেয়ে বেশি প্রাবন্ধিক।
৫. যাবে, তাই না?
উপরের বাক্যগুলোয় ব্যবহৃত ‘না’ শব্দটি কোথাও নেতিবাচক নয়, বরং জোরালোভাবে ইতিবাচক। যা ‘হ্যাঁ’ শব্দের চেয়েও অধিক গুরুত্ববহ। তবে প্রথম দুটি বাক্যের সাথে তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বাক্যের কিছুটা তফাত আছে। যেমন; প্রথম ও দ্বিতীয় বাক্য হতে ‘না’ শব্দটি তুলে দিলেও অর্থের কোনো পরিবর্তন হবে না। কিন্তু ভাবানুভূতির কিছু পরিবর্তন ঘটবে। অন্যান্য বাক্যগুলো হতে ‘না’ শব্দটি তুলে দিলে অর্থ ও ভাব দুটোই পরিবর্তন হয়ে যাবে। পঞ্চম বাক্য প্রশ্নবোধক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে বাক্যটিতে ‘না’ শব্দটি যুক্ত করে ‘যাওয়া’ ক্রিয়াটিকে অধিকতর নিশ্চিত করার প্রয়াস নিবেদিত। ইংরেজিতে এমন বাক্য ট্যাগ কোয়েশ্চন নামে পরিচিত।
‘না’ শব্দের প্রশ্নবোধক ও কারণজ্ঞাপক ব্যবহার বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি মনোরম রূপ। ‘না’ এর প্রশ্নবোধক ও কারণজ্ঞাপক অর্থ-প্রকাশক চারটি বাক্য নিচে দেয়া হলো:
(ক) দিবস কেন যে এল না, এল না? (কারণার্থক)
(খ) যাবে না কেন? (কারণার্থক)
(গ) সে কি স্কুলে যায়নি? (প্রশ্নজ্ঞাপক)
(ঘ) আমি কি যাব না? (প্রশ্নজ্ঞাপক)
error: Content is protected !!