নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

ড. মোহাম্মদ আমীন

নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

নিউটনের ছাত্রী

কিশোর উপন্যাস

কিছুটা ভয় এবং কিছুটা সংকোচ নিয়ে ডিআইজি সাহেবের অফিস কক্ষে ঢুকলাম। তিনি আমার কাছে ডিআইজি নন। তার চেয়ে বড়ো— শ্রদ্ধেয় এবং প্রিয়। প্রিয়দের সম্পর্ক পদ দিয়ে নয়, মস্তক দিয়ে রচিত হয়। তিনি আমার ছাত্র ওমর সুলতানের বাবা। তবু ডিআইজি। মস্তক মর্যাদা মানুষ ছাড়তে পারে, কিন্তু পদমর্যাদা সহজে ছাড়ে না। এজন্য টুপির চেয়ে পাদুকার দাম, মর্যাদা এবং সম্মান ও খাতির অধিক হয়। তাই

ড. মোহাম্মদ আমীন

যুগ যুগ ধরে পদধারীর কাছে জ্ঞানীর মস্তক নত থেকেছে।
কী জানি কেন ডেকেছেন। মনে নানা রকম সংশয়। তবে ভয় নেই। আমি তার ছেলের গৃহশিক্ষক। অপরাধ বেশি হলেও শাস্তি বেশি হবে না। শাস্তির মাত্রা কেবল অপরাধের ওপর নয়, সম্পর্কের ওপরও নির্ভর করে। সম্পর্ক শাস্তিকেও পরিবর্তন করে দিতে পারে। ভয় নিয়ে নির্ভয়ে ঢুকে পড়লাম ডিআইজি সাহেবে রুমে।
বিশাল একটা কালো চেয়ারে তিনি বসে আছেন। পেছনে তোয়ালে। হাতে পাইপ, জ্বলছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। চেয়ারের হাতলের দুপাশে সোনালি রঙের মসৃণ আচ্ছাদন। রুমে ঢোকার কয়েক মিনিট পর হাতপা ঠান্ডা হয়ে গেল। ভয়ে নয়, শীতাতপ যন্ত্রের আপদমস্তক প্রলম্বিত চুমোয়।
এর আগে এত বড়ো পুলিশ অফিসারের রুমে কখনো ঢুকিনি। আমার দৌড় বড়ো জোর থানা, থানার ওসি। থানার পাশ দিয়ে যাবার সময়ও ভয় লাগত। টানা থেকে নাকি থানা। থানা মানুষকে টেনে নিয়ে যায়। এ নিয়ে মানুষের মুখে নানা কথা শোনা যায়। শুনে শুনে থানার প্রতি প্রচণ্ড বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল। মাঝে মাঝে রাস্তায় পুলিশ দেখতাম। যাদের কাঁধে চকচকে ব্যাজ আর বুকে রঙবেরঙের কারুকাজ করা ফিতা ঝুলত। আমি দেখতাম— আর ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। পুলিশ দেখে শ্রদ্ধা জাগেনি কখনো কোনোদিন।
সালাম দিলাম।
ডিআইজ সাহেব ‘ওয়েলকাম’ বলে উঠে দাঁড়ালেন। না উঠলেও চলত। আমার দিকে সামান্য ঝুঁকে হ্যান্ডশেকের জন্য ডান হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমিও। তিনি আমার হাতে মৃদু চাপ দিয়ে ছোটো তিনটা ঝাঁকুনি দিলেন। চাপ ও ঝাঁকুনির হার্দিক তাপে পুরো শরীর শিউরে উঠল। বুঝলাম, হ্যান্ডশেক একটা দারুণ শিল্পকর্ম। ভালোভাবে করতে জানলে কলিজা পর্যন্ত মেনথল টানার মতো গন্ধে শিরশির করে উঠে।
ডিআইজি সাহেব আদুরে গলায় মমতা ঢেলে বললেন, টিচার, বসুন। প্লিজ। পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
আমার ভয় উধাও। ভয় এখন বরাভয়, অভয়ের ভর।
বিশাল রুম। দামি আসবাব আর সোনালি রূপালি নানা ক্রেস্ট। প্রতিটি জিনিস বেশ সুন্দর করে সাজানো। মনে হলো এই রুমের জিনিসপত্র শুধু যত্ন আর মোছামুছির মাঝেই থাকে। আমার সামনেও একজন পুলিশ আয়না মুছছিলেন। মেঝের কার্পেটে আভিজাত্যের নরম ছোঁয়া। মনে হলো এইমাত্র বিছানো হয়েছে।
টেবিলে অনেকগুলো ফাইল। ডিআইজি সাহেবের সামনের টেবিলের ডান পাশের চেয়ারে দুজন পুলিশ। বুক পড়ে নাম জেনে নিলাম। একজন মাহতাব। একটু চিকন এবং কিছুটা শ্যামলা। অন্যজন মিজান, বেশ ফর্সা এবং নাদুস-নুদুস। কাঁধ দেখে বুঝলাম পদমর্যাদায় এসপি। উভয়ে উৎসুক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ইচ্ছেমতো ভাবছেন। হয়তো ভাবছেন, আমি বিশাল কেউকেটা কেউ। তবে চেহারায় তালপাতার সেপাই।
চেয়ারে বসার সঙ্গে সঙ্গে চৌকশ এক কনসটেবল চা-নাস্তা নিয়ে এলেন। হয়তো এমনই আদেশ ছিল ডিআইজি সাহেবের। দুটো ফোন এল। রিসিভ করলেন ডিআইজি সাহেব। কম কথায় অনেক প্রকাশ।
একটা ফাইল স্বাক্ষর করে মেঝে ছুড়ে দিয়ে বললেন, টিচার আপনার ছাত্র, আই মিন আমার ছেলে সুলতানের খরব কী?
সুলতান মানে রাজ্যাপাটের সুলতান নয়, ওমর সুলতান। তাঁর একমাত্র সন্তান।
বললাম, ওমর তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী। নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। আপনাকে আগেও বলেছি— তার মেধা যে কাউকে হতভম্ব করে দিতে পারে।
আপনাকে নয় নিশ্চয়? ডিআইজি সাহেব বেশ গাম্ভীর্যের সঙ্গে বললেন।
আমিই তো তার মেধায় প্রথম হতভম্ব হয়েছিলাম। আপানারা কেউ তাকে চিনতেই পারেননি।
এতদিন তার মেধা সুপ্ত ছিল। আপনি এসে জাগিয়ে দিয়েছেন। আমরাও বুঝতে পেরেছি। এটাই শিক্ষকের কাজ। শিক্ষকের কাজ পড়ানো নয়, তার আসল কাজ শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার আগ্রহ সৃষ্টি করা।
আপনারা অযথা শাসনে শাসনে সুলতানের মেধাকে ভয়ার্ত করে তুলেছিলেন। ভয় আর বিরূপ কথার মধ্যে তার মেধা বিকশিত হতে পারছিল না। তাই সে অমন খারাপ আচরণ করত। এখন সে ভয়মুক্ত। তাই ইচ্ছেমতো ডানা মেলার সুযোগ পাচ্ছে। আপনরা তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন, কিন্তু ভালোবাসা দেননি।
মানে?
প্রশ্রয় আর ভালোবার ঢের তফাত।
ডিআইজি সাহেব ড্রয়ার থেকে দুটো ডায়ারি, চারটা কলম এবং হলদে রঙের একটা রেডিমেড শার্ট বের করে আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, এগুলো রাখুন। আমার ক্ষুদ্র উপহার।
আমি দ্বিধার সঙ্গে কৃতজ্ঞতা জড়ানো শ্রদ্ধায় দাঁড়িয়ে এগিয়ে দেওয়া জিনিসগুলো নিতে নিতে বললাম, থ্যাংক ইউ।
নো মেনশন প্লিজ, মাই ডিয়ার সান। সিট ডাউন।
উপহারগুলো দেখলাম। অনেক সুন্দর। জামাটার রঙ আমার পছন্দের। হয়তো তিনি আমার গায়ের জামা দেখে পছন্দ করেছেন।
আমি অভিভূত।
ডায়ারি দুটি চমৎকার। দেখলে বোঝা যায়, সৌখিন হাতে রাখার জন্য বানানো। একটা ডায়ারি গোপালকে দেব। সেকালে রেডিমেড শার্ট রীতিমতো স্বপ্ন। আমার মুখ হাসিতে ভরে গেল। উপহার নয়, মমতার কাঞ্চন।
ডিআইজি সাহেবের মমতা উপহারের চেয়ে ঢের দামি মনে হলো। উপহার পেলে সবাই খুশি হয়, কিন্তু উপহারের সঙ্গে এমন হাসি আর নিখাদ মমতা বড়ো দুর্লভ। এমন বড়ো অফিসারের কাছ থেকে আমার মতো কয়জনই বা এরূপ হাসিমাখা মমতা উপহার পায়? কয়জন বড়ো অফিসারই বা এমন বদান্যতা দেখাতে পারেন। আমার মন কৃতজ্ঞতায় নুয়ে। যেন সারা পৃথিবী প্রার্থনায় বসেছে।
ডিআইজি সাহেব চা এবং খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে বললেন, প্লিজ টিচার, শুরু করুন।
বেশ কয়েক ধরনের নাস্তার মাঝখানে সুন্দর একটা কাপ। পাশে একটা সিরামিকের কেটলি। ওখানেই চা। দারুণ ঘ্রাণ। দোকানের চা থেকে এমন ঘ্রাণ আসে না। পাশে আরো দুটি ছোটো ছোটো পাত্র— একটায় চিনি, অন্যটায় দুধ। তাঁর বাসাতেও এভাবে দেওয়া হয়।
ডিআইজ সাহেব একটা প্লেট আমার দিকে সামান্য ঠেলে দিয়ে হাসতে হাসতে বললেন, ওমর কিন্তু আপনার ভক্ত হয়ে যাচ্ছে।
ভক্ত বানাতে না পারলে কোনো শিক্ষকের পক্ষে কার্যকর শিক্ষা প্রদান সম্ভব নয়। ছাত্রশিক্ষক সম্পর্ক হবে বন্ধুর মতো নিবিড় আর পির-শিষ্যের মতো প্রবীর। আমার সব ছাত্রছাত্রী আমার ভক্ত।
এখন মা-বাবার চেয়েও আপনি তার প্রিয়। মাঝে মাঝে ঈর্ষা হয়।
সে গুরুজনদের শ্রদ্ধা করতে শিখছে। একসময় দেখবেন, পিতামাতাই তার প্রধান শ্রদ্ধার বিষয় হয়ে উঠেছে। শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের কৌশল শিশুদের শেখাতে হয়। আপনি ঈর্ষা কথাটা যে কারণেই বলুন না কেন, ওই ঈর্ষাই আপনার সন্তুষ্টি। তবে ওমর যেন কোনোভাবে এটি জানতে না পারে। সে খুবই স্পর্শকাতর। ব্রিলিয়ান্টরা স্পর্শকাতরই হয়।
সামান্য লজ্জা পেয়ে গেলেন বলে মনে হলো ডিআইজি সাহেব। কথাটাকে হালকা করে নেওয়া প্রয়োজন মনে করে আবার বললেন, প্লিজ খাওয়া শুরু করুন?
আপনি?
“থ্যাংক ইউ”, বাম দিকে ফিরে বললাম, “আপনারা?”
ডিআইজি সাহেব বললেন, আমরা কিছুক্ষণ আগে খেয়েছি। আপনি খান। আমার সামনে বসা দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি—মাহতাব এবং মিজান। আমার দুই চৌকশ এসপি।
সালাম দিলাম। দুজনেই সালাম নিয়ে হাত এগিয়ে দিলেন হ্যান্ডশেকের জন্য। পুলিশের হ্যান্ডশেকের আলাদা একটা মাজেজা দেখলাম। সামান্য চাপ দিয়ে কয়েকটা ঝাঁকি দিলেন। হ্যান্ডশেক শব্দের বাংলা অর্থই তো হাতঝাঁকি।ঝাঁকি না দিলে হ্যান্ডশেক হবে কীভাবে!
ভালোই লাগল।

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com
শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি
শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান
১. স্যমন্তক: এক মলাটে স্যমন্তক সম্পূর্ণ উপন্যাস একসঙ্গে
৩. সন্মিত্রা: সন্মিত্রা পুরো উপন্যাস একসঙ্গে এক মলাটে।
 
 

error: Content is protected !!