নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

১২

মার রেজাল্ট?
“আসল প্রশ্নটা এখনো করা হয়নি।”, সেলিমা বলল, এই প্রশ্নের নম্বর আশি। এর উত্তর জেনে রেজাল্ট দেওয়া হবে। এ কদিন বিশ-এর পরীক্ষা হয়েছে? টেনশন লাগছে স্যার?”
তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?
সাক্ষাৎকার আমি নিচ্ছি। আমি প্রশ্ন করব। আপনি উত্তর দেবেন। আপনি অনেক কিছু জানেন না। কেন জানেন-না স্যার?
আমার লজ্জা আরো ভীষণ লজ্জা পেয়ে গেল। এমন লজ্জা পেলে আমার গলার স্বর ছোটো হয়ে যায়। চোখদুটো পুঁটি মাছের পাখনার মতো
ড. মোহাম্মদ আমীন

শুধু নড়ে এবং নড়তে নড়তে এক সময় থেমে যায় মরা বেড়ালের মতো।
বললাম, একজন মানুষ সবকিছু জানে না। জানা সম্ভবও নয়। আমি যা জানি না, তা শিখে এসে তোমাকে জানাব। তুমি অনেক কিছু জানতে চেয়েছ—যা বলতে পারিনি তা লিখে নিয়েছি। জেনে এসে জানাব। এজন্য শিক্ষককে ছাত্রদের চেয়ে বেশি পড়তে হয়। আমরা সবাই শিক্ষক আবার সবাই ছাত্র। আমি কোনো প্রশ্ন করলে তুমি পারবে?
না পারার আশঙ্কা বেশি। পারার সম্ভাবনা কম।
আমার ক্ষেত্রেও একই। পৃথিবীর সব মানুষ ছাত্র।
আপনি স্যার কতক্ষণ লেখাপড়া করেন?
আমি লেখাপড়া ছাড়া আর কিছু করি না। গাড়িতে পড়ি। যানজট আমার সময়কে খেতে পারে না। বরং আমি বই পড়ে সময়কে বন্দি করে রাখি আমার কাছে। তোমাকেও পড়ি, সাহেদকেও পড়ি। সব মানুষকে পড়ি।
এত পড়ার পরও তো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না?
এজন্য তো পড়তে হয়। ক্ষুধা যত বাড়ে খাওয়ার ইচ্ছা তত প্রবল হয়। তেমনি যত পারি না, পড়ার ইচ্ছা তত প্রবল হয়।
আমি একটু আসি?
কোথায়?
আম্মুকে বলতে।
কী বলবে?
আপনার কাছে পড়ব।
মানে?
তিন দিন আমি আপনার ইন্টারভিউ নিয়েছি।
ইন্টারভিউ কেন?
আমাকে পড়ানোর যোগ্যতা আপনার আছে কি না দেখার জন্য।
পাশ করলাম?
করেছেন।
দশ ভাগ প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারিনি।
তবু স্টার মার্ক পেয়েছেন।
কীভাবে?
শেষের প্রশ্নে আশিতে আশি পেয়েছেন। প্রত্যেক টিচারকে আমি এভাবে প্রশ্ন করেছি। তারা সবাই ধমক দিয়ে বলেছেন, “এসব পরীক্ষায় আসবে না। বাচলামি বাদ দিয়ে ক্লাসের বই বের করো। কেবল আপনিই বললেন— শিখে এসে শেখাব। আপনিই বললেন— ছাত্রছাত্রীর চেয়ে শিক্ষদের বেশি পড়তে হয়।” তাই তাদের পত্রপাঠ বিদায় করে দিয়েছি। সবই ছিল নিউটন।
ভালোর মধ্যেও নিউটন, খারাপের মধ্যেও নিউটন এটা কী?
জীবন তো স্যার ভালোমন্দের মিশ্রণ। ছাত্রজীবনে নিউটন ছিলেন হাবাগোবা।
কী বলছ এসব?
ঠিক বলছি, স্যার। তিনি থিয়েটার, নাটক, গানবাজনা — কিছুই পছন্দ করতেন না। শিল্প-সাহিত্যের চৌদ্দ সীমনার মধ্যেও কেউ তাঁকে নিতে পারত না। গান শুনলে মনে করতেন মাছের বাজারের চিল্লাচিল্লি। গানের সুর তার কানে গরম সীসা হয়ে গলে গলে পড়ত।
কবিতা?
কবিতা ছিল তাঁর ভীষণ অপছন্দের। কবিতা শুনলে তাঁর নাকি মনে হতো কানের পর্দায় বুলেট পড়ছে। কবিদের মনে করতেন ফাঁকিবাজ। কাগজ অপচয়কারী। তিন পঙ্‌ক্তি লিখে পুরো পৃষ্ঠা শেষ। শিক্ষক হিসেবে ছিলেন হদ্দ বোকা।
মানে?
নিউটন তেত্রিশ বছর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যায়ের লুকাসিয়ান প্রফেসর ছিলেন। দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবনে মাত্র তিনজন ছাত্রকে পড়িয়েছিলেন। তাদের কেউই স্নাতক হতে পারেননি। যা পড়াতেন তা কেউ বুঝত না। আসলে স্যার, শিক্ষকদের অত বেশি জানার প্রয়োজন নেই। শিক্ষার্থীদের শিক্ষায় আগ্রহী করে তোলার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় জ্ঞানটুকু বিতরণের সক্ষমতাই আদর্শ শিক্ষক হওয়ার অন্যতম শর্ত হওয়া উচিত। আপনার কাছে এটি আছে। আমি আম্মুকে ডেকে আনতে যাচ্ছি।
আম্মুকে ডেকে আনতে হবে কেন?
ইন্টারভিউতে পাশ করেছেন। বেতন ধার্য হবে এবার। আম্মু বলবে, মাসে আটশ টাকার কথা। আপনি রাজি হবেন না। বলবেন, ষোলোশ টাকার কম হলে পড়াবেন না।
মনে মনে নিজের কপালে নিজে আঘাত করতে শুরু করলাম। ডিআইজি সাহেব আমাকে কোথায় এনে ফেললেন। এ তো ওমর নয়, ওমরের চেয়ে কয়েকশ গুণ ওপরে। তদুপরি মেয়ে। জানি না কপালে কী আছে।
বললাম, আমার বন্ধুরা পাঁচশ টাকা দিয়ে পড়ায়। ষোলোশ অনেক টাকা! যদি রাজি না হয়?
রাজি হবে না মানে? তার বাপ রাজি হবে। আপনি ভালো টিচার। ভালো কিছু পেতে হলে ভালো দাম দিতে হবে— এটি সবাই জানে। আরো বেশি বলতাম। বেশি বললে ভাববে—আপনি লোভী। আমার শিক্ষককে কেউ লোভী ভাবুক, এটি আমি চাই না। তিনি দামি হবেন, লোভী নন।
তোমাকে কী কমিশন দিতে হবে?
উত্তর দেওয়ার আগে সেলিমা তার মাকে ডেকে আনার জন্য চলে গেল। কয়েক মিনিট পর সেলিমা চলে এল। আরও কয়েক মিনিট পর সেলিমার মা এসে পর্দার ওপার থেকে বললেন, মাস্টার সাব, মাসে আটশ টেকা করে দেব।
আমি বললাম, ষোলোশ টাকা দিলে ভালো হয়।
অন্য মাস্টার তো পাঁচশ টাকায় পড়ায়।
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। এবার কী বলব? সেলিমা ফিস ফিস করে বলল, বলুন— “তাহলে আমি যাই। যারা পাঁচশ টাকা দিয়ে পড়াবেন তাদের নিয়ে আসুন।” কাকাতুয়ার মতো আওড়ে গেলাম সেলিমাকে, “তাহলে আমি যাই। যারা পাঁচশ টাকা দিয়ে পড়াবেন তাদের নিয়ে আসুন।”
“না না”, সেলিমার মা পর্দার আড়াল থেকে বললেন, “আপনি যত চাইছেন তত দেব। ভালো করে পড়াবেন। আমার মেয়েটা অনেক ভালো।”
সেলিমার মা চলে যাবার পর সেলিমা বলল, হুররে! কী বুঝলেন স্যার?
সবার আমি ছাত্র।
সেলিমা বলল—
“সবার আমি ছাত্রী
শিখতে হবে সবার কাছে, শিখব দিবারাত্রি।” এখন মিষ্টি হবে। আপনি পাশ করেছেন-না! সাহেদ, তুমি স্যারকে কী উপহার দেবে?
বিদ্যুৎ চলে গেল হঠাৎ। অন্ধকারে সাহেদ আমাকে উদ্দেশ করে বলল, স্যার, আপনি কী চান?
তোমার প্রিয় কবি কে?
নীহারিকা দেবী, মানে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত।
আমি তাঁর একটি কবিতা শুনতে চাই।
শুনুন স্যার— কবিতার নাম ‘কুটির”।
“ঝিকিমিকি দেখা যায় সোনালি নদীর,
ওইখানে আমাদের পাতার কুটির।
এলোমেলো হাওয়া বয়,
সারা বেলা কথা কয়,
কাশফুলে দুলে ওঠে নদীর দুপার,
রূপসির শাড়ি যেন তৈরি রুপার।
 
কুটিরের কোল ঘেঁষে একটু উঠোন,
নেচে নেচে খেলা করি ছোট দুটি বোন।
পরনে খড়কে-ডুরে,
বেণি নাচে ঘুরে ঘুরে,
পায়ে পায়ে— ‘রুনু ঝুনু’ হালকা খাড়ুর,
কেন নাচি নাই তার খেয়াল কারুর।
 
আকাশে গড়িয়া ওঠে মেঘের মিনার,
তারি ফাঁকে দেখা যায় চাঁদের কিনার।
গাছের পাতার ফাঁকে,
আকাশ যে চেয়ে থাকে,
গুনগুন গান গাই, চোখে নাই ঘুম।
চাঁদ যেন আমাদের নিকট কুটুম।
 
নৌকারা আসে যায় পাটেতে বোঝাই,
দেখে কী যে খুশি লাগে কী করে বোঝাই!
কত দূর দেশ থেকে,
আসিয়াছে এঁকেবেঁকে,
বাদলে ‘বদর’ বলে তুলিয়া বাদাম,
হাল দিয়ে ধরে রাখে মেঘের লাগাম।
 
দু-কদম হেঁটে এসো মোদের কুটির,
পিলসুজে বাতি জ্বলে মিটির মিটির।
চাল আছে ঢেঁকি ছাঁটা,
রয়েছে পানের বাটা,
কলাপাতা ভরে দেব ঘরে-পাতা দই,
এই দেখ আছে মোর আয়না কাঁকই।
 
যদি আস একবার, বলি—মিছা না,
মোদের উঠোনটুকু ঠিক বিছানা।
পিয়াল, পেয়ারা গাছে—
ছায়া করে রহিয়াছে,
ধুঁধুলের ঝাঁকা বেয়ে উঠিতেছে পুঁই,
খড়কুটো খুঁজে ফেরে দুষ্টু চড়ুই।
 
এসো এসো আমাদের সোনার কুটির—
ঝিকিমিকি করে জল নিটোল নদীর।
ঝিঙের শাখার পরে
ফিঙে বসে খেলা করে,
বেলা যে পড়িয়া এল, গায়ে লাগে হিম,
আকাশে সাঁঝের তারা, উঠানে পিদিম।”
সাহেদের আবৃত্তি শেষ হলো। কিশোরী মনীষা প্রদীপ নিয়ে রুমে ঢুকল। কাকতালীয়ভাবে সঙ্গে সঙ্গে চলে এল বিদ্যুৎ।
উভয়ে একসঙ্গে বলে উঠল, হুররে।
 

Language
error: Content is protected !!