নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

১৬

রি স্যার, পাঁচ মিনিট দেরি হয়ে গেল” হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে রুমে ঢুকে সাহেদ বলল, “আমার এক অসুস্থ ক্লাসম্যাটকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। গরিবের ছেলে। বেঁটে বলে সবাই ডাকে বাঁটলু। সবাই ঘৃণা করে। আপনি-না বলেছিলেন— মানুষের প্রয়োজনে এগিয়ে আসাই সবচেয়ে বড়ো জ্ঞান।”
থ্যাংক ইউ।
আমার এখন পড়তে ভালো লাগে। আচ্ছা স্যার, দেরি কাকে বলে?
আমরা সময়ের ওপর ভর করে চলি। তাই না? সময়ের সঙ্গে চলতে পারাটাই স্বাভাবিকতা। তোমার লক্ষ্যকে তুমি স্পর্শ করার আগে তোমার সময় এসে স্পর্শ করে চলে গেল— এমন ঘটনাকে বলে দেরি। মনে রাখবা, You may delay, but time will not.
“স্যার”, সেলিমা বলল, “আমি না কি বাঁটুল মানে শর্ট?”
Short people are really good at climbing and balancing. বাট, ইউ আর নট শর্ট। জাস্ট পারফেক্ট। আর যদি বেঁটে হও তো—
তো কী স্যার?
লা লা লা – – –
আরে জিসকি বিবি ছটি উসকা ভি বড়া নাম হে
গোদ মে বিথালো বাচ্চা কা ক্যায়া কাম হে
মেরে আঙিনা মে তোমারা ক্যায়া- – – । বেঁটে দীর্ঘকাল ইয়াং থাকে। বয়স ধরা পড়ে না। একষট্টিকে মনে হয়ে ষোলো। তোমাকে কি স্কুলে শিক্ষকগণ লাইনের আগে এনে দাঁড় করান?
না।
তাহলে তুমি বেঁটে নও। বেঁটে হলে শিক্ষকগণ তোমাকে লাইনের প্রথমে দাঁড় করিয়ে দিত।
নিউটন কিন্তু বেঁটে ছিলেন। তাই কেউ বেঁটে বললে আমার ভালোই লাগে। নিজেকে নিউটন নিউটন মনে হয়। আমার ওজন আর একটু কম হওয়া উচিত ছিল। একথা কেন বলছি জানেন স্যার? নিউটন জন্মের স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বারো সপ্তাহ আগে জন্মেছিলেন। তাই শরীরটা ছিল বেঁটে আর কঞ্চির মতো চিকন।
সাহেদ বলল, জন্মকালে নিউটন কত শর্ট ছিলেন?
“এত শর্ট ছিলেন যে”, আমি বললাম, “নিউটনের মায়ের ভাষায়— এক কোয়ার্টার কাপের মধ্যে নিউটনকে ভালোভাবে রাখা যেত।”
ওহ মাই গড, সাহেদ বলল।
বেঁটে হওয়ার সবচেয়ে বড়ো গুণ হচ্ছে অনেকদিন ছোটো থাকা যায়।
ঠিক বলেছেন স্যার। লম্বা হলে বাবা আমাকে আরো চার বছর আগে বিয়ে দিয়ে দিতেন। কয়েক সন্তানের জননী হয়ে আবৃত্তি করতাম—
“প্রিয় বাবা-জান-আমার কোম্পানি গণি,
রেখেছ মূর্খ করে শিক্ষিত করনি।
বড়ো দুখে বলি বাবা জোড় করে হাত—
বিয়ে দিয়ে জীবনটা করেছ বরবাদ। ” বড়ো বোনরা বলে— আমি নাকি আমার পরিবারের সবচেয়ে ভাগ্যবান মেয়ে।
কারণ?
আমার বড়ো তিন বোনের বিয়ে হয়েছে ষোলো বছর বয়সের মধ্যে। বাবা আমাকে মাঝে মাঝে ডাকেন। ডাকলেই বুঝি কেন ডেকেছেন। যাবার সময় মা আর তাহের ভাইয়াকে নিয়ে যাই। চুলগুলো এমনভাবে আচড়াই যাতে ভালোভাবে লেপটে থাকে। এমন জামা পরি যাতে মনে হয় বাচ্চা। মা বলে, “ওগো গনির বাবা, সেলি আমার এখনো বিয়ের লায়েক হয়নি।” তাহের ভাইয়াও সায় দেন। বাবা বলেন, “বয়স তো বাড়ছে।” মা বলেন, “শরীর তো বাড়ছে না।” বাবা বলেন, “শরীর না—বাড়লে আমি কী করব?” মা জবাব দেয়, “আপনি দেখেন, মেয়েটিকে এখনো দুধের বাচ্চা মনে হয়।” তারপরও বিপদ কাটছে না। প্রতিমাসে দু—একজন করে লোক আসছে বিয়ে করতে। আমার মতো কালো আর বেঁটে মেয়েটাকে বিয়ে করার জন্য সবাই উন্মাদ। কারণ কী জানেন স্যার?
কী?
বাবার সম্পদ। মোটা টাকার যৌতুক। অথচ আমার অনেক সিনিয়র বান্ধবী আমার চেয়ে অনেক সুন্দরী। তাদের বিয়ের জন্য পাত্র পাওয়া যায় না। পাশের বাড়ির মাজেদাকে দেখেছেন-না স্যার?
দেখেছি।
কত সুন্দরী। তাকে বিয়ে করার জন্য কেউ আসে না। বাবা গরিব—
“ধনীর মেয়ে কালোও ভালো,
বিয়ে করে নিয়ে চলো।
ওরে বাছা ভয় কীরে তোর এত্ত পাবি যৌতুক
গাড়ি পাবি, বাড়ি পাবি; পাবি আরো কত সুখ।”
আমি সেলিমার কথা শুনে অবাক হলাম না, কষ্ট পেলাম। এমন ভালো মেয়েদের যদি এই বয়সে বিয়ে হয়ে যায় তাহলে দেশ প্রকৃত অর্থে পিছিয়ে যাবে। শিশুশিক্ষা মায়ের শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল। মানুষ তো আর পশু নয় যে, শুধু খাবে।
আপনি স্যার আমাকে নিয়ে এত ভাবেন কেন?
মেধাবীদের নিয়ে ভাবতে হয়। তুমি আমার ছাত্রী। তুমি আমার বন্ধু। আমি তোমাদের ভালোবাসি। তোমরাই আমাদের যুগান্তরের ইতিহাস হবে। আমার সন্তানের পথ তোমাদের শিক্ষার ওপর নির্ভর করে আছে।
“ইতিহাস সৃষ্টি করতে হলে ইতিহাসবেত্তা প্রয়োজন।” সেলিমা বলল, “নইলে কোনো ঘটনাই ইতিহাস হয় না। ইতিহাসবেত্তা থাকলে কাকের জল পানের ঘটনাও ইতিহাস হয়ে যায়। এই যেমন—
“একদা এক কৃষ্ণ কাকের তৃষ্ণা পেয়েছিল—
কিংবা কোনো বাঘের গলায়
ছোটো একটা হাড় —।”
বললাম, তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলি?
আমাকে করে দেবে জবাই আর আপনাকে পত্রপাঠ বিদায়। ভাববে— আমরা পড়ি না, খোশ গল্প করি। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে বিয়ে দিয়ে দেবে।
কেন?
তিনি মনে করবেন, আমার সঙ্গে আপনার প্রেম হয়ে গেছে। তাই যাতে বিয়ে না হয় সেজন্য তদ্বির করতে গেছেন। ভুলেও এমন কাজ করতে যাবেন না। সব্বনাশ হয়ে যাবে।
আরে না। তিনি অনেক ভালো মানুষ। আমার সঙ্গে কয়েক বার কথা হয়েছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছেন। শিরশির করে উঠেছিল শরীরটা।
সাহেদ বলল, আপনি কখনো এ বিষয়ে বাবার সঙ্গে আলাপ করবেন না। আপনি আমার বাবাকে জানেন না।
জানি।
“কী রকম জানেন জানি”, সেলিমা প্রতিদিনের মতো মিষ্টি হাসিটাকে বিকশিত করে বলল, “এক টিচার তার ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার বাবা তোমাকে তিন টাকা দিলেন। তোমার কাছে দুই টাকা আছে। এখন তোমার কত টাকা হবে?
ছাত্র অনেক্ষণ ভেবে বলল, দুই টাকা হবে।
শিক্ষক বলেছিলেন, তুমি অঙ্ক জান না।
ছাত্র বলেছিল, আপনি স্যার আমার বাবাকে জানেন না।”
সত্যি কি তোমার বাবা এমন করবেন?
আমার বাবা মূর্ধন্য-গণি সাংঘাতিক গোঁড়া। বিশেষ করে মেয়েদের বেলা।
“স্যার” সাহেদ বলল, “বেলা নিয়ে একটা ছড়া আছে-না!
কী ছড়া?
তার বেলা?”
এটি বেলা নিয়ে নয়, বঙ্গভঙ্গ নিয়ে। ছড়ার নাম— ‘খোকা ও খুকু’। আমার একটি প্রিয় ছড়া। অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন—
“তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
ভারত ভেঙে ভাগ করো !
তার বেলা?”
এতটুক আবৃত্তি করে শ্বাস ফেলার জন্য থামতেই সেলিমা শুরু করল—
“ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা
জমিজমা ঘরবাড়ি
পাটের আড়ৎ ধানের গোলা
কারখানা আর রেলগাড়ি!
তার বেলা?”
সেলিমা থামামাত্র সাহেদ বলল, আমি শেষ করে দিই স্যার ছড়াটি? আপু?
“তেলের শিশি ভাঙল বলে
খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা
বাঙলা ভেঙে ভাগ করো!
তার বেলা?”
 
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
 

Language
error: Content is protected !!