নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস


“উনি টিচার। মানে আমার ছেলে ওমর সুলতানের শিক্ষক”, ডিআইজি সাহেব এসপি জোড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “অসাধারণ মেধাবী এবং শিক্ষাদানে অতুলনীয় কুশলী।”
মাহতাব: স্কুলের শিক্ষক?
না।
তবে?
হাউজ টিউটর। ইউনিভার্সিটিতে পড়েন। কোনো সংশয় ছাড়াই বলতে পারি অসাধারণ। আমি বলি—পরশ পাথর। তার পরশে আমার অপদার্থ সুলতান হীরায় পরিণত হতে যাচ্ছে। সত্য বলতে কী— আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞ। বড়ো একটা মুশকিল থেকে মুক্তি দিয়েছেন।
প্রশংসা শুনে আমি লজ্জিত আনন্দে মুগ্ধ হয়ে ডিআইজি সাহেবের দিকে তাকালাম। পুলিশের পোশাকে বসে থাকা অনেকগুলো ব্যাজ আর ফিতাধারী লোকটাকে মনে হচ্ছে— পুলিশ নয়, মানুষ। মানুষ নয়, পিতা। পিতা নয়, নির্ভরতা। পুলিশ এত মোলায়েম কথা বলতে পারে? আসলে, কাছে না গেলে অনেক জানা ভুল থেকে যায় অজানায়। আমার চোখ শ্রদ্ধায় স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক সিক্ত হয়ে উঠল। পুলিশ কেবল পুলিশ নয়, তারাও মানুষ।
আপনাকে একটা অনুরোধ করব?
ডিআইজি সাহেব এমনভাবে কথটা বললেন, আমি লজ্জা পেয়ে গেলাম।
 আপনার আদেশ আমার আশীর্বাদ।
ডিআইজি সাহেব খুশি হলেন আমার কথায়, টিচার, আমার এক বন্ধুর ছোটো বোন, খুব ভালো ছাত্রী। প্রবল মেধাবী। তাদের বাসায় যতবার গিয়েছি, মেয়েটির প্রতিটা কথা আমাকে মুগ্ধ করেছে। চঞ্চল, কিন্তু অমায়িক; দুষ্ট তবে শালীন। শ্যামলা বাট ভেরি নাইস। তাকে পড়াতে হবে।

বাম থেকে হায়াৎ মামুদ, ড. মোহাম্মদ আমীন ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।

আমি তিনটা টিউশন করি। লজিং তো আছেই। ক্লাসের পড়া পড়তে হয়। এই অবস্থায় আর একটা টিউশনি করা আমার পক্ষে কষ্টকর হবে। কিন্তু ডিআইজি সাহেব এমনভাবে বলেছেন, না-করার কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। না বলতে গেলে না শব্দটা গলায় আটকে যাচ্ছে। না বলা বড়ো কঠিন। আমি কঠিন কাজ করতে পারি না। বড়ো দুর্বল চিত্তের মানুষ। ডিআইজি সাহেব হয়তো আমার মনের ভাষা পড়তে পেরেছেন। হাজার হোক পুলিশ। অকথিত মনের কথা পড়াই তাদের প্রধান কাজ।
প্লিজ, টিচার, না করবেন না।
আমি লজিং থাকি এবং তিনটা টিউশনি করি।
একটু কষ্ট হবে। প্রয়োজনে আপনার আসা যাওয়ার জন্য গাড়ির ব্যবস্থা করব। ওদের গাড়ির অভাব নেই। আপনি হয়তো বলবেন, আরেক জনের কথা।
তাই ভাবছিলাম।
দেখুন, শিক্ষকের অভাব নেই, কিন্তু ভালো শিক্ষকের বড়ো অভাব। অনেকদিন থেকে তারাও একজন ভালো শিক্ষক খুঁজছিলেন। সেদিন গল্পে গল্পে আপনার কখা বলে ফেললাম। আকস্মিক অনুরোধ করে বসল আমার বন্ধু। বেশ ঘনিষ্ঠ। না করতে পারলাম না। বলাটা উচিত হয়নি।
বললাম, আমি একজন ভালো টিচার দিই?
আপনার চেয়ে ভালো?
আমার চেয়ে মেধাবী। সব পরীক্ষায় প্রথম বিভাগ। ইংরেজি ভাষায় বিএ (অনার্স) ফাস্ট ক্লাস ফার্স্ট
এ বিষয়টা নিয়ে আমার প্রবল আপত্তি। অ্যাকাডেমিক মেধা আর পাঠদানের যোগ্যতা অভিন্ন হলে আমার সুলতানকে নিয়ে এত ভুগতে হলো কেন? তার সব শিক্ষকই ছিল প্রথম বিভাগ প্রাপ্ত। দুজন ছিলেন এসএসসি এবং এইচএসসি-তে স্ট্যান্ড। আমি নিজে চুজ করে এনেছিলাম। বলেছিলাম— যত চান তত বেতন দেব। কেউ পড়াতে পারল না। আপনিই পারলেন।
আমার এক বন্ধু আছে। ভালো পড়ায়। খুব ভালো পড়ায়।
“মেয়েটা অসাধারণ”, ডিআইজি সাহেব বললেন, “যে কোনো শিক্ষক তাকে পড়াতে পারবে না। গর্ব করে বলছি না, উদাহরণস্বরূপ আপনার কথার সূত্র ধরে বলছি— মেয়েটি আমার ছেলের চেয়েও ভয়ংকর, মেধাবী এবং অমায়িক। আমি মনে করি, একমাত্র আপনিই তার উপযুক্ত। অনেক শিক্ষক আনা হয়েছিল, কেউ পড়াতে পারেনি।”
কেন?
জানি না। হয়তো তার মেধা বা কৌশলের সঙ্গে শিক্ষকগণ কুলিয়ে উঠতে পারেনি। নতুবা কুলিয়ে উঠতে হলে যে কৌশল নিতে হয় হয়তো, তাদের তা জানা ছিল না। সবাই কয়েক দিন পড়িয়ে চলে গেছে। নতুবা, ছাত্রীই বাদ দিয়ে দিয়েছে। আপনি ছাড়া ওই মেয়েকে আর কেউ পড়াতে পারবে বলে মনে হয় না।
আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ভয় পাওয়ার কথা। মেয়েটি ওমরের চেয়ে মেধাবী, ওমরের চেয়ে ভয়ানক। সহজ কথায় অসাধারণ, অধিকন্তু মেয়ে। তাহলে ওই মেয়ে ওমরের চেযে আরও মারাত্মক হবে। এখন আমার কী হবে? আমি ঘামতে শুরু করলাম। কপালে কী আছে আল্লাহই জানে।
তাহলে কী না করে দেব?
আমি মুখ খুলতে যাচ্ছিলাম না বলার জন্য। তার আগে ডিআইজি সাহেব বললেন, টিচার, ও খুব ভালো মেয়ে। আমি পর্যন্ত সে মেয়ের মেধা দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়ি। সময় পেলে তাদের বাড়ি যাই। কেন জানেন?
কেন?
কেবল মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার জন্য।
কেমন মেয়ে?
ভদ্র, অমায়িক এবং হাসিখুশি। খুব মজা পাবেন পড়িয়ে। সত্য বলতে কী, তার কাছ থেকে শেখারও অনেক কিছু আছে। আরে ভাই কাজে আনন্দ না থাকলে সেটা তো গোলামি। শিখবেন আর শেখাবেন। পড়বেন আর পড়াবেন। মনে করুন, মসজিদের ইমাম। ইমাম নিজে নামাজ পড়ান বিনিময়ে বেতন পান, একই সঙ্গে নিজের ফরজটাও আদায় হয়ে যায়। পৃথিবীতে এমন লাভজনক চাকুরি আর নেই। নামটাও কী গর্জিয়াস।
ভাবলাম— ডিআইজি সাহেবের বন্ধু, নিশ্চয় হোমড়াচোমড়া কেউ হবেন। রাজার বন্ধু তো রাজাই হয়। সবচেয়ে বড়ো কথা— তিনি এমনভাবে বললেন, না করতে পারলাম না। অধিকন্তু মেয়েটির প্রশংসা শুনে আমার আগ্রহ এমন বেড়ে গেছে যে, সময় না থাকা সত্ত্বেও পড়ানোর আগ্রহ মনে মনে প্রবল হয়ে উঠল। ডিআইজ সাহেব যার এমন প্রশংসা করল তাকে দেখতে হবে। এমন মেধাবী কারো শিক্ষক হওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার।
মাহতাব সাহেব বললেন, আমিও ছাত্র জীবনে টিউশনি করতাম।
বললাম, শুনেছি টিউশনি নাকি বিসিএস পাশকে সহজ করে দেয়। অষ্টম-নবম শ্রেণির জ্ঞানটুকু ভালোভাবে জানতে পারলে বিসিএস পাশ ডালভাত হয়ে যায়। এজন্য আমি টিউশনি করি।
মাহতাব সাহেব বললেন, একদম ঠিক বলেছেন। টিউশনি করা প্রার্থীদের মধ্যে বিসিএস পাশের হার বেশি। ছাত্রী অধিকন্তু মেধাবী, এমন শিক্ষার্থীর শিক্ষক হওয়ার মজাই আলাদা। কষ্ট হলেও শুরু করে তিন। ভালো লাগবে।
কী ভাবলেন টিচার, ডিআইজি সাহেব প্রশ্ন করলেন।
আপনি যখন বললেন—।
গুড। আই’ম ভেরি প্লিজড- – – ।
আমি এখন যাই।
যাবেন?
হ্যাঁ।
কিছুক্ষণ পড়ে যান। ওয়েটিংরুমে একটু অপেক্ষা করুন। কিছু জরুরি কাজ আছে এদের সঙ্গে। দশ মিনিটের বেশি লাগবে না। আমার বন্ধু মানে আপনার হবু ছাত্রীর ভাই দশ পনের মিনিটের মধ্যে চলে আসবে। আমি ফোন করে দিচ্ছি। আপনার কোনো জরুরি কাজ নেই তো?
না।
আমি ডিআইজি সাহেবের রুম থেকে বের হয়ে ওয়েটিং রুমের নরম গদিতে শরীর এলিয়ে দিলাম। শরীর ছিল ক্লান্ত। মন ছিল শ্রান্ত। চট্টগ্রাম ইউনিভার্সিটি থেকে গাদাগাদি করা যাত্রীর বস্তাঠাসা চাপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দঁড়িয়ে চট্টগ্রাম শহরে আসতে হয়েছে। ডিআইজি সাহেবের অফিসের নরম গদির ওয়েটিং রুমের তাপানুকূল হাওয়া পেয়ে আরামলোভী ঘুম চোখ দুটি বুজে দিল বেঘোরে।
আমি স্বপ্ন দেখলাম। স্বপ্ন দেখলাম— ওমরের মতো একটি মেয়ে। তাকে পড়াতে গেছি। সে আমাকে অবারিত ধারায় হেনস্তা করে যাচ্ছে। আমি হা করে তার মেধার স্ফুরণ দেখছি আর আমার অজ্ঞতাকে লুকানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু পারছি না। ভয়ে কাঁপছি।  লজ্জায় ঘামছি। পালিয়ের যাওয়ার জন্য পথ খুঁজতে যাব— এসময় ঘুম ভেঙে গেল।

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

Language
error: Content is protected !!