নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

২১

আগামীকাল উচ্চতর গণিত। এটাই সেলিমার শেষ লৈখিক পরীক্ষা। তারপর ব্যাবহারিক। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা আগে চলে গেলাম। উচ্চতর গণিতে একটু বেশি সময় দিতে হবে। রুমে কেউ নেই। প্রতিদিনের মতো আমার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লাম।
সাহেদ এল। সেলিমা আসেনি। আরো পাঁচ মিনিট চলে গেল। সেলিমা এল না।
তোমার আপু? সাহেদকে প্রশ্ন করলাম।
আসছে।
কয়েক মিনিট পর একটা মেয়ে রুমে ঢুকে সালাম দিল। কণ্ঠ সেলিমার মতো মনে হলো। তবে পোশাক এবং বাহ্যিক অবয়ব সেলিমার মতো নয়। সেলিমা মনে করে তাকালাম। তাকিয়েই চমকে উঠলাম, সেলিমা নয়।
আপনি? বিস্ময় দিয়ে প্রশ্ন করলাম।
মেয়েটি কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে আমার সামনের টেবিলের অপরপ্রান্তে রাখা সেলিমার চেয়ারে বসে পড়ল। অবাক হওয়ার কথা। তাই অবাক হলাম।
সাহেদ, ইনি কে?
স্যার, ভালোভাবে দেখুন।
একটু চঞ্চল হয়ে অচঞ্চল দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে ভালোভাবে তাকালাম। আমার দৃষ্টিতে হাসি নিক্ষেপ করল মেয়েটি। কেবল ওষ্ঠাধর দেখলাম। হাসি দেখে নিশ্চিত হলাম মেয়েটি— সেলিমা।
তবু সংশয় যায় না। একদম নতুন সাজে। মাথায় হিজাব। এমনভাবে পরেছে, চুল-কান আদৌ আছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। চোখ আর ওষ্ঠাধর ছাড়া পুরো মুখ হিজাব-কাপড়ে ঢাকা। এমনকি হাত পর্যন্ত সেলিমায় হঠাৎ হিজাব কেন বুঝতে পারলাম না।
অত বোঝার দরকার নেই। আমি হাউজ টিউটর। পোশাক-পরিচ্ছদ ব্যক্তিগত বিষয়। মনের প্রশ্ন মনে রেখে দিয়ে হিজাবওয়ালির দিকে আবার তাকাই। সে আমার চোখ দেখে মনে আটকে থাকা ভাবনাগুলো তার প্রিয় কবির কবিতার মতো পড়ে নিল ভালোভাবে।
খিলখিল হাসিতে ঝরনা জড়িয়ে বলল, আমি আসলেই সেলিমা।
এমন রূপ কেন?
অবাক হচ্ছেন স্যার?
অবাক নয়, হতবাক। তুমি হুজুর হয়ে গেলে কখন?
কাল।
কেন গো?
প্রয়োজনই নিরঞ্জন।
সুন্দর একটা বাণী শিখলাম।
আমার মা তার সব দামি অলংকার কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখে। টেলিভিশন দেখা শেষ হলে কাপড়ের আচ্ছাদনে ঢেকে রাখা হয়; যাতে কোনো ময়লা না পড়ে, পরিষ্কার থাকে। খাবারগুলোও ঢেকে রাখা হয়, যাতে অবাঞ্ছিত কোনো পোকা-মাকড় বা কোনো ময়লা না পড়ে। তাই না স্যার?
তাই তো হওয়া উচিত।
জীবদের শরীর নিরাপদ চামড়া-পালকে ঢাকা থাকে।
হ্যাঁ।
হিজাবের কাজটাও তেমনি নিরাপত্তামূলক।
বই আননি যে! পড়বে না?
সকালে বই উলটে দেখলাম গণিতে কোনো প্রবলেম নেই।
প্রবলেম কোথায়?
আমার মনে। পরীক্ষার আগের দিন মনটা ফ্রেশ রাখা উচিত। তাই আপনাকে খবর দিয়েছি। পেটের খাবার পর্যাপ্ত হলে মনের খাবার অনিবার্য হয়ে যায়। এজন্য ধনীরা মনের খাবারের জন্য ইতস্তত ছুটোছুটি করে। কানাডা যায়, বম্বে যায়। বাসায় প্রচুর খাবার থাকা সত্ত্বেও হোটেলে দৌড়ায়।
তুমি কখন হিজাবপ্রেমী হয়ে গেলে?
স্যার, যে কেউ যে-কোনো সময় পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। ওই যে বললাম— প্রয়োজনই নিরঞ্জন। মেয়েদের বেলায় তা আরো বেশি। আজকের কন্যা কালকের বঁধূ। মেয়েরা দ্রব্য। তাও নাকি আবার পচনশীল, মিষ্টি এবং মূল্যবান। তাই ঢেকে না রাখলে ময়লা ধরে, ক্ষতিকর পোকা চুষে যায়। বিক্রি হয় না। বাবা বলেন, মেয়েরা নাকি খোসা ছড়ানো পাকা কলা—কেবল পিঁপড়ে মাছির আস্তানা। ভালো লোকের ঘৃণা। তার ভাষায়— হিজাব পাকা কলার খোসা।
এতদিন পর এমন বোধ?
সাহেদ বলল, আপুর জন্য বিয়ের কথা চলছে অনেক দিন থাকে।
তা তো জানি।
গতকাল রাতে আপুকে দেখতে আসার কথা ছিল। তাই বিয়ে ভেঙে দেওয়ার জন্য দুপুরে বাথরুমে ঢুকে নিজের চুল নিজে ছেঁটে ফেলেছে। পাগলির মতো লাগছিল। পাগলিকে কে বিয়ে করে!
যাদের দেখতে আসার কথা ছিল তাদের কী হলো?
তাহের ভাইয়া তার সেক্রেটারিকে পাঠিয়ে বিশেষ অসুবিধার কথা বলে নিষেধ করে দিয়েছে। বাবা অনেক গালাগালি করেছেন। মেরেছেনও।
কী মারাত্মক মেয়েরে বাবা!
আমি স্যার মারাত্মকই। কাজটা কি খারাপ করেছি?
এত সাহসী কাজ— আমার মতো ভীরুজনের মন্তব্য করা শোভনীয় হবে না।
স্যার, বিনষ্ট জিনিস সংখ্যায় বেড়ে যায়। ছোটো জিনিস আসলেই বাড়া; বাড়ে লাখ লাখ, হাজারে হাজার। যখন চুল কাটতে শুরু করলাম। যত ছোটো করি চুলের সংখ্যা তত বাড়ছিল আর মাথা হতে ঝরে ঝরে পড়ছিল বাথরুমের মেঝেতে।
এত সাহস তোমার?
সাহস না থাকলে তো স্যার আমি এতক্ষণ কনে সাজার বিছানায় থাকতাম। নতুবা কয়েক সন্তানের মা হয়ে হেঁসেলে।
এভাবে নিজেকে কতদিন রক্ষা করবে?
যতদিন পারি।
পারবে তো?
ভালোভাবে এক মিনিট বেঁচে থাকারও মজা আছে। আমরা তো স্যার প্রত্যেকে মারা যাব, তবু বেঁচে থাকার চেষ্টা করি কেন?
তাই তো!
I like the night. Without the dark, we’d never see the stars.
তুমি বিয়ে করবে না?
আপনি করবেন না? উত্তর না দিয়ে পালটা প্রশ্ন সেলিমার।
করব।
কখন?
লেখাপড়া শেষ হোক। একটা চাকরি-বাকরি হোক; তারপর।
আমিও।
তুমি কি চাকুরি করবে?
চাকুরি না করলে গনি কোম্পানিদের কী হবে? উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান করে আর কর্মীরা উদ্যোক্তার প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। স্যার, উভয়ের সম্পর্ক শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো। আমি পড়তে চাই।
পড়বে।
কিন্তু বিয়ের জন্য উঠেপড়ে লেগেছে বাবা, বাড়ির সবাই। জানি না চুল ছেঁটে কতদিন আশাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারব।
আশাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এছাড়া জীবন অর্থহীন।
যদি পূরণ না হয়?
তাতে কী? সব আশা যদি পূরণ হয় তাহলে তা আমার রেগুলারিটির মতো সস্তা হয়ে যাবে। আশা পূরণের হার যত কম হয় সেটি তত দামি হয়। মনে রাখবে—
“Hope is the thing with feathers
That perches in the soul
And sings the tune without the words
And never stops at all.”
নাস্তা এল।
অল্প খেয়ে বললাম, আর না।
সাহেদ বলল, আপনি এত কম খান কেন? আমি আপনার তিনগুণ খাই।
কম খাই বলে আমি চিকন আর বেশি খাও বলে তুমি মোটা।
সেলিমা সাহেদকে বলল, “জর্জ বার্নাড শ নাম শুনেছ?
হ্যাঁ।
তিনিও স্যারের মতো চিকন ছিলেন।
চিকন ছিলেন কেন?
সেলিমা বলল, জ্ঞানীরা একটু চিকন হয়? নিউটনও চিকন ছিলেন, নিকোলাই তেসলা, এডিসন, মহাত্মা গান্ধী, জগদীশচন্দ্র বসু, মাদাম কুরি সবাই চিকন ছিলেন।
সেলিমার কথা শেষ হওয়ার পর বললাম, জর্জ বার্নাড শ কাঠির মতো চিকন ছিলেন। তাঁর লেখক বন্ধু চেস্টারটন ছিলেন বেশ স্বাস্থ্যবান মোটাসোটা আর নাদুসনুদুস। একদিন তাদের আড্ডায় সামসময়িক দুর্ভিক্ষের প্রসঙ্গ ওঠে এল। ইংল্যান্ডে তখন দুর্ভিক্ষ চলছিল।
চেস্টারটন বার্নার্ড শ-এর দিকে তাকিয়ে বললেন, “বুঝলে শ, দেশে যে দুর্ভিক্ষ চলছে তা তোমাকে দেখলেই বোঝা যায়।
প্রত্যুত্তরে বার্নার্ডশ বললেন, “লোকে এটাও বুঝবে যে, দুর্ভিক্ষের কারণটা তুমি।”

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর

All Links/3

১. স্যমন্তক: এক মলাটে স্যমন্তক সম্পূর্ণ উপন্যাস একসঙ্গে

২. অর্হণা: অর্হণা : এক মলাটে সম্পূর্ণ উপন্যাস অর্হণা

৩. সন্মিত্রা: সন্মিত্রা সম্পূর্ণ উপন্যাস : প্রথম থেকে শেষ পর্ব

৪. তিনে দুয়ে দশ: তিনে দুয়ে দশ সম্পূর্ণ উপন্যাস একসঙ্গে

৫. তিনে দুয়ে দশ: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী সমগ্র পর্ব

Language
error: Content is protected !!