নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

২২

স্যার, সেলিমা পড়বে।” এসএসসি পরীক্ষা শেষ হবার পনেরো-বিশ দিন পর তাহের মেসে এসে জানাল, আপনাকে নিতে এসেছি। আমার সঙ্গে যাওয়ার অনুরোধ করছে সেলিমা।”
সময় ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে এরশাদ ভ্যাকেশন। সেলিমার সঙ্গ যেন নেশা নেশা মুগ্ধতা। বেশ লাগে। চলে গেলাম তাহেরের সঙ্গে। সেলিমা কদমবুসি করল। মাথায় এখনো হিজাব। চুল লম্বা হয়নি নিশ্চয়। মুখের হাসি দিয়ে অন্তরের বিষণ্নতা ঢাকার চেষ্টা বেশ ভালোভাবে দেখতে পেলাম। সে যেমন আমাকে পড়তে পারে, আমিও তেমন তাকে পড়তে পারি। অনেকদিন পর সেলিমা আমার মনে অন্যভাবে আবির্ভূত হলো। মুগ্ধ হলাম মুগ্ধতায়।
কেমন আছ সেলি?
“চুলগুলো এখনো লম্বা হয়নি:, সেলিমা বলল, “প্রকৃতির ওপর জোর চলে না। স্যার, কারো লম্বা চুলে অনেক ফুল। আবার কারো লম্বা চুলে অনেক ভুল। আমি দ্বিতীয় লাইনে। যদি টাকু হয়ে যেতাম, শরীরটা শ্বেতরোগে ভরে যেত— কী যে ভালো হতো!
এতদিন কি বাসায় ছিলে?
কয়েকদিন বেড়ালাম। কালই এলাম। ভালো লাগছিল না।
রেজাল্ট কেমন হবে মনে করো?
এসব ভাবলে কষ্ট লাগে। আমার ভাবানাগুলো আমার অভিশাপ। চুল লম্বা হলে বিয়ে হয়ে যাবে। আমিও সহজে চুল লম্বা হতে দেব না। সপ্তাহে একবার করে ইঁদুরেকাট দেব। ইন্টারের বইগুলো সংগ্রহ করে নিয়েছি। পড়াতে আসবেন। গণিত পদার্থ রসায়ন সবই তো ম্যাথে ভরপুর। তাই না স্যার?
হ্যাঁ।
আগেভাগে পড়ে নেব। ক্লাসে অজ্ঞ থাকতে ভালো লাগে না।
আমাদের স্কুল পরীক্ষাসমূহের প্রশ্নপত্র সম্পর্কে তোমার অভিমত কী?
আমার ইঁদুরকাট চুলের মতো। আপনার প্রশ্নের এক্সেক্ট উত্তর দিতে হলে অস্কার ওয়াইল্ডের কাছে চলে যেতে হবে।
তার কাছে কেন?
অস্কার ওয়াইল্ড একদিন তিনি টেমস ব্রিজের ওপর দিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ এক যুবককে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করতে দেখলেন। ওয়াইল্ড যুবকটিকে ধরে ফেলে বললেন, তুমি আত্মহত্যা করতে চাইছ কেন?
যুবক বলল, এবারও পরীক্ষায় কৃতকার্য হইনি।
অস্কার ওয়াইল্ড যুবকটিকে নিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটলেন। বিদায়ের সময় সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, এই তুচ্ছ কারণে আত্মহত্যা করলে লোকে তোমাকে নির্ঘাত বোকা বলবে। “কেন?” যুবক জানতে চাইল।ওয়াইল্ড বললেন, “কারণ পরীক্ষায় উজবুকেরা এমন সব প্রশ্ন করে বসে যে, মাঝেমধ্যে বিজ্ঞরাও সঠিক উত্তর দিতে পারে না।”
কোনো প্রশ্নের উত্তর কি বাদ গেছে?
না। বলছিলাম— প্রশ্নে কোনো বুদ্ধিমত্তার ছাপ থাকে না। চলমান বছরের প্রশ্নপত্র দেখা যায় পূর্ববর্তী বছরের আগের প্রশ্নের অবিকল নকল। আপনি স্যার পড়াতে আসবেন তো? না এলে খারাপ লাগবে। আড়াই বছরের অভ্যাস।
আমারও খারাপ লাগবে। তুমি শুধু আমার ছাত্রী নও, বন্ধুও।
ওই দিন থেকে সেলিমাকে আগের মতো পড়াতে শুরু করলাম। দিন দিন তার মেধা আর প্রতিভা দুটোই বিকশিত হচ্ছিল। সঙ্গে আমারও। ভালো শিক্ষার্থী ভালো শিক্ষক তৈরির কারিগর।
ঠিক দুই মাস পর সেলিমার মা এসে বলল, মাস্টার সাব আপনাকে এখন আর আসতে হবে না। সেলিমার বিয়ের কথা চলছে। সাহেদ লেখাপড়ায় অত ভালো না। তার বাবা বলছে, “আমার ছেলেদের বেশি পড়ে কাজ নেই। ব্যাবসা করবে। টাকা থাকলে কত এমএ-বিএ আমার চাকরি করবে।”
আপনি কিছু বলেননি? আমি জানতে চাইলাম।
“বলেছিলাম”, সেলিমার মা বলল “ছেলেটিকে পড়ান। তাহেরের বাবা রাজি হননি। কেনই বা রাজি হবেন? উনার বড়ো ছেলের ড্রাইভার ইন্টারমেডিয়েট, কিন্তু সে ক্লাস ফাইভ। সেলির বাবা ক্লাস ফোর। তার অধীনে কাজ করে অনেক উচ্চশিক্ষিত। আমার ছেলে তাহেরের সেক্রেটারি ডিগ্রি পাশ। সে অষ্টম শ্রেণি। আমি গ্র্যাজুয়েট আমার হাসব্যান্ড চতুর্থ শ্রেণি পাশ। তাইলে বা-আজি অনে হন, কী লাভ লেহাপড়া গরি?”
ঠিক বলেছেন খালাম্মা। কিন্তু কথাগুলো কি আপনার?
বাপরে, আমি মেয়ে মানুষ। মেয়ে মানুষের ঘরের কথা পরকে বলতে নেই।
সেলিমাকে আর পড়াতে চান না?
আমি তো চাই আমার মেয়ে ডাক্তার হোক, ইঞ্জিনিয়ার হোক।
বিয়ে দিতে চাইছেন কেন?
সবাই তাই চাইছে।
আপনি বাধা দেন।
আমার সে সামর্থ্য নেই। তবু চেষ্টা করব। এসএসসির ইন্টারমেডিয়েটে ভর্তি হলে আপনাকে খবর দেব। খবর পাইলে চলি আইসেন।
সেলিমা বলল, মা, কয়েক মাস পড়েই তো রেজাল্ট দেবে। স্যার এলে ক্ষতি কী? আমাদের কী টাকার অভাব? কিছুক্ষণ তো অন্তত পড়তে পারি। তাইলে এগিয়ে থাকতাম।
বিষয়টা টাকার না।
কীসের?
তোর বাপ যেটা বইলতে বলছে, আমি সেটাই বললাম।
“মা”, সেলিমা বলল, “ এই টিচার অনেক মমতা দিয়ে পড়ান। তিনি না এলে আমার পড়তে ইচ্ছে করে না। আসলে ভালো লাগে না। তিনি এলে আমি উৎসাহ পাই। অনেক কিছু শিখতে পারি।”
এত উৎসাহ ভালো না। মানুষের চোখে পড়ে।
আমি চুপ করে তাদের কথা শুনছি। সেলিমা আমার সঙ্গ উপভোগ করে। আমিও। তার কাছে আমিও অনেক কিছু শিখতে পারি। সেলিমা মনে করে সেও আমার কাছে অনেক কিছু শিখতে পারে। এটাই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে নিবিড়তা সৃষ্টির মৌলিক বিষয়।
আচ্ছা আমি এখন আসি?
সেলিমার চোখ দুটো জলে জলে বর্ষার হালালুকি। ছল ছল করে বলল, মাঝে মাঝে আসবেন স্যার। আসবেন তো?
শিক্ষক আমন্ত্রণ বা নিমন্ত্রণ ছাড়া অকারণে ছাত্রীর বাড়িতে বেড়াতে যায় না। বিশেষ করে আমাদের মতো অবিবাহিত টিউশন-মাস্টার। ছাত্র হলেও না, ছাত্রী হলেও না। আমি কেবল পড়াতে আসতে পারি, তাও আহ্বান পেলে।
আমি খবর দিলে আসবেন তো?
চেষ্টা করব।
সেলিমার চোখ জলে ভরে গেল।
এরপর সেলিমাদের বাসায় আমার যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল।
কিছুদিন পর সেলিমা তার বড়ো ভাই গণি কোম্পানিকে দিয়ে খবর দিয়েছিল যেতে। গিয়েছিলাম। সে খুব খুশি হয়েছিল। কিন্তু আমার উপস্থিতি তাদের বাড়ির অন্যদের চোখে কেমন বিদঘুটে উপহাসের বিষয় মনে হয়েছিল। এরপর আরও কয়েকবার তাহেরের মাধ্যমে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল। যাইনি। অপমানিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেখানে যাওয়া উচিত নয়।

Language
error: Content is protected !!