নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

২৩

এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে।
পূর্বকোণে দেখলাম— সেলিমা কুমিল্লা বোর্ডে মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছে। মেনে নিতে বাধ্য বলে মেনে নিয়েছি, কিন্তু খুশি হইনি। আমার খুশিতে কষ্টের বিস্ময়। তাকে আরো ভালো নম্বর দেওয়া উচিত ছিল। উত্তম পরীক্ষক না হলে উত্তমদের বাছাই উত্তম হয় না। তবু সান্ত্বনা— কোন পরিবারের মেয়ে তাও তো দেখতে হবে। এ ভেবে পত্রিকটাটি বাতাসে উড়িয়ে দুহাত প্রসারিত করে চিৎকার দিয়ে বলে উঠি—
আজ গগনে গগনে ভোরের আকাশেও তারা জ্বলে ঝিলমিল,
দুখের আনন্দে সুখের পায়রা ভেসে হেসে তাই; করে শুধু খিলখিল।
তারপর অপেক্ষা করতে থাকি সেলিমার—কখন মিষ্টি পাঠিয়ে যেতে বলবে তাদের বাসায় কিংবা নিজে চলে আসবে হেসে ভেসে। ইউনিভার্সিটি গেলাম না আর। যদি সেলিমার আহ্বান না-পাই!
মেসের অনেকে বলছে— আমার জন্য সেলিমা ভালো রেজাল্ট করেছে। বিভিন্ন সময় আামার আরও ছাত্র-ছাত্রী এসএসসি দিয়েছে। তা যদি হয় তো তারা এত ভালো রেজাল্ট করেনি কেন?
আমার অপেক্ষা দুপুর গড়িয়ে বিকেল। তারপর সন্ধ্যার দিকে হেলে। সেলিমা এল না। অবশ্য বাসা এত কাছে না। তিন কিলোমিটার তো হবেই। সে মেয়ে, তার আসার সুযোগ থাকলেও পরিবেশ নেই। সিদ্ধান্ত নিলাম, সেলিমাকে অভিনন্দন জানিয়ে আসব। আমি বড়ো। বড়ো হয়ে ছোটোদের প্রতি রাগ করলে ছোটো হয়ে যেতে হয়। দিনের একমাত্র বিকেলটা সন্ধ্যার গহ্বরে ঢুকে যাওয়ার আগে কিছু উপহার নিয়ে সেলিমাদের বাড়ি চলে গেলাম।
সারা বাড়িতে খুশির জোয়ার। উঠোনে সামিয়ানা টাঙ্গানো হয়েছে। এর নিচে এক কোনায় মিষ্টির পাহাড়। আনছে আর রাখছে, যার ইচ্ছে সেই নিয়ে নিয়ে খাচ্ছে। লোকজন আসছে আর যাচ্ছে। সেলিমার হাই স্কুলের সব শিক্ষক-শিক্ষিকা এসেছেন। আত্মীয়—স্বজনে চারদিক ভরপুর।
যাদের বাড়ির কেউ কখনো অষ্টম শ্রেণির সিঁড়ি ভাঙতে পারেনি, তাদের বড়ির একজন মেয়ে, মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছে। যেমন তেমন কথা নয়। গণি কোম্পানি আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে অন্য দিকে চলে গেলেন। এত খুশিতে এই অবহেলা কষ্ট দিতে পারল না। বুঝলাম না কারণ কী! থাক গে। বড়োদের চোখে ছোটোরা কেবল অবহেলার সামগ্রী।
গনি কোম্পানি আমাকে দেখে এগিয়ে এলেন, কী হবর মাস্টর সাব? বইলছিলাম না, নিউটনর ছাত্রী উপজেলার সেরা অইব। এহন তো পুরা দেশের সের অইয়ে।
তার কথা আমার কানে যাচ্ছিল, না কি কানের গোড়া থেকে চলে আসছিল বুঝতে পারছিলাম না। আমার চোখ খুঁজছিল সেলিমাকে। সাহেদ হলেও চলত, কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
নিউটনের ছাত্রী কোথায়? প্রশ্ন করলাম গনি কোম্পানিকে।
গর্বের সঙ্গে বললেন, ইতির মাস্টরনি অলর-লই দোতালাত হথা হদ্দে।
এত মেহমান ঠেলে লজ্জা লাগছিল ওপরে যেতে। তাছাড়া কোন কক্ষে যাব? গনি কোম্পানিও বলছেন না ওপরে যেতে। কী করব ভাবতে না ভাবতে আরো কিছুক্ষণ চলে গেল। হঠাৎ দেখলাম— তাহের এদিকে আসছে।
সে আমাকে দেখে কিছুটা সংকুচিত হয়ে এগিয়ে এল। সালাম দিয়ে বলল, স্যার, খুব খুশি হয়েছি আপনি এসেছেন। সেলিমা আপনাকে খবর দিতে বলেছিল। নানা ব্যস্ততার কারণে মনে ছিল না। কিছু মনে করবেন না।
সেলিমা কোথায়?
ওপরে আসুন, বলেই তাহের আমাকে তার রুমে নিয়ে গেল। তার রুম মানে সেই রুম, যে রুমে সেলিমাকে পড়িয়েছি। রুমে কেউ ছিল না। আমাকে বসিয়ে তাহের চলে গেল।
কয়েক মিনিট পর সেলিমা এল। শুধু এল না, সঙ্গে নিয়ে এল এক জাহাজ আবেগ। আবেগে আমাকে এমন বেগে জড়িয়ে ধরল আমি হতবাক হয়ে গেলাম। আমার সব অভিমান-অপমান তার আবেগের তোড়ে ভেসে-ভেঙে খানখান হয়ে গেল।
সাহেদ এসে বলল, আপু আম্মু এসেছে।
সেলিমা খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আমাকে ছেড়ে দিয়ে তার মাকে বলল, মা, স্যার আজ রাতে খেয়ে যাবেন। অনেক্ষণ গল্প করব।
সেলিমার মা বললেন, এত দেরি করলেন কেন বাজি? মেয়েটা আমার আপনার জন্য অস্থির হয়ে অপেক্ষা করছিল। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। মেয়েটার জন্য অনেক কষ্ট করেছেন।
আমি কিন্তু তার রেজাল্টে খুশি হয়নি। মনে করেছিলাম ফাস্ট হবে।
বইয়ুন, বলে সেলিমার মা চলে গেলেন।
“আরো আগে আসেননি কেন?” সেলিমা বলল, “আমি তো সকাল সকাল আসার জন্য খবর দিয়েছিলাম। কোন সকাল থেকে অপেক্ষা করছি।”
বলতে পারলাম না আমি রবাহুত। বলতে পারলাম না— আমাকে কেউ খবর দেয়নি। আমি নিজে নিজে এসেছি। ইচ্ছে করলে সেলিমা নিজে গিয়ে আমাকে খবর দিতে পারত। দেয়নি, কষ্ট পেয়েছি। তবে এখন ওসব নিয়ে ভাবার কোনো মানে হয় না। সে আমার ছাত্রী। এখানে অভিমান নয়, সর্বদা সপ্রাণ আহ্বানই বাঞ্ছনীয়। পিতা আর শিক্ষকদের অভিমান করতে নেই। তাদের কাজ অভিমান হজম করা। সেলিমার উচ্ছ্বাসের প্রমত্ত জোয়ারে আমার সব কষ্ট ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে।
সেলিমার জন্য একটা কলম আর একটা বই এনেছি। সেগুলো তার হাতে তুলে দিলাম। বইটির নাম ছিল: কী পাইনি। লেখক আকবর হোসেন। তিনি আমার প্রিয় ঔপন্যাসিক। টেস্ট পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার পর একটা বই দিয়েছিলাম— মেঘ বৃষ্টি বাদল। একই লেখক।
বইটির নাম দেখে সেলিমা বলল, আমার মনে হচ্ছে আমি আজ সব পেয়েছি। আমি চেয়েছিলাম প্রথমে আপনাকে সালাম করতে।
তুমি খুশি হয়েছ?
আজ যত উপহার পেয়েছি, সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে আপনার ককী।
ককি মানে?
কলম আর কী পাইনি।
আমার সামান্য উপহারে তোমার অসামান্য খুশি দেখে একটা কথা মনে পড়ে গেল।
কী কথা স্যার?
Who does not thank for little will not thank for much.
আমাকে দোয়া করবেন। যেন লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাই।
আমার দোয়া কি বাংলাদেশ তোমার মতো নিউটনকে সন্তুষ্ট করার যোগ্যতা রাখে?
রাখে।
দোয়া কী; তা কি তুমি জান?
জানি স্যার।
কী?
আমার মঙ্গলের জন্য আপনার ঐকান্তিক প্রত্যাশা।
প্রত্যাশা কি আসলে আশাকে সফল করতে পারে?
পারে।
কীভাবে?
এই আপনি যেমন আমাকে মেয়েদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ করে দিলেন।
“এবং” আমি বললাম, “তুমি আমার চেষ্টাকে সফল করার জন্য প্রচণ্ড অধ্যবসায় নিয়ে কাজ করেছ। মনে রাখবে, দোয়া কার্যকর করার দায়িত্ব দোয়াকারীর উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে যাকে দোয়া করা হচ্ছে তার কার্যকলাপের ওপর।”
স্যার, আমি যা হয়েছি-পেয়েছি এবং হব-পাব তার জন্য বহুলাংশে আপনার দুই বছরের সান্নিধ্যের কাছে একান্তভাবে ঋণী। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
অনেক্ষণ হয়ে গেল। এবার যাই?
খেয়ে যাবেন।
আর একদিন।

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

All Link

All Links/1

All Links/2 শুবাচির প্রশ্ন থেকে উত্তর

All Links/3

Language
error: Content is protected !!