নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

২৫

ইচএসসি পরীক্ষা শুরু হলো সেলিমার। একই সঙ্গে আমার অনার্স পরীক্ষাও। ব্যস্ততার মাঝেও ইংরেজি প্রথম পত্রের পরীক্ষার দিন সেলিমার পরীক্ষার হলে গেলাম। তার অনেক আত্মীস্বজন এসেছেন। তাদের মধ্যে পরিচিত কয়েক জনের সঙ্গে দেখা হলো। সেলিমা হল থেকে বের হয়ে সবার আগে ছুটে এল আমার কাছে। খুব ভালো হচ্ছে তার পরীক্ষা।
তার একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে বললেন, টিচার, সেলিমার বিয়ের কথা চলছে। আপনি তো এখন তাকে পড়ান না। আসার প্রয়োজন নেই। কেউ কিছু মনে করতে পারে। মানুষের মন ভালো না। খুব খারাপ। কিছু মনে করবেন না আবার।
এরপর আর যাইনি।
যেতে ইচ্ছে হতো, কিন্তু ইচ্ছেটাকে পরিস্থিতির কারণে বড়ো অনিচ্ছায় প্রতিহত করি। না গেলে কী হয়? কিছু হয় না। মানুষ সব সহ্য করতে পারে। গেলে তিলকে তাল বানাতে মুহূর্ত দেরি হবে না। আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। লজিং থেকে লেখাপড়া করি। টিউশনি করে পড়ার খরচ যোগাই। এমন যুবকদের সাহস উদ্যমের মাঝে নয়, কেবল ভীরুতার মাঝে ঘুরপাক খায়।
যথাসময়ে এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট দিল। বেশ আগ্রহ নিয়ে পত্রিকা দেখলাম। সেলিমার রোল নাম্বার নেই।
সেলিমা পাশ করবে না— এমন হওয়া রীতিমতো অবিশ্বাস্য। হিতাহিত আমার লোপ পেয়ে গেল । পত্রিকা নিয়ে ছুটলাম সেলিমাদের বাড়ি। লজ্জা আমার আবেগের টানে ভেসে গেছে সেলিমায়।
উঠোনে দেখা পেলাম সাহেদের। ভেতরে নিয়ে বসতে দিল।
সেলিমা কোথায়? জানতে চাইলাম।
মামা বাড়ি, সাহেদ উত্তর দিল।
তার রেজাল্টের খবর কী?
কীসের রেজাল্ট?
এইচএসসি পরীক্ষার। আজ পত্রিকায় রেজাল্ট দিয়েছে জান না?
না।
সাহেদের কথা স্বাভাবিক মনে হলো না। আমাকে এড়িয়ে যাওয়ার ভাব। অনাগ্রহের সঙ্গে কিছুটা রূক্ষতা এবং কষ্টের ছোঁয়া দেখলাম তার মুখে-বুকে। এড়িয়ে যাবার প্রবণতা স্পষ্ট। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
কী হলো, কিছু বলছ না যে?
কিছু হয়নি। হলেও জানি না। জানলেও বলব না।
কথাগুলো বেয়াদবের মতো মনে হলো। কিছু বললাম না আর। চলে এলাম। সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। এত ভালো ছাত্রী সেলিমা ফেল করবে, তা কীভাবে হয়?
কয়েক মাস সহ্য করলাম সেলিমার রহস্যজনক অফল। একসময় সহ্যের বাধ অস্থির মমতার ধাক্কায় ভেঙে খানখান। আবার ছুটে গেলাম সেলিমাদের বাড়ি। কেউ কথা বলল না। আমাকে দেখে সবাই মিটি মিটি হাসছে। কথা বলার মতো পরিচিত কাউকে পেলাম না। নিজেকে ভারি অবাঞ্ছিত মনে হলো। তবু আবেগ সবেগে সেলিমার মমতায় আমাকে শক্তি দিল। অপমান সম্মানে বারিত হলো স্নেহের ঝুড়িতে। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও কাউকে না-পেয়ে ফিরে আসার পথে সাহেদের সঙ্গে দেখা।
প্রথমে সে তাকে লুকিয়ে ফেলতে চেয়েছিল আমার চোখ থেকে। আমি ডাক দেওয়ায় আর লুকাতে পারল না।
লজ্জা পেয়ে গেল ভীষণ।
সেলিমা কোথায়?
নাই।
কোথায় ?
তিন মাস আগে আপুর বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুর বাড়ি ফটিকছড়ি।
মজা করছ, তাই না?
সত্যি স্যার।
কী হয়েছে বলো।
আসুন স্যার, বাসায় বসে কথা বলি।
চলো।
বিয়ের কথা শুনে আপু বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল। মা দেখে ফেলায় বেঁচে যায়। এরপর থেকে সে একপ্রকার গৃহবন্দি ছিল।
আসলে বলো তো সে কোথায়?
বললাম তো— আপুর বিয়ে হয়ে গেছে।
পরীক্ষার আগে, না পড়ে?
সাতটা বিষয়ের পরীক্ষা দিতে পেরেছে।
তারপর?
মাঝখানে এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আহুত হরতালের জন্য কলেজ পনের দিন বন্ধ ছিল। একদিন বাবা আর বড়ো ভাই সেলিমা আপুকে মামা বাড়ি নিয়ে গেলেন। সেখানে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলেন।
পরীক্ষাটা তো অন্তত দিতে পারত।
সেলিমা আপুও সবাইকে এই রিকোয়েস্ট করেছিল। কেউ তার অনুরোধ রাখেনি। কেঁদে কেঁদে সবার পায়ে পড়েছিল। কেউ শুনেনি।
শ্বশুর বাড়ি থেকেও তো পরীক্ষা দিতে পারতে?
বলেছিল আপু। কিন্তু
কিন্তু কী?
আপুর স্বামী হযরতুল আল্লামা কেবলা হুজুর বলেছে— যারা কলেজে পড়ে তারা জাহান্নমি। বিশ্ববিদ্যালয় নাকি বেশ্যাবিদ্যালয়। যারা কলেজে পড়ে তারা কোনো পাক মুসলিমের বউ হতে পারে না। কোরআন—হাদিস এবং ইসলামি জ্ঞান ছাড়া আর সব জ্ঞান হারাম। বোরকা না পরলে কেয়ামতের দিন গরম আলকাতরা পরিয়ে দেবে আল্লাহ।
তাড়াতাড়ি বলো। এখন সে কোথায়?
বিয়ের দুদিন পর হরতালের মধ্যে আপুকে নিয়ে তার স্বামী কেবলা হুজুর সৌদি আরব ওমরাহ হজ করতে চলে যান। হজ করিয়ে আপুকে অতীতের সব পাপ থেকে মুক্ত করে শিশুর মতো নিষ্পাপ করে এনেছেন। তাকে আর কোনো পাপ করতে দেবেন না। তাই লেখাপড়া বন্ধ করে দিলেন।
সেলিমা এখন কোথায়?
এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিস ফিস করে বলল, নাইওর আইছে।
তার সঙ্গে কথা বলতে পারি?
“ডেকে নিয়ে আসি” বলে সাহেদ চলে গেল। কিছুক্ষণ পর দরজার গোড়া থেকে ভেসে এল সেলিমার মায়ের গলা, মাস্টার সাব আঁই জানি, অঁনে সেলিমার লগে দেখা করতে আইছেন। তাই না?
হ্যাঁ।
দেখা হবে না।
কেন?
পর পুরষের সঙ্গে নারীদের কথা বলা নিষেধ।
আমি যে তাকে একটু দেখতে চাই।
সম্ভব নয়। আপনি পরপুরুষ।
আমি আপনার মেয়ের শিক্ষক। সে আমার বোনের মতো। কন্যার মতো। তিন বছরের বেশি পাশাপাশি বসে পড়িয়েছি। একটু কথা বললে অসুবিধা কী? আমি শিক্ষক, পরপুরুষ হব কেন?
যাদের বিয়ে করা ইসলামি শরিয়তে নিষিদ্ধ তারা ছাড়া বাকি সবাই পরপুরুষ। সেলিমার স্বামী আমাার হাতে তার বউকে তুলে দিয়েছেন। তিনি আল্লাহর নেকবান্দা, আওলাদে রাসুল। মেয়েটারে হজ করিয়ে নিষ্পাপ করে এনেছেন। আমি তার বউটারে হেফাজত করতে না পারলে কেয়ামতের দিন আল্লাহরে কী জবাব দেব?
মেয়ে তো আপনার।
সেলিমার গ্র্যাজুয়েট মা এবার প্রমিত বাংলায় বললেন, বিয়ের পর মেয়েরা আর বাবা-মায়ের থাকে না, বাবা। স্বামীর হয়ে যায়। বাবা, আপনি অনুগ্রহপূর্বক আর আসবেন না। সেলিমার বাবা দেখলে হুলুস্থল করে দেবেন। আমি গেলাম। চা-নাস্তা খেয়ে যাবেন।
বলতে না বলতে প্রচুর নাস্তা নিয়ে এল এক মনিষী। খেতে ইচ্ছা করছিল না। কিন্তু না-খাওয়া ঠিক হবে না। একটা মিষ্টি মুখে দিলাম। মনে হলো— বালি আর তুষের মিশেল। চায়ের কাপে ওষ্ঠাধর ছুঁইয়ে নামিয়ে নিলাম। বিষের গন্ধ। তবু দুই চুমুক গলায় ঢুকিয়ে বের হওয়ার পথে ভেসে এল অনুচ্চ মেয়েলি গলা, স্যার।
আমি পিছনে ফিরলাম।
সেলিমা।
তাকে দেখে আমার সারা শরীর মোচড় দিয়ে উঠল আহত সাপের মতো। শাড়ি পরেছে। শাড়ি-সেলিমাকে আর দেখিনি। সেলিমা দরজা ঠেলে এগিয়ে আসতেই তার মা তাকে একপ্রকার টেনে হিচড়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন।
মা, স্যারের সঙ্গে একটা মিনিট কথা বলব, প্লিজ।
না।
কেন? দাও-না গো মা?
তুমি হজ করে পাপশূন্য হয়ে এসেছ। আমি তোমাকে পরপুরুষের কাছে যেতে দিতে পারি না। পরপুরুষের চোখে পড়া মানে চোখ জেনাহ।
আমার কলজের ভেতর কামারের হাপর। চোখ ভিজে বর্ষার ঢাকা। কয়েক ফোঁটা হয়তো গড়িয়েও পড়েছে তাদের পাকা মেঝেতে। সেলিমার মন কেমন করছে? আমি এত কষ্ট পাচ্ছি সে কত কষ্ট পাচ্ছে! অন্যের জন্য কষ্ট পাওয়াটাই কি ভালোবাসা?
জানি না, কিন্তু কষ্ট পাচ্ছি।
কারো জন্য কষ্ট পাওয়া যদি ভালোবাসা হয়, তাহলে সেলিমাকে আমি ভালোবাসি। সিঁড়ি বেয়ে কিছুদূর নেমে আবার ওপরে উঠলাম।
সেলিমার মা বললেন, আবার কী?
সেলিমাকে একবার দেখতে চাই। আমার কষ্ট হচ্ছে খুব। সে কী বলতে চাইছে তা শুনে চলে যাব।
না।
ভেতর থেকে ভেসে এল সেলিমার চিৎকার, মা কোনো কথা বলব না। শুধু কদমবুসি করে চলে আসব। স্যারকে একটি বার সালাম করতে দাও-না মা?
না। জামাই বলেছে— কোনো পরপুরুষের সঙ্গে দেখা করা যাবে না। কবিরাহ গুনাহ।
শিক্ষক কীভাবে পরপুুরুষ হয়?
বিয়ের পর স্বামী যাকে বলে সেই ওই নারীর পরপুরুষ; বাপ হলেও।
 
 

Language
error: Content is protected !!