নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

২৬

টফট করছে বুক।
মেসে এসে কিছুই খেতে পারলাম না। অথচ পেটে প্রচণ্ড খিদে। বারবার সেলিমার কথা মনে পড়েছে। মেসম্যাট তপন জোর করে খেতে বসালো। প্লেটের দিকে তাকলাম। সব ভাত সেলিমা হয়ে গেছে। চোখের সামনে ভেসে উঠল ঘটনা— সেলিমার মা কীভাবে তাকে টেনে নিয়ে গেল। কী আকুতি সেলিমার!
ইস, কী কষ্ট!
সে এখন কী করছে?
নিশ্চয় আমার মতো ছটফট করছে। আমি কেঁদে দিলাম। সেলিমা কী যেন বলতে চেয়েছিল। কী বলতে চেয়েছিল? সে কি বলতে চেয়েছিল— স্যার, আমাকে বাঁচান। আমাকে এই অন্ধকার জাহান্নম থেকে বের করে নিয়ে যান।
তার কথাটি শোনার ইচ্ছে আমাকে অস্থির করে তুলল। ইচ্ছে করছে আবার সেলিমার বাড়িতে ছুটে যাই। সবার সামনে তাকে বাড়ি থেকে ঢেকে এনে জিজ্ঞাসা করি, বলো— কী বলতে চেয়েছিলে? বলো— কী সাহায্য চাও। আমি প্রস্তুত।
আসলে এটি কথার কথা। আমার সেলিমাদের বাড়ি যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইচ্ছা থাকলেও সাহস নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে মেরে আমার লাশটা তাদের ইটের ভাটায় ফেলে দেবে। কাকপক্ষীও টের পাবে না। তাদের আচরণ জানিয়ে দিয়েছে আমি কত অবাঞ্ছিত।
সেলিমাদের বাড়ি যাওয়া মন থেকে বাদ দিয়ে দিলাম, কিন্তু সেলিমাকে বাদ দেওয়া গেল না। বারবার মনে পড়তে থাকল। এ ফাঁকে সেলিমা অধ্যয়ন-টেবিল থেকে আমার হৃদয়-টেবিলে ঢুকে পড়ল। আমি আরো কাতর হয়ে গেলাম।
কী অবাক!
সেলিমা পড়তে চেয়েছিল। অধ্যয়ন শেষ না-হওয়া পর্যন্ত বিয়ে থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। আমাকে কিছু বলতে চেয়েছিল। নিজের পছন্দ মতো সঙ্গী চেয়েছিল। আমার সহায়তা চেয়েছিল। আমি কিছুই করতে পারিনি।
কী করব?
আমি একটা ছাগল। ছাগল দিয়ে কি আর হালচাষ হয়? আমি একটা লজিং মাস্টার, আমার দৌড় বেলা বিস্কুট পর্যন্ত। অতিরিক্ত এক কাপ পাতলা চা। সঙ্গে সাড়ে চার মুষ্টি মুড়ি।
এরপর সেলিমার সঙ্গে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। কিন্ত মন থেকে একটুও বিচ্ছন্ন করা গেল না। ভোলার চেষ্টা স্মরণের চেষ্টাকেই কেবল প্রকট করে তোলে। ভুলে যাওয়া যদি এত সহজ হতো, তাহলে সন্তানহারা জননীকে কি এত কাঁদতে হতো?
মাহফুজ আমার সহপাঠী। চট্টগ্রাম শহরে তাদের বাসা। আমি জানতাম তার বাড়ি শহরে। সেলিমার বাড়ি হতে চলে আসার কয়েক মাস পর একদিন কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, মাহফুজের গ্রামের বাড়ি ফটিকছড়ি।
আমি সেলিমার কথা বললাম। সে চিনতে পারল। সেলিমা আমার ছাত্রী তা শুনে অবাক হলো। অবাক হলো এজন্যই যে, সেলিমা এখন ফটিকছড়ির বিখ্যাত মহিলা। সেলিমার শ্বশুর বাড়ি আর মাহফুজের গ্রামের বাড়ি একই পাড়ায়। ধনী পরিবারে বিয়ে হয়েছে। তবে মারাত্মক গোঁড়া। এত গোঁড়া যে, পাঁচ বছরের মেয়েদেরও আপাদমস্তক বোরকা না-পরিয়ে বের হতে দেয় না। হাতমোজা পর্যন্ত পরতে হয়। সেলিমার শ্বশুর বড়ো মাদ্রাসার প্রধান এবং স্বামী কেবলা হুজুর ওই মাদ্রাসার মোহাদ্দেস।
“মেয়েটা অনেক বড়ো কিছু হতে পারত”, মাহফুজকে বললাম, “অকালে ঝরে গেল। এভাবে অনেকে অকালে ঝরে যায়। কুসংস্কার থেকে মুসলিম সমাজ এখনো বের হতে পারল না। এখনো মনে করে মেয়েদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা হারাম। সেলিমা কুসংস্কারের বলি হলো। তার লেখাপড়াটা বন্ধ হয়ে গেল। এসএসসি-তে স্ট্যান্ড করা মেয়ে সে।
মাহফুজ বলল, কেবলা হুজুরের বউ সেলিমা কলেজে ভর্তি হয়েছে।
“কী?” আমার বুক আনন্দে নেচে উঠল। আমার আর কিছুর প্রয়োজন নেই। আপ্লুত গলায় বললাম, সত্যি?
সে এবারের এইচএসসি পরীক্ষার্থী।
তুমি কীভাবে জানলে?
আমি কেন? এলাকার সবাই জানে। আপাদমস্তক বোরকা ঢেকে কলেজে আসেন কেবলা হুজুরের বউ। গ্রামসুদ্ধ হতবাক, সবাই তাকে বীর নারী হিসেবে শ্রদ্ধা করে। ওই বাড়ির বউ কলেজে— এ তো হাতির ডিম পারার চেয়েও অবিশ্বাস্য। কেবলা হুজুরের বউ, মানে তোমার ছাত্রী গতবার বিয়ের জন্য যে মেয়ে তিনটা পরীক্ষা দিতে পারেনি। তাই না?
হ্যাঁ।
আরে ভাই জেদ আর প্রতিভা থাকলে কেউ আটকে রাখতে পারে না। তোমার ছাত্রীকে যেমন পারল না। হয়ত সাময়িক কিছু কষ্ট হয়েছে।
মন থেকে সমস্ত কষ্ট মুহূর্তে মুছে গেল। একটা বছর নষ্ট হলো—এমন দুর্ঘটনা অনেকের ঘটে। এটি মেনে নেওয়া যায়। মনে মনে সান্ত্বনা নিলাম। সেলিমাকে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব।
যাওয়া ঠিক হবে? নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম।
উত্তর এল মন থেকে, ঠিক হবে না।
মাহফুজের মুখে শোনা কথা এক দশমাংশ সত্য হলেও সেলিমার শ্বশুর বাড়ি ভয়ানক কারাগার। তার বাপের বাড়িতে যা করেছে, শ্বশুর বাড়িতে কী হতে পারে তা অনুমান করতে কষ্ট হলো না।
আড়াল থেকে সেলিমাকে দেখা যায় না? মাহফুজকে বললাম।
পাগল হয়েছ?
পাগল হবে কেন?
তুমি কলেজে গেলে একটি চলন্ত বোরকা দেখতে পাবে। তার মুখ দেখতে পাবে না। এমনকি হাতের আঙুল কিংবা পায়ের নখ— কিছুই দেখতে পাবে না। কিন্তু তোমাকে দেখে যদি সে আবেগবশত কথা বলার জন্য বোরকার মুখ খুলে ফেলে বা না খুলেও কথা বলে তখন কী হবে বুঝতে পারছ?
কী হবে?
মুহূর্তে সবখানে জানাজানি হয়ে যাবে। আমি জানি না তোমার কী হবে। সেলিমার লেখাপড়া চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।
দেখতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে যে!
যদি দেখতে চাও তাহলে তুমিও বোরকা পরে যাও। তোমার দেখার কাজটা হয়ে যাবে। তবে মুখ নয়, বোরকা। তুমি আসলে মেয়েটার জন্য উন্মাদ হয়ে গেছ।
হ্যাঁ। আসলেই।
প্রেমে পড়েছ?
এসব ভাবিনি। শুধু বুঝি তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। তার সান্নিধ্য ভালো লাগে।
মনে রেখো— সেলিমার স্বামী নারীশিক্ষার ঘোর বিরোধী। তাঁর ভাষায়, যে মেয়ের ওপর পর পুরুষের নজর পড়বে, সে মেয়েকে কেটে ফেলা বেহতর। মেয়েদের সৃষ্টি করা হয়েছে কেবল সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য আর স্বামীর সেবা করার জন্য। এছাড়া তাদের আর কোনো কাজ নেই। সেলিমা কীভাবে কলেজে ভর্তি হতে পারল তা বিস্ময়কর। সেলিমা আমাদের তেজস্বিনী। এ অবস্থায় তোমার যাওয়াটা কি উচিত হবে?
না।
সে কলেজে ভর্তি হয়েছে পড়ুক। ইউনিভার্সিটি এলে কিছুটা হলেও স্বাধীনতা পাবে। তখন দেখা করতে পারবে। মাত্র কয়েকটা মাস।
সন্তুষ্ট হলাম মাহফুজের কথায়। তাকে নিয়ে আমার স্বপ্ন ছিল এটাই। সামনে তার এইচএসসি ফাইনাল। আমার এখন ভাবনা— সেলিমার বিশ্ববিদ্যালয়। মাঝখানে আর কিছু না।
অপেক্ষা কেবল পরবর্তী ধাপ— বিশ্ববিদ্যালয়। ওখানে তার সঙ্গে দেখা হবে আমার। তৃপ্তি আমার মাথা হতে পা বেয়ে মাটিতে নেমে সারা পৃথিবী ছড়িয়ে পড়ল।
হুররে।

Language
error: Content is protected !!