নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

সলেই কি তোমার আপু বদমেজাজি?
একদম অক্টোপাসের মতো, সাহেদ বলল।
কীসের মতো?
অক্টোপাস।
অক্টোপাস কি বদমেজাজি?
এটি স্যার পৃথিবীর সবচেয়ে বদমেজাজি প্রাণী। অভিজাতদের চেয়েও।
তাহলে আমার উপায়?
পড়ে এলে ভয় নেই। পড়ে আসবেন।
বললাম, কী পড়ে আসব?
উত্তর দেওয়ার আগে রুমে ঢুকে সেলিমা। ডান হাতে একটা পানির বোতল। বাম হাতে একটা হাতপাখা। বোতলটি টেবিলের উপর রেখে বলল, “বিদ্যুৎ চলে যেতে পারে তাই হাতপাখা।” তারপর হাতপাখাটি নাড়তে নাড়তে সাহেদকে ছোটো একটা ঘুসি দিয়ে বলল, “আমি বদমজাজি?”
সাহেদ বলল, নিউটন তো বদমেজাজিই ছিল।
সত্যি?
“জি স্যার”, সাহেদ বলল, “আপু বলেছেন।
কী বলেছেন?
নিউটন আমাদের সেলিমা আপুর মতো সবকিছু তালিকা করে রাখতেন। আপুর ডায়ারিতে তারিখ বাই তারিখ গত দশ বছরের সব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাবেন। সবাই ঘুমিয়ে পড়লে সে জেগে জেগে পড়ে আর ডায়ারিতে তালিকা বানায়।”
কীরে সেলিমা, ঠিক?
আইজ্যাক নিউটন নিজের সব কাজের তালিকা তৈরি করে রাখতেন। তাঁর তৈরি একটি তালিকায় ১৯ বছর পর্যন্ত করা ৪৮টি অপরাধের স্বীকারোক্তি ছিল। এই তালিকায় ছিল মা এবং সৎ বাবাকে বাড়িসহ জ্যান্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি, ভাইবোনকে ঘুসি মারা, মা ও বোনের সঙ্গে খিটিমিটি, এরকম আরও অনেক কিছু।
সাহেদ বলল, আপু যেমন করে।
সাহেদকে বললাম, তুমিও কী এমন তালিকা বানাবে?
না। আমি ভবিষ্যতে কী করব তার তালিকা বানাব। অতীত নিয়ে আমি স্যার অত ভাবি না। অবশ্য নিউটনও ভাবতেন না।
তোমরা কী সব নিউটন? আমি প্রশ্ন করলাম।
“আমি নই, আপু”, সাহেদ পানির বোতলটা আমার দিকে ঠেলে দিয়ে এক পাশে রেখে বলল, “বোতলটি স্যার কাছে রাখুন।”
কী জন্য?
পিপাসা লাগতে পারে। এই বোতলের পানি আপনার জন্য। আপনিই পান করবেন। ফ্রিজ থেকে আনা। গলা শুকিয়ে যাবে তো, তাই।
এক গ্লাস দাও। আসলেই গলা শুকিয়ে গেছে।
সাহেদ এক গ্লাস পানি আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, নিন স্যার।
সেলিমা আমার সামনে একটা মগ রাখল।
এটা কী? আমি বললাম।
স্যার, হোয়াট ইজ বিফোর ইউ?
আমার সামনে টেবিল আছে, চেয়ার আছে, মগ আছে, কাপ আছে, তুমি আছ, দেওয়াল আছে, বই আছে— কোনটি বলব।
আমি তো স্যার আপনার সামনে কী আছে তা জিজ্ঞাসা করিনি।
কী জিজ্ঞাসা করেছ?
হোয়াট ইজ বিফোর ইউ?
বুঝতে পারছি না।
ইংরেজি বর্ণমালা ক্রমান্বয়ে পড়ে যান – – – S T U V; কী দেখলেন স্যার? ইংরেজি বর্ণমালার সজ্জায় ইউ (U) বর্ণের পূর্বে টি (T)। সুতরাং, “হোয়াট ইজ বিফোর ইউ?” প্রশ্নের হান্ড্রেড পার্সেন্ট নিশ্চিত উত্তর হলো T।
আবার বোকা বানালে।
আপনি কী স্যার জানেন, টি (tea) এবং চা নামটা কীভাবে হলো?
জানি না।।
চায়না ভাষায় এটাকে বলা হয় টি (T) এবং ম্যান্ডারিন ভাষায় ওই টি-কে বলা হয় Ch-a । ম্যান্ডারিন ভাষা থেকে আমরা চা শব্দটি পেয়েছি। আর ইংরেজরা পেয়েছে চায়না থেকে। আমি কী স্যার বোঝাতে পেরেছি?
পেরেছ। এবার ক্লাসের বই নাও।
আজ পড়ব না। চা খান।
সেলিমার চা-বাণী শুনে চা খেতে ইচ্ছে করছিল না। বললাম, চা খাব না। আসলেই চা-টা আমার কেমন জানি ভালো লাগে না।
চা ব্রেইনের জন্য খুবই উপকারী। চায়ে লিথেনাইন আছে। এটি মগজের ধারণ শক্তি বৃদ্ধিতে খুব সহায়ক। নিউরেনগুলোকে সচল রাখে। যত চা খাবেন তত ব্রেইনি হবেন। লেখক-গবেষকগণ এজন্য সারাক্ষণ চায়ের ওপর থাকেন। গনি ভাই সারাদিন চা খায়। বুদ্ধি খুলে যায়। চায়ের বুদ্ধি দিয়ে হেভি ব্যাবসা করে। অন্য কেউ যেখান থেকে এক টাকা আয় করে, গনি ভাই সেখান থেকে একশ টাকা আয় করতে পারে। চায়ের কেরামতি।
“সেলি”, অক্টোপাস না কি পৃথিবীর সবচেয়ে বদমেজাজি প্রাণী?
নীল রক্তের প্রাণীরা বদমেজাজি হয়। এজন্য বলা হয় নীলনকশা, নীলছবি। এগুলো সব খারাপ।
কিন্তু ব্লু ব্লার্ড?
এরা তো স্যার সবচেয়ে বেশি বদমেজাজি।
অক্টোপাসের রক্ত কি নীল?
মানুষের জানামতে পৃথিবীর একমাত্র নীল রক্তের প্রাণী হচ্ছে অক্টোপস।
আজ তাহলে ক্লাসের কিছু পড়বে না?
না, স্যার।
কেন পড়বে না?
সত্য বললে কষ্ট পাবেন না তো?
কষ্ট পেলেও শুনব।
আমাকে পড়ার যোগ্যতা আছে কি না তা আগে জেনে নিই। তারপর অন্য কিছু।
সেলিমার কথায় যত না কষ্ট পেয়েছি তার চেয়ে বেশি পেয়েছি লজ্জা। আগের টিচারদের চলে যাওয়ার বা বিদায় করে দেওয়ার অন্তত একটা কারণ জানতে পারলাম। তার কথা শুনে আমার মনে দ্বিধা এসে ভিড় করল। আগামীকাল আমার তাকে পড়াতে আসা কি উচিত হবে? মনে পড়ে গেল ডিআইজি সাহেবের কথা। আমাকে অনেক আস্থায় এনে সেলিমাকে পড়ানোর জন্য দিয়েছেন। মনে পড়ে গেল গনি কোম্পানির উপহাস। ডিআইজি সাহেবের প্রশংসা এবং গনি কোম্পানির উপহাস আমাকে প্রত্যয়ী করে তুলল। সেলিমাকে পড়াব। শেষ পর্যন্ত দেখব।
কিছু ভাবছেন স্যার?
ভাবছি, তোমাকে পড়ানোর যোগ্যতা অর্জন করতে হবে।
যদি ফেল করেন?
তুমি তো বললে আজ আর পড়বে না। তাই এই প্রশ্নের উত্তর আজ দিতে পারছি না। পাশ করার পর দেব।
যদি ফেল করেন?
উত্তর পাবে না।
গলা শুকিয়ে কাঠ। আরেক গ্লাস পানি পান করে বললাম, আমি যাচ্ছি। গাড়ি কি আমাকে দিয়ে আসবে?
“দিয়ে আসবে”, সেলিমা বলল, “তবে গাড়ি কখন আসবে ঠিক নেই। এক্ষুনি চলে আসতে পারে। আবার রাত এগারোটাও হতে পারে। গাড়ি অফিসের কাজে চলে গেছে।”
থাক। আমি বাসে চলে যাব। তোমার বড়ো ভাই বলেছিল—আমাকে আনার জন্য গাড়ি পাঠাবে। গাড়ি গেলে আমি আসব। নইলে আসব না। মনে থাকে যেন।
থাকবে। তবে স্যার একটা কথা— নতুন বউ প্রথম প্রথম খুব আদর পায়। আমি কি বলেছি বুঝেছেন স্যার।
বুঝেছি। গনি কোম্পানির গাড়ির জন্য অপেক্ষ না করাই উত্তম।
মনে মনে বললাম— আগামীকাল গাড়ি না গেলে আসব না। এটি হবে এই মেয়েকে না-পড়ানোর একটি উত্তম অজুহাত।
আমি উঠতে যাব এসময় একজন যুবক ঘরে ঢুকল। সেলিমা তাকে দেখিয়ে বলল, আমার ইমেডিয়েট বড়ো ভাই তাহের। আপনার ছাত্র সাহাবুদ্দিনের বন্ধু।
তাহের আমাকে সালাম দিল। সেলিমার মতো চেহারা। রং শ্যামলা, কিন্তু মসৃণ। অবয়বটাও বেশ। হাসিমাখা শ্যামলা মুখটি সাদা দাঁতের আলো পড়ে অরোরার মতে চিকচিক করছে।
তাহের চলে যাবার পর সেলিমা বলল, তাহের ভাইয়া আমার বন্ধুর মতো।
কোন ক্লাসে পড়ে?
ব্যাবসা ক্লাসে।
মানে?
ব্যাবসা করে।
তাই বলো।
আগামী সপ্তাহে আমাদের জন্মদিন।  আপনি পাশ করুন বা না-করুন, দাওয়াত। আসবেন কিন্তু।
আমাদের জন্মদিন মানে? আমি  সেলিমাকে প্রশ্ন করলাম।
সাহেদ আর আমার আগস্ট মাসের ২৩ তারিখ জন্ম। একই মাসের একই তারিখ। তবে বছর আর বার ভিন্ন।
আশ্চর্য!
আশ্চর্যের কিছু নেই। গবেষণা বলে— প্রতি তেইশ জন মানুষের মধ্যে দুই জনের জন্ম তারিখ একই হওয়ার সম্ভাবনা মোর দ্যান ফিফটি পার্সেন্ট। আমাদের বাড়িতে সব মিলিয়ে চব্বিশ জন।
গবেষণা আর কী বলে?
পৃথিবীতে আগস্ট মাসে সবচেয়ে বেশি জন্মদিন উদ্‌যাপিত হয়। হারটি স্যার কত জানেন?
কত?
নাইন পার্সেন্ট।
নেক্সট?
জুলাই। অ্যান্ড দ্যান সেপ্টেম্বর।
 
হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ।
গানটির ইতিহাস জানেন স্যার?
না।
মিলডারড এবং প্যাটি নামের দুই বোন ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে Good Morning to All গানটি রচনা করেন। পরে গানের কথাগুলো  পরিবর্তন করে গাওয়া হয়  Happy Birthday to You. এটি পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বার গাওয়া গান।
আজ থাক।
 আশা করি আগামীকাল আবার দেখা হবে।
যদি গাড়ি যায়।
অবশ্যই যাবে। আপনাকে আপাতত না-বলার কোনো অজুহাত দিচ্ছি না। যদি পাশ করে যান তো আমার ভাগ্য খুলে যাবে। মনের মতো টিচার পাচ্ছি না। আপনি যদি মনের মতন হয়ে যান! দারুণ হবে।
দেখা যাক। আমি গেলাম।
গেলাম নয়, আসুন।
 
 
 
 

Language
error: Content is protected !!