নিউটনের ছাত্রী: এক মলাটে নিউটনের ছাত্রী: সমগ্র পর্ব: কিশোর উপন্যাস

গাড়ির ভোঁ শুনে উঁকি দিলাম জানালা দিয়ে, ভলভো। সেলিমার বড়ো ভাই গনি কোম্পানির গাড়ি। হয়তো আমাকে নেওয়ার জন্য পাঠিয়েছেন। লজিং বাড়ির ছাত্র শাহাবুদ্দিন এসে নিশ্চিত করল— গনি কোম্পানির গাড়ি এবং তা আমাকে নেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছে।
গাড়ি আসার আগেই আমি অর্ধেক রেডি হয়ে বসেছিলাম। জানি না গাড়ির অপেক্ষায় না কি সেলিমার উদ্দেশে রওয়ানা হওয়ার অপেক্ষায়। মেয়েটি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আমাকে তার ভক্ত বানিয়ে দিয়েছে। গাড়ি না-এলেও আমার মন আমাকে সেলিমার কাছে নিয়ে যেত।
শাহাবুদ্দিন বলল, আপনি কি স্যার সেলিমাকে পড়াবেন?
দেখি সুযোগ হয় কি না।
কোনো টিচার তাকে পড়াতে পারেন না।
তোমাকে কে বলেছে?
সবাই জানে।
শাহাবুদ্দিন আমার ছাত্র। তাদের বাড়িতে আমি লজিং থাকি। ছাত্রদের মধ্যে সে বড়ো। জ্যেষ্ঠ হচ্ছে রোকসানা। এবার সে এসএসসি দেবে।
তুমি সেলিমাকে কীভাবে চেন?
আমার বন্ধু তাহের সেলিমার ইমিডিয়েট বড়ো ভাই।
প্যান্ট আগেই পড়া ছিল। কথা বলতে বলতে পুরো রেডি হয়ে নিলাম। আমার রুমের দরজাটা বন্ধ করে গাড়িতে উঠে বসলাম। বিশাল ভলভো গাড়ি সিংহের মতো গর্জন করে হরিণের গতিতে আমাকে নিয়ে ছুটল সেলিমাদের বাড়ির দিকে।
গাড়িতে বসে নিজেকে খুব দামি ভাবতে ইচ্ছে করল। অনেকে আমার দিকে তাকিয়ে। গৃহশিক্ষকের জন্য সাধারণত কেউ গাড়ি পাঠায় না, তাও আবার এত বড়ো এবং দামি। গোপাল সকালে ছিল, এখন নেই। আমাকে এত বড়ো গাড়িতে দেখলে তার বুকটা খুশিতে গাড়ির চেয়ে বড়ো হয়ে যেত। হরিণের চেয়েও দ্রুত গতির দৌড় দিয়ে ধরার চেষ্টা করত ভলভোকে— পারুক বা না পারুক।
অল্প দূরে সেলিমাদের বাড়ি। বেশিক্ষণ লাগল না পৌঁছতে। গাড়ি থেকে নেমে সোজা দোতালায় গিয়ে আগের রুমটায় ঢুকে ঠিক আগের জায়গায় রাখা চেয়ারটায বসে পড়লাম। দরজা ভেজানোই ছিল।
আমি ঢুকতে না ঢুকতে সেলিমাও এসে পড়ল। হয়তো আমার অপেক্ষায় ছিল। আজ অন্য রকম সুগন্ধি মেখেছে সে। মাথার চুলগুলো ভিন্ন যত্নে সাজানো। বাম দিকের কিছু চুল আঁকাবাঁকা করে গিফটবক্সের মতো লাল ফিতার সজ্জায় নৃংশসভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। বয়স যেন আরো পাঁচ বছর কমে গেল একদিনে।
সেলিমা আসার কিছুক্ষণ পর সাহেদ এল। ঘড়ি দেখে বললাম, ফোর মিনিট লেট, হোয়াই?
“স্যার”, সেলিমা বলল, “ Four’ একটা মজার শব্দ।
কেমন?
শব্দটির অর্থ চার এবং বর্ণও চার। এমন শব্দ ইংরেজি ভাষায় আর নেই। Forty আরেকটি মজার শব্দ।
যেমন?
Forty শব্দের বর্ণগুলো অকারাদিক্রম অনুসারে সাজানো। One কিন্তু উলটোক্রমে সাজানো। মজার না স্যার?
খুব মজার।
এসব কোত্থেকে শিখেছ?
ম্যাজিক অব ম্যাথস নামের বই থেকে। আমার মামা ইউএসএ থেকে এনেছেন। দারুণ বই। আচ্ছা স্যার আমি যদি বলি C is equal to F; আপনি কি বিশ্বাস করবেন?
তোমার কথা কোনটা বিশ্বাস করব এবং কোনটা করব না কিছুই বুঝতে পারি না। প্রমাণ করে দেখাও।
মাইনাস চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াস সমান কত ডিগি ফারেনহাইট তা কি জানেন?
বললাম, -40 °C is equal to -40 °F.
তাহলে স্যার, -40 °C = -40 °F.
হ্যাঁ।
উভয় পাশ থেকে -40 ° চলে গেলে আর কী থাকে?
C=F
দারুণ।
“আর দেরি হবে না”, সাহেদ সালাম দিয়ে বলল, এখন আমি অঙ্ক করব।
সেলিমা বলল, করব নয়, বলো—কষব।
করা আর কষার মধ্যে তফাত কী? আমি প্রশ্ন করলাম সেলিমাকে।
“কষা হচ্ছে’, সেলিমা বলল, “বুঝে বুঝে নিজে নিজে সমাধান বের করা। আর করা হচ্ছে অন্যের কষা সমাধান দেখে মুখস্থ করা। সকল কষাই করা, কিন্তু সকল করা কষা নয়।”
“তুমি কী পড়বে?” সেলিমাকে বললাম।
আমাদের ফিজিক্সে আইনস্টাইন নামের এক ভদ্রলোকের কথা আছে। আপনি নিশ্চয় তার নাম শুনেছেন। ভদ্রলোক অনেক জ্ঞানী ছিলেন। মাস্টারি করতেন। উনি স্যার কয় তারিখ জন্মগ্রহণ করেছেন?
“জানি না”, আমি গলা কাঁপানোটা কোনোভাবে লুকিয়ে রেখে বললাম।
১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই মার্চ জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেছেন। আর একজন ভদ্রলোকের কথাও আছে। তার নাম নিউটন। ভলভো ভাই যাকে আমার শিক্ষক জানেন। স্যার, তিনি কখন জন্মগ্রহণ করেছেন জানেন?
জানি না।
গলাটা আরো জোরে কেঁপে উঠল। লজ্জা পেলে এমন হয় আমার। আমি লজ্জা পেতে অভ্যস্ত, কিন্তু কোনো ছাত্রীর কাছে নয়। এখন ছাত্রীর কাছেই লজ্জা পেতে হচ্ছে। মাথা গরম হয়ে উঠছে। গরম করা যাবে না। গরম মাথা কেবল নিজের মগজকে জ্বালিয়ে অঙ্গার করে দেয়।
সেলিমা বলল, নিউটন ১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেছেন। মারা গেছেন ১৭২৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে মার্চ। হায়াতটা ভালোই পেয়েছেন। তবে বর্তমান গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে তার মৃত্যু তারিখ ৩১ শে মার্চ। তাঁকে ওয়েস্ট মিনিস্টার অ্যাবে গোরস্থানে কবর দেওয়া হয়। তিনিই প্রথম বিজ্ঞানী যাকে এই সন্মানে ভূষিত করা হয়।
বেশ স্টাডি কর তুমি।
তিনি স্যার কখন মেট্রিক পাস করেছেন জানেন?
জানি না।
সেলিমার একের পর এক প্রশ্নে আমার অজ্ঞতা ক্রমশ বিকশিত হয়ে উঠছিল। এই বিকাশ মস্তককে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত করে তুলছিল। আমি রেগে যাচ্ছিলাম। বুকটাও কাঁপছে। লক্ষণ ভালো নয়। না জানলে রাগার কী কারণ বুঝতে পারলাাম না। তবে বুঝতে পারলাম— না জানলে মানুষ অযথা রেগে যায়। হতে পারে এটি অজ্ঞের অজ্ঞতা ঢাকার ব্যর্থ কৌশল। লজ্জারাশি জলের মতো জমে জমে এবং ঘষা খেয়ে আগুন হয়ে যায়, যা রাগ নামে পরিচিত। আমার মাথা রাগে টগবগ করছে। বুক থেকে জল দিয়ে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
তোমার ক্লাসের বই বের করো? সেলিমাকে প্রশ্ন করা হতে নিরস্ত করার অস্ত্র হিসেবে বললাম।
সেলিমা বলল, নিউটন ট্রিনিটি কলেজ থেকে ১৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে মেট্রিকুলেশন পাশ করেছেন। তাঁর বিখ্যাত বইটার নাম কী জানি স্যার?
ফিলসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা।
ঠিক বলেছেন, স্যার। এটি লাতিন নাম। আপনি অনেক কিছু জানেন।
আমি বললাম, তুমি নিউটনের মতো।
ঠিক বলেননি-নি স্যার। নিউটন তোতলা ছিলেন। কথা বলার সময় আটকে যেতেন। আমি তোতলা নই। আচ্ছা স্যার, বলুন তো বিশ্ববিখ্যাত মানুষদের মধ্যে আর কে কে তোতলা ছিলেন?
এ্যারিস্টোটল। এই মুহূর্তে আর কারো নাম মনে পড়ছে না। আমার এক ফুপাতো ভাই ছিল তোতলা। আহসানউল্লাহ নাম। এখন সৌদি আরব। সে বিখ্যাত কেউ না।
সেলিমা বলল, উইনস্টন চার্চিল এবং চার্লস ডারউইনও তোতলা ছিলেন।
সাহেদ বলল, বেশি জ্ঞানীরা তোতলা হয়। সব জ্ঞান মুখ দিয়ে একসঙ্গে বের হয়ে আসতে চায়। কিন্তু মুখ এত জ্ঞান একসঙ্গে ছাড়তে পারে না বলে আটকে যায়। এটাই তোতলামি।
সাহেদের অঙ্কের খাতাটি টেনে নিলাম। অসন্তোষজনক নয়। খাতাটি ফেরত দিয়ে বললাম, করতে থাক। কষতে পারবে।
সেলিমা সাহেদকে বলল, ২০ কে আধা দিয়ে ভাগ করে দশ যোগ করলে কত হবে?
২০। হয়েছে না?
“হয়নি” আমি বললাম, “ উত্তর হবে ৫০।”
সেলিমা বলল, আচ্ছ স্যার বলুন তো, Which room has no walls?
কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর বললাম, বলতে পারছি না।
সেলিমা বলল, mushroom।
অনেক কথা হয়েছে, এবার বই বের করো।
আজ পড়ব না স্যার।
কেন?
বিমানবন্দর যাব। বড়ো দুলাভাই আসছেন। যাব স্যার?
যাও।
স্যার, দুলাভাই মানে কী?
দুলা হওয়ার পর যকে ভাই ডাকতে হয় সে দুলাভাই। তার মানে আইনগত ভাই। ব্রাদার-ইন-ল।
একটা জিনিস, ওপরেও যায় নিচেও নামে, কিন্তু নড়ে না। সেটি কী?
আমাকে অজ্ঞতার লজ্জা হতে মুক্তি দিয়ে সাহেদ বলল, সিঁড়ি।
স্যার, একটি গাছে পঞ্চাশটি পাখি বসেছিল। এক শিকারি এয়ারগান দিয়ে গুলি করল। একটা পাখি মারা গেল। গাছে আর কয়টি পাখি থাকবে?
আমি বললাম, একটাও থাকবে না।
হলো না, সেলিম হেসে বলল।
কেন?
গাছটি যদি ছোটো হয় তাহলে একটা পাখিও থাকবে না। সবগুলো পাখি এয়ারগানের গুলির শব্দে ভয় পেয়ে উড়ে যেতে পারে। গাছটি যদি অনেক বড়ো হয় কিংবা বাতাসের বিপরীত গুলি ছোড়া হয় তাহলে এয়ারগানের শব্দ সবখানে যাবে না। সেক্ষেত্রে সব পাখি উড়ে নাও যেতে পারে। অতএব, কয়টি থাকবে তা বলা যাবে না। এটি ঘটনাস্থলে গিয়ে গুনে বলতে হবে।
কিন্তু সবাই যে বলে, একটা পাখিও থাকবে না?
আন্দাজে বলে। জাস্ট, আন্দাজে অজানা এমসিকিউ প্রশ্নের বৃত্ত ভরাট করার মতো। যদি লেগে যায়।
 
 

Language
error: Content is protected !!