নিকারি ও নিকারি নৌকা

ড. মোহাম্মদ আমীন

নিকারি ও নিকারি নৌকা
 
নিকারি: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, নিকারি দেশি শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষ্যে) মৎসজীবী জাতিবিশেষ; মুসলিম মৎস্যজীবী। নিকারি সম্প্রদায়ের লোকজন সাধারণত মাছের পাইকারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তবে অনেকে মৎস্য আহরণও করে। সাধারণভাবে, নিকারিদের পেশা জেলেদের কাছ থেকে স্বল্প মূল্যে মাছ কিনে তুলনামূলকভাবে উচ্চদামে পাইকারি বিক্রি করা। একাজে নিকারিরা লাভবান হতো, কিন্তু জেলেরা ঠকে যেত। এজন্য বাংলায় সৃষ্টি হয় একটি প্রবচন: নিকারির কানে সোনা, জেলের পরনে ত্যানা। নিকারির বউয়ের লাল শাড়ি, জাইল্যার নাই ঘরবাড়ি। নিকারি-বেটির কী বাহার, জাইল্যা-বেটির হাহাকার।
 
নিকারি নৌকা: নিকারি নামে পরিচিত জাতি বা মুসলিম সম্প্রদায়ের নিকারি নামে পরিচিত মৎস্যজীবীরা যে নৌকায় করে মৎস্য আহরণ, সরবরাহ বা বিক্রি করত সেসব নৌকাকে বলা হতো নিকারি নৌকা।
 
গবেষক কিরণচন্দ্র দে পূর্ববাংলা এবং আসামে হিন্দু মৎস্যজীবীর মধ্যে ২৩টি ভিন্ন জাতিবর্ণের কথা উল্লেখ করেছেন। যথা: কৈবর্ত, কিওয়াট, কারিতা, তিওয়ার বা রাজবংশী, দাস, শিকারি, মালো বা ঝালো, নমশূদ্র বা চন্ডাল, বেরুয়া, জিয়ানি, কারাল, পোদ, বিন্দ বা বিন্দু, বাগদি, পাটনি, নদিয়াল, মালি, হারি, গনরি, বনপার, গংগটা, মুরারী, সুরাহিয়া এবং লোহাইত।
 
মৎস্য আহরণ বা তৎসম্পর্কিত পেশায় নিয়োজিত মুসলমানদের ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে ভিন্ন সামাজিক পরিচিতি ছিল। এগুলো হচ্ছে:  মহিফারোশ বা মহিমল, দালাইট্যা,  গুটিয়া, জেলে, জিয়ানি, ধাওয়া, আবদাল, নিকারি এবং বেবাজিয়া। প্রসঙ্গত, ফারমি মহি ও ফারোশ মিলে মহিফারোশ। ফারসি  মহি অর্থ মাছ এবং ফারোশ অর্থ বিক্রেতা। সুতরাং, মহিফারোশ অর্থ মাছবিক্রেতা।
 
সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জেলেদের প্রাচীনকাল থেকে নিচু জাতের গণ্য করা হতো। কবি মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল কাব্যের সূত্রে জে.এন দাশগুপ্ত ষোড়শ শতকের গ্রামবাংলার বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর উঁচু-নিচু অবস্থান নির্ণয় করতে গিয়ে জেলেদের অন্ত্যজ জনগোষ্ঠী হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। এ.কে.এন করিম বলেছেন, “যেহেতু বাংলায় শিকার এবং মাছ ধরা অত্যন্ত প্রাচীন পেশা সেহেতু এদেশে আগমন করে দখলদারিত্ব কায়েমকারী বহিরাগতরা এ সকল পেশাকে অত্যন্ত নীচু জ্ঞান করত। আসলে পুরাকাল থেকেই হিন্দু জাতিভেদ প্রথানুসারে মৎস্যজীবীগণ অন্ত্যজ শ্রেণিভুক্ত।
 
হান্টার এবং রিজলে তাঁদের গবেষণায় বাংলার হিন্দু জেলে সম্প্রদায়কে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে অত্যন্ত নীচু স্তরের উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে, মুসলমানদের ক্ষেত্রে উঁচু-নীচু ভেদাভেদের বিষয়টি হিন্দুদের মতো প্রকট না হলেও মৎস্যজীবী মুসলমানগণ অন্যান্য পেশাজীবী মুসলমানদের দৃষ্টিতে নীচু। নিকারি ইত্যাকার মুসলমান মৎস্যজীবীদের এতই নীচ অবস্থানে দেখানো হয়েছে যে, কোনো উচ্চ শ্রেণির মুসলমান নিঃসংকোচে তাদের সঙ্গে মেলামেশা করা থেকেও বিরত থাকত। অবশ্য ইদানীং দেশে রপ্তানিমুখী মৎস্য অর্থনীতি প্রবর্তনের ফলে মুসলমান মৎস্যজীবীদের প্রতি প্রচলিত হেয় দৃষ্টি আর নেই।
 
মহিফারোশ ফারসি শব্দ। ফারসি ماهی মহি বা মাহি অর্থ মাছ। ফারসি فروش ফরোশ  উদ্ভূত ফরুখতান فروختن ক্রিয়া থেকে। এর অর্থ বিক্রি করা। আর ফারোশ অর্থ বিক্রেতা। এভাবে মহিফারোশ ماہی فروش অর্থ মাছ বিক্রেতা বা জেলে। ফারোস দিয়ে গঠিত অন্যান্য কয়েকটি শব্দ :
গুলফারোশ – ফুল বিক্রেতা
ওয়াতানফারোশ – দেশ বিক্রেতা বা দেশদ্রোহী
দাওয়াফারোশ – ঔষধ বিক্রেতা
সারফারোশ – বাহাদুর
সবযিফারোশ – সবজি বিক্রেতা
তাবাস্সুমফারোশ – খুশি
মাযহাব ফারোশ – ধর্মব্যবসায়ী
হক়ফারোশ – সত্য বিক্রেতা বা বেইমান
নানফারোশ – রুটি বিক্রেতা
শরাবফারোশ – মদ বিক্রেতা
দিলফারোশ – প্রেমিক
 
ফররুখ
ফর অর্থ যশ, খ্যাতি, দীপ্তি। রুখ অর্থ মুখ। চোখে-মুখে যার দীপ্তি, সেই ফররুখ। ফর আর রুখ দুটোই ফারসি শব্দ। তবে ফররুখ শব্দের অর্থ হিসেবে সৌভাগ্যশালী ব্যবহৃত হয়।
 
পানীয় জল পিনেকা পানি
সংস্কৃত পানি থেকে পানীয়। পানি বিশেষ্য  এবং পানীয় বিশেষণ। পানীয় মানে পানের যোগ্য।  পশ্চিম বাংলার পশ্চিমে হিন্দিতেও পানি।  বাংলায়  স্টেশনে লেখা থাকে “পানীয় জল” হিন্দিতে লেখা থাকে “পিনেকা পানি।”
 
 
 
লিংক: https://draminbd.com/নিকারি-ও-নিকারি-নৌকা/
error: Content is protected !!