নিধিরাম সর্দার: সম্রাট বাহাদুর শাহ, রাষ্ট্রপতি, সম্রাট, রাজা রানি নিধিরাম সর্দার

ড. মোহাম্মদ আমীন

নিধিরাম সর্দার: সম্রাট বাহাদুর শাহ, রাষ্ট্রপতি, সম্রাট, রাজা রানি নিধিরাম সর্দার

নিধিরাম সর্দার কী? নিধিরাম সর্দার বাংলায় বহুল প্রচলিত একটি বাগ্‌ধারা। নিধি ও রাম তৎসম এবং সর্দার ফারসি শব্দ।  নিধি ও রাম মিলে নিধিরাম। যার নিধি রামের কাছে বা রামই যার নিধি  নিধি নিয়ন্ত্রণ করেন তিনিই নিধিরাম। অর্থাৎ যার ভাগ্য বা সম্পদ কিংবা ক্ষমতা নিজের কাছে নেই, অন্যের কাছে থাকে, অন্যকোনো প্রভাবশালী পক্ষ নিয়ন্ত্রণ করে যার পদ-পদবি আছে, বাহ্যিক জৌলুশ আছে এবং যাকে সাধারণভাবে নেতা বা ক্ষমতার অধিকারী গণ্য করা হয়, মান্য করা হয় এবং যে নিজেও ক্ষমতা নিয়ে বড়াই করে, আত্মতৃপ্তি লাভ করে; কিন্তু কার্যকরণ ক্ষমতা বা নিধি নিজের কাছে থাকে না; থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না, ভোগ করতে পারে না; তার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রামের বা অন্যের কাছে থাকে তাকে নিধিরাম সর্দার বলা হয়। প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার ব্যবস্থায় প্রেসিডেন্ট নিধিরাম সর্দার। গণতান্ত্রিক দেশসমূহের রাজা-রানি বা সম্রাটগণ নিধিরাম সর্দার। ইংরেজ আমলে সম্রাট থেকে শুরু করে রাজা-মহারাজা, নবাব-জমিদার প্রমুখ ছিলেন নিধিরাম সর্দার।

কথিত হয়, অষ্টাদশ শতকের শেষদিকে মোগল সম্রাটগণের ক্ষমতাকে উপলক্ষ্য করে নিধিরাম সর্দার কথাটির উদ্ভব এবং বিস্তার। সে সময় কেউ ভারতের সম্রাট পদে অধিষ্ঠিত হলে আগের মতো রাজন্যবর্গ, জমিদার, পরিষদবর্গ ও প্রজাসাধারণ সম্রাটের কাছে বিভিন্ন আরজি নিয়ে আসতেন। মোগল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীগণ বিধি অনুযায়ী সম্রাট হতেন। কিন্তু সম্রাট কোনো কাজে কাউকে ন্যূনতম সহায়তাও করতে পারতেন না। কারণ সে সময় সম্রাটের সব কার্যকরণ ক্ষমতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ইংরেজের হাতে এবং ক্ষেত্র বিশেষ্যে অন্য কোনো প্রভাবশালী বা দেশীয় রাজন্যবর্গের কাছেও থাকত।  সম্রাটগণ ছিলেন ওই প্রভাবশালীগণের পুতুল। তাঁরা ছিল কেবল নামমাত্র সম্রাট পদের অধিকারী। পুরো পদটাই ছিল আলংকারিক। অঙ্গ হতে খুলে নিলেও কোনো কার্যকর পরিবর্তন হতো না। সম্রাট হিসেবে তাঁদের সব ছিল, কিন্তু সম্রাটের ক্ষমতা প্রয়োগ করার কোনো রসদ বা অধিকার ছিল না। তখন লোকজন বলতে শুরু করেন, মোগল সম্রাটগণ নামমাত্র সম্রাট। তাঁদের কোনো ধন, ঐশ্বর্য বা ক্ষমতা নেই। সব ইংরেজদের হাতে। সম্রাটের সব ক্ষমতা রাম বা শ্রেষ্ঠ হিসেবে পরিগণিত ইংরজদের হাতে। তাঁরা নিধিরাম সর্দার।

আওরঙ্গজেব-এর আমল থেকে মোগলদের ক্ষমতাক্ষরণ এবং উপমহাদেশে ইংরেজদের ক্ষমতা দখল আর প্রভাব বিস্তারের সূচনা। আওরঙ্গজেব অনেকের হাতের পুতুল হয়ে রাজ্য শাসন করেছেন। শাসনকালের শেষ দিকে তিনি বহুলাংশে ইংরেজ; নিজের আত্মীয়স্বজন, নিয়োজিত  নবাব, আর্মেনীয়, ফ্রেঞ্চ, ডাচ, মারাঠা এমনকি দেশীয় রাজন্যবর্গেরও ক্রীড়নকে পরিণত হয়েছিলেন।  তাঁর মৃত্যুর পর যারা মোগল সম্রাট হয়েছিলেন তাঁদের সবাই ছিলেন পুরোই  নিধিরাম সর্দার; হোক ইংরেজের বা অন্য কারো। অনেক সম্রাট তাঁদের অধস্তন কর্মচারীর নির্দেশে রাজ্য পরিচালনা করতেন। এদের বলা হতো নিধিরাম সর্দার। এককথায়, তখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত প্রায় সবাই ছিলেন প্রধানত ইংরেজদের নিধিরাম সর্দার।

নিধিরাম শব্দের অন্তর্ভুক্ত  নিধি (নি+√ধা+ই)  অর্থ গচ্ছিত ধন, রত্ন, বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়োজিত তহবিল, ভাগ্য, প্রায়োগিক ক্ষমতা  প্রভৃতি। অন্যদিকে, নিধিরাম শব্দের অন্তর্ভুক্ত রাম অর্থ  নেতা, শ্রেষ্ঠ, ক্ষমতার প্রয়োগকারী, বড়ো প্রভৃতি।  সুতরাং, নিধিরাম অর্থ যার ভাগ্য, ধন, রত্ন, সম্পদ, কার্যকরণ ক্ষমতা বা প্রভাব  রাম বা অন্যের কাছে, কিন্তু নিজের কিছু করার ক্ষমতা নেই তাকে বলা হয় হয় নিধিরাম। সুতরাং, নিধিরাম সর্দার হচ্ছে এমন নেতা বা ব্যক্তি যার প্রকৃতপক্ষে কোনো ক্ষমতা নেই এবং যে অন্যের ক্ষমতা ধারণ করে অন্যের ওপর নির্ভরশীল থেকে অন্যের ইচ্ছাতে কেবল ক্ষমতা বা কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। সোজা কথায় যার পদ আছে কিন্তু কার্যকরণ ক্ষমতা নেই তিনিই নিধিরাম। সুতরাং, নিধিরাম সর্দার অর্থ: এমন ভাগ্যনির্ভর কেউ যার নিজের কোনো ক্ষমতা, সম্পদ কিংবা ঐশ্বর্য নেই; অন্যের বা ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে নিজেকে সম্পদ, প্রভাব, রত্ন, কার্যক্ষমতা প্রভৃতির পরিচালক বা নেতা মনে করে কেবল আলংকারিক পদ ধারণ করে থাকে।

 

শুবাচ গ্রুপ এর লিংক: www.draminbd.com

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ) প্রমিত বানানবিধি

শুবাচ আধুনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান

error: Content is protected !!