নেদারল্যান্ডস (Netherlands) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

নেদারল্যান্ডস (Netherlands)

নেদারল্যান্ড্স এর সরকারি নাম নেদারল্যান্ড্স রাজ্য। এটি পশ্চিম ইউরোপের ক্যারিবিয়ান ৩টি দ্বীপ অঞ্চল নিয়ে গঠিত। নেদারল্যান্ডস এর ইউরোপীয়ান অংশের পূর্বে জার্মানি, দক্ষিণে বেলজিয়াম এবং দক্ষিণ-পশ্চিমে দক্ষিণ-সাগরের সঙ্গে বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য ও জার্মানির সঙ্গে জলীয় সীমানা রয়েছে।

জার্মানি ভাষায় নেদারল্যান্ডস শব্দের অর্থ নিচু ভূমি  বা নিচু দেশ। এর প্রাচীন নাম হল্যান্ড (Holland)। বর্তমানে হল্যান্ড নেদারল্যান্ডস এর একটি অঙ্গরাজ্যের নাম। তবে এখনও অনেকে নেদারল্যান্ডস নির্দেশ করতে হল্যান্ড বলে থাকেন। জার্মানিক হল্যান্ড শব্দের অর্থ  হল্ট-ল্যান্ড (holt-land)। যার আভিধানিক অর্থ বৃক্ষাচ্ছাদিত জমি (wooded land)। আবার অনেকে মনে করেন, এর অর্থ ফাঁপা জমি বা মার্স ল্যান্ড hollow” or “marsh land । অনেকের মতে, স্থানীয় ডাচ ভাষায় নেডার শব্দের অর্থ নিচু এবং ল্যান্ড শব্দের অর্থ ভূমি। সুতরাং নেডারল্যান্ড (Nederland)শব্দের অর্থ লোল্যান্ড নিচুভূমি।

নেদারল্যান্ডস এর মোট আয়তন ৪১,৫৪৩ বর্গকিলোমিটার বা ১৬,০৩৩ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশের পরিমাণ ১৮.৪১%। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, নেদারল্যান্ডস এর আয়তন ১,৬৯,৭১,৫৪২ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ৪০৭.৭। আয়তন বিবেচনায় নেদারল্যান্ডস পৃথিবীর ১৩৪-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ৬৫-তম। অন্যদিকে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ৩০-তম জনবহুল দেশ। আম্স্টারডম নেদারল্যান্ডস এর রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। জাতীয়ভাবে দাপ্তরিক ভাষা ডাচ এবং আঞ্চলিকভাবে দাপ্তরিক ভাষা পশ্চিম ফ্রিসিয়ান, ইংরেজি ও পাপিয়ামেন্টো। লিম্বারগিস, ডচ লো স্যাক্সন আঞ্চলিক স্বীকৃত ভাষা। সরকারিভাবে নেদারল্যান্ডস এর নাগরিকগণ ডাচ নামে পরিচিত।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে জিডিপি (পিপিপি) ৮৩১.৪১১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৪৯,০৯৪ ইউএস ডলার। আবার জিডিপি (নমিনাল) ৭৫০.৭৮২ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪৪,৩৩৩ ইউএস ডলার। মাথাপিছু আয় বিবেচনায় নেদারল্যান্ডস পৃথিবীর ১৫-তম ধনী দেশ। ইউরো, ইউএস ডলার  নেদারল্যান্ডসের মুদ্রা।

আমস্টারডাম, হেগ ও রটরডাম নেদারল্যান্ডস এর প্রধান শহর। আমস্টারডাম  দেশের রাজধানী হলেও হেগ শহরে সংসদ ও সরকারের ডাচ আসন অবস্থিত। রটারডাম বন্দর ((port of Rotterdam) ইউরোপের বৃহত্তম সামুদ্রিক বন্দর। এটি এত বড় যে, ইউরোপের পরবর্তী বৃহত্তম তিনটি বন্দরের সম্মিলিত অবয়বের চেয়েও বড়। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দ হতে ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত এটি পৃথিবীর বৃহত্তম বন্দর ছিল। ১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই স্পেন হতে স্বাধীনতা ঘোষণা কওে এবং ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মার্চ রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর বর্তমান সংবিধান গৃহীত হয়।

নেদারল্যান্ডস বারটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। এদের প্রেিভয়েন্স বলা হয়। প্রত্যেকটি প্রভিয়েন্স একজন গর্ভনর দ্বারা শাসিত, যাকে কমিশনার অব দ্য কুইন বা কমিস্যারিস ভ্যান দ্য কোনিগিন বলা হয়। শুধু লিমবার্গ প্রভিয়েন্সের প্রধানকে গর্ভনর বলা হয়। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, নেদারল্যান্ডসে প্রভিয়েন্সের সংখ্যা ৪৩০টি। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডস বর্তমান জাতীয় পতাকা গ্রহণ করা হয়।

নেদারল্যান্ডসের প্রধান খ্রিস্টধর্ম এবং দ্বিতীয় ইসলাম। খ্রিস্টানদের বেশির ভাগই  প্রোটেস্ট্যান্ট। মুসলমানদের বেশির ভাগ তুর্কী, বসনীয়, মরক্কোন,  সোমালি ও ইরাকি বংশোদ্ভূত।

পৃথিবীতে নেদারল্যান্ডস সরকার  ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে  প্রথম সমলিঙ্গের বিয়ে বৈধ ঘোষণা করে নতুন যুগের সূচনা ঘটায়। পুরুষের গড় দৈর্ঘ্য ১৮৪ সেন্টিমিটর এবং মেয়েদের ১৭০ সেন্টিমিটার। নদী এবং হ্রদে মিলে এ দেশে ৪,০০০ কিলোমিটার নৌপথ রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে মাত্র ৩২৩ মিটর উঁচু ভালসারবার্গ (Vaalserberg) নেদারল্যান্ডসের সর্বোচ্চ বিন্দু। বাকি পুরো দেশ প্যানকেকের মতো সমতল। গড়ে প্রতি ডাচ বছরে ৭৪ লিটার বিয়ার পান করে।

কীভাবে সমূদ্রের পানিকে দূরে রাখতে হয় এবং নদীর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে জলপ্রবাহকে আটলান্টিসের দিকে প্রবাহিত করতে হয় সে বিষয়ে তারা বিশ্বের সেরা বিশেষজ্ঞ। এজন্য হ্যারিকেন ক্যাথরিনা দুর্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ডাচদের সাহায্য চেয়েছিল। এখানে অধিকাংশ কবর ১০,১৫ বা ২০ বছরের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। কবরস্থানের জমির অভাবে স্থায়ীভাবে কোনো কবর ক্রয় করা যায় না।নেদারল্যান্ডস এর স্কিপল (Schiphol) বিমানবন্দর প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৪.৫ মিটার নিচে।

পৃথিবীর ৭০% বেকন আসে নেদারল্যন্ডস হতে। ডাচরা পৃথিবীর দীর্ঘতম। পৃথিবীর ৭৫% পুষ্পকন্দ (flower bulb) উৎপাদন করে নেদারল্যান্ডস। নেদারল্যান্ডসের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যাপ্রবণ, তন্মধ্যে ২৫% ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে এবং মাত্র ৫০% সমুদ্রপৃষ্ঠের ১ মিটার ওপরে। শত বছর ধরে ডাচরা তাদের বিখ্যাত ডাচ উইন্ডমিল দ্বারা পানি সেচ করে আসছে। ৮৬% ডাচ দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে ইংরেজি ব্যবহার করে।

সর্বক্ষণ কাজে নিয়োজিত পিতা-মাতার পিতৃত্বকালীন ছুটি বছরে ৫৭ দিন। ছেরের ৮ বছর বয়স হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময় এ ছুটি নেওয়া যায়। স্কান্ডিনেভিয়ানদের পর কপি পানে ডাচদের স্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রতিজন ডাচ প্রতিবছর গড়ে ১৪০ লিটার কপি পান করে। ১৬০০-১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে ডাচরাই প্রথম ইউরোপে বিপুল পরিমাণ কপি আমদানি করে। নেদারল্যান্ডস এর রোটারডাম (Rotterdam) বন্দর পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্দর। ডাচি শহর আইন্ডহোভেন (Eindhoven হ) আলোর শহর নামেও পরিচিত। কারণ বিখ্যাত ও মহাকায় বৈদ্যুতিক বাল্ব প্রস্তুত কোম্পানি ফিলিপস এখানেই প্রথম ব্যবসা শুরু করেছিল।

হ্যানিকেন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বিয়ার প্রস্তুতকারী দেশ। সারা বিশ্বের ৭০টি দেশে হ্যানিকেনের ১৪০টি ভাঁটিখানা রয়েছে। নেদারল্যান্ডস এর বিয়ারের চাহিদার ৫০% এর যোগান দেয় হ্যানিকেন। ইউরোপের দেশসমূহের মধ্যে নেদারল্যান্ডস সবচেয়ে বেশি বিয়ার রপ্তানি করে। ইউরোপের বিয়ার রপ্তানির ৫০% নেদারল্যান্ডস করে থাকে। সারা দেশে সাইকেল চালানোর জন্য নির্দিষ্ট পথ রয়েছে। এ পথ দিয়ে কোনো পথচারী হাঁটতে পারে না। ইউরোপের দেশসমূহের মধ্যে জনঘণত্ব বিবেচনায় এটি সবচেয়ে জনবহুল দেশ।

নেদারল্যান্ডসে এখনও শতাধিক বছর হতে ব্যবহৃত হয়ে আসা এক হাজারের অধিক উইন্ডমিল কর্মক্ষম অবস্থায় আছে। একসময় এখানে ১০ হাজার উইন্ডমিল ছিল। কাইন্ডারডাইকে (Kinderdijk) অবস্থিত ১৯ পোল্ডার জলনিষ্কশন উইন্ডমিলকে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য সাইট ঘোষণা করে। খন্ডকালীন চাকুরির হার বিবেচনায় ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের  দেশসমূহে নেদারল্যান্ডস সর্বোচ্চ। এখানে প্রতি দশজন লোকের ৪ জন খণ্ডকালীন চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করে। মিউজিয়ামের জন্যও নেদারল্যান্ডস বিখ্যাত। পুরো দেশের ১০০০ এর অদিক জাদুঘর রয়েছে।

ডাচদের তৈরি পনীর পৃথিবীর সেরা হিসাবে খ্যাত। হাউস অব অরেঞ্জ থেকে ডাচরা স্পেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে ডাচ রাজকীয় পরিবারের সূচনা ঘটায়। এ জন্য নেদারল্যান্ডস এর জাতীয় রং অরেঞ্জ। প্রতিডাচ দিনে গড়ে ২.৫ কিলোমিটার এবং বছরে ৯০০ কিলোমিটার সাইকেল চালায়। হেনিক্যান, গ্রোরালস ও আমস্টেল প্রভৃতি বিশ্ববিখ্যাত ডাচ বিয়ার ব্রান্ড। বৃষ্টিময় আবহাওয়া সত্ত্বেও ডাচরা ছাতার পরিবতেৃ রেইন কোট পরিধান করে। কারণ বৃষ্টির সঙ্গে বাতাসের এত বেগ থাকে যে, ছাতা ব্যবহার করা এবং ছাতা পরিধান করে সাইকেল ইত্যাদি চালানো কঠিন।


মাল্টা (Malta) : ইতিহাস ও নামকরণ

মোনাকো (Monaco) : ইতিহাস ও নামকরণ

মন্টিনেগ্রো (Montenegro) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

Language
error: Content is protected !!