নেপাল (Nepal) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

নপাল (Nepal)

নেপাল হিমালয় অধ্যুষিত একটি দক্ষিণ এশীয়ার একটি স্থলবেষ্ঠিত রাষ্ট্র, যার উত্তরে চীন এবং দক্ষিণ, পূর্ব ও পশ্চিমে ভারতের সীমান্ত রয়েছে। নেপালের ৮১% অধিবাসী হিন্দু ধর্মের অনুসারী। আয়তনে ছোট হওয়া সত্ত্বেও নেপালের ভূমিরূপ অত্যন্ত বিচিত্র। আর্দ্র আবহাওয়া বিশিষ্ট অঞ্চল তরাই থেকে শুরু করে সুবিশাল হিমালয়; সর্বত্রই এ বৈচিত্র্যের পরিচয় পাওয়া যায়। নেপাল এবং চীনের সীমান্ত জুড়ে যে অঞ্চল, সেখানে পৃথিবীর সর্বোচ্চ ১০টি পর্বতের ৮টিই অবস্থিত। এখানেই পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট অবস্থিত। নেপালের আকৃতি অনেকটা চতুর্ভুজের মত। এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৮০০ কিমি এবং প্রস্থে ২০০ কিমি।

কথিত হয়, দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহাসিক প্রাচীন মানচিত্রে বর্ণিত নেপা (Nepa) শব্দ হতে নেপাল নামের উদ্ভব। তিব্বতি-বার্মান ভাষায় নেপা (Nepa) শব্দের অর্থ ‘এমন একদল লোক যারা গবাদিপশু বা গরুকে পোষ মানায়’ বা ‘এমন জনগোষ্ঠী যারা গবাদিপশু বা গরু পালন’ করে। অঞ্চলটি সেখানকার নেপা বা নেপার, নেওয়ার, নেউয়া, নেওয়াল প্রভৃতি নামে আখ্যায়িত লোকের বসবাসস্থল হিসাবে পরিচিত ছিল। আধুনিক নেপালের কাঠমুণ্ড এবং আশেপাশের এলাকায় এখনও এ নামের এবং ও পেশার বহু লোক বসবাস করে। অনেকে মনে করেন, সংস্কৃত নিপালায়া (nipalaya) হতে নেপাল নামের উদ্ভব। উল্লেখ্য, নিপালায় অর্থ পর্বতের পাদদেশ বা পাদদেশের আবাস। যা হিমালয়কে নির্দেশ করে। আবার অনেকে মনে করেন, তিব্বতি ভাষার শব্দ নায়ামপাল(niyampal) হতে নেপাল নামের উদ্ভব। যার অর্থ পূত ভূমি, পবিত্র ভূমি (holy land)।

আসলে নেপাল নামের যথার্থ ব্যুৎপত্তি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। অনেকে বলে থাকেন, নেপাল নামটি ‘নে’ও ‘পাল’ শব্দ যুক্ত হয়ে সৃষ্টি হয়েছে। ‘নে’ শব্দের অর্থ পবিত্র এবং ‘পাল’ শব্দের অর্থ গুহা। এ মতানুসারে নেপাল শব্দের অর্থ পবিত্র গুহা।

নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুর উপত্যকায় প্রাপ্ত নিওলিথিক যুগের বেশকিছু উপাদান এটিই নির্দেশ করে যে, হিমালয়ান অঞ্চলে প্রায় ৯০০০ বছর থেকে মানুষ বসবাস করে আসছে। প্রায় ২৫০০ বছর পূর্বে নেপালে তিব্বতী-বার্মীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ইন্দো ইরানীয় বা আর্য জাতিগোষ্ঠী এ হিমালয়ান উপত্যকায় প্রবেশ করে। ১০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে অঞ্চলটিতে বিভিন্ন গোষ্ঠী স্বতন্ত্র রাজ্য ও কনফেডারেশন গড়ে তুলে। এ রকমই একটি কনফেডারেশন ছিল সাকিয়া। একসময় এ অঞ্চলের রাজা ছিলেন সিদ্ধার্থ গৌতম (৫৬৩-৪৮৩ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ), যিনি গৌতমবুদ্ধ বা শুধু বুদ্ধ নামে পরিচিত। তিনি পবিত্র ও সাধনাময় জীবনযাপনের জন্য রাজত্ব ত্যাগ করেছিলেন।

২৫০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দে এই অঞ্চলটি উত্তর ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্যের (Mauryan) অধীনে আসে। ৪র্থ শতকে এটি গুপ্ত স¤্রাজ্যের অধীনে একটি পুতুল রাষ্ট্রে পরিণত হয়। পঞ্চম শতকের শেষে বেশ কিছকাল দেশটি একদল শাসকের অধীনে ন্যস্ত হয়। যারা সাধারণভাবে লিচ্ছবি (Licchavis) নামে পরিচিত। অষ্টম শতকে লিচ্ছভিদের পতন ঘটে এবং শুরু হয় নেওয়ারি (Newari) যুগের। একাদশ শতকের শেষ ভাগে নেপালের দক্ষিণাংশ, দক্ষিণ ভারতের চালুক্য সাম্রাজ্যের (Chalukaya) অধীনে চলে আসে। চালুক্য রাজাদের সবাই হিন্দু ধর্মের প্ষ্ঠৃপোষকতা করতেন। তাই তাদের রাজত্বকালে নেপালের ধর্মে পরিবর্তন আসে। দ্বাদশ শতকে যেসব রাজা নেপাল শাসন করেন, তাদের নামের শেষে মল্ল শব্দ যুক্ত ছিল। যার অর্থ কুস্তিগীর।

২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের মে মাস পর্যন্ত নেপাল সাংবিধানিক রাজতন্ত্র কার্যকর ছিল। ওই মাসের ২৮ তারিখ নেপালের আইনসভা সংবিধানে সংশোধন আনে এবং নেপালকে একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত করে। বর্তমানে নেপালে বহুদলীয় প্রজাতন্ত্র কার্যকর আছে। নেপাল ১৪টি প্রাশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত। এগুলো আবার ৭৫টি জেলায় বিভক্ত।

নেপালের মোট আয়তন ১,৪৭,১৮১ বর্গ কিলোমিটার বা ৫৬,৮২৭ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ২.৮%। ২০১১ খ্রিষ্টাব্দের আদম শুমারি অনুযায়ী নেপালের মোট জনসংখ্যা ২,৬৪,৯৪,৫০০। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যা ১৮০। আয়তন বিবেচনায় নেপাল পৃথিবীর ৯৫-তম বৃহত্তম রাষ্ট্র কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় ৬২-তম জনবহুল দেশ। নেপালের অধিবাসীর সরকারিভাবে নেপালিজ নামে পরিচিত।

২০১৩ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, নেপালের জিডিপি (পিপিপি) ৬২.৩৮৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২.৩১০ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি নমিনাল ১৯.৯২১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৭৪৩ ইউএস ডলার। নেপালের মুদ্রার নাম নেপালিজ রুপি। তবে ভারতীয় রুপিও এখানে প্রচলিত। নেপালের জনসংখ্যার ৮১% হিন্দু, ৯% বুড্ডিস্ট, ৫% মুসলিম এবং ৫% খ্রিষ্টান ও অন্যান্য ধর্ম অনুসরণ করে থাকে। ১৭৬৮ খ্রিষ্টাব্দে নেপালকে কিংডম, ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ জানুয়ারি স্টেট এবং ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মে প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করা হয়। নেপালি জনগণের অর্ধেক দৈনিক ১ ডলারের কম আয় দিয়ে জীবনযাত্রা নির্বাহ করে থাকে।

পৃথিবীর ৫টি দেশ, যথাক্রমে নেপাল, ভুটান, ভারত, চায়না ও পাকিস্তানে হিমালয় পর্বতমালা বিস্তৃত। তবে এভারেস্ট পর্বতমালার অধিকাংশ নেপালে। ৮,৮৪৮ মিটার উঁচু, পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টসহ প্রথম সর্বোচ্চ দশটি পর্বতশৃঙ্গের ৮টিই নেপালের উত্তরাংশে অবিস্থত। অল্প এলাকায় বিশ্ব ঐতিহ্যের সংখ্যা বিবেচনায় নেপাল বিশ্বে প্রথম। কাঠমু- এলাকার ১৫ কিলোমিটার ব্যাসের মধ্যেই রয়েছে ৭টি বিশ্ব ঐতিহ্য। বিশ্বের কয়েকটি স্থানের মধ্যে নেপাল অন্যতম একটি দেশ, যেখান থেকে একই সঙ্গে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও একশিঙ্গি গ-ার দেখা যায়।

নেপাল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে প্রাচীন দেশ। এটি কখনও বিশ্বের অন্য কোনো শক্তির কলোনি হিসাবে শাসিত হয়নি বা কোনো শক্তির অধীনে ছিল না। তাই নেপালে কোনো স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয় না। নেপাল ব্যতীত পৃথিবীর সবদেশের জাতীয় পতাকা আয়তকার কিন্তু নেপালের জাতীয় পতাকা লাল ও ত্রিভুজাকৃতির দুটি সুস্পষ্ট অংশে চিহ্নিত। উপরের ত্রিভুজে চন্দ্র এবং নিচের ত্রিভুজে সূর্য রয়েছে। ত্রিভুজদ্বয় হিমালয় পর্বত এবং হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক। জাতীয় পতাকাটির মূল ডিজাইন করা হয়েছিল ২০০০ বছর আগে। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর পতাকাটি সামান্য পরিবর্তন করে পুনরায় গৃহীত হয়।

নেপালের জাতীয় পশু গোরু। তাই এটি জবাই করা নিষিদ্ধ। প্রায় বিলুপ্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, পাণ্ডা ও তুষার-চিতা নেপালে পাওয়া যায়। পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নেপালে অবস্থিত। এভারেস্ট শব্দের নেপালি ভাবার্থ সাগরমাথা (Forehead of the Sky)। এর অর্থ আকাশদেবী। ২৯,০২৯ ফুট (৮,৮৪৮ মিটার) উঁচু বিশাল এ পর্বতমালা যেন আকাশকে মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্যার জর্জ এভারেস্টের ( Sir George Everest) আপত্তি সত্ত্বেও রয়্যাল জিউগ্রাফিক্যাল সোসাইটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতটির নাম রাখেন এভারেস্ট (Everest)।

শেরপা নেপালের পূর্ব-পার্বত্য এলাকায় বসবাসরত একটি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। শেরপা শব্দের অর্থ পৃথিবীতে অবস্থিত দেবীর মাতা(Goddess mother of the world) বা পৃথিবীতে বসবাসকারী দেবীর জননী। তারা পর্বতারোহনে অত্যন্ত দক্ষ এবং জন্মগতভাবে পর্বতারোহনের যোগ্য, দৈহিক ও মানসিক গড়নের অধিকারী। এদের অনেকে পর্বতারোহীদের পথপ্রদর্শক সহায়তাকারী ও কুলির কাজ করে থাকেন। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মে নিউজিল্যান্ড নিবাসী স্যার এডমন্ড পার্সিভ্যাল হিলারি (Sir Edmund Percival Hillary) প্রথম এভারেস্ট শৃঙ্গে আরোহন করেন। তাঁর সহয়তাকারী ছিলেন নেপালের শেরপা গোষ্ঠীভুক্ত তেনজিং নরগে (Tenzing Norgay  )। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুলাই হিলারি জন্মগ্রহণ করেন এবং ২০০৮ খ্রিষ্টাব্দের ১১ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মে তেনজিং নরেগা ৮৬ বছর বয়সে মারা যান।

নেপালের প্রতিরক্ষা সৈনিকদের বলা হয় গোর্কা বাহিনি বা গোর্কা সৈন্য। ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দ হতে বিশ্বখ্যাত নেপালি গোর্কা সৈনিকরা ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নেপাল আক্রমণ করলে দেশটির জানমালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ অবস্থায় ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে চুক্তিতে গোর্কা সৈন্যদের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অংশ হিসাবে মেনে নেওয়া হয়। কাপুরষতার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয় (Better to die than be a coward)’ এটি নেপালি গোর্কা সৈন্যদের নীতিবাক্য।

একসময় নেপালকে আগাছার রাজধানী বলা হতো। এখনও নেপালের গ্রামীণ এলাকায় রাস্তা-ঘাট, গর্ত, খামারবাড়ি, চাষের ভূমি, পাহাড়ের পাদদেশ সর্বত্র প্রচুর আগাছা দেখা যায়। নেপালে ৮০টি নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী ও ১২৩ ভাষা রয়েছে। নেপাল বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে ধর্মের নামে কখনও একবিন্দু রক্তপাত হয়নি। তবে এটি মানুষের রক্ত। পূণ্যলাভের জন্য নেপালের হিন্দুরা প্রচুর প্রাণী বলী দিয়ে থাকেন। নেপাল গৌতম বুদ্ধের জন্মস্থান। নেপালের লুম্বিনি এলাকার কপিলাভস্তুতে গৌতম বুদ্ধ জন্মগ্রহণ করেন। তাই লুম্বিনি সারা বিশ্বের বৌদ্ধদের একটি পবিত্র স্থান।


কাজাখস্তান (Kazakhstan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কুয়েত (Kuwait): ইতিহাস ও নামকরণ

লাও (Laos) : ইতিহাস ও নামকরণ

লেবানন (Lebanon) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!