নেয়ার নেয়ে নেয়ে: ফুলটুশি মৌটুসকি: পণ্ডিত বনাম শিক্ষক

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/নেয়ার-নেয়ে-নেয়ে-ফুলটুশি-ম/
বাম থেকে হায়াৎ মামুদ, ড. মোহাম্মদ আমীন ও অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক।
 তিনি নেয়ার জন্য এসেছেন। বাক্যটির অর্থ কী?
নেয়ার: নেয়ার দেশি শব্দ। উচ্চারণ— নেআর্‌। অর্থ— খাটের পৃষ্ঠদেশে বুননের জন্য কাঠের পাটাতনের পরিবর্তে ব্যবহৃত মোটা সুতোয় বোনা চওড়া ফিতে; যেমন: নেয়ার খাট। পাজামা, সালোয়ার প্রভৃতি কোমরে আটকানোর জন্য ব্যবহৃত ফিতাকেও ‘নেয়ার’ বলা হয়।

সুতরাং, “তিনি নেয়ার জন্য এসেছেন।” কথার অর্থ — তিনি খাটের ফিতের/ কোমরে পোশাক বাঁধার ফিতের জন্য এসেছেন।

নেয়ে: অভিধানে নেয়ে শব্দের দুটি ভুক্তি। দুটোই খাঁটি বাংলা। একটি এসেছে সংস্কৃত স্নান থেকে এবং অন্যটি এসেছে নাবিক থেকে।
  • সংস্কৃত স্নান থেকে উদ্ভূত নেয়ে হলো— ‘স্নান করার পর’ বাগ্‌ভঙ্গির অসমাপিকা ক্রিয়ার  একটি রূপ। যেমন: নেয়ে খাও, ঘাম ঝরছে গা থেকে।
  • সংস্কৃত নাবিক থেকে উদ্ভূত নেয়ে অর্থ— (বিশেষ্যে)— নৌকার মাঝি, যে নৌকা চালায়, নৌকা চালানো যার পেশা। যেমন:
“খরবায়ু বয় বেগে, চারি দিক ছায় মেঘে,
ওগো নেয়ে, নাওখানি বাইয়ো।
তুমি কষে ধরো হাল, আমি তুলে বাঁধি পাল—
হাঁই মারো, মারো টান হাঁইয়ো।” (রবীন্দ্রনাথ)
প্রয়োগ: নেয়ে, নেয়ে নেয়ার খাটে খেতে বসেছে।
ফুলটুশি ও মৌটুসকি
ফুলটুশি : ফুলটুশি বাংলা শব্দ। উচ্চারণ— ফুল্‌টুশি। বিশেষণে/বিশেষ্যে শব্দটির অর্থ— তুলতুলে, নরম, ফুলের মতো স্নিগ্ধ যার পরশ, মোহনীয়, যার স্পর্শ আনন্দদায়ক, মোহিত অনুভূতির ধারক, অনবদ্য মমতায় ভরা মুগ্ধকর অবয়ব।  “ফুলটুশি আজ হারিয়ে দিল নিটোল বিভোর কূলে।”
মৌটুসকি: মৌটুসকি দেশি শব্দ। উচ্চারণ: মৌটুশ্‌কি। অর্থ (বিশেষণে)— মধুরভাষিণী, মঞ্জুভাষিণী। মুগ্ধকর মঞ্জুভাষ এবং শ্রুতমধুর কণ্ঠের জন্য তাহসিন ঐশীকে আমি মৌটুসকি ডাকি। বিশেষ্যে মৌটুসকি উজ্জ্বল বর্ণের চঞ্চল প্রজাতির ছোটো একটি গায়ক পাখি। প্রেমেন্দ্র মিত্রের ভাষায়, — “আবার কোথায় মৌটুস্‌কি টুস্‌কি মারে ফুলে।”
“ফুলটুশি আজ হারিয়ে দিল নিটোল বিভোর কূলে”
“আবার কোথায় মৌটুস্‌কি টুস্‌কি মারে ফুলে।”

পণ্ডিত বনাম শিক্ষক

সংস্কৃত পণ্ডিত(পণ্ডা+ইত) অর্থ—
  • (বিশেষণে) বিদ্বান, বিজ্ঞ; শাস্ত্রজ্ঞ; ভাষাবিশারদ; এবং
  • (বিশেষ্যে) সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক, ব্রাহ্মণের উপাধি।
আভিধানিক অর্থ হতে দেখা যায়— যিনি বিদ্বান বা বিজ্ঞ কিংবা কোনো শাস্ত্রে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ তিনি পণ্ডিত। বিদ্বান না হলেও একজন ব্যক্তি পণ্ডিত হতে পারেন। কারণ এটি উপাধি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। আবার সংস্কৃত ভাষায় বিশেষভাবে অভিজ্ঞ না হয়েও সাধারণ জ্ঞান নিয়ে সংস্কৃত ভাষার শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হলে পণ্ডিত বলা হয়।
দাদাঠাকুর নামে পরিচিত শরৎচন্দ্র পণ্ডিত (২৭ শে এপ্রিল, ১৮৮১— ২৭শে এপ্রিল, ১৯৬৮) বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ পণ্ডিত। তিনি বাংলা প্যালিনড্রোমের পথিকৃৎ। তাঁর মালিকানাধীন পণ্ডিত প্রেস বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত প্রেস।
রাজনীতিক পণ্ডিত: জওহরলাল নেহেরুর বোন, ইন্দিরা গান্ধীর পিসি বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত (১৮ই অগস্ট ১৯০০ — ১লা ডিসেম্বর ১৯৯০) ছিলেন
বিশ্বখ্যাত কূটনৈতিক ও রাজনীতিবিদ।
প্রসঙ্গত, পণ্ডা অর্থ শোভন বুদ্ধি, মার্জিত বুদ্ধি, শৈলী বুদ্ধি।
শিক্ষক: সংস্কৃত শিক্ষক (√শিক্ষ্‌+ণিচ+অক) অর্থ— (বিশেষ ও বিশেষণে) শিক্ষাদাতা, অধ্যাপক; উপদেষ্টা; গুরু। অর্থাৎ যিনি অধ্যয়ন পেশায় নিয়োজিত তিনি শিক্ষক।
সব শিক্ষক পণ্ডিত, কিন্তু সব পণ্ডিত শিক্ষক নয়।
রাজনীতিক পণ্ডিত: জওহরলাল নেহেরুর বোন, ইন্দিরা গান্ধীর পিসি ও রাজীব গান্ধীর পিসি-ঠাকুরমা বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত (১৮ই অগস্ট ১৯০০ – ১লা ডিসেম্বর ১৯৯০) একজন ভারতীয় কূটনৈতিক ও রাজনীতিবিদ।
error: Content is protected !!