নয়নজুলি না নয়ানজুলি

ইউসুফ খান

নয়নজুলি না নয়ানজুলি

জলজ্যান্ত জোলোকথা
বাংলার দেশ জল-জলাশয়ের দেশ, তাই বাংলা ভাষা জোলো কথায় ছয়লাপ হয়ে আছে – আটক আড়া আড়ি কাঁদর কুণ্ড কুলি কোল কোলা খাটিক খাড়ি খাত খাল গঙ্গা গাঙ গড় গড়্যা গাবা গাড়া গোড় গোড়ে গড়িয়া ঘোলা জুলি জোড় জোল ঝাল ঝিল ডাঁড়া ডোবা দাঁড়া দোয়ান নালা নালি নোয়ান নয়ানজুলি পুকুর বাঁওড় বাঁধ বিল ভাটি ভেড়ি মোয়ান শোল হেদুয়া হেদো হাওড়।
(আরও কথা যোগাতে পারবেন বাংলাদেশের মানুষজন। তাঁদের জীবন অনেক বেশি জল জলাশয় জলখাত দিয়ে ঘেরা। চুপ না থেকে বলে ফেলুন।)
ওপরের কথাগুলোর সবকটার মানে এবং ইতিহাস নিয়ে বলতে বসলে কথার বাঁধ ভেঙে বানভাসি হয়ে যাবে। আমরা কথাগুলোর একটাও তলিয়ে জানি না, এবং কোনও কথার গভীরে ডুব দিয়ে দেখতেও চাই না। সবার নয়ন শুধু ওই নয়নজুলিতে। কথাটা নিয়ে অনেকের অনেক জিজ্ঞাসা।

গোড়ার কথা
গৌড় ভাষার গোড়ায় আছে গোঁড় গোণ্ড্‌ ভাষা। অস্ট্রিক মূলের ভাষা। সাঁওতালি এরই একটা শাখা। শান্ত সভ্য উন্নত অস্ট্রিক জনগোষ্ঠিকে খেদিয়ে পুব দেশের জঙ্গলে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাঢ় পুরুল্যা বীরভূঁই বঙ্গের ভাষার শিরায় শিরায় তারই রক্ত বইছে। বাংলা ভাষার অবকাঠামোটা অস্ট্রিক। পরে এর পরিকাঠামোতে একে একে দ্রাবিড় আর্য অনুপ্রবেশ ঘটেছে। মঙ্গোল সেমেটিক আরও পরে এসে বাংলা ভাষার মাটিতে পলির পলেস্তারা দিয়েছে।
রাঢ় বাংলার ভাষা আর চর্যার শব্দমূল এবং ছন্দকাঠামোর ডিএনএ ম্যাপিং করে পণ্ডিতরা বলে দিচ্ছেন মূলে বাংলা ভাষা অস্ট্রিক এবং প্রাচীন। আমরা যে শব্দগুলোকে দেশি বলে এটিমোলজি এড়িয়ে যাই সেগুলো প্রধানত অস্ট্রিক। জীবন্ত বাংলা ভাষায় সেই সব শব্দ এখনও জ্যান্ত আছে। খোদ বঙ্গ শব্দটাই অস্ট্রিক।
অস্ট্রিকের কয়েকটা ধ্বনি আর্যলিপিতে লেখা যায় না। এর মধ্যে একটা ধ্বনি ঞ-র কাছাকাছি, খাঁটি সাঁওতালি শুনলে খানিকটা আভাস পাওয়া যায়। এটার বর্ণরূপ আমরা ঞ ঙ্গ ঙ ং যখন যা পারি জায়গা বুঝে লিখে দিই। ডাঙ্গা ডাঙা বঙ্গ বনগাঁ সঙ্গী স্যাঙাৎ ভুঞা ভুঁই গাং গাঞি কথাগুলোতে এর উপস্থিতি বোঝা যায়। ভুঞা ভুঞ্যা ভুঁইয়া বানানে এতো দ্বিধা ত্রিধা তার কারণ একটাই – আসল ধ্বনিটার একটাও লেজিট বর্ণরূপ পাণিনি দিয়ে যাননি, কারণ তাঁর দায়ও ছিলো না। ঞ-র এই জ্ঞানটা আমাদেরকে কিছু জোলো কথা বুঝতে সাহায্য করবে।

তাল তাড়ি
দ্রাবিড়ের দুটো ধ্বনি মূর্ধন্য ণ আর মূর্ধন্য ল় ळ। ওড়িআ এবং দক্ষিণের বেশির ভাগ দ্রাবিড় লিপিতে দুটো করে ল আছে। মারাঠি লিপি আর্যলিপি হলেও ওরাও মূর্ধন্য ল়-টা বানিয়ে নিয়েছে। যোগেশচন্দ্র রায় বিদ্যানিধি ওড়িআ ভাষাতেও বিশাল পণ্ডিত ছিলেন, বিদ্যানিধি উপাধি উনি ওড়িশা থেকেই পান। বাঙ্গালা শব্দকোষ লিখতে গিয়ে উনি এই ল় ব্যবহার করেছেন। ণ ল় দুটোরই উচ্চারণ ড় এর কান ঘেঁষে যায়। কণা-র উচ্চারণ আমাদের কানে কঁড়া মতো শোনাবে। বম্বের বোল-বচ্চন সিনেমাটাতে অজয় দেবগণ হরিয়াণৱী উচ্চারণে এটা অনেকটা করে দেখিয়েছে।
তালের রস গেঁজে গেলে হয় তাড়ি, কারণ কথাটা আসলে দ্রাবিড় তাল়ী। তন্বী তমালতালী বনরাজিনীলা মনে আছে? তাল়ী মানে তাল। কালিদাস দ্রাবিড় তাল়ী লিখেছেন সংস্কৃত লিপিতে তাই তাল়ী হয়ে গেছে তালী। তাল়ীর রসকে বলে তাড়ি। পাততাড়ি মানে পাততাল়ী মানে তালপাতা। তাল়ীর ঠিক দ্রাবিড় উচ্চারণ করলে আমাদের কানে সেটা তাড়ি হিসেবেই পৌঁছবে। যেমন চীনেম্যান কটর.মটর কথাটাকে শুনবেও কতল.মতল, বলবেও কতল.মতল। জিভ যা পারে না, কান সেটা শোনে না, এবং উল্টোটাও সত্যি, কালারা বোবা হয়। বাংলা লিপি মূর্ধন্য ল় নেয়নি বলে তাল তাড়িতে এই বর্ণবিপর্যয়।
এই খবরটাও আমাদের কাজে লাগবে।

জোল শোল
নিচু মাঠের জমি, যে জমিতে প্রায় সারা বছর জল জমে থাকে তাকে বলে জোল। দ্রাবিড় জোল়। বাঁকড়ো পুরুল্যা-তে তাই জোলকে বলে জোড়। একটা জোল কয়েক বিঘে জুড়ে হতে পারে। জোলে বর্ষায় হাঁটু-জল আর গরমে গোড়ালি-জল থাকে। জোলের জমিকে বলতো জোলান জমি বা জোলি। ডুবো জোলিতে উঁচু উঁচু ঘাস হতো। আর তাতে হতো শিঙি মাগুর শোল ল্যাটা কই খলসে ইত্যাদি নানা রকম মিষ্টি জলের মাছ। জল কম থাকলে কোনও কোনও বছর জোল জমিতে একবার ধান চাষ হতো। জল থেকে গলা উঁচিয়ে থাকা লম্বা লম্বা বিশেষ জাতের আমন ধান, জোলি ধান। এর চাল খয়েরি লাল হতো আর চাল ভীষণ মিষ্টি হতো। আমরা ঢেঁকশাল থেকে মুঠো মুঠো নরম চাল নিয়ে চিবিয়ে খেতাম। এই ধানের লম্বা লম্বা খড় নরম পচা পচা হতো, শুধু জ্বাল-দিবার জ্বালানি হিসেবে কাজে লাগতো, গোরুতে খেতো না, ঘর ছাওয়া যেতো না। কোনও কোনও বছর খরানি-তে খটখটে হয়ে গেলে বা বর্ষায় গলা-ডোবা জল হলে সে বছর আর জোল জমিতে চাষ হতো না। এক ফসলি হবার কারণে জোলের জমির দামও কম হতো। জোল জমি গাঁ-ভিটের বাইরে দূরে নিরিবিলিতে মাঠের মাঝে নিচু মাঠে হতো। কোথাও কোথাও জোলের গায়ের পড়া-জমিতে কাঁটাবনে ঘেরা ভাগাড় শ্মশান মশান থাকতো। ডাকাত এবং তান্ত্রিকদের আড়াল দিতো এইসব জায়গা। যে জোড়ের গায়ে মশান আছে সেটা মশানজোড়, যাকে সাহেব বাঙালিরা বলে ম্যাসাঞ্জোর। এই সব জোল প্রকৃতিতে ছিলো মানুষ তৈরি করেনি।

জোলের সঙ্গে জোড়শব্দ হচ্ছে খাল-জোল। মানুষের খোঁড়া খালে জল জমে এই জোল তৈরি হয়, তাই এটা খাল-জোল। খোঁড়া ক্যানালের গায়ে বা উঁচু রাস্তার ধারে এই জোল তৈরি হয়ে যেতে পারে। রাস্তা উঁচু করার জন্য রাস্তার পাশের জমিতে খাল করে সেই মাটি রাস্তায় ফেলা হয়। পরে খালে জল জমে জোল তৈরি হয়। ট্রেনে যেতে যেতে আমরা দেখি রেললাইনের প্যারালালে একটানা নদী মতো বয়ে চলেছে। এগুলো নদী না বা কাটাপড়া নদীও না। এর বেশির ভাগই রেললাইন পাতার সময় রেললাইন উঁচু করার জন্য পাশের জমির মাটি তুলে তৈরি হওয়া খাল। সেই খাল জলে ভরে গিয়ে হয়েছে খাল-জোল বা খাল।
মেঠো ছোটো কাঁদর নদী পথ হারালে তার কিছুটা অংশ কাটা পড়ে গিয়ে যে জলাশয় তৈরি হয় তাকেও জোড় বলে।
জোল এর জাতভাই হচ্ছে শোল। নাটাশোল আমলাশোল খয়রাশোল আসানশোল। জোলের সঙ্গে শোলের কোনও সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে কি না জানি না। কেউ জানলে আওয়াজ দেবেন।

জুলি জুড়ি
বর্ষায় উঠোনের উপছে ওঠা জল বা চাষের ভুঁই ভেসে যাওযা জল যাতে সহজে পথ খুঁজে নিচু খাল ডোবা পুকুরে গড়িয়ে যেতে পারে তার জন্য কোদাল দিয়ে মাটিতে টানা একটা নালা বা নালী খুঁড়ে দেওয়া হয়। নালা চওড়া, নালী সরু। জল বেরিয়ে যাবার এই নালা নালী প্রণালীকে বলে জুলি। শহরে বলে ড্রেইন। জুলি তৈরি করা হয় কোদাল দিয়ে চটান-মাটি চটিয়ে, তবে জলের তোড়ে জুলি নিজে নিজেও তৈরি হয়ে যায়। ল় ড় নিয়মে জুলি হবে জুড়ি। আমি শুনিনি তবে ডিকশনারিতে লিখেছে ত্রিপুরায় বলে।

নয়ানজুলি
‘জীবনে কারও কাছে মাথা নোয়াইনি’ বা ‘পুকুর-পাড়ের নোয়ানো গাছ, চিনতো একটা ছটফটে মাাাছ’ কথা দুটোতে নোয়াইনি ক্রিয়াপদ আর নোয়ানো বিশেষণ। এদের বিশেষ্য হচ্ছে নোয়ান নোআন্‌। মানে ঢাল ঢলতা গড়ান নতি অবনতি। ‘আমাদের কোলজমিটার পশ্চিম দিকটাতে একটু নোয়ান আছে, জল ডাঁড়াতে পারছে না’, ‘বটতলার ব্যাঁকের মুখে রাস্তায় একটা নোয়ান আছে, সাইকেল নিয়ে আস্তে নাববি।’, ‘এই নাও, ডানদিকের পাল্লাটায় একটু নোয়ান আছে, এক কেজির বেশিই হচ্ছে, তুমি এক কেজিরই দাম দাও’, ‘কীরম করে বস্তাগুলো চাপালি, গাড়িটার সামনের দিকটা বেশি নোয়ান হয়ে গেছে, গোরুগুলোর কাঁধে লাগবে না? কটা বস্তা পেছনে করে দে’। দাঁড়িপাল্লায় এবং গোরুর গাড়িতে নোয়ানের উল্টো কথাটা হচ্ছে ওলা। পাল্লা বা গোরুর গাড়ি ওলা হওয়া মানে একটা দিক ওপর দিকে উঠে যাওয়া, উন্নতি।
উঠোন বা জমি থেকে বেরনো জুলি পায়ের কাছে থাকে। তার জলে পা ডুবিয়ে পা ধোয়া যায়। কিন্তু উঁচু মাটির-রাস্তার পাশে তৈরি হওয়া নালা জুলি, রাস্তা থেকে নিচুতে গড়ানে নোয়ানের শেষে থাকে। রাস্তা থেকে ঝাঁপালে এই জুলির কাছে পৌঁছনো যাবে। এই জুলি রাস্তার নোয়ানের নিচুতে থাকা জুলি এবং এই জুলিতে রাস্তার জল নোয়ান দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নামে, তাই এর নাম নোয়ানজুলি। এটাই মুখে মুখে হয়ে গেছে নয়ানজুলি।
গ্রামের লোকেরা নয়ানজুলি-ই বলে, কখনও নয়নজুলি বলতে শুনিনি। শহুরে লোকেরা ড্রেন চেনে, নয়ানজুলি তারা শোনেনি ছাপার অক্ষরে দেখেছে, তাই নয়ান-কে শুদ্দু করে নয়ন লিখছে।

পুনশ্চ: প্রথমে বলা জোলো কথাগুলোর বাকিগুলো নিয়েও জলঘোলা করছি। ক্রমশ প্রকাশ্য। আপনারাও বলতে শুরু করুন ওগুলো সম্পর্কে যে যা জানেন। আমি দোয়ান কথাটার মানে জানিনা। আমার জেলা বর্ধমান আসলে বার্‌.দোয়ান। বাঁকুড়ায় আছে বান্‌.দোয়ান। শুধু বুঝি দোয়ান একটা জোলো কথা। হেল্প। (ত্রুটি মার্জনীয়, শুদ্ধি প্রার্থনীয়)

উৎস:  নয়নজুলি না নয়ানজুলি, ইউসুফ খান,, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)  
কলকাতা, ২০২০ আগস্ট ১৯


কিছু প্রয়োজনীয় পোস্ট

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
এই পোস্টের ওয়েব লিংক: কিছু প্রয়োজনীয় পোস্ট
— — — — — — — — — — — — — — — — —
— — — — — — — — — — — — — — — — —
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
——— ইউসুফ খানের লেখা ওয়েব লিংক———–
— — — ইউসুফ খানের পোস্ট শুবাচ লিংক — — — — — —
— — — — — — — — — — — — — —

 

error: Content is protected !!