পরিচ্ছন্নকর্মী, পরিচ্ছন্ন কর্মী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী: পরিচ্ছন্নকর্মী বনাম পরিচ্ছন্নতাকর্মী

ড. মোহাম্মদ আমীন

পরিচ্ছন্নকর্মী, পরিচ্ছন্ন কর্মী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী: পরিচ্ছন্নকর্মী বনাম পরিচ্ছন্নতাকর্মী

‘কর্মীটি পরিষ্কার’ বা ‘পরিষ্কার যে কর্মী’ বা ‘পরিচ্ছন্ন যে কর্মী’ কথাটি প্রকাশের জন্য অনেকে লিখে থাকেন ‘পরিচ্ছন্নকর্মী’। অধিকাংশের অভিমত, শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ। কারণ বিশেষণ পদ অন্য পদের অর্থকে বিশদ বা সীমিত করার মাধ্যমে বিশেষিত করে। তাই সমাসবদ্ধ না-হলে বিশেষণ পদ বিশেষায়িত পদ থেকে ফাঁক রেখে বসে। যেমন : মেধাবী ছাত্র, পশ্চিম দিগন্ত, সোনালি ফসল, সব ছাত্র, অনেক লোক, গোটা সমাজ, প্রধান অতিথি, মূল কারণ, এক টাকা, চার মাস, নয় বস্তা, সিকি চামচ, প্রথম স্থান, মোগলাই পরাটা, নজরুল সংগীত, এই ছেলেটা, কাঠের পুতুল, পড়ার ঘর, বাতির আলো, কত লোক, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, সবচেয়ে দামি ইত্যাদি।
 
আলোচ্য ক্ষেত্রে ‘পরিচ্ছন্ন’ বিশেষণ পদ এবং ‘কর্মী’ পরিচ্ছন্ন বিশেষণটিকে বিশেষায়িত করছে। তাই শব্দদুটো পরস্পর সেঁটে বসবে না, ফাঁক রেখে বসবে। অতএব শুদ্ধ হচ্ছে ‘পরিচ্ছন্ন কর্মী’।
 
যারা ‘পরিচ্ছন্নকর্মী’ লিখেন তাদের বক্তব্য, ‘পরিচ্ছন্নকর্মী’ শব্দটি ত্রুটিপূর্ণ বলা যায় না। কারণ সমাসবদ্ধ পদে বিশেষণ ও বিশেষ্যের মধ্যে ফাঁক থাকে না। যেমন: খাসকামরা, চিরজীবন, নবজাতক, দীর্ঘনিঃশ্বাস, ঘনবস্তু, প্রত্যক্ষপ্রমাণ, বড়লাট, বিগতযৌবন, বিকৃতমস্তিষ্ক, ভগ্নদশা, রাজপথ, তেমাথা প্রভৃতি। অতএব সে হিসেবে পরিচ্ছন্নকর্মী ত্রুটিপূর্ণ নয়।
 
বাক্যে ‘পরিচ্ছন্নতা’ এবং ‘কর্মী’ শব্দদ্বয় বিশেষ্যপদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পরিচ্ছন্নতা একটি ক্রিয়ার নামও বটে। পরিচ্ছন্নতা ও কর্মী শব্দের সমাসবদ্ধ শব্দ ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’। এর অর্থ পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখেন যে কর্মী। সুতরাং যে ব্যক্তি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কর্মে নিয়োজিত তাকে বলা হবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী। শব্দ দুটো পরস্পর সেঁটে বসবে। আগের শব্দটির বানান নিয়ে দ্বিমত থাকলেও এই শব্দটির বানান নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে শব্দটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভুল দেখা যায়।
 
অনেকে পরিচ্ছন্ন কর্মী এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অর্থ গুলিয়ে ফেলেন। মনে রাখতে হবে, শব্দ দুটোর অর্থ এক নয়। ‘পরিচ্ছন্ন কর্মী’ অর্থ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন কর্মী। কিন্তু ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ অর্থ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত কর্মী। ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ শব্দটি দিয়ে ব্যক্তির পেশাকে নির্দেশ করা হয়, স্বভাব বা আচরণকে নয়। যেমন : মৃদুল পোদ্দারের বাবা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ হিসেবে নিয়োজিত আছেন। অন্যদিকে, ‘পরিচ্ছন্ন কর্মী’ শব্দগুচ্ছ দিয়ে ব্যক্তির পরিচ্ছন্নতা, পারিপাট্য, সুরুচি, কমনীয়তা, চারুতা প্রভৃতি আচরণকে নির্দেশিত করে। যেমন মৃদুল পোদ্দারের বাবা ‘পরিচ্ছন্ন কর্মী’ হিসেবে শ্রেষ্ঠ পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পুরস্কার পেয়েছেন।
 
যে কোনো কর্মী পরিচ্ছন্ন কর্মী হতে পারেন কিন্তু পরিচ্ছন্নতাকর্মী বলতে কেবল তাদেরই বোঝায় যেসব কর্মী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কাজে নিয়োজিত।
 
প্রয়োগ: প্যারিস পুরসভার পরিচ্ছন্নতাকর্মীবৃন্দ পরিচ্ছন্ন কর্মী হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। পরিচ্ছন্ন কর্মী না হলে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে বলা যায় না। পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে সবার আগে পরিচ্ছন্ন কর্মী হতে হবে।
 
অজ
‘অজ’ শব্দের অর্থ ছাগল। এটি প্রয়োজনীয় পশু, নিরীহও। কিছু কিছু ছাগল আকস্মিক দেখা প্রকৃতির মতো আকর্ষণীয়, মহা দাপটে ঘুড়ে বেড়ায় আলেকজান্ডারের মতো। ডাকটাও তার খারাপ না– ম্যা ম্যা, মা মা শব্দের অপভ্রংশ। খাওয়ার অভ্যাসটাও মানুষের মতো বাছবিচারহীন- যা পায় তা-ই খায়। তবু বাংলায় অজকে কেবল খারাপ অর্থে ব্যবহার করা হয়। যেমন:
 
অজাগলস্তন: ছাগলের গলদেশে যে চামড়া ঝোলে। শব্দকারদের মতে, এটি আকারে স্তনের মতো হলেও কোনো কাজে লাগে না। তাই বাজে জিনিস বা নিরর্থক কিছু প্রকাশের জন্য লেখা হয় অজাগলস্তন। অথচ এটি ছাগলের একটি চমৎকার অলংকার। মেয়েদের যেমন কণ্ঠহার। কী মধুর মমতায় দোলে। মনে হয় যেন নায়াগ্রার জল অর্ধেক নেমে নুয়ে নুয়ে দুলছে। এমন সুন্দর বস্তুটার নাম অজালংকার দিলে কী ক্ষতি হতো?
অজ নিয়ে এমন অজশব্দ আরও আছে। যেমন:
 
অজ পাড়া-গাঁ: পুরোপুরি পাড়া-গাঁ (অজ=নিতান্ত [মন্দ অর্থে])।
অজমূর্খ: একেবারে মূর্খ (অজ = কিছু জানে না)।
অজাযুদ্ধ: ছাগলের লড়াই।যাতে যুদ্ধের চেয়ে আস্ফালনই বেশী); বহ্বারম্ভ।
 
 
 
বৈয়াকরণ ও বৈয়াকরণিক
 
ব্যাকরণ শব্দের সঙ্গে অ-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে বৈয়াকরণ (ব্যাকরণ+অ)। প্রত্যয় যুক্ত হলে কখনো কখনো শব্দের আদিস্বরের বৃদ্ধি ঘটে। তৎসম বৈয়াকরণ শব্দের অর্থ— (বিশেষণে) ব্যাকরণবিদ, ব্যাকরণ, ব্যাকরণসর্ম্পকীয় এবং (বিশেষ্যে) ব্যাকরণেপণ্ডিত। শুবাচের প্রধান উপদেষ্টা হায়াৎ মামুদ একজন বৈয়াকরণ)।
ব্যাকরণ শব্দের সঙ্গে একবার প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বৈয়াকরণ শব্দ গঠিত হয়েছে। সুতরাং, এর সঙ্গে পুনরায় ইক-প্রত্যয় ‍যুক্ত করা বাহুল্য এবং দূষণীয়। এটি এক গলায় একসঙ্গে দুটো টাই পরার মতো হাস্যকর।
বৈয়াকরণ শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যাকরণবিদ লিখুন। বৈয়াকরণিক লিখেবেন না।
শুবাচের প্রধান উপদেষ্টা হায়াৎ মামুদ একজন বৈয়াকরণ।
শুবাচের প্রধান উপদেষ্টা হায়াৎ মামুদ একজন ব্যাকরণবিদ।
 
এই লিংকের পোস্ট
https://draminbd.com/পরিচ্ছন্নকর্মী-পরিচ্ছন্/
 
error: Content is protected !!