পর্তুগাল (Portugal) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

পর্তুগাল (Portugal)

পর্তুগাল দক্ষিণ-পশ্চিম ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। এটি আইবেরীয় উপদ্বীপের পশ্চিম অংশে, স্পেনের দক্ষিণে ও পশ্চিমে অবস্থিত।

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

আটলান্টিক মহাসাগরে  দেশটির দীর্ঘ উপকূল রয়েছে। এছাড়া আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত আসোরেস দ্বীপপুঞ্জ ও মাদেইরা দ্বীপপুঞ্জ নামের দুটি স্বায়ত্তশাসিত দ্বীপপুঞ্জ পর্তুগালের নিয়ন্ত্রণাধীন। লিসবন পর্তুগালের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

ল্যাটিন পর্তুস ক্যাল (Portus Cale) হতে রোমান পর্তুক্যাল (Portucale) শব্দের উৎপত্তি। দৗরু নদীর  মোহনায় অবস্থিত প্রাক্তন রোমান বসতি পোর্তুস কালে থেকে পর্তুগাল নামটি এসেছে।  ল্যাটিন পর্তুস (Portus) শব্দের অর্থ পোর্ট বা বন্দর। তবে ক্যাল (Cale) শব্দের অর্থ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। অনেকে মনে করেন, গ্রিক কাল্লিস (kallis) যার অর্থ সুন্দর অথবা ল্যাটিন ক্যালেরে (calere), যার অর্থ উষ্ণ হওয়া বা তপ্ত শব্দ হতে ক্যালে শব্দের উৎপত্তি। তবে এটি ঠিক যে, সদূর প্রাচীনকাল হতে বর্তমানে পর্তুগাল নামে পরিচালিত দেশটি সুন্দরের বন্দরের জন্য বিখ্যাত ছিল।

পর্তুগালের মোট আয়তন ৯১,২১২ বর্গকিলোমিটার বা ৩৫,৬০৩ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ০.৫%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, লোকসংখ্যা ১,০৪,২৭,৩০১ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে লোকসংখ্যা ১১৫। আয়তন বিবেচনায় পর্তুগাল পৃথিবীর ১১১-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ৮৩-তম। অন্যদিকে, জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ৯৭-তম জনবহুল দেশ। পর্তুগালের সরকারি ভাষা পর্তুগিজ এবং স্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা মিরান্দেস। সরকারিভাবে পর্তুগালের

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

অধিবাসীদের পর্তুগিজ বলা হয়। জনসংখ্যার ৯৬.৩% পর্তুগিজ এবং ৩.৭% অন্যান্য। এ দেশের অধিকাংশ লোক খ্রিস্টান। প্রেসিডেন্ট দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান। লিসবন দেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।

২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, পর্তুগালের জিডিপি (পিপিপি) ২৮১.৩৫৭ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২৭,০৬৯ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ২২৯.০৪৮ এবং মাথাপিছু আয় ২২,১২৩ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম ইউরো। মাথাপিছু আয় বিবেচনায় পর্তুগাল পৃথিবীর ৩৬-তম ধনী দেশ। ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুন নরওয়ের পতাকা প্রথম গৃহীত হয়। সেটি এখনও অবিকৃতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পর্তুগাল মোটামুটি আয়তাকৃতির। এর উত্তরের ভূমি পর্বতময় ও সবুজে ছাওয়া; এখানে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং আবহাওয়া শীতল। এই অঞ্চলটি, বিশেষ করে  দোউরু নদীর উপত্যকা আঙুরক্ষেতের জন্য বিখ্যাত। এখান থেকে পর্তুগালের বিখ্যাত পোর্ট ওয়াইনের জন্য আঙুর উৎপাদিত হয়। এখানে আঙুর ছাড়াও গম ও অন্যান্য কৃষিদ্রব্য উৎপাদিত হয়। এখানে কর্ক, ওক ও জলপাই গাছও জন্মে। দেশের একেবারে দক্ষিণে আলগার্ভে অঞ্চলটি উষ্ণ গ্রীষ্মকাল এবং বিরাট এলাকা  রৌদ্রোজ্জ্বল বেলাভূমির জন্য বিখ্যাত।

পর্তুগাল খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতকে রোমান সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। খ্রিস্টীয় ৫ম শতকে রোমান শাসনের অবসানের পর ইউরোপের

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

অভ্যন্তরভাগ থেকে জার্মান জাতির লোকেরা এসে পর্তুগাল শাসন করে। এরপর উত্তর আফ্রিকা  থেকে মুসলমানেরা এসে দেশটি দখল করে। তারপর এলাকাটি স্পেনীয় রাজাদের অধীনে আসে। ১২শ শতকে পর্তুগাল স্বাধীন রাজ্যে পরিণত হয়।

১৫শ শতকে পর্তুগাল ইউরোপের প্রধান সমুদ্রাভিযান কেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তী প্রায় ১০০ বছর পর্তুগিজ নাবিকেরা বিশ্ব ভ্রমণের মাধ্যমে বিশ্বের সমুদ্র বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করেন। এই নাবিকদের সহায়তায় পর্তুগাল ইউরোপের প্রথম রাষ্ট্র হিসাবে একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। আফ্রিকা, এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় তাদের উপনিবেশ ছিল। বর্তমানে পর্তুগিজ ভাষা বিশ্বের সবচেয়ে  বেশি প্রচলিত ভাষার একটি।  ১৬শ শতকের শেষ নাগাদ পর্তুগালের শক্তি ও সম্পদ নিঃশেষ হয়ে যায় এবং দেশটি তার বেশির ভাগ এশীয় উপনিবেশ হারায়। পর্তুগাল তার বৃহত্তম উপনিবেশ ব্রাজিলের উপর ১৯শ শতক পর্যন্ত এবং তার বিশাল আফ্রিকান সাম্রাজ্যের উপর ২০শ শতক পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে।

১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পর্তুগালে রাজতন্ত্র প্রচলিত ছিল। ওই বছর পর্তুগালে প্রথম প্রজাতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটে। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে  কু-এর মাধ্যমে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এটি পাঁচ দশক ধরে পর্তুগাল শাসন করে। ১৯৬০-এর দশকে আফ্রিকাতে ঔপনিবেশিক যুদ্ধের কারণে পর্তুগালের সম্পদ হ্রাস পায় এবং জাতীয় অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে  পর্তুগালে একটি বিপ্লব ঘটে এবং একটি সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসে।

১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে  পর্তুগাল তার সমস্ত আফ্রিকান উপনিবেশকে স্বাধীনতা দিয়ে দেয়। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে  প্রণীত নতুন সংবিধানে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। তখন থেকে পর্তুগাল ইউরোপের সঙ্গে নতুন করে সম্পর্ক স্থাপন করে। পর্তুগাল

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে  ইউরোপীয় সম্প্রদায়ে (পরবর্তীকালে যা ইউরোপীয় ইউনিয়নে পরিণত হয়) যোগদান করে এবং ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে  মুদ্রা হিসেবে ইউরো- কে গ্রহণ করে। ১৯৯৯ সালেই পর্তুগাল এশিয়ায় তার শেষ উপনিবেশ মাকাও-কে চীনের কাছে  ফেরত দেয়।

পর্তুগাল ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের সর্বপশ্চিমে অবস্থিত। আটলান্টিক দ্বীপপুঞ্জ এজোর্স ও ম্যাদেরিয়া দ্বীপপুঞ্জের ওপরও পর্তুগালের সার্বভৌমত্ব রয়েছে। পঞ্চদশ ও ষোড়ক শতকে পর্তুগাল বৈশ্বিক সামুদ্রিক শক্তিতে পরিণত হয়। পর্তুগিজ অভিযাত্রী হেনরি দা নেভিগেটর, ভাস্কো ডা গামা ও আলভার্স ক্যাবরাল অনেকগুলো দ্বীপ ও ভূখণ্ডে উপনিবেশ সৃষ্টি করে। ফলে স্পেনের সঙ্গে সঙ্গে  পর্তুগালও অর্থনীতির, রাজনীতি ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম শক্তিতে পরিণত হয়। ব্রাজিল, আফ্রিকা ও এশিয়াসহ একসময় নতুন পৃথিবীর অর্ধাংশের মালিক ছিল পর্তুগাল।

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের তাগুস নদীর উপর অবস্থিত ১৭.২ কিলোমিটার দীর্ঘ ভাস্কো ডা গামা ইউরোপের বৃহত্তম সেতু।  এ সেতু উদ্বোধনের সময় একটি ডাইনিং টেবিল সেট করা হয়েছিল। যাতে একসঙ্গে ১৫,০০০ লোক ভোজনক্রিয়া সম্পন্ন করেছিল। এটি ডাইনিং টেবিলের বৃহত্তমতার বিশ্ব রেকর্ড। পর্তুগালের দশ জন অধিবাসীর নয় জন রোমান ক্যাথলিক। যা পর্তুগালকে পৃথিবীর সবচেয়ে অধিক সামাজিক রক্ষণশীল দেশে পরিণত করেছে।

কর্ক বৃক্ষ পর্তুগালের দেশীয় অটবী। এটি এখনও প্রচুর উৎপন্ন হয়। কর্ক বৃক্ষ হতে তৈরি নরম ও স্পঞ্জপ্রকৃতির কর্ক এর জন্য পর্তুগাল

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

পৃথিবীর বৃহত্তম কর্ক উৎপাদনকারী দেশে পরিণত হয়েছে। পর্তুগালের মন্টাডো ল্যান্ডস্কেপে ৫০ ভাগের অধিকসহ বিশ্বের ৭০%  কর্ক উৎপাদিত হয়। সুনির্দিষ্ট সীমানা বিবচেনায় পর্তুগাল ইউরোপের প্রাচীনতম জাতিরাষ্ট্র। পুর্তগালের বর্তমান সীমানা ১১৩৯ খ্রিষ্টাব্দে  নির্ধারিত করা হয়। যা এখনও অপরিবর্তনীয় রয়েছে।

লিসবন পশ্চিম ইউরোপের প্রাচীনতম শহর। ১৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দে  ভয়ঙ্কর এক ভূমিকম্পের আঘাতে প্রায় পুরো লিসবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিলে। এ ভূমিকম্পে লিসবন তার অনেক প্রাচীন ঐতিহ্যমণ্ডিত অবকাঠামো হারিয়ে ফেলে। পর্তুগালে ইউনেস্কো ঐতিহ্য সাইটের সংখ্যা ১৫। তন্মধ্যে ১৪টি সাংস্কৃতিক এবং একটি প্রাকৃতিক।

২০০৮ খ্রিষ্টাব্দে  পর্তুগাল বিশ্বে প্রথমবারের মতো তার সকল নাগরিকের পরিচয়পত্রে  আঙ্গুলের ছাপ নেয়। মাছ ও শেলফিশ খাওয়ার ক্ষেত্রে পর্তুগালের লোকেরা পৃথিবীতে প্রথম। এত মাছ আর কোনো দেশের নাগরিক খায় না। ¦ ঔপনিবেশিক শক্তি হিসাবে

প্রকাশক: পুথিনিলয়।

পুর্তগাল ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে  প্রথম দাসত্বপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে। এর পঞ্চাশ বছর পর ব্রিটেন, ফ্রান্স, স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র দাসত্বপ্রথা বিলুপ্ত ঘোষণা করে। 

পর্তুগাল, ব্রাজিল, কেপ ভার্ডে, অ্যাঙ্গোলা, গিনি বিসাউ, মোজাম্বিক, প্রিন্সপে, সাউতোমে এবং ইকুয়েটরিয়ালা গিনির দাপ্তরিক ভাষা পর্তুগিজ। ভারতের গোয়া, ম্যাকাও  এবং পশ্চিম তিমুরের লোকেরাও পর্তুগিজ ভাষায় কথা বলে। পর্তুগিজের রাজধানী লিসবনে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বুকস্টোর রয়েছে। এর নাম বার্টান্ড বুক স্টোর। এটি ১৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পর্তুগাল ও ইংল্যান্ডের কুটনীতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছিল ১৩৭৩ খ্রিস্টাব্দে। এটাকে পৃথিবীর প্রাচীনতম কুটনীতিক সম্পর্ক বলা হয়। ১২৯০ খ্রিষ্টাব্দে  প্রতিষ্ঠিত কয়মব্রা বিশ্ববিদ্যালয় ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি।


মন্টিনেগ্রো (Montenegro) : ইতিহাস ও নামকরণ

নেদারল্যান্ডস (Netherlands) : ইতিহাস ও নামকরণ

নরওয়ে (Norway) : ইতিহাস ও নামকরণ

পোলান্ড (Poland) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

All Link

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

Knowledge Link

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

Language
error: Content is protected !!