পর্তুগিজ শব্দের তালিকা

উদয় চট্টোপাধ্যায়, শুবাচ

বাংলায় ব্যবহৃত শব্দগুলির উৎসভিত্তিক বিভাজন হল তৎসম, অর্ধতৎসম, তদ্ভব, দেশি ও বিদেশি। বাংলায় বিদেশি শব্দ প্রচুর। আমাদের প্রাত্যহিক কথাবার্তা ও রচনায় সেগুলো ব্যবহার করে থাকি সদাসর্বদা, কিন্তু তারা আদতে যে বিদেশি, সেটা আমাদের মনেই হয় না। সত্যজিৎ রায়ের ‘বাদশাহী আংটি’তে এক জায়গায় ফেলুদা তপসেকে বলছেন চিরকুটের লেখার অর্থ সে বুঝবে না, কেননা সেটা ফারসিতে লেখা। লেখাটা ছিল – ‘খুব হুঁশিয়ার’। বাংলাভাষায় আরবি ফারসির ভাণ্ডার বিপুল। সেটাই স্বাভাবিক। আরব পারস্যের সঙ্গে ভারতবর্ষের বাণিজ্যিক আদানপ্রদান বহু শতাব্দীপ্রাচীন। তারপর প্রায় চারশো বছর তুর্ক–আফগান আর মুঘল শাসনের সুবাদে রাজকীয় ভাষার বহু শব্দ স্থান নিয়েছে আমাদের ব্যবহারিক জীবনে। ঠিক তেমনটাই ঘটেছে ইংরেজি শব্দের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে। দুশো বছরের রাজভাষা আমাদের অভ্যস্ত করে দিয়েছে স্কুল, কলেজ, প্রফেসার, চেয়ার, টেবিল, রেল, এরোপ্লেন, সিনেমা, থিয়েটার, সার্কাস, রেস্টুরেন্ট, ফুটবল, ক্রিকেট ইত্যাদি বহুবিধ ইংরেজি শব্দের ব্যবহারে। বেশ কিছু হুবহু, আবার বেশ কিছু পরিবর্তিত রূপে। স্কুল ‘ইসকুল’ হয়েছে, টেব্‌ল্‌ হয়েছে টেবিল, জাজ হয়েছে জজ, লর্ড হয়েছে লাট, পোলিশ হয়েছে পুলিশ।

আরবি ফারসি আর ইংরেজির পরেই বাংলাভাষায় পোর্তুগিজ শব্দের প্রাচুর্য। এবং সেটাও স্বাভাবিক। পোর্তুগিজরাই প্রথম ইউরোপীয় জাতি যারা সমুদ্রপথে ভারতের উপকূলে এসে পৌঁছেছিল, এবং তাদের সঙ্গে ভারতের কয়েকটি অঞ্চলের বাণিজ্যিক আদানপ্রদানের সূত্রপাত হয়েছিল। গোয়া, দমন, দিউ-এ পোর্তুগিজ শাসন কায়েম হয়েছিল, এবং তা’ বলবৎ ছিল ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর সময় পর্যন্ত। বাংলার উপকূলবর্তী অঞ্চলে তাদের বাণিজ্য এবং অত্যাচার শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দী থেকে। স্থানীয় অধিবাসীরা ‘হার্মাদের’ অত্যাচারে সদাশঙ্কিত জীবনযাপন করত। এই হার্মাদ কথাটাও পোর্তুগিজ – স্প্যানিশ আর্মাদা (armado) থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ army বা সৈন্যদল। কিছু সৈন্য বাঙালি রমণীর সঙ্গে ঘর বেঁধে স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে উঠেছিল এই সব অঞ্চলে। তাদের বংশধররা গোমেজ, ডি সুজা ইত্যাদি পদবি ধারণ করলেও তারা রীতিমতো বাঙালি। ঠিক এমনটাই ঘটেছে মালাবার উপকূলে, আর গোয়ায় তো বটেই।

ঘর বাঁধার কথাই যখন উঠল তখন ঘরগৃহস্থালি সংক্রান্ত শব্দাবলি দিয়েই শুরু করা যাক। রান্নাঘরের বাসনপত্রের মধ্যে রয়েছে গামলা (gamella), বালতি (balde), বয়াম (boiao), বেসালি (vasilla), বোতল (botella), হাঁড়িদের মধ্যে তিজেল (tigela) আর তোলো (talha), পরাত (prato)। পেয়ালা ফারসি-উদ্ভূত হলেও পিরিচ (pires) পোর্তুগিজ। বাসন শব্দটাও পোর্তুগিজ basia থেকে উদ্ভূত। রান্নাঘরের ফল-সবজির ঝুড়িতে পাচ্ছি আনারস (ananas), পেঁপে (papaya), সবেদা (sapota), আতা (ata), নোনা (anona), কাজু (caju), পেয়ারা (pera), বাতাবি (batavia), সান্তারা (cintra), কপি (couve) – এই কপি অবশ্য বাঁধাকপি, ফুলকপি বা ওলকপি নয়। চায়ের সঙ্গে খাবার বিসকুট (biscoito), ব্রেকফাস্টের পাউরুটি (pao)। ‘পাও মানেই রুটি, আমরা বাংলায় তার সঙ্গে রুটি যোগ করে পাউরুটি করে নিয়েছি হাতে-গড়া রুটির সঙ্গে তার তারতম্য বোঝাতে। মারাঠিতে কিন্তু পাউরুটি বোঝাতে পাও কথাটাই চলে – ‘পাওভাজি’ মুম্বাই-এর এক অতি জনপ্রিয় টিফিন, যা এখন সর্বগ্রাহী বাঙালি রসনাকেও পরিতৃপ্ত করেছে। জ্বর হলে সাবু বা সাগু (sago) খেতে হবে, কিংবা জ্বর থেকে উঠে বলবর্ধক সালসা (salsaparrilha)–এ দুটি শব্দও পোর্তুগিজ।

ঘর গৃহস্থালিতে কী লাগে? তালিকার প্রথমেই আসে একটা বাড়ি বা ফ্ল্যাট, যার মধ্যে থাকবে এক বা একাধিক কামরা (camara)। কামরায় জানালা (janala) থাকবে, জানলায় গরাদে (grade) লাগাতে হবে। বাড়ি তৈরি করতে হলে মিস্ত্রি (mestre) লাগবে, সে এসে বাঁশের ভারা (vara) বেঁধে কাজ শুরু করবে। এই বাড়ি তৈরির মিস্ত্রি অবশ্য যে সে মিস্ত্রি নয়, সে রাজমিস্ত্রি। তাই বলে সে কি রাজা? তা ‘নয়’। ‘রাজ’ শব্দটি এসেছে আরবি থেকে, যার অর্থ স্থপতি। এককালে বাড়ির ছাদ তৈরি হতো কড়ি বরগা বসিয়ে। রবীন্দ্রনাথের চলমান কলকাতার বর্ণনায় পাচ্ছি: ‘চেয়ে দেখি ঠোকাঠুকি বরগা কড়িতে’। বরগা (verga) পোর্তুগিজ শব্দ। বাড়ি তৈরি হয়ে গেলে লাগবে গৃহসরঞ্জাম। তার মধ্যে পড়বে অবশ্যই একটা দুটো আলমারি (armario), দু চারটে চেয়ারের সঙ্গে সম্ভব হলে একটা হাতল-দেওয়া আরাম কেদারা (cadeira), দেওয়ালে ছবি টাঙানো কিংবা মশারির দড়ি বাঁধার জন্যে কিছু পেরেক (pergo)। কিছু কিছু বিশেষ প্রয়োজন মেটাতে লাগবে আলপিন (alfinete) থেকে কাটারি (catane), হয় তো বা একটা ইস্ত্রিরি-ও (estirar)। ঘর বন্ধ করে বেরোতে গেলে লাগবে চাবি (chave)। এগুলোর বেশির ভাগই ইস্পাতে তৈরি–ইস্পাত কথাটা এসেছে পোর্তুগিজ espada থেকে। এইসব কিনতে গেলে লাগবে রেস্ত (resto), প্রয়োজনীয় টাকাকড়ি, যে কথাটা আমরা প্রায়শই ব্যবহার করে থাকি।

আমাদের মেয়েদের জামাকাপড়ের তালিকায় আছে সালোয়ার কামিজ। সালোয়ার এসেছে ফারসি থেকে, কামিজ (camisa) পোর্তুগিজ। শেমিজ (chemise) কিন্তু ইংরেজি। সায়া (saia), ফিতা (fita), বোতাম (botao) পোর্তুগিজ, স্নানের সময় তেল গামছার স্থান নিয়েছে সাবান (sabao) আর তোয়ালে (toalha)। স্নান খাওয়া সেরে কারো কারো তামাক (tabaco) সেবনের প্রয়োজন হয়। দ্বিপ্রাহরিক বিশ্রামের সময় এককালে মহিলামহলে তাসের বিন্তি (vinte) খেলার চল ছিল। বিন্তি কথাটা বাদ দিয়ে তাসের হরতন, ইস্কাপন, চিড়েতন, রুহিতন কিন্তু ওলন্দাজি। হল্যান্ডের অধিবাসী বোঝাতে ওলন্দাজ (holandez) শব্দটি আবার পোর্তুগিজ। সেইরকম আর একটি জাতিবাচক শব্দ কাফ্রি (cafre), এবং নিগ্রো (negro), যার অর্থ ‘কালো’।

খ্রিস্টধর্ম মালাবার উপকূলে পৌঁছেছিল খ্রিস্টিয় প্রথম শতাব্দীতেই, কিন্তু বঙ্গপ্রদেশে এসেছিল পোর্তুগিজ ওলন্দাজের হাত ধরে। তার ছাপ রয়েছে গির্জা (igreja) আর পাদরি (padre) শব্দ দুটিতে। খ্রিস্টধর্ম অহিংসার কথা বললেও বিদেশি বণিকরা বাণিজ্যের আর জমিদারির অধিকার অর্জন করতে সবসময় শান্তিপূর্ব পথে চলে নি সে-কথা বলাই বাহুল্য। তাদের সঙ্গে এসেছে কিরিচ (cris), বোমা (bomba), পিস্তল (pistola)। বোমার সূত্রে বোমাবাজরা হয়েছে বোম্বেটে (bombardiere)। জাহাজি ব্যবসাবাণিজ্য সূত্রে পোর্তুগিজ থেকে বাংলায় এসেছে মাস্তুল (mastro), পিপা (pipa), গুদাম (godao), আলকাতরা (alcatrao), ছাপ দিয়ে বোঝানোর মার্কা (marca), বই-এর ফরমা (forma), এমন কি কেরাণি (kiranuti)। সেঁকোবিষ কথাটা এসেছে arsenico থেকে। শব্দটির মতো জিনিসটাও কি পোর্তুগিজের আমদানি?

কাকাতুয়া আমাদের দেশের পাখি না-হলেও বাঙালি শিশুরা ব্যঞ্জনবর্ণের ক-অক্ষরের সঙ্গে পরিচিত হয় ‘কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি’ আবৃত্তি করে। পোর্তুগিজরাই কাকাতুয়া নিয়ে আসে, আর নামটাও। বাংলার কোনো কোনো অঞ্চলে হাতুড়িকে মারতুল (martalo) বলা হয়, কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হয় দু-মুখো থলি সাঁকালি (sacola), আর গ্রামাঞ্চলে বর্ষার জল থেকে মাথা বাঁচাতে তালপাতার তৈরি টোকা (touca) – শব্দগুলি পোর্তুগিজ থেকে আগত। viola বাংলায় হয়েছে বেহালা। কেউ যদি এন্তার বেহালা বাজিয়ে চলে, ‘এন্তার’ বোঝায় লাগাতার। এ-শব্দটিও এসেছে পোর্তুগিজ entaro থেকে, যার অর্থ সমগ্র–entire। বাংলায় এসে শব্দটির অর্থ পরিবর্তন ঘটেছে, সম্ভবত ‘নিরন্তরের’ সঙ্গে ধ্বনিসাদৃশ্যের প্রভাবে। আরো বিবিধ বিষয় জানার জন্য : শুদ্ধ বানান চর্চা। 

আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ লিংক: 

যবন শব্দের ব্যুৎপত্তি 

 

গ্রন্থ সহায়তা :

১। সংসদ বাংলা অভিধান–সাহিত্য সংসদ, কলকাতা (২০০৩)

২। বাংলা শব্দের উৎস সন্ধানে–বিমলেন্দু দাস, যোগমায়া প্রকাশনী, কলকাতা (২০১০)

৩। বাঙ্গাঁলা ভাষার ইতিবৃত্ত–মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মাত্তলা ব্রাদার্স, ঢাকা (২০১২)

error: Content is protected !!