পাকিস্তান (Pakistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (এশিয়া)

ড. মোহাম্মদ আমীন

পাকিস্তান (Pakistan)

পাকিস্তানের সরকারি নাম ইসলামি রিপাবলিক পাকিস্তান। দক্ষিণ এশিয়ায় অবস্থিত এ দেশটি দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত। এর দক্ষিণে আরব সাগর, পশ্চিমে আফগানিস্তান ও ইরান, পূর্বে ভারত এবং উত্তর-পূর্বে চীনের তিব্বত ও শিঞ্চিয়াং এলাকা অবস্থিত। ইসলামাবাদ পাকিস্তানের রাজধানী এবং করাচি বৃহত্তম শহর।

উর্দু শব্দ পাক (Pak)) ও পারসি প্রত্যয় (-stan) -স্তান যুক্ত হয়ে পাকিস্তান নামের উদ্ভব। উর্দু ভাষায় পাক শব্দের অর্থ পবিত্র এবং পারসি -স্তান (-stan) শব্দের অর্থ দেশ, ভূমি বা জমি। সুতরাং পাকিস্তান শব্দের অর্থ পাকজমি বা পাকদেশ। ক্যাম্ব্রিজের ছাত্র ও মুসলিম জাতীয়তাবাদী নেতা চৌধুরী রহমত আলী খান পাকিস্তান নামের উদ্ভাবক। তিনি এ নামটি উদ্ভাবন করেন এবং প্রথম ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ জানুয়ারি নাউ এন্ড নেভার (Now or Never) নামের একটি পুস্তিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি দেশটির বিভিন্ন রাজ্য, অঞ্চল ও স্বতন্ত্র আবাস-ভূমির নামের সমন্বয়ে পাকিস্তান নামটি রাখার প্রস্তাব করেন। ব্যাখ্যায় বলেন, P=Punjab, A=Afghania (Ali’s preferred name for the Khyber Pakhtunkhwa), K=Kashmir, S=Sindh এবং Balochistan এর প্রত্যয় বা শেষাংশ -stan নিয়ে পাকিস্তান নাম গঠন করা হয়েছে।। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান নামক গ্রন্থে রহমত আলী তার দেওয়া পাকিস্তান নামের ব্যাখ্যা আরও বিস্তৃত করে বলেন, পাকিস্তান অর্থ পবিত্র জাতির পিতৃভূমি the Fatherland of the Pak Nation)| )। তিনি এ গ্রন্থে পাকিস্তান নামের যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সেটি হচ্ছে : P=Punjab, A= Arabi, K=Kashmir, I=Islami, S=Sindh, T=Tamam log (roughly the modern central-Asian states), A=Afghanistan and N=BalochistaN।তবে এ ব্যাখ্যা বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কারণ আফগানিস্তান পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তবু সে নামটি রাখা হয়েছিল। অন্যদিকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলেও এ দেশের নাম ব্যাখ্যায় ছিল না। এ সমালোচনা হতে উত্তরণের জন্য ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, পাক মানে পবিত্র আর স্তান মানে দেশ। সুতরাং পাকিস্তান মানে পবিত্র দেশ।

প্রাচীন সিন্ধু অঞ্চল বর্তমান পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশ ছাড়া বাকিটা নিয়ে গঠিত ছিল। প্রাচীনকালে নব্য প্রস্তর যুগীয় মেহেরগড়সহ অনেক উন্নত সভ্যতার উৎপত্তিস্থল পাকিস্তান। ব্রোঞ্জ যুগে (২৮০০- ১৮০০খ্রিস্টপূর্ব) সিন্ধু সভ্যতায় হরপ্পা ও মহেঞ্জো-দাড়ো নামে দুটি উন্নত নগর ছিল। বৈদিক যুগে (১৫০০ – ৫০০খ্রিস্টপূর্ব) ইন্দো আর্যদের মাধ্যমে এখানে হিন্দুদের গোড়াপত্তন হয়। যারা ক্রমান্বয়ে পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। মুলতান শহর হিন্দুদের গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতীয় উপমহাদেশ বিভাজনের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি দেশের জন্ম হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান থেকে পূর্ব-পাকিস্তান পৃথক হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

পাকিস্তাানের মোট আয়তন ৮,৮১,৯১২ বর্গ কিলোমিটার বা ৩,৪০,৫০৮ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় অংশের পরিমাণ ৩.১%। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, মোট জনসংখ্যা ১৯,১৭,১০,০০০ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার জনসংখ্যা ২৬০.৮। আয়তন বিবেচনায় পাকিস্তান পৃথিবীর ৩৬-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। তবে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এর অবস্থান ৫৫। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, পাকিস্তানের জিডিপি (পিপিপি) ৯২৮.৪৩৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার (২৬-তম) এবং মাথাপিছু আয় ৪,৮৮৬ ইউএস ডলার (১৩৬-তম)। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ২৫০.১৩৬ বিলিয়ন ইউএস ডলার (৪২-তম) এবং মাথাপিছু আয় ১,৩৪২ ইউএস ডলার (১৫৩)। পাকিস্তানের মুদ্রার নাম পাকিস্তানি রুপি। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তান ইসলামি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।

পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশ্রেণি পাকিস্তানে অবস্থিত। এরমধ্যে হিমালয় ও হিন্দুুকুশ পর্বতশ্রেণি উল্লেখযোগ্য। পৃথিবীর সুউঁচ্চ ১৪টি পর্বত শৃঙ্গের মধ্যে ৪টি পাকিস্তানে অবস্থিত। কে-২ পৃথিবীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ পাকিস্তানে অবস্থিত।
পাকিস্তানের বালুচিস্তানে (Balochistan) আরব সাগরের দক্ষিণ-পশ্চিম তটরেখায় অবস্থিত গোয়াদার (Gwadar) বন্দর পৃথিবীর বৃহত্তম গভীর সমুদ্র বন্দর। চীনের সহযোগিতায় পাকিস্তান এ বন্দরকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছে।

পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য কী জানেন? সমুদ্র সমতল হতে ১৫,৩৯৭ ফুট উঁচুতে নির্মিত চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে সংযুক্ত কারাকোরাম সড়ক। এটি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ও চীনের সহযোগিতায় ১৫ বছরে নির্মিত হয়েছে। এটি মানুষের তৈরি পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুস্থান দিয়ে বয়ে যাওয়া পাকা (pave) আস্তর্জাতিক সড়ক । সড়কটি পাকিস্তানকে চায়নার জিংজিয়াং প্রদেশের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

খেওয়ারা লবণ খনি (Khewara Salt Mine পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং পাকিস্তানের প্রাচীনতম লবণ খনি। খ্রিস্টপূর্ব ৩২০ অব্দে মহাবীর আলেকজান্ডারের সৈন্যরা এ খনি আবিষ্কার করেন। প্রতিবছর এ খনি হতে ৩,৫০,০০০ টন লবণ উৎপন্ন হয়। এখানে সংরক্ষিত লবণের পরিমাণ ৬০০ মিলিয়ন টন।

বিখ্যাত সান্দর চূড়া পাকিস্তানের গিলগিটে অবস্থিত। এটাকে পৃথিবীর ছাদও বলা হয়। এটি সমুদ্র সমতল হতে ১২,২০০ ফুট ওপরে। এখানে অবস্থিত পোলো গ্রাউন্ড পৃথিবীর সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত পোলো গ্রাউন্ড হিসাবে স্বীকৃত। পাকিস্তান ও ভারত সীমান্তে অবস্থিত থার (Thar) মরুভূমি পৃথিবীর নবম বৃহত্তম মরুভূমি। এটি প্রায় ১০ হাজার বছরের পুরানো মরুভূমি। একসময় এখানে পানির উৎস ছিল।

বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম একক সেচব্যবস্থা পাকিস্তানে অবস্থিত। এ সেচব্যবস্থার মাধ্যমে ১৪.৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে চাষ করার সুবিধা সৃষ্টি করা হয়েছে। পুরো সেচব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখার জন্য ৫৮,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল খনন করা হয়েছে। এখানে রয়েছে ১৯টি ব্যারেজ, ১২টি আন্তনদী সংযোগ এবং ৪৩টি স্বয়ংসম্পূর্ণ সেচখাল।

বিশ্বের মোট ফুটবল উৎপাদনেরে ৫০% নির্মিত হয় পাকিস্তানে। পাকিস্তানের শিয়ালকোট (Sialkot) ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতের জন্য বিখ্যাত। হাতে সেলাই-করা ফুটবল এ শহরের একটি কোম্পানির ট্রেডমার্ক করা। ওয়ার্ল্ডকাপ বর্ষে ৬০ মিলিয়ন হস্ত-সেলাই ফুটবল শিয়ালকোটের একটি ছোট কারখানা হতে প্রস্তুত হয়। ফিফা বিশ্বকাপ/২০১৪ এর জন্য ৪২ মিলিয়ন ব্রাজুকা (Brazuca) ফুটবল ব্রাজিলে রপ্তানি করা হয়েছে। নাসা পাকিস্তানের শিয়ালকোটে প্রস্তুত এ ফুটবল পরীক্ষা করে বলেছে- এটি বিশ্বে এ পর্যন্ত নির্মিত সবচেয়ে ভালো ফুটবল।

পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তি অর্জনকারী বিশ্বের প্রথম মুসলিম রাষ্ট্র। ১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মে হতে পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশ হিসাবে গণ্য।

পাকিস্তানে ইদিহ ফাউন্ডেশনের আওতায় পরিচালিত অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস বিশ্বের সবচেয়ে বড় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক সার্ভিস। ইদিহ ফাউন্ডেশন (Edhi Foundation) একটি এনজিও। এ ফাউন্ডেশন স্বাস্থ্য সেবা ও এতিমদের আশ্রয় প্রদানের কাজ করে থাকে। আবদুল সাত্তার ইদিহ্ একটি ছোট কক্ষ থেকে সেবা কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। এখন সারা পাকিস্তানের সংস্থাটির ৩০০ কেন্দ্র রয়েছে। পাকিস্তান ছাড়াও যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান ও চায়নায় এ ফাউন্ডেশন কাজ করছে।

গত ৫ বছরের মধ্যে পাকিস্তানে শিক্ষিতের হার ২৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার হার বৃদ্ধিতে এটি পৃথিবীর সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান। পৃথিবীর সবচেয়ে কনিষ্ঠ মাইক্রোসফ্ট সনদপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞ আরফা করিম ও বাবর ইকবাল। দুজনে পাকিস্তানের নাগরিক। মিলিটারি ফোর্স বিবেচনায় পাকিস্তান পৃথিবীর ষষ্ঠ বৃহত্তম দেশ। জাতীয় সংগীতের সুর বিবেচনায় পাকিস্তানের জাতীয় সংগীতের সুর শ্রেষ্ঠ তিনটি জাতীয় সংগীতের মধ্যে প্রথম।

পাকিস্তানের পাইলটদের বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষিত বৈমানিক বলা হয়। এশিয়ার সর্বোচ্চ রেল স্টেশন এ দেশে অবস্থিত। পাকিস্তানের দুই ভাই প্রথম পিসি ভাইরাস তৈরি করেছে। যা বিশ্ব কম্পিউটার জগতকে ভাইরাসের কবলে নিপতিত করে। বিংশ শতকের শ্রেষ্ঠ কাওয়ালি গায়ক ওস্তাদ নুসরাত ফতেহ আলী খান পাকিস্তানের নাগরিক।

পাকিস্তানের শাহ ফয়সাল মসজিদে একসঙ্গে ১ লাখ লোক নামাজ আদায় করতে পারে। ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে এটার নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তখন ওই শহরের সব নাগরিক একসঙ্গে এ মসজিদে নামাজ আদায় করতে পারত। অবশ্য এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তান পৃথিবীর কয়েকটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বিধ্বস্ত দেশের অন্যতম। প্রায় প্রত্যেকটি মুসলিম দেশের মতো এখানেও মানুষ চরম অনিশ্চয়তা ও অশান্তিতে বাস করে। মসজিদে হয় বোমাবাজি, সম্প্রদায় কন্দোল এবং গোষ্ঠীগত বিরোধ লেগেই থাকে সবসময়।


লেবানন (Lebanon) : ইতিহাস ও নামকরণ

নর্থ কোরিয়া ( North Korea) : ইতিহাস ও নামকরণ

নেপাল (Nepal) : ইতিহাস ও নামকরণ

ওমান (Oman) : ইতিহাস ও নামকরণ

পাকিস্তান (Pakistan) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

error: Content is protected !!