পাটিগণিত ও বীজগণিত: বীজগণিত কেন; গাছগণিত বা ফলগণিত নয় কেন

ড. মোহাম্মদ আমীন

 
পাটিগণিত: পাটি ও গণিত মিলে পাটিগণিত। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা পাটি শব্দের  পাটি অর্থ শৃঙ্খলা, সংখ্যা, সারি, প্রণালি, ক্রম, মাদুর, শ্রেণিবদ্ধ জনপদ প্রভৃতি। পাটিগণিতের ‘পাটি’ শব্দের অর্থ সংখ্যা এবং গণিত অর্থ— গণনা করা হয়েছে এমন, সংখ্যাত, গোনাগাঁথা গণনার দ্বারা স্থিরীকৃত। সুতরাং, পাটিগণিত অর্থ এমন একটি হিসাব বা সাংখ্যিক কৌশল যদ্দ্বারা  অঙ্কের ভেতর যে যে সংখ্যা দেওয়া আছে তা দিয়েই সমস্যার সমাধান করা হয়। পাটিগণিতে সব সংখ্যা  ব্যক্তি।  ০ ১ ২ ৩  ৪ ৫ ৬ ৭ ৮ ৯ এবং এসব পাটি দিয়ে গঠিত সংখ্যা বা পাটি  দিয়ে পাটিগণিতের সকল সমস্যার সমাধান করা হয়।  সংখ্যা ছাড়া এখানে অব্যক্ত কোনো রাশি কল্পনা করা হয় না। তাই এর নাম পাটিগণিত। সহজ কথায়, গণিতের যে শাখায় শুধু ব্যক্ত বা বোধ্য সংখ্যা বা পাটি ব্যবহার করে সমস্যার সমাধান করা হয় তাকে পাটিগণিত বলে।
 
বীজগণিত: বীজগণিত শব্দটি লাতিন Algebra শব্দের প্রতিশব্দ। লাতিন Algebra শব্দটি আরবি আল্-জাবের থেকে উদ্ভূত। আল জাবের কথার আক্ষরিক অর্থ ভাঙ্গা হাড় জোড়া দেওয়া, সমন্বয় সাধন, সমন্বিতকরণ, একত্রীকরণ প্রভৃতি। তবে গণিতে শব্দটির অর্থ সমন্বয় বা একত্রীকরণ। আরবীয় গণিতজ্ঞ আল-খাওয়ারেজমির গণিত গ্রন্থ al-Kitab al-Mukhtaṣar fī Ḥisab al-Jabr wal-Muqabalah বা Ilm al-jabr wa l-muqabala  বা লাতিন Liber Algebrae et Almucabola  গ্র ন্থটি  Al-Jabr (ٱلْجَبْر) নামে বহুল পরিচিত ।  ৮২০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রচিত Al-Jabr গ্রন্থে আল-খাওয়ারেজমি প্রথম বীজগণিত সম্পর্কে আলোচনার সূত্রপাত করেন। শব্দটির পুস্তকনামীয় অর্থ সমন্বয়, সমন্বয় সাধন, সমন্বিত করা, একত্রীকরণ প্রভৃতি। বীজগণিতে সমীকরণে দুটি অংশ থাকে।  দুটি অংশ বা সমীকরণকে সমন্বিত করে হিসাব করাই এই গণিতের কাজ। তাই একে খাওয়ারজেমি আল-জাবের নাম দিয়েছেন। এই   ‘আরবি নাম আল-জাবের (الجبر) হতে পরবর্তীকালে লাতিন অ্যালজেব্রা নামের উদ্ভব। 
 
 
বীজগণিতে কেন: কেন গাছগগণিত বা ফলগণিত নয়: বীজগণিতে ব্যক্ত  ও অব্যক্ত— উভয় প্রকার সংখ্যা বা রাশি চলক-ধ্রুবক প্রভৃতি রয়েছে। দুই পাশের কল্পিত বা অব্যক্ত রাশির সমানকরণ বা সমীকরণ বীজগণিতের মূল বিষয়। সমীকরণের বিভিন্ন অংশকে একত্র ও সমন্বিত করে সমস্যার সমাধান করাই বীজগণিতের কাজ। ক্ষুদ্র বা উৎসকে বিস্তৃত করে এখান থেকে প্রত্যাশিত বিষয় বা ফল লাভ এর উদ্দেশ্য। বীজের মধ্যে গাছের রহস্য লুকিয়ে থাকে। তেমনি এই গণিতে যা লুকিয়ে থাকে  অজানা রাশি বা মূলে। এই গণিতের উদ্দেশ্য বীজ বা রুট বা মূল থেকে ফল ও গাছ পাওয়া। তাই এর নাম বীজগণিত। আরও বিস্তারিতভাবে বলা যায়: বীজগণিতে সমীকরণের মধ্যে ব্যক্ত রাশির সঙ্গে অজানা x,y,z প্রভৃতি অজানা রাশিও থাকে। সমীকরণের সাহায্যে এসব অজানা রাশির মান বের করাই হচ্ছে  বীজগণিতের উদ্দেশ্য। এই অজানা রাশিগুলোকে বলা হয় মূল বা root বা বীজ বা চলক। এই গণিতের সকল প্রকার হিসাব নিকাশ ও সূত্রাবলির কাজ  এদের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়।  তাই এর নাম বীজগণিত।
 
উপসংহার:পাটিগণিত নির্ভর করে দশটি মৌলিক সংখ্যা (০-৯) বা পাটি বা মৌলিক সংখ্যা দিয়ে গঠিত অন্যান্য ব্যক্ত সংখ্যার ওপর। বীজগণিত অজানা রাশি বা চলক বা ধ্রুবক বা প্রতীকের বৈশিষ্টের ওপর নির্ভর করে। এবং এসব দিয়ে সমীকরণ তৈরি করে তার মান নিরুপণ করা হয়। এই অজানা রাশি বা প্রতীক-ই হলো বীজ, তার থেকেই বীজগণিত নাম এসেছে। বীজের মধ্যে গাছের রহস্য লুকিয়ে থাকে। তেমনি এই গণিতের অজানা রাশি বা মূল বা বীজে সমাধান লুকিয়ে থাকে।  এই গণিতের উদ্দেশ্য বীজ বা রুট বা মূল থেকে ফল ও গাছ পাওয়া। তাই এর নাম বীজগণিত।
 
 
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!