পালক প্রতিপালক; ভিতর ভেতর; জিজ্ঞেস জিজ্ঞাসা; অভ্যাস ও অভ্যেস; খড়ম, খড়ামি, খড়ুমে; স্ত স্থ

ড. মোহাম্মদ আমীন
 
 
 

পালক ও প্রতিপালক

‘প্রতি’ সংস্কৃত উপসর্গ। এই সংস্কৃত উপসর্গটি অন্য শব্দ বা শব্দাংশের সঙ্গে যুক্ত হলে ‘বিপরীত’ বা ‘বিরোধী’ অর্থ দেয়। যেমন: প্রতিবাদ, প্রতিকণা, প্রতিপক্ষ ইত্যাদি। ক্ষেত্রবিশেষে ‘পরোক্ষ’ বা ‘তুল্য’ অর্থ প্রদানেও এর প্রয়োগ দেখা যায়। যেমন: “প্রতিচ্ছবি” ‘প্রতিরূপ’ প্রতিবিম্ব। এখানে, ‘প্রতিচ্ছবি’ সরাসরি ‘ছবি’ নয়, কিন্তু “ছবি’ নামক ধারণাটির “পরোক্ষ ইঙ্গিত”। একইভাবে ‘পালক’ হলেন তিনি, যিনি খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান নিরাপত্তা ইত্যাদি প্রত্যক্ষভাবে বা সরাসরি প্রদান করেন। কিন্তু ‘প্রতিপালক’ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, নিরাপত্তা ইত্যাদি সরাসরি প্রদান করেন না, ঘুরিয়ে বা মাধ্যম দিয়ে বা পরোক্ষভাবে প্রদান করেন। যেমন : স্রষ্টা আমাদের ‘প্রতিপালক’। পালক হতে আসে প্রতিপালক।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত প্রতিপালক (প্রতি+√পালি+ইক্) শব্দের অর্থ ঈশ্বর। বিশেষণে শব্দটি ‘প্রতিপালনকারী’। প্রতিপালক শব্দের উৎপত্তিকে এভাবেও বলা যায় : ‘তুল্য’ বা ‘সমান’ অর্থে ‘প্রতি’ উপসর্গ যুক্ত হয়ে ‘পালক’ শব্দের অর্থকে বিশেষায়িত করেছে। তবে, ‘পালক’ শব্দের আর একটি অর্থ পাখির পালক। পাখিরা পালকের সাহায্যে উড়ে। এটি তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগী।
 

ভিতর ভেতর

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত অভ্যন্তর থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘ভিতর’ শব্দ হচ্ছে ‘ভেতর’ শব্দের সাধু রূপ।শব্দটির অর্থ হলো : মধ্য, অভ্যন্তর, অন্দর। এর বৈশেষণিক রূপ : ভেতরের, অন্তবর্তী প্রভৃতি। ‘জিজ্ঞাসা’ ও ‘জিজ্ঞেস’; দুটোই শুদ্ধ। ‘জিজ্ঞাসা’ হচ্ছে সংস্কৃত এবং ‘জিজ্ঞেস’ তদ্ভব। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে সংস্কৃত জিজ্ঞাসা শব্দের অর্থ জানার ইচ্ছা, কৌতূহল, প্রশ্ন (জিজ্ঞাসা করা), তত্ত্বানুসন্ধান, জ্ঞানানুসন্ধান প্রভৃতি। একই অভিধানমতে, সংস্কৃত জিজ্ঞাসা শব্দ থেকে উদ্ভূত জিজ্ঞেস শব্দের অর্থ জিজ্ঞাসা। সুতরাং উভয় শব্দের অর্থ অভিন্ন।

খড়ম, খড়ামি, খড়ুমে

সংস্কৃত কাষ্ঠময় থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা খড়ম অর্থ (বিশেষ্যে) কাঠের পাদুকাবিশেষ যার মধ্যভাগ মাটি স্পর্শ করে না। একসময় এটিই ছিল একমাত্র পাদুকা। পায়ে পরে হাঁটলে খটখট আওয়াজ হতো। খড়মকে বলা হয় পৃথিবীর প্রথম পাদুকা। এখন আর দেখা যায় না।
রবীন্দ্রনাথের জুতা আবিষ্কার কবিতায় রাজার চরণ ঢাকার জন্য কি খড়ম ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল? না মনে হয়। কবিতায় চামার কুল-পতি রাজার চরণদুটো ঢেকে দিয়েছিল চামড়া দিয়ে, এমনই লেখা আছে কবিতায়:
“নিজের দুটি চরণ ঢাকো তবে
ধরণী আর ঢাকিতে নাহি হবে।’
—– —– ——
রাজার পদ চর্ম-আবরণে
ঢাকিল বুড়া বসিয়া পদোপান্তে।
মন্ত্রী কহে, ‘আমারো ছিল মনে
কেমনে বেটা পেরেছে সেটা জানতে।’”
খড়ম-যোগে গঠিত শব্দ: খড়মপেটা, খড়মপেয়ে, খড়ুমে, খড়ামি প্রভৃতি। যারা খড়ম প্রস্তুত করত তাদের খড়ামি বলা হতো। খড়মপেয়ে অর্থ (বিশেষণে) পায়ের তালুর মাঝের অংশ মাটি স্পর্শ করে না এমন পা, খড়মের মতো পা-বিশিষ্ট।
“দাদু আসে আওয়াজ করে, খটখট খট খড়ম
তাই না শুনে লজ্জা দাদি ,ঘোমটা টানে শরম “
 
স্ত ও স্থ
যে সকল শব্দের শেষে ‘দন্ত্য-স’ আছে সে সকল শব্দের শেষে ‘ত’ কিংবা সংস্কৃত ‘ক্ত’ প্রত্যয়যুক্ত করা হলে শব্দের শেষে ‘স্ত’ হবে এবং শব্দটি বিশেষণে পরিণত হয়। যেমন: বিন্যাস- বিন্যস্ত, আশ্বাস- আশ্বস্ত, সন্ত্রাস- সন্ত্রস্ত ইত্যাদি।
শব্দের অর্থ ‘যে বা যে স্থানে’ প্রকাশ করলে শব্দটির সঙ্গে ‘স্থ’ যুক্ত হবে।
যেমন: গ্রহস্থ, কণ্ঠস্থ ।
কোন শব্দে ‘স্ত’ বা ‘স্থ’ বসানো নিয়ে ঝামেলায় পড়লে প্রথমে শব্দটি হতে ‘স্থ’ বাদ দিয়ে দিন। এরপর অবশিষ্ট শব্দাংশ অর্থবোধক হলে নিশ্চিত ‘স্থ’ বসানো যাবে, অন্যথায় ‘স্ত’
যেমন: অধীনস্থ, অন্তঃস্থ, নিকটস্থ, পকেটস্থ, দ্বারস্থ, পরিবারস্থ, কণ্ঠস্থ, ভূগর্ভস্থ, মনস্থ, মুখস্থ, সভাস্থ, সমাধিস্থ, মনস্থ ইত্যাদি শব্দগুলো হতে ‘স্থ’ বাদ দিলেও প্রত্যেকটি শব্দ অর্থবোধক থাকে।
অভ্যস্ত, অস্ত, আশ্বস্ত, নিরস্ত, ন্যস্ত, পরাস্ত, পর্যুদস্ত, প্রশস্ত শব্দগুলো হতে ‘স্ত’ বাদ দিলে শব্দগুলো আর অর্থবোধক থাকে না।
 
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
error: Content is protected !!