পোস্ট শব্দের বাংলা

ড. মোহাম্মদ আমীন
ফেসবুকে পোস্ট হিসেবে যেসব লেখা, চিত্র, অডিও-ভিডি বা অন্যকিছু প্রকাশ করা হয় সেটার বাংলা কী অনেকে জানেন না। ইংরেজি পোস্ট (post) শব্দ দিয়ে তা প্রকাশ করা হয়। অথচ ফেসবুকে ব্যবহৃত ইংরেজি ‘পোস্ট’ শব্দের একটি সুন্দর বাংলা আছে- যা ইংরেজি পোস্ট শব্দের চেয়ে অনেক বেশি সুনির্দিষ্ট, কার্যকর অর্থদ্যোতক, শ্রুতিমধুর এব সহজ। শব্দটি হচ্ছে : যযাতি।
ইংরেজি post শব্দের অর্থ ডাকঘর, খাম, আসন, কর্মচারীর পদ, ডাকগাড়ি, গঁজ, বাণিজ্যস্থল, কর্মচারীর চাকুরি, নির্দিষ্ট খানা, নির্দিষ্ট অবস্থানস্থল, আড্ডায় স্থাপন করা, ডাকঘরে দেওয়া, ডাকব্যবস্থা, ডাকবক্স, ত্বরা, পিছনে, পরে, পত্র প্রেরণ করা প্রভৃতি ছাড়াও আরও অনেক কিছু হতে পারে। কিন্তু ‘যযাতি’ শব্দের অর্থ অনেক সুনির্দিষ্ট এবং ব্যুৎপত্তি বিবেচনায় বেশ প্রাসঙ্গিক। বাংলার অনেক শব্দের মতো ‘যযাতি’ শব্দটিও ভারতীয় পুরাণ থেকে প্রাসঙ্গিক ঘটনার অনুকূল পরিক্রমায় সৃষ্ট একটি অর্থবহুল শব্দ। এখন ‘যযাতি’ শব্দটি কীভাবে সৃষ্টি হলো এবং কেনই বা ফেসবুক প্রসঙ্গে ইংরেজি ‘পোস্ট’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘যযাতি’ হলো তা বিশ্লেষণ করা যাক :
ভরতীয় পুরাণ শব্দটির উৎস। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি মতে– চন্দ্র বংশের মহারাজা ‘যযাতি’  হচ্ছেন নহুষের পুত্র এবং পাণ্ডবদের অন্যতম আদিপুরুষ। যযাতির দুই স্ত্রীর ছিল- দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের কন্যা দেবযানী ও দৈত্যরাজ বৃষপর্বার কন্যা শর্মিষ্ঠা। দেবযানীর অজ্ঞাতে যযাতি শর্মিষ্ঠার সঙ্গে মিলিত হন।  বিষয়টি দেবযানী শুক্রাচার্যকে বলে দেন। শুক্রাচার্যের অভিশাপে যযাতি অকালে জরাগ্রস্থ বা নপুংসক হয়ে যান। চার পুত্রের মধ্যে শুধু কনিষ্ঠ পুত্র যযাতির জরা নিতে রাজি হলেন। পুরুকে জরা দিয়ে যযাতি সহস্র বছর যাবৎ ভোগ, প্রজাপালন এবং ধর্ম-কর্ম করলেন। তারপর পুরুকে রাজত্ব দিয়ে বনবাসে চলে গেলেন। সেখান থেকে কিছুকাল পরে সুরলোকে গমন করলেন।
 
সুরলোকে থাকাকালীন আত্মপ্রসংসা করায় ইন্দ্রের আজ্ঞায় তিনি স্বর্গচ্যূত হন। তবে, ভূতলে না পরে যযাতি কিছুকাল অন্তরীক্ষে অষ্টক, প্রতর্দন, বসুমান বা বসুমনা ও শিবি – এই চারজন রাজর্ষির সঙ্গে বিবিধ ধর্মালাপ করে কালাতিপাত করতে থাকেন।তাঁরা সবাই ছিলেন যযাতির কন্যা মাধবীর পুত্র। ধর্মালোচনা কালে মাধবী ও গালব মুনি এসে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন এবং সকলে নিজেদের তপস্যার কিছু ভাগ যযাতিকে দান করায় তিনি আবার স্বর্গে ফিরে যেতে পারলেন। কথিত হয়, তাদের এই অবস্থান ছিল আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি বিস্তারের আন্তরীক্ষক ক্ষেত্র। তাদের চিন্তাভাবনা বা ধর্মালাপ কোনো কঠিন বস্তুতে লিখিত হতো না। এগুলো বিশেষ পদ্ধতিতে অন্তরীক্ষে লিখিত হতো এবং যযাতি বিশেষ কৌশলে লেখাগুলোকে প্রয়োজনীয় চিহ্নাদি-সহ  অন্তরীক্ষেই সংরক্ষিত করে রাখতেন। এখান থেকে তিনি তার প্রার্থনা এবং সম্মিলিতি ধর্মীয় ভাবনা স্বর্গালোকে প্রেরণ করতেন। যযাতির চিন্তা, ধর্মালাপ ও লেখা স্বর্গালোকে প্রেরণকে সাধারণভাবে বলা হতো- যযাতি।
অন্তরীক্ষ অনুকূল হলে যখনই ইচ্ছা তখনই যযাতি, অন্তরীক্ষে বসবাসকারী রাজর্ষিবর্গ এবং এমনকি স্বর্গমত্যের অনেকেও ওই লেখা দেখতে পেতেন। অন্তরীক্ষে সম্পাদিত যযাতির  লেখালেখি এবং তা সংরক্ষণ ও পরিশেষে যযাতির স্বর্গারোহণের সঙ্গে বর্তমান ফেসবুক-সহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রদত্ত পোস্ট-এর মিল থাকায় বাংলায় এর নাম করা হয়েছে যযাতি।
সূত্র : শব্দের ব্যুৎপত্তি ও প্রমিত বানান সহায়িকা, ড. মোহাম্মদ আমীন।
বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!