প্রতিদিন খসড়া-২

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পোস্টের (প্রতিদিন খসড়া-২) সংযোগ: https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-২/

প্রতিদিন খসড়া-২

শুবাচে যযাতি হিসেবে প্রকাশের জন্য এই পৃষ্ঠায় খসড়া রাখা হয়। এখানকার খসড়া শুবাচে এবং ওয়েবসাইটে চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়। এই পৃষ্ঠার লেখাগুলো খসড়ামাত্র।

                                                                                                                                    ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রতিদিন খসড়া-১

প্রতিদিন খসড়া-২

প্রতিদিন খসড়া-৩

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — 

তড়িৎ বনাম ত্বরিত

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, তড়িৎ শব্দের উচ্চারণ: তোড়িত্‌।  ত্বরিত শব্দের উচ্চারণ: তোরিতো। অভিধানমতে, তড়িৎ অর্থ— (বিশেষ্যে) বিদ্যুৎ, ক্ষণপ্রভা। ত্বরিত অর্থ— (বিশেষণে) ক্রমশ গতি বাড়ানো হয়েছে এমন। দুটোই তৎসম শব্দ।
 
ধরনা কী?
যে বাঁশ ধরে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া হয়— এককথায় তাকে ধরনা বলে।
ধরনায় হাত রেখে ঢেঁকিতে দাও পাড়,
নইলে সোনা ব্যথা পাবে ভেঙে যাবে ঘাড়।
ধরনা দেশি শব্দ। অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত ধরনা শব্দের অর্থ— যে বাঁশ ধরে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া হয়; কাঁচাবাড়ির ছাদ যে কাঠের ওপর ভর করে থাকে, আড়া, কড়ি; সাঁকোর পার্শ্ববর্তী হাতল (পাড় হওয়ার সময় যা ধরে ভারসাম্য রক্ষা করা হয়)।
 
চুল ধুলেও ময়লা যায় না।
 
Black will take no other hue= চুল ধুলেও ময়লা যায় না।
অনেকে ইংরেজি “Black will take no other hue.” প্রবাদের বঙ্গানুবাদ করেন, “কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না।” কয়লার কালোটাকে ময়লা মনে করে এমন বঙ্গানুবাদ। এটি অনুবাদ হয়নি, হনুবাদ হয়েছে। যে করেছে, তার কয়লার বৈশিষ্ট্য আর গুণাবলি সম্পর্কে ধারণা ছিল না। কিন্তু পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার জন্য এমন হনুবাদের অনুবাদটাই শিখতে হয়েছে, লিখতে হয়েছে শুদ্ধ গণ্যে।
 
এ প্রবাদটি “জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভালো” প্রবাদের বিপরীত এবং প্রয়াসের মাধ্যমে শিক্ষা, জ্ঞান ও আত্মোন্নয়ন অর্জনের প্রতিকূল প্রত্যয়। প্রবাদটি সত্য হলে একজন অবোধ শিশু অধ্যবসায়ের মাধ্যমে বিশ্বখ্যাত পণ্ডিত হতে পারত না। কেউ রবীন্দ্রনাথ হয়ে জন্মায় না। ধুতে ধুতে হয়। আবার সবাই রবীন্দ্রনাথও হতে পারে না।
 
কয়লার কালো ময়লা নয়। এই কালোই হীরক উৎপাদেনের পূর্বশর্ত। ওই কৃষ্ণত্বে কয়লার অপার সৌন্দর্য আর সৃষ্টিশীলতার সমূহ অর্জন নিহিত। কেউ কয়লা কিনতে গিয়ে ময়লা বলে সাদা খড়িমাটি কিনে এনেছে?
 
কালো বলে কি মাথার কালো চুলগুলো সাদা রং বা সাদা পরচুলা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়? বরং আরও চুকচুকে কালো করার জন্য সাধনা করা হয়, সাধনা ঔষধালয়ে গিয়ে।
 
কয়লা পোড়ালে কারখানা; চুল পোড়ালে আবর্জনা। কয়লার বুকে থাকে হীরা, চুলের বুকে থাকে খুশকি-পীড়া । কয়লার কালো যদি ময়লা হয়, তাহলে কলমের কালি কিংবা চোখেরমনি ময়লা হবে না কেন? আমি প্রতিদিন চুল ধুই, খুশকি যায় না। যদি ‘কালো’ ময়লা হয়, তাহলে ,“Black will take no other hue.” প্রবাদের উত্তম অনুবাদ হতে পারে: চুল ধুলেও ময়লা যায় না।
 
  • রসাবাদ: রসায়ন ও প্রবাদ শব্দের জোড়কলম বা খিচুড়ি শব্দ।
 
 
 
শরানে শব্দের অর্থ: ওরে লাল ধুলোর শরানে ওরে শরানে
“বড়ো লোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল
“ওরে লাল ধুলোর শরানে ওরে শরানে
ভালোবাসা দাড়িন ছিল মাথার সিঁথেনে”
এখানে শরানে শব্দের অর্থ কী?
কথাগুলো রতন কাহার-এর ‘বড়ো লোকের বিটি লো’ গানের দুটি পঙ্‌ক্তি। এখনে বর্ণিত শরান শব্দটি সরণি (উচ্চারণ শরোনি) শব্দের আঞ্চলিক-কাব্যিক-কোমল রূপ। তৎসম সরণ শব্দের অর্থ পথ, রাস্তা। সমার্থক সরণি। যেমন: তাজউদ্দিন সরণি- – -।
গানে বর্ণিত শরানে শব্দের অর্থ— পথে, রাস্তায়। পশ্চিমবঙ্গে এবং বাংলাদেশের কিছু কিছু আদিবাসীর মধ্যে শব্দটির ব্যবহার দেখা যায়।
তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ উপন্যাসে পরিবেশিত বেদেদের গানে শরান শব্দটির উপস্থিতি বেশ হৃদয়গ্রাহী মমতায় বর্ণিত—“ও তুই যেতে শরানে, ধাক্কা লেগেছে পরানে।”
 
বেলুন বনাম বেলুন: বেলুন শব্দের অর্থ
 
অভিধানে দুটি বেলুন দেখা যায়। একটি সংস্কৃত উৎসের বেলুন এবং অন্যটি ফরাসি উৎসের বেলুন। সংস্কৃত বেল্লন থেকে উদ্ভূত বেলুন অর্থ— (বিশেষ্যে) রুটি বেলার জন্য ব্যবহৃত কাঠের তৈরি গোলাকার ও মসৃণ দণ্ডবিশেষ; Cylinder. ফরাসি Balloon থেকে উদ্ভূত বেলুন অর্থ— (বিশেষ্যে) গরম বাতাস ভরা ফানুস থেকে ঝোলানো ঝুড়ি যাতে চড়ে মানুষ আকাশপথে ভ্রমণ করতে পারে; সাজসজ্জা বা খেলনা হিসেবে ব্যবহৃত বাতাসভর্তি হালকা প্লাস্টিকের থলি।বেলুন (balloon) শব্দের বাংলা অর্থ কী? বেলুন ফরাসি উৎসের বাংলা শব্দ। এটি ফরাসি উৎসের বাংলা শব্দ হিসেবে বাংলা অভিধানে অন্তর্ভুক্ত। অতএব, বেলুন-এর বাংলা বেলুন। বিশ্লেষিত অর্থ তৃতীয় পরিচ্ছেদে বর্ণিত।
 
বড়োলোক ও ধনী
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা ‘বড়ো’ ও সংস্কৃত ‘লোক’ সমন্বয়ে গঠিত বড়োলোক অর্থ— (বিশেষ্যে) ধনী ব্যক্তি। এই শব্দে বড়ো কথাটি ধনী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। যদিও পৃথকভাবে বড়ো শব্দের আরও একাধিক অর্থ রয়েছে। অন্যদিকে, সংস্কৃত ধনী অর্থ— (বিশেষণে) ধনবান, বিত্তশালী, মহাজন; দক্ষ, কুশল; স্ত্রীবাচক ধনিনী। অভিধানমতে, বড়োলোক শব্দে যুক্ত ধনী অর্থ— ধনবান, সম্পদশালী, বিত্তশালী।   বড়োলোক ও ধনী উভয়ের পার্থক্য হলো— বড়োলোক বিশেষ্য এবং ধনী বিশেষণ। ধনীর সঙ্গে লোক যুক্ত করলে এটি বড়োলোক শব্দের সমার্থক হয়ে যায়। অর্থাৎ অভিধানমতে, বড়োলোক = ধনীলোক। বড়োলোকের বেটি লো লম্বা লম্বা চুল- – -।
 
 

অনুগ্রহ হনুগ্রহ এবং হনুমান

অনু আর গ্রহ মিলে অনুগ্রহ। সংস্কৃত অনুগ্রহ (অনু+√গ্রহ্‌+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) দয়া, কৃপা, করুণা; সহায়তা, আনুকূল্য; উপকার; প্রসন্নতা, সন্তুষ্টি প্রভৃতি।
সংস্কৃত হনু (√হন্‌+উ) অর্থ— (বিশেষ্যে) চিবুক, চোয়াল। বাংলা হনু অর্থ— (ক্রিয়ায়) ‘হইলাম’ শব্দের আঞ্চলিক রূপ। উভয় শব্দের উচ্চারণ হোনু।
সংস্কৃত হনু আর গ্রহ মিলে হনুগ্রহ। হনুগ্রহ (হনু+গ্রহ) অর্থ— (বিশেষ্যে) মাংসপেশীর আকস্মিক সংকোচনজনিত চোয়ালের অনড় অবস্থা, locked jaw. সংস্কৃত (হনু+মৎ) অর্থ— (বিশেষ্যে) লম্বা লেজওয়ালা কালোমুখ বানরের প্রজাতিবিশেষ; রামায়ণে বর্ণিত রামের অনুচর।
হনু বা হনুগ্রহের সঙ্গে হনুমানের কোনো সম্পর্ক নেই। অনুগ্রহের সঙ্গেও হনুগ্রহের কোনো সম্পর্ক নেই।

হরিভুক

সংস্কৃত হরিভুক (হরি+√ভুজ্‌+ক্বিপ) অর্থ—  (বিশেষ্য) সাপ। হরি শব্দের একটি অর্থ ব্যাং। সাপ ব্যাং খায়। এজন্য তাকে হরিভুক বলা হয়।

 
বাসি বনাম -বাসী
সংস্কৃত বাসিত থেকে উদ্ভুত বাসি অর্থ (বিশেষণে) টাটকা নয় (বাসিভাত, বাসি তরকারি খেয়ে তার পেট খারাপ হয়ে গেছে।); আধোয়া (বাসি মুখ, বাসি মুখে কিছু খাওয়া ভালো নয়।); পুরানো (বাসি খবর, বাসি খবর আর কত পড়বে?)।
 
-বাসী: ‘-বাসী’ শব্দের দুটি পৃথকভুক্তি রয়েছে।  বানান একই হলেও দুটোর ব্যুৎপত্তি ও অর্থ ভিন্ন।  সংস্কৃত –বাসী (বস্‌+ইন্) অর্থ— (বিশেষণে) বসবাস করছে এমন, বাসকারী।  যেমন— শহরবাসী, গ্রামবাসী, গৃহবাসী ইত্যাদি। এটি বস্‌ ধাতুযোগে গঠিত। অন্যদিকে, সংস্কৃত -বাসী (বাস+ইন) অর্থ— (বিশেষণে) বস্ত্রধারী (চীরবাসী)। 
 
 
LL.B-এর পূর্ণরূপ কী?
LL.B একটি লাতিন প্রকাশ। লাতিন ভাষায় LL.B= Legum Baccalaureus. ইংরেজিতে যা Bachelor of Laws. এখানে Legum হচ্ছে Laws.  genitive plural legum (“of laws”)
 
প্রশ্ন আসতে পারে, মূল শব্দে একটি L, কিন্তু সংক্ষেপণে দুটি ( LL) কেন? “LL” হচ্ছে Legum-এর সংক্ষেপণ। লাতিন ভাষায় প্রথম বর্ণকে দুবার লেখা হয়। যেমন: পৃষ্ঠা বা page-এর সংক্ষেপণ pp. অনেক সময় দুটি L-কে প্রকাশের জন্য LL.B-কে “Bachelor of Legal Letters” নামেও আখ্যায়িত করা হয়।
 
LL.B হচ্ছে যুক্তরাজ্য-সহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে প্রচলিত আইনের গ্র্যাজুয়েশন। তবে যুক্তরাষ্ট্রে LL.B নামের কোনো ডিগ্রি নেই। ওই দেশে LL.B-এর তুল্য ডিগ্রি হচ্ছে— J.D. যার পূর্ণরূপ Juris Doctor.
 
 
শবেবরাত
শবেবরাত ফারসি উৎসের শব্দ।  আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত শবেবরাত অর্থ— হিজরি পঞ্জিকার শাবান মাসের ১৪ তারিখের রাত; ইসলাম ধর্মমতে যে রাতে আল্লাহ সকল প্রাণীর ভাগ্য নির্ধারণ করেন; ভাগ্যরজনি।
https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-২/
 
 
দহ বানাম দাহ
দহ: সংস্কৃত হ্রদ থেকে উদ্ভূদ খাঁটি বাংলা দহ অর্থ— (বিশেষ্যে) অগাধ জলপূর্ণ স্থান, হ্রদ; ঘূর্ণিজল, গভীর গর্ত বা বিস্তীর্ণ ফাটল; (আলংকারিক) সংকট (দহে পড়া)।
দাহ: সংস্কৃত দাহ (√দহ্‌+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) দহন, দগ্ধকরণ, জ্বলন, প্রদাহ, আগুন; মৃতের সৎকার (শবদাহ), কিছ পোড়ানো (ঝিনুক দাহ); (আলংকারিক) যন্ত্রণা।
প্রয়োগ: দহের পাড়ে শবদাহ করে আসার পথে গৃহদাহ দেখে সবাই দহে পড়ে গেল।
https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-২/
 
 
চুন 
 
চুন কী?
ঝিনুক শামুক প্রভৃতি পুড়িয়ে পাওয়া ক্ষারপদার্থ। একসময় কেবল ঝিনুক শামুক পুড়িয়ে চুন উৎপাদন করা হতো। ঝিনাইদাহ/ঝিনাইদহ জেলার নামটি ঝিনুক দাহ থেকে এসেছে। এলাকাটি একসময় ঝিনুক দাহ করে চুন উৎপাদনের জন্য বিখ্যাত ছিল। এখন ঝিনুকের প্রধান উৎস খনি।
চুন নামক পদার্থটির রং সাদা। একদম কাকের বিষ্ঠার মতো। নানাকাজে চুন ব্যবহার করা হয়। এমনকি পান খেতেও চুন লাগে। কবির ভাষায়—
“চুন বেশি খাইলে গাল পুড়ি যায়, কম খাইলে গাল জ্বলে,
প্রেম কইরো না দুজনের মন সমান না হইলে- – -।”
 
চুন-এর সঙ্গে কাম লাগলে হয়— চুনকাম। ‘চুনকাম’ আসলে কোনো কাম-কাজ নয়। এর অর্থ— চুনগোলা পানির প্রলেপ। চুন দেওয়ালে গেলে চুনকাম— এটি সৌন্দর্য; কিন্তু মুখে গেলে— চুনকালি। চুনকালি অর্থ— কলঙ্ক। চুন সাদা হলেও কলঙ্ক রূপ নিলে কালি হয়ে যায়। হেমন্তের ভাষায়—
মেঘ কালো আঁধার কালো,
আর কলঙ্ক যে কালো- – -।
 
চুন দিয়ে তৈরি বা চুনযুক্ত কিংবা চুনের মতো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী জিনিসকে বলা হয় চুনা। চুন, পুঁটি মাছের সঙ্গে লাগলে হয়ে যায়— খুদে, খুদে মাছ। এই যেমন চুনাপুঁটি। নাচানাচি করে জলের ওপর ভীষণ, খেতেও স্বাদ। অনেকে বলে— চুনোপুঁটি। তুচ্ছার্থেও কথাটি ব্যবহার করা হয়। তবে এখন চুনোপুঁটিকেও তুচ্ছ করার যে সুযোগ নেই তা মাছের বাজারে গেলে বোঝা যায়।
 
যে বা যারা চুন উৎপাদন করে তাকে বা তাদের বলে চুনারি বা চুনুরি। চুন্নির সঙ্গে কিন্তু, চুনের কোনো সম্পর্ক নেই। যে নারী চুরি করে তাকে বলে চুন্নি। চুন্নিকে চোরের বউ হতে হবে এমন কোনো নির্দিষ্টতা নেই। চুন্নি যতই অবহেলার হোক না, চুনার স্ত্রী চুনি কিন্তু খুব দামি। ইংরেজিতে রুবি (ruby) নামে পরিচিত বাংলা চুনিই পদ্মরাগমণি।
নামটা কী!
 
তো যাই হোক, চুন কিন্তু তর্জনীতে লাগিয়ে পানে লাগাতে হয়। এজন্য তর্জনীর এত দাম। তারপরও পান থেকে চুন খসলে অনেক খবর, কবর হয়ে যায়।
 
 
 
ইয়ার ইয়ার্কি এবং ইয়ারবক্সি
 
ইয়ার: ইয়ার ফারসি উৎসের শব্দ। এর অর্থ (বিশেষণে) সখা, বন্ধু, রসিক মানুষ, ফাজিল; ঘনিষ্ঠ বন্ধু। হাফিজের কথায় নজরুল লিখেছেন—
“ফুলের বাহার, গোলাব-কপোল, গেলাস-সাথী মস্ত-ইয়ার,
এক লহমার খুশির তুফান, এইতো জীবন— ভাবনা কিসের!”
ইয়ার্কি: ফারসি ইয়ার শব্দ থেকে ইয়ার্কি শব্দের উদ্ভব। বাক্যে (বিশেষ্য) হিসেবে ব্যবহৃত ইয়ার্কি অর্থ— ফাজলামি, রসিকতা, হালকা আনন্দ ফুর্তি। “যা যা ইয়ারকি করিসনি”—রাজশেখর বসু।
ইয়ারবক্সি: ফারসি ইয়ার থেকে ইয়ারবক্সি। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ইয়ারবক্সি অর্থ— রসিক বন্ধু, রঙ্গপ্রিয় সঙ্গী, আড্ডার বন্ধু, সমপর্যায়ের বন্ধুবান্ধব; তুচ্ছ ও হালকা আনন্দে বা কাজে সাহায্যকারী সঙ্গীসাথি, কুকর্মের সঙ্গী। ‘‘ইংরাজি-নবিশ ইয়ারবক্‌শিকে মদ খাওয়ান’’ — বঙ্কিচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

তাং নং সাং প্রমিত কি না

বাংলা একাডেমি আধুনি বাংলা অভিধানমতে, তাং হলো বিশেষ্যে আরবি তারিখ শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ। নং হলো বিশেষ্যে ইংরেজি নাম্বার (number) শব্দের সংক্ষিপ্ত রূপ এবং সাং হলো বিশেষ্যে আরবি সাকিন শব্দের সংক্ষিপ্ত লেখ্য রূপ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, তাং, নং ও সাং প্রমিত।
 
ভাগের মা গঙ্গা পায় না
হিন্দু শাস্ত্রমতে মরার পরে শবদাহ করে দেহের কিছু অংশ (অস্থি) পূন্য লাভের আশায় গঙ্গায় ভাসিয়ে দিতে হয়। এমন করলে  পরবর্তীকালে স্বর্গ লাভ হয়। মৃতের  জীবিত স্বজন এই দায়িত্ব পালন করে থাকে।  এ ক্ষেত্রে দেখা যায় যে মৃত মায়ের সন্তানের সংখ্যা একাধিক সেইসব মায়েদের অস্থি সাধারণত গঙ্গায় ফেলা হয় না। হলেও তা তুলনামূলকভাবে কম। সন্তানগণ একে অপরকে মায়ের অস্থি গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে আসার দায়িত্ব চাপিয়ে প্রত্যেকে এড়িয়ে যেতে চায়।  এই ঘটনা থেকে  প্রবাদটির উৎপত্তি। ভাবার্থ বিচারে, ভাগাভাগি করে কাজ করলে কাজ সুচারুরূপে হয় না। ইংরেজি যথার্থ অনুবাদ, Everybody’s business is nobody’s business. 
 
শুধু ভাগাভাগি, রেষারেষির, বিভিন্ন মত প্রভৃতির জন্যই এমন হয়ে থাকে। অন্যদিকে, এক সন্তানের বেলায় এমনটি ঘটে না। তার দেহাংশ সুষ্ঠুভাবে গঙ্গায় বিসর্জন করা হয়ে থাকে। বিকল্প থাকলে দায়িত্বহীনতা, কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়া, দায়সারাভাবে কোনো কর্ম সম্পাদন করা, নিজের করণীয় অন্যের ঘাড়ে গছিয়ে দেওয়া অনেকের স্বভাব। মায়ের প্রতি কর্তব্য অনস্বীকার্য। তবে এক মায়ের একাধিক সন্তান থাকলে শেষ বয়সের ধাক্কা একাধিক থেকেই আসতে থাকে। এক সন্তান অন্যজনের কাঁধে মায়ের দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে নিজে ভারমুক্ত হতে চায়। আর মায়ের মৃত্যুর পরেও শেষকৃত্য, করণীয়  আচার প্রভৃতি দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে গিয়ে যথার্থভাবে করা হয় না।  অথচ একজন সন্তান হলে সবকিছু যথাসময়ে যথাযথভাবে সম্পাদিত হতো। 
কোনো কাজ সম্পাদনকালে দায়িত্ব নির্দিষ্ট করা না থাকলে, কিন্তু কাজটি সবার কর্তব্য হলে একে অন্যের উপর দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা যায়। ফলে মূল কাজটি যথাসময়ে সুষ্ঠুভাবে  সম্পন্ন হয় না; এমনকি নাও হতে পারে। হিন্দু সমাজে মৃত্যুকালে মুখে গঙ্গাজল দেবার রীতি প্রচলিত।  সবার ঘরেই পবিত্র জল রাখা হয়। কিন্তু এক মায়ের অনেক সন্তান থাকলে কে গঙ্গজল দেবে, দায়িত্বটা আসলে কার প্রভৃতি নিয়ে  ঝগড়া করতে থাকে। একজন অন্যজনকে বলে, গঙ্গাজল দেওয়া তার দায়িত্ব নয়, অন্য জনের। অবশেষে গঙ্গাজল না পেয়েই মা ভবলীলা সাঙ্গ করে।

প্রবহমান না কি প্রবাহমান

বহমান শব্দের সঙ্গে প্র যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে প্রবহমান। অন্যভাবে, প্রবহমান= প্র+√বহ্+মান। অর্থাৎ, বহ্ ধাতুর সঙ্গে মান যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে বহমান। তারপর, বহমান-এর আগে প্র যুক্ত হয়ে গঠন করেছে প্রবহমান।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, প্রবহমান (প্র+√বহ্+মান (শানচ)। এর অর্থ— (বিশেষণে) প্রবাহিত হচ্ছে এমন, চলমান।

সুতরাং, প্রবাহমান বানান ভুল।

মনে রাখুন: এখানে বহমান-এর সঙ্গে প্র যুক্ত হয়েছে।বাহমান -বানানের কোনো শুদ্ধ শব্দ নেই। তাই প্রবাহমান বানানের কোনো শুদ্ধ শব্দ সংস্কৃত ব্যাকরণমতে হতে পারে না।
——————————-
প্রবহমান বানানটি আয়ত্তের বিষয়ে ওপরের লেখাগুলো পর্যাপ্ত মনে হলে নিচের লেখাগুলো না-পড়লেও চলবে। কোরোনার যুগে অযথা ঝামেলায় গিয়ে লাভ নেই।
স্মর্তব্য: ণত্ববিধান অনুসারে শব্দটির ব্যাকরণগত শুদ্ধ রূপ হয়: ‘প্রবহমাণ’ । তাই গঠনগত দিক থেকে ‘প্রবহমান’ বানানটিও ভুল। কিন্তু অশুদ্ধ হলেও ‘প্রবহমান’ বহুল প্রচলিত এবং নানা অভিধানে স্বীকৃত। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে এটাকে তৎসমে শুদ্ধ বানান বলা হয়েছে। অতএব, প্রবহমান লিখুন, প্রবাহমান নয়।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি. ড. মোহাম্মদ আমীন।
 
 
 
 
যৌগিক বাক্য
লোকটি শক্তিশালী, সাহসী ও ধনী; কিন্তু মারাত্মক অলস। এটাকে যৌগিক বাক্য বলা হয় কেন?
সাধারণভাবে পরস্পর নিরপেক্ষ একাধিক সরল বা জটিল বাক্য অব্যয় দ্বারা যুক্ত হয়ে একটি একক বাক্য গঠন করলে তাকে ব্যাকরণের ভাষায় যৌগিক বাক্য বলে। যেমন: লোকটি শক্তিশালী, সাহসী ও ধনী; কিন্তু মারাত্মক অলস।
 
যোগ থেকে যৌগিক। এর অর্থ যোগ হওয়া, যুক্ত হয়ে গঠিত, মিলিত, মিলন, সমন্বিত। যৌগিক বাক্য দুই বা ততোধিক স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও পরস্পর নিরপেক্ষ সরল বা খন্ডবাক্যের একীভূত রূপ। তাই এর নাম যৌগিক বাক্য।
 
 
বাঙাল কোন উৎসের শব্দ? এর অর্থ কী?
 
বাঙাল শব্দটি সংস্কৃত বঙ্গ থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  ব্যঙ্গার্থে বিশেষণ হিসেবে বাঙাল শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যার অর্থ— সাবেক পূর্ববঙ্গ এবং বর্তমানে বাংলাদেশের অধিবাসী। পশ্চিম বঙ্গের বাঙালিরা বর্তমান বাংলাদেশের বাঙালিদের ব্যঙ্গার্থে বাঙাল সম্বোধন শুরু করে। এখন, আমরা নিজেরাই নিজেদের বাঙাল শব্দটি ব্যঙ্গার্থে ব্যবহার করি।  সুতরাং, বাঙাল কথাটি অভিধান ও প্রয়োগ অনুসারে— নেতিবাচক, উপহাসমূলক ও ব্যঙ্গার্থে  ব্যবহৃত একটি শব্দ।
 
 
কফি কোন ভাষা হতে আগত?
 
কফি তুর্কি উৎসের শব্দ। ইংরেজি বানান: coffee, জনপ্রিয় পানীয়বিশেষ। কফিতে আছে দুই বার, চায়ে আছে একবার—বলুন তো সেটি কী?
ড. আমীন স্যার লিখেন, বাবি-বিবি। এটি কী?
 
বাবি-বিবি
বাবি-বিবি হচ্ছে— ‘বাকি অংশ, বিস্তারিত এবং বিবিধ বিবরণ’ কথার সংক্ষেপণ।
 
বাংলাদেশি বানানে ই-কার কেন
 
 বাংলাদেশি শব্দের মিলনে বাংলাদেশি। দেশি শব্দটি সংস্কৃত দৈশিক হতে উদ্ভূত। তাই এটি খাঁটি বাংলা শব্দ বা অতৎসম শব্দ। অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ঈ-কার বিধেয় নয়।  দেশি অতৎসম শব্দ। তাই বানানে ই-কার। অধিকন্তু, মূল শব্দ দৈশিক-এর বানানেও ই-কার। তাই বাংলাদেশি বানানে ই-কার অপরিহার্য। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশি শব্দের অর্থ— (বিশেষণে) বাংলাদেশজাত, বাংলাদেশে উৎপন্ন (বাংলাদেশি পণ্য ), বাংলাদেশে প্রচলিত (বাংলাদেশি চালচলন, বাংলাদেশি সংস্কৃতি)।
 
খসরু ও খসম অর্থ কী?
খসরু কসম: আরবি উৎসের শব্দ কসম অর্থ— (বিশেষ্যে) স্বামী, পতি। ফারসি উৎসের শব্দ হিসেবে চিহ্নিত খসরু অর্থ— রাজা, বাদশা।
 
ডলাডলি অর্থ কী?
এটি বাংলা শব্দ। অভিধানমতে, ডলাডলি অর্থ— (বিশেষ্যে) টেপাটেপি।
 
কমণ্ডুলু অর্থ কী?
কমণ্ডলু (ক+মণ্ড্‌+অলু) সংস্কৃত শব্দ। সন্ন্যাসীদের ব্যবহৃত জলপাত্রবিশেষ; হাতলযুক্ত পাত্র, মগ। এটি দেখতে বদনার মতোই তবে উপরের দিকে একটি হাতল থাকে।
কফি কোন ভাষা হতে আগত?
কফি তুর্কি উৎসের শব্দ। ইংরেজি বানান: coffee, জনপ্রিয় পানীয়বিশেষ। কফিতে দুই বার, চায়ে একবার—বলুন তো সেটি কী?
 
ড. আমীন স্যার লিখেন, বাবি-বিবি। এটি কী?
বাবি-বিবি হচ্ছে— ‘বাকি অংশ, বিস্তারিত এবং বিবিধ বিবরণ’ কথার সংক্ষেপণ।

জবাবদিহি ও জবাবদিহিতা: কোনটি শুদ্ধ

অনেকে মনে করেন, জবাবদিহিতা শব্দটি ভুল, শুদ্ধ কেবল জবাবদিহি। তা ঠিক নয়। জবাবদিহি ও জবাবদিহিতা দুটোই শুদ্ধ। তবে ভিন্নার্থক।
আরবি ‘জবাব’ ও ফারসি ‘দিহি’ মিলে গঠিত ‘জবাবদিহি’ অর্থ (বিশেষ্যে) কারণ প্রদর্শন, কৈফিয়ত, দায়িত্ব প্রভৃতি।‘জবাবদিহিতা’ অর্থ (বিশেষ্যে) কোনো কাজের দায়দায়িত্ব গ্রহণ ও তৎসংক্রান্ত প্রশ্নের জবাব দেওয়ার বাধ্যবাধকতা। দুটোই আরবি উৎসের শব্দ। তাই ই-কার।উভয় শব্দ বিশেষ্য বলে প্রয়োগে ভুল হয়ে যায়।
পার্থক্য: জবাবদিহি কারণ প্রদর্শনের সাময়িক বাধ্যবাধকতা নয়। এটি নির্ধারিত রীতিনীতি-জাত স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ কিংবা কর্তব্যজাত কর্ম-বর্ণন। যেমন: নিয়মিত কর্মপ্রতিবেদন প্রেরণ, অধিক্ষেত্র পরিদর্শন; সুফলভোগীদের নিজের কর্মপরিকল্পনা জ্ঞাতকরণ। প্রথম ও দ্বিতীয়টি দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেও তৃতীয়টি অত্যাবশ্যক নাও হতে পারে।
জবাবদিহি ঐচ্ছিক বিষয়, এটি না করলেও চলে বা এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু জবাবদিহিতায় স্বাভাবিক জবাবদিহির নির্ধারিত অবস্থার বাইরেও কারণ প্রদর্শনের কঠোর বাধ্যবাধকতা জড়িত। জবাবদিহিতা বাধ্যতমূলক আদেশ, এটি কর্মের প্রাত্যহিক অংশ নাও হতে পারে। জবাবদিহি এড়ানো যায়, কিন্তু জবাবদিহিতা এড়ানো যায় না। কোনো বিশেষ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ জবাবদিহিতা তলব করতে পারে।
জবাবদিহিতা কথাটির বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। অথচ, যেখানে এটি লেখা হচ্ছে তার অধিকাংশ স্থলে জবাবদিহি শব্দটি ব্যবহার করাই উচিত।
প্রয়োগ: জবাবদিহিতা নেই বলে জবাবদিহিও চোখে পড়ে না।
 
 
বিশিষ্ট
সংস্কৃত বিশিষ্ট (বি+√ শিষ্‌+ত) শব্দের অর্থ— (বিশেষণে) সাধারণ নয় এমন,  মর্যাদাসম্পন্ন (বিশিষ্ট চিকিৎসক), যুক্ত ( গন্ধবিশিষ্ট)। বিশিষ্ট শব্দটি যুক্ত অর্থে ‘-বিশেষ’ শব্দের মতো সংশ্লিষ্ট শব্দের পর যুক্ত হয়ে বসে। যেমন—ঝাঁজালো গন্ধবিশিষ্ট রাসায়নিক। সন্দেশ, দারুণ স্বাদবিশিষ্ট মিষ্টিবিশেষ। তবে সংশ্লিষ্ট শব্দের আগে বিশিষ্ট ফাঁক রেখে বসে। যেমন— বিশিষ্ট নেতা, বিশিষ্ট শিক্ষক প্রভৃতি।
 
কুশপুত্তলিকা
কুশ+পুত্তলিকা। কুশ দিয়ে তৈরি হয় যে পুতুল। কুশতৃণে বা শরপত্রে রচিত পুত্তলিকা। যার দাহ হয়নি বা মুখাগ্নি পর্যন্ত হয়নি এবং যার অস্থি পাওয়া যায়নি তার কুশপুত্তলিকা দাহ করতে হয়।
কুশপুত্তলিকা শব্দটি এখন রাজনীতির ক্ষেত্রে বেশ প্রচলিত। তবে যারা কুশুপুত্তলিকা দাহ করেন তারা জানেন না যে, এটি প্রাচীন মানুষের নিদান।

কে কখন আলাদা ও কখন পৃথক বসে?

“আপনাকে যেতে বলেছে কে?” এই বাক্যে প্রথম কে, বিভক্তি এবং দ্বিতীয় কে, সর্বনাম। কে কে দেশের জন্য জীবনকে উৎসর্গ করতে চাও?” এই বাক্যে কে কে সর্বনাম এবং জীবন-এর সঙ্গে যুক্ত কে বিভক্তি। অনুরূপ: তাকেকে এখানে আসতে বলেছে?
নিমোনিক:
(১) সর্বনাম হিসেবে ব্যবহৃত হলে কে আলাদা বসে। যেমন: তোমার বাবা কে তা আমি জানতাম না। এখানে কে শব্দটি সর্বনাম হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় বাবা থেকে পৃথক বসেছে।
সাধারণত প্রশ্নবোধক বাক্যে কে শব্দটিকে পূর্ববর্তী শব্দ থেকে ফাঁক রেখে লেখার বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। যেমন: আপনি কে? তোমরা কে কে যাবে? তুমি কে?
(২) প্রশ্নবোধক হোক বা না হোক বিভক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হলে -কে পূর্ব শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসে। যেমন: আপনাকে যেতে হবে। তোমাকে আমার চাই। মা, আমাকে ডাকছ? দেশকে ভালোবাস, জাতিকে সেবা দাও। মামাকে দেখতে যাবে না হাসপাতালে? আপাকে ডাকব?

অতৎসম শব্দের বানানে ষ এর ব্যবহার

ড. মোহাম্মদ আমীন
অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ণ-এর ব্যবহার হয় না। বাংলা একাডেমি প্রণীত প্রমিত বানানের নিয়মে বলা হয়েছে, “অতৎসম শব্দের বানানে ণ ব্যবহার করা হবে না।” তবে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন কোনো কঠিন নিয়ম করা হয়নি। কারণ, বিভিন্ন অর্ধতৎসম ও তদ্ভব শব্দে ষ এমনভাবে ঘনিষ্টভাবে মিশে আছে, যে এসব শব্দে বিদ্যমান ষ আর পরিহার করা যায় না। ষ বর্ণটি ণ-এর মতো শুধু সংস্কৃতে সীমাবদ্ধ নয়। তাই অতৎসম শব্দে ষ-এর ব্যবহার নিয়ে যেন কোনো দ্বিধায় আমরা না পড়ি। তাই তৎসম নয়, এমন বহু শব্দের বানানে ষ ব্যবহার করা হয়। নিচে অতৎসম শব্দে ষ ব্যবহারের নিয়ম ও কারণ বর্ণনা করা হলো—
১. কোমল রূপ: সংস্কৃত বা তৎসম শব্দের কোমল রূপ অতৎসম হলেও কোমল রূপে মূর্ধন্য-ষ বহাল থাকে। যেমন বর্ষা> বরষা, হর্ষ> হরষ।
২. যুক্তাক্ষরে: তৎসম শব্দের যুক্তাক্ষর রূপে মূর্ধন্য-ষ থাকলে, তদ্ভবে একই যুক্তাক্ষর বা মূর্ধন্য-ষ যুক্ত অন্য একটি যুক্তাক্ষর হতে পারে। যেমন: স্পষ্ট>পষ্ট, তৃষ্ণা> তেষ্টা, কৃষ্ণ> কেষ্টা, বিষ্ণু>বিষ্টু, বৈষ্ণব> বোষ্টম।
৩. সংখ্যাবচাক শব্দ: বাংলা সংখ্যাবাচক শব্দে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহৃত হতে পারে। যেমন: ষোলো, ষাট ইত্যাদি
৪. তৎসমের মূর্ধন্য-ষ অতৎসমে থাকে: তৎসম শব্দের বানানে ণ থাকলে তদ্ভবে ন হয়। যেমন কর্ণ>কান, স্বর্ণ>সোনা। কিন্তু মূর্ধন্য-ষ থাকলে তদ্ভবেও মূর্ধন্য-ষ থাকে। যেমন আমিষ>আঁষ, ষণ্ড>ষাঁড়, সুনিষণ্নক>সুষনি
৫. ক্রিয়াপদে মূর্ধন্য-ষ: আধুনিক বাংলায় ক্রিয়াপদে ণ হয় না, কিন্তু মূর্ধন্য-ষ হতে পারে। যেমন পোষা, মুষড়ে পড়া, শুষে নেওয়া ইত্যাদি।
৬. প্রাচীন বাংলার ক্রিয়াপদে ণ দেখা যায়। যেমন “লুই ভণই গুরু পুচ্ছিঅ জাণ” (চর্যাপদ)। অর্থ: লুই বলছেন গুরুকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নাও।
বাংলা একাডেমি বলেছে— বিদেশি শব্দে ষ এর প্রয়োজন নেই। কিন্তু ক্ষেত্রে ণ-এর মতো কোনো কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি। ণ-এর জন্য বলা হয়েছে, “অতৎসম শব্দের বানানে ণ ব্যবহার করা হবে না।” অন্যদিকে,মূর্ধন্য-ষ-এর জন্য বলা হয়েছে— “বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রে মূর্ধন্য-ষ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই।” তবে ইংরেজির ক্ষেত্রে স/শ ব্যবহারের নিয়ম উল্লেখ করা হয়েছে। ষড়যন্ত্র শব্দটি বিদেশি হলেও বানানে মূর্ধন্য-ষ আছে।
বাংলা একাডেমি সকল অতৎসম শব্দে মূর্ধন্য-ণ বর্জন করেছে। কিন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রবর্তিত বাঙ্গালা বানানের নিয়ম পুস্তিকায় বলা হয়েছে “অ-সংস্কৃত শব্দে কেবল ‘ন’ হইবে, যথা— কান, সোনা, বামুন, কোরান, করোনার। কিন্তু যুক্তাক্ষর ণ্ট, ণ্ঠ, ণ্ড, ণ্ঢ চলিবে, যথা— ঘুণ্টি, লণ্ঠন, ঠাণ্ডা।” তবে বাংলা একাডেমির মতে লন্ঠন, ঠান্ডা ইত্যাদি বানান প্রমিত।
 
বাকি অংশ ও অন্যান্য বিষয় দেখার জন্য নিচের লিংক: অতৎসম শব্দে ষ-এর ব্যবহার : চাষা চাষি ও চাষা
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

প্রতিদিন খসড়া-১

প্রতিদিন খসড়া-২

প্রতিদিন খসড়া-৩

প্রতিদিন খসড়া-১ : https://draminbd.com/2020/12/27/প্রতিদিন-খসড়া/

প্রতিদিন খসড়া-২ : https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-২/

প্রতিদিন খসড়া: https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-৩/

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
 
 
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
error: Content is protected !!