প্রতিদিন খসড়া-৩

ড. মোহাম্মদ আমীন

এই পোস্টের (প্রতিদিন খসড়া-৩) সংযোগ: https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-৩/

প্রতিদিন খসড়া-৩

শুবাচে যযাতি হিসেবে প্রকাশের জন্য এই পৃষ্ঠায় খসড়া রাখা হয়। এখানকার খসড়া শুবাচে এবং ওয়েবসাইটে চূড়ান্তভাবে প্রকাশ করা হয়। এই পৃষ্ঠার লেখাগুলো খসড়ামাত্র।

প্রতিদিন খসড়া-১

প্রতিদিন খসড়া-২

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
— — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — — —
 
হতে থেকে চেয়ে
হতে: প্রাকৃত উৎসের শব্দ ‘হতে’ প্রধানত  (অব্যয়ে) অপাদান কারকে পঞ্চমী বিভক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর আভিধানিক অর্থ— থেকে, অবধি, ফলে দ্বারা। উচ্চারণ— হোতে। অবধি:  তখন হতে সে নিরুদ্দেশ। কী হতে কী হয়ে গেল। কী হতে চেয়েছি আর কী হলাম।
 
চেয়ে: চেয়ে বাংলা শব্দ।  অব্যয় হিসেব ব্যবহৃত হলে এর অর্থ— অপেক্ষা, হতে, থেকে (তোমার চেয়ে আমার বয়স বেশি। আর কতকাল পথ চেয়ে থাকব। এর চেয়ে বেশি কী আর করবে তুমি! অসমাপিকা ক্রিয়া হিসেবে  চেয়ে শব্দের অর্থ— যাচ্ঞা করে, তাকিয়ে। যেমন: চেয়ে নাও। কিছু টাকা চেয়েছি। যা চেয়েছি কেন তা পাই না।   চেয়ে চেয়ে দেখলাম তুমি চলে গেলে। 
 
থেকে:  থেকে বাংলা শব্দ। অভিধানে থেকে শব্দের দুটি পৃথক ভুক্তি রয়েছে। প্রথমত: অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত থেকে অর্থ— হতে, অপেক্ষা, চেয়ে। দ্বিতীয় অর্থ— থাকা বা থাকিয়া। এখানে থেকে শব্দটি ক্রিয়াবিশেষ্যে থাকিয়া শব্দের কথ্য বা চলিত রূপ। যেমন: তোমার থেকে এমন ব্যবহার আশা করিনি, তোমার থেকে আমার বয়স বেশি। আর একটা দিন থেকে যাও। তোমার থেকে এমন ব্যবহার আশা করিনি। 
 
তিনটি শব্দ কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমার্থক। কখন সমার্থক হবে তা নির্ভর করছে বাক্যে শব্দটি কোন পদ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার এবং বাক্যের ধরণের ওপর। পদ মিলে গেলেও বাক্যের ধরণে সামঞ্জস্য না হলে সমার্থক হলেও একই অর্থে  একই বাক্যে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে না। যেমন: সে হতে আমি একা। এই বাক্যে হতে এর স্থলে থেকে দেওয়া গেলেও চেয়ে  দেওয়া সমীচীন হবে না।
 
 
 
গাল (মুখ) আর গাল (গালাগালি) সমার্থক কেন?
 
আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত গল থেকে আগত তদ্ভব গাল অর্থ —  (বিশেষ্যে ) মুখ, মুখবিবর, কপোল, মুখমণ্ডল। অন্যদিকে, বাংলা গাল অর্থ — (বিশেষ্যে) গালাগালি, কটু বাক্য, মন্দ বাক্য। গাল শব্দের একমাত্র উৎসভূমি গাল। গালমন্দ, গালাগাল, গালাগালি, গালি, গালিগালাজ, অকথা, কুকথা সবকিছুর মাতৃভূমি ও জন্মভূমি দুটোই গাল। গাল ছাড়া এসব কটু বাক্য আর কোথাও জন্ম নিতে পারে না। বাঙালিরা দেখল, গাল থেকে গালাগালি আসে। গাল (মুখ) ছাড়া আরও কোথাও হতে কটু বাক্য  আসার সুযোগ নেই। তাই বুদ্ধিমান বাঙালিরা সংস্কৃত গল হতে আগত তদ্ভব গাল শব্দকে গালাগালি শব্দের সমার্থক করে দিয়েছে। তাই বাংলা অভিধানে  মুখ অর্থদ্যোতক গাল আর কটু বাক্য অর্থদ্যোতক গাল পরস্পর সমার্থক। তবে মুখটা হতে হবে মানুষের। মানুষ ছাড়া অন্য কোনো জীবের গাল থেকে গাল আসে না।
প্রয়োগ: তুই হারামি একটা মানুষ, তুই বদমাশের গাল আছে, তুই শয়তান গাল না দিয়ে কীভাবে পারবি।
https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-৩/
 
খাবলা, খাবলে খাবলে; কুরা, কুরে কুরে
 
খাবলা ও খাবলে খাবলে: খাবলা বাংলা শব্দ। অভিধানমতে, খাবলা অর্থ— মুষ্টি, মুঠি; গ্রাস; দংশন, কামড়, থাবা; পাঞ্জা পরিমাণ, হাতের কোষ বা কোষ পরিমাণ। এক খাবলা চাল, এক খাবলা ভাত। এর সমার্থক শব্দ খাবল। খাবল থেকে খাবলে খাবলে এবং খাবলানো।  এদের অর্থ— কামড়ে কামড়ে, দংশন করতে করতে, থাবা দিতে দিতে। কুরা ও কুরে কুরে: কুরা বাংলা শব্দ। অভিধানমতে, কুরা অর্থ— (ক্রিয়াবিশেষ্যে) কুরানি দিয়ে চাঁছা। কুরে কুরে— অর্থ চাঁছা-চাঁছি; চেঁছে চেঁছে।
 
প্রয়োগ: বাঘ যখন কুরে কুরে জীবন্ত হরিণের মাংস খাবলে খাবলে খায়, তখন সে ভাবে না— হরিণ ব্যথা পাচ্ছে। মানুষ যখন জীবন্ত মাছের শরীর থেকে কুরে কুরে আঁশ অপসারণ করে কিংবা আরেক মানুষকে নানাভাবে কুরে কুরে আর খাবলে খাবলে ন্যায্য অধিকারগুলো অধিকার করে নেয়, তখন মানুষ ভাবে না— তার কর্ম অন্যকে কত ব্যথা দিচ্ছে। কী পাশব মানুষ!
সুনীলের ভাষায়—
“- – -আমি মানুষের পায়ের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে
থাকি—তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখব বলে।”
গবেট, গবা ও গবাদি
গবেট দেশি শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষণে) নির্বোধ, বোকা, হাবা, হাঁদা, স্থূলবুদ্ধি। সংস্কৃত গো থেকে উদ্ভূত গবা অর্থ— (বিশেষণে) গবেট। অর্থাৎ গবা আর  গবেট পরস্পর সমার্থক। তৎসম বা সংস্কৃত গবাদি (গো+আদি) অর্থ— (বিশেষ্যে) গোরু ও অন্যান্য গৃহপালিত পশুর মতো। গবা ও গবেট দুটোই গোরু হতে এসেছে। যার শাব্দিক অর্থ গোরুর মতো, গবাদি পশুর মতো।  আলংকারিক অর্থ— গোরু বা গবাদি পশুর মতো স্থূল বুদ্ধিসম্পন্ন। এমন গবা আর দেখিনি। সে একটা গবেট, সামান্য যোগ-বিয়োগও পারে না।
 
মৌলবাদ ও মৌলবাদী
 
যারা বা যে মতবাদের অনুসারীরা নিজের বিশ্বাস্য বা অনুসৃত মতবাদকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে আর বাকি সব মতবাদকে নিকৃষ্ট, ঘৃণ্য ও বাতিল করে দেয় এবং ভিন্ন মতাবলম্বীকে নিজের মতবাদের অনুসারী করার জন্য বল প্রয়োগ করে, নানাভাবে প্রভাবিত করার চেষ্ট করে, দলন করে বা হেয় করে তাদের মৌলবাদী বলা হয়। যে বাদ বা মতবাদ এমন ধারণাসমূহ পোষণ করে এবং তা বাস্তবায়নে অনুসারীদের প্রাণিত করে তাকে বলা হয় মৌলবাদ।
 
মূল শব্দ থেকে মৌল, মৌলবাদ ও মৌলবাদী শব্দের উদ্ভব। সংস্কৃত মূল শব্দের অনেকগুলো অর্থের মধ্যে এ আলোচনার প্রাসঙ্গিক অর্থ— উৎপত্তিস্থান, উৎস, আদিকারণ প্রভৃতি।মৌল (মূল+অ) অর্থ— মূলসংক্রান্ত, মূল থেকে জাত, আদিম। মৌলিক পদার্থকেও মৌল বলা হয়। এটি আমাদের আলোচনায় প্রাসঙ্গিক নয়।
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (পৃষ্ঠা ১১৩৮) অনুযায়ী মৌলবাদ (মৌল+বাদ) অর্থ— (বিশেষ্যে) ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রতি অন্ধবিশ্বাস। মৌলবাদী (মৌল+√বদ্+ইন্) অর্থ— (বিশেষণে) ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধ অনুসারী। অর্থাৎ এই অভিধানমতে, যারা ধর্মীয় গোঁড়ামির অন্ধ অনুসারী তারা মৌলবাদী।
 
গ্রামীণ বনাম গ্রাম্য
সংস্কৃত গ্রামীণ (গ্রাম+ঈন্) অর্থ— (বিশেষণে) গ্রামজাত, গ্রাম্য; গ্রামসম্বন্ধীয়; গ্রামস্থ। সংস্কৃত (গ্রাম+য) অর্থ—  (বিশেষণে) গ্রামসংক্রান্ত, গ্রামে উৎপন্ন; গ্রামস্থ, অর্ধশিক্ষিক, অমার্জিত। উভয়ে তৎসম, বিশেষণ এবং গ্রামবিষয়ক অর্থ দ্যোতিত করে। অর্থ বিশ্লেষণে দেখা যায়,  গ্রামীণ ও গ্রাম্য উভয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমার্থক। তবে গ্রাম্য শব্দটির সঙ্গে নেতিবাচক অশিক্ষিত ও মার্জিত অর্থ থাকায় তার ভেতরের ইতিবাচক গ্রামীণ অর্থ প্রায়োগিক ক্ষেত্রে উহ্য থেকে যায়। তাই গ্রাম্য শব্দটি প্রায়শ নেতিবাচক ও গালি অর্থে ব্যবহৃত হয় কিংবা অনুরূপ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে মনে করা হয়।  তাই গ্রাম্য কথাটির মধ্যে ইতিবাচক গ্রামীণ অর্থ থাকলেও ব্যবহারের কারণে গ্রাম্য শব্দটি নেতিবাচক শব্দে পরিণত হয়েছে। এভাবে মানুষের মতো অনেক শব্দও তার উৎকৃষ্টতা হারিয়ে নিকৃষ্টে পরিণত হয়।
 
মাল্লা ও মোল্লা এবং মাঝিমাল্লা
 
 মাল্লা: আরবি মল্লাহ্ থেকে উদ্ভূত মাল্লা অর্থ— (বিশেষ্যে) নৌকার মাঝি বা তার সহযোগী, মাঝির সহযোগী, নাবিক।
 
মোল্লা: মোল্লা আরবি উৎসের বাংলা  শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষ্যে) আরবি ভাষা ও ইসলামি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তি, পদবিশেষ। অনেকের নামের আগে-পরে  পদবি হিসেবে মোল্লা দেখা যায়।  যেহেতু, মোল্লা শব্দটি পদবি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, তাই আরবি ভাষা ও ইসলামি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ না হলেও  ঐতিহ্য হিসেবে বংশপরম্পরায় নামের আগে বা পরে   মোল্লা শব্দটি ব্যবহার করেন। মোল্লা গ্রুপের মোল্লা সল্ট বেশি পরিচিত।
 
মাঝি: মাঝি বাংলা শব্দ। এর অর্থ— (বিশেষ্যে) নৌকার চালক, সাঁওতালপল্লির মোড়ল, মৎস্যব্যবসায়ী, জেলে। পদবি হিসেবে মাঝি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।  মাঝির কাজকে মাঝিগিরি বলে। বাংলা মাঝি ও ফারসি উৎসের –গিরি সমন্বয়ে মাঝিগিরি শব্দটি গঠিত।
মাঝি বাইয়া যাও রে…
অকূল দরিয়ার মাঝে
আমার ভাঙা নাও রে মাঝি
বাইয়া যাও রে
 
মাঝিমাল্লা: মাঝি ও মাল্লা শব্দের মিলনে মাঝিমাল্লা শব্দের উদ্ভব। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা মাঝিমাল্লা অর্থ— মাঝি ও তার সহকর্মী। নৌযানের মাঝি এবং মাঝিকে নৌ পরিচালনার কাজে সহায়তাকারীদের একত্রে মাঝিমাল্লা বলা হয়।
আবুবকর উসমান উমর আলি হায়দর
দাঁড়ি যে এ তরণির, নাই ওরে নাই ডর!
কাণ্ডারি এ তরির পাকা মাঝিমাল্লা,
দাঁড়ি-মুখে সারি-গান –লা-শরিক আল্লাহ!
 
 
ডাক দিয়েছেন দয়াল আমারে, রইব না আর বেশিদিন তোদের মাঝারে- – –
সংস্কৃত মধ্য থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ মাঝ থেকে মাঝারে শব্দের উদ্ভব। ‘মাঝ’ অর্থ— ভেতর (মনের মাঝে), মধ্যস্থল। অভিধানমতে, মাঝারে শব্দের অর্থ— মাঝে, মধ্যে, সঙ্গে, সাথে, অভ্যন্তরে প্রভৃতি। মনিরুজ্জামান মনির রচিত গানের কলিটিতে বর্ণিত মাঝারে শব্দের অর্থ— মাঝে, মধ্যে, সঙ্গে, সাথে প্রভৃতি। অতএব, কলিটির অর্থ— দয়াল (প্রভু/ঈশ্বর) আমাকে ডাক দিয়েছেন। আমি আর তোমাদের মাঝে বেশিদিন থাকব না। 
মাজারে:  আরবি উৎসের বাংলা শব্দ মাজার অর্থ— সাধুপুুরুষের সমাধিক্ষেত্র। মাজারে অর্থ— সাধুপুুরুষের সমাধিক্ষেত্রে।
 
“তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না” গানে বর্ণিত গৌড় শব্দের অর্থ কী?
গানটির প্রথম কয়েকটি কলি দেখুন—
“ওরে ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
ক্ষ্যাপা ছেড়ে দিলে সোনার গৌড়
আমরা আর পাব না না না, আর তো পাব না
তোমায় হৃদ মাঝারে রাখিব ছেড়ে দেব না।।”
এখানে গৌড় বানানে উপস্থাপিত  শব্দের অর্থ কী?  শব্দটি আসলে গৌড় নয়। যদিও  ইন্টারনেটের প্রায়  সবখানে গৌড় বানানই দেখা যায়। বানানটি ভুল।  এটি আসলে গৌর। উচ্চারণ— গোউ্‌রো।  গৌর শব্দটি গানে বিশেষ্য এবং ব্যক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অভিধানমতে,  তৎসম গৌর (√গু+র) অর্থ—  (বিশেষ্যে) শ্রীচৈতন্য, গৌরাঙ্গ। গানটি শুনলে অর্থটি স্পষ্ট হয় যে, শব্দটি গৌড় নয়, গৌর। গানের কথায় বিদ্যমান রাধা, ব্রজ, দ্বিজ ভূষণ প্রভৃতি শব্দ গৌর বানানকে প্রতিষ্ঠা করে।
 
মওলা মওলানা মকরুহ
মওলা: আরবি উৎসের বাংলা মওলা শব্দের অর্থ— (বিশেষ্যে) আল্লাহ, প্রভু।
 
মওলানা: আরবি উৎসের বাংলা মওলানা শব্দের অর্থ— (বিশেষ্যে) ইসলাম ধর্ম বিষয়ে পণ্ডিত, আলেম।
 
মকরুহ: বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত আরবি উৎসের বাংলা শব্দ মকরুহ অর্থ— ইসলাম ধর্মমতে নিষিদ্ধ নয় তবে বর্জনীয়।
 
 
পুস্তক তৎসম না কি অতৎসম
পুস্ত থেকে পুস্তক। সংস্কৃত ‘পুস্ত (√পুস্ত্ +অ)’ শব্দের তিনটি অর্থ। যথা— লেপন, শিল্পকর্মবিশেষ এবং হিসাব লেখার খাতা। সংস্কৃত এই ‘পুস্ত’ শব্দের সঙ্গে ক-প্রত্যয় যুক্ত হয়ে গঠিত হয়ছে পুস্তক। অতএব, পুস্তক সংস্কৃত শব্দ। বাংলায় যা তৎসম নামে পরিচিত। ‘পুস্ত’ বানানের আর একটি শব্দ বাংলায় ব্যবহৃত হয়। এর অর্থ— বংশপরম্পরা। এটি ফারসি উৎসের শব্দ। ফারসি পুস্ত-এর সঙ্গে সংস্কৃত/তৎসম পুস্তক-এর অন্তর্গত ‘পুস্ত’-এর কোনো সম্পর্ক নেই।
 
 
 
বিবাহ বনাম সাঙা 
সংস্কৃত বিবাহ (বি+√বহ্+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) নারী-পুরুষের স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একত্র জীবন যাপনের সামাজিক অনুমোদন, বিয়ে, পরিণয়, উদ্‌বাহ, শাদিয়ে মোবারক। দেশি সাঙা অর্থ— (বিশেষ্যে) নারীর পুনর্বিবাহ; বিধবাববিবাহ। এক বা একাধিকবার বিয়ে হয়েছে, কিন্তু এখন বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান নেই এমন নারীর  বিবাহ বা এমন নারী বিবাহ করাকে দেশি কথায় সাঙা বলে।  সাঙাও এক প্রকার বিবাহ। তবে সব বিবাহ সাঙা নয়, কিন্তু সব সাঙা বিবাহ। সাঙা শব্দের আরেকটি অর্থ— বাঁশ দিয়ে তৈরি কাপড় রাখার তাকবিশেষ।
সাঙার কাপড় সাঙার মাঝে,
বললে কনে হাসির লাজে।
কলা ও মানবিক
কলা:  অভিধানে কলা শব্দের দুটি ভুক্তি। একটি খাঁটি বাংলা কলা এবং আরেকটি সংস্কৃত বা তৎসম কলা। সংস্কৃত কদলক থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা কলা অর্থ— (বিশেষ্যে) ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে চাষ করা হয় এমন বড়ো লম্বা ও সবুজপাতাবিশিষ্ট একবীজপত্রী ওষধি ‍উদ্ভিদ বা তার পুষ্টিকর ফল, রম্ভা, banana; কাঁচকলা (কাঁচা অবস্থায় রেঁধে খাওয়া যায়) প্রভৃতি। যেমন: সাগর কলা। সংস্কৃত কলা (কলি+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) গীতবাদ্যনৃত্য প্রভৃতি চৌষট্টি বিদ্যা; চারুশিল্প; নির্মাণকুশলতা; ছলচাতুরি (ছলাকলা); রাশিচক্রের সূক্ষ্ম ভাগ; যে বিশেষ তন্তু দ্বারা দেহের বিভিন্ন অংশ গঠিত হয়; tissue.
 
মানবিক: সংস্কৃত মানবিক (মানব+ইক) অর্থ— (বিশেষণে)মানুষের পক্ষে স্বাভাবিক এমন (মানবিক বৈশিষ্ট্য); মনুষ্যোচিত (মানবিক কাজ); মানুষ-সর্ম্পকিত (মানবিক বিষয়াবলি); লোকহিতকর, জনগণের জন্য কল্যাণকর (মানবিক উদ্যোগ)। বিশেষ্যে শব্দটির অর্থ— মানবিকতা।  লুলুম্বার মানবিক কাজের মধ্যে ক্ষুধার্তদের বিনামূল্যে কলা বিতরণ প্রকল্প উচ্চ প্রশংসার দাবি রাখে।
 
 
 
তড়িৎ বনাম ত্বরিত
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, তড়িৎ শব্দের উচ্চারণ: তোড়িত্‌।  ত্বরিত শব্দের উচ্চারণ: তোরিতো। অভিধানমতে, তড়িৎ অর্থ— (বিশেষ্যে) বিদ্যুৎ, ক্ষণপ্রভা। ত্বরিত অর্থ— (বিশেষণে) ক্রমশ গতি বাড়ানো হয়েছে এমন। দুটোই তৎসম শব্দ।
 
ধরনা কী?
যে বাঁশ ধরে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া হয়— এককথায় তাকে ধরনা বলে।
ধরনায় হাত রেখে ঢেঁকিতে দাও পাড়,
নইলে সোনা ব্যথা পাবে ভেঙে যাবে ঘাড়।
ধরনা দেশি শব্দ। অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত ধরনা শব্দের অর্থ— যে বাঁশ ধরে ঢেঁকিতে পাড় দেওয়া হয়; কাঁচাবাড়ির ছাদ যে কাঠের ওপর ভর করে থাকে, আড়া, কড়ি; সাঁকোর পার্শ্ববর্তী হাতল (পাড় হওয়ার সময় যা ধরে ভারসাম্য রক্ষা করে)।

কিছু পরিবর্তিত বানান: কিছু জানা কিছু অজানা

শুবাচ-এর ওয়েবসাইট: www.draminbd.com
ব্যাবহারিক: আগে লেখা হতো ব্যবহারিক। বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধান বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ব্যবহারিকশব্দটি নেই। আছে কেবল ব্যাবহারিক। ব্যবহার শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যোগে ব্যাবহারিক করা হয়েছে। যেমন: বর্ষ+ইক= বার্ষিক, অর্থ+ইক= আর্থিক, সমসময় +ইক= সামসময়িক। তেমনি: ব্যবহার+ইক = ব্যাবহারিক।
 
বৈচারিক: হরদম লেখা হয় বিচারিক। চাকুরির প্রথম বেলায় আমার কক্ষের দরজাতেও টাঙানো থাকত: বিচারিক হাকিম। ব্যাকরণমতে এটি শুদ্ধ নয়। বিচার শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে শব্দটি হয় বৈচারিক। যেমন: দিন+ ইক= দৈনিক, বিদেশ+ইক= বৈদেশিক, বিজ্ঞান+ইক= বৈজ্ঞানিক, নীতি+ইক= নৈতিক; তেমনি, বিচার+ ইক= বৈচারিক।
 
বড়ো গোরুর ছোটোগল্প: আগে লেখা হতো গরু, ছোট, বড়, পটল কিন্তু এখন লিখতে হবে যথাক্রমে গোরু, ছোটো, বড়ো, পটোল। ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে গরু, ছোট, বড়, পটল (আনাজ) পাবেন না। তেমনি পাবেন না ছোটগল্প। পাবেন কেবল ছোটোগল্প, গোরু, বড়ো, ছোটো পটোল। ও-কার পেয়ে এরা সবাই মোটাসোটা।
 
ঘুস: ঘুস অতৎসম শব্দ। তাই ঘুষ অশুদ্ধ। লিখতে হবে ঘুস। ঘুসাঘুসি থেকে ঘুস। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে একমাত্র ঘুস বানানকে ঠাঁই দিয়েছে। অতৎসম বলে ষ নেই ঘুসে।
 
খ্রিষ্ট খ্রিষ্টাব্দ: ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দেও খ্রিস্ট, খ্রিস্টাব্দ, খ্রিস্টীয় লিখেছি। এখন এসব বানানে স নেই। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে লিখতে হবে, খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্টীয়। বাংলা একাডেমি বলছে, এগুলো বিদেশি নয়, আত্তীকৃত শব্দ।
 
লক্ষ লক্ষ্য উপলক্ষ্য: লক্ষ শব্দের অর্থ খেয়াল করা বা লাখ, ১০০০০০ (ছেলেটির দিকে লক্ষ রেখ, লক্ষ টাকা দেব তোমাকে)। লক্ষ্য শব্দের অর্থ উদ্দেশ্য (আমার লক্ষ্য লেখক হওয়া)। লক্ষ্য থেকে উপলক্ষ্য। তাই লক্ষ্য না থাকলে উপলক্ষ্য আসতে পারে না। অতএব লিখতে হবে উপলক্ষ্য। উপলক্ষ বানান অশুদ্ধ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে উপলক্ষ বানানের কোনো শব্দ নেই।
 
টম্যাটো: টমেটো বা টমাটো নয়, ফরাসি এই সবজিটির প্রমিত বাংলা বানান টম্যাটো। ইংরেজিতে tomato। বাংলায় ম-য়ে য-ফলা দিতে হবে। মনে করুন, এটি মূল্য বানানের ল্য থেকে এসেছে। জীবনের চেয়ে টম্যাটোর মূল্য কম নয়।
 
সবজি: সবজি বানানে ব-কে জ-এর সঙ্গে মিশিয়ে দিলে সবজির আসল গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যাবে। পৃথক রাখবেন— যদি তাজা সবজি খেতে চান। এটাকে মনে করুন, করোনার সামাজিক দূরত্ব।
 
শিহরন:অতৎসম শব্দে ণ-ত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, শিহরন বাংলা শব্দ। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত শিহরন শব্দের অর্থ রোমাঞ্চ, কম্পন প্রভৃতি। অতৎসম শব্দ বলে ‘শিহরন’ বানানে মূর্ধন্য- ণ অনাবশ্যক।
 
গোরু: বাংলা ভাষার আদি হতে বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যায়। পঞ্চাশটি চর্যাপদের মধ্যে ‘গরু’ শব্দ নেই। মধ্যযুগের কাব্যে Cow এর বাংলা অর্থ হিসেবে ছয় রকম বানান পাওয়া যায়। সেগুলো হচ্ছে : গরু, গরুঅ, গরূ, গোরু, গোরো, গো।
 
১৪৫০ -১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে বড়ু চণ্ডীদাস লিখেছেন গরু, গরূ, গোরো এবং বিদ্যাপতি লিখেছেন ‘গরুঅ’। ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দে মালাধর বসু লিখেছেন ‘গোরু’, ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে মুকুন্দ দাস লিখেছেন ‘গোরু’ এবং ১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল ইসলাম লিখেছেন ‘গোরু। ১৯২৯/৩০ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও ‘গোরু’ বানান দেখা যায়। যদিও পরে তিনি ‘গরু’ লিখতে শুরু করেন।পশ্চিমবঙ্গেও সে সূত্রে গরু প্রচলিত হয়ে যায়। যদিও সুনীতিবাবু লিখতেন গোরু।রবীন্দ্রনাথ ‘গরু’ লেখাতে ওই বানানটিই বহুল প্রচলিত হয়ে পড়ে।
 
গো (সংস্কৃত, গম+ও) / গোরু/গরু (সংস্কৃত, গরূপ) অর্থ হলো: জ্ঞান, ঐশ্বর্য, ধনু, গাভি, ষাঁড়, বৃষ, নিরেট বোকা/মূর্খ প্রভৃতি।
বাংলাদেশের বাংলা একাডেমি উচ্চারণ অভিধান ও ব্যবহারিক বাংলা অভিধানে ‘গরু’ লেখা হয়েছে। কারণ সংবৃত অ-ধ্বনির পরে ই/ঈ/উ/ঊ-কার থাকলে অ-ধ্বনি ও-ধ্বনি উচ্চারিত হয়। যেমন : গরু>গোরু। জামিল চৌধুরী সম্পাদিত ‘বাংলা একাডেমি অধুনিক বাংলা অভিধান’ (২০১৬খ্রিষ্টাব্দ) লিখেছে ‘গোরু’।
আমবাগান, কাঁঠাল বাগান কিন্তু ধানখেত, ধানবাগান নয় কেন
কারণ আম-কাঁঠাল বাগানে হয়। ধান কিন্তু বাগানে হয় না। এখন প্রশ্ন আসতে পারে বাগান আর খেত—  এ দুয়ের তফাত কী? উভয়ের মধ্যে সুস্পষ্ট  তফাত রয়েছে। তবে তফাতের ফাঁক খুঁজতে গিয়ে কেউ যদি বলে বসেন—  ফুলের বাগান বলা হয়, ফুলের খেত বলা হয় না, কেন? হয়, হবে না কেন?  সংজ্ঞার্থে পড়লে বলতে পারেন। ভুল হবে না। তবে, শ্রুতিমাধুর্য, শোভনীয়তা, সৌজন্য এবং প্রচলনের দিকে খেয়াল রেখে শব্দ প্রয়োগ করা হয়।  ফুলের বাগনকে ফুলের খেত বললে অসুবিধা নেই। বিষয়টা অর্থের নয়, মাধুর্যের। মায়ের একটি  অর্থ মাতারি। তাই বলে মাকে কেউ মাতারি ডাকে না। মাগি আর মেয়ে সমার্থক। কিন্তু প্রয়োগে নয় অভিধানে। আরেকটা কথা—  শিল্পসাহিত্যে ব্যতিক্রম অনিবার্য এবং এটাই তার সৌন্দর্য। এবার আমার চোখ দুটো খুলে অভিধানের চোখ নিয়ে বাগান আর খেত দুটো একটু ঘুরে  আসি
 
বাগান: ফারসি বাগান অর্থ— (বিশেষ্যে) উদ্যান, উপবন। এবার দেখি উদ্যান অর্থ কী। সংস্কৃত উদ্যান (√উদ্‌+যা+অন) অর্থ— (বিশেষ্যে)  বাগান, কানন।  সংস্কৃত কানন (√কানি+অন) অর্থ (বিশেষ্যে) উদ্যান, বাগান, অরণ্য। সংস্কৃত অরণ্য (ঋ+অন্য) অর্থ— (বিশেষ্যে) গাছপালায় ঢাকা জায়গা যেখানে বন্য পশুপাখি বিচরণ করে; বন, জঙ্গল। অভিধানে অরণ্য কিংবা বন জঙ্গল বা উপবন প্রভৃতিকে গৌণার্থে ইংরেজি garden অর্থদ্যোতিত বাগানের সমার্থক বলা হলেও  প্রায়োগিকভাবে বাগান (গার্ডেন) কথাটি সর্বক্ষেত্রে অরণ্য কিংবা বন বা জঙ্গলের সমার্থক নয়। আম বা কাঁঠালের চাষ করা হয় অরণ্যে, জঙ্গলে, উপবনে। খেতে নয়। খেতে এসব বৃক্ষ ফসলের জন্য হানিকর।
 
খেত: সংস্কৃত ক্ষেত্র থেকে উদ্ভূত খেত অর্থ— (বিশেষ্যে) চাষের জমি, শস্য উৎপাদনের মাঠ।  যে মাঠে বা যে ভূমিতে শস্যাদি উৎপাদন করা হয় সাধারণত সেটি খেত। খেত বলা হয় শস্য উৎপাদনের সেই মাঠকে যেখানে সাধারণত মৌসুমভিত্তিক বিবিধ শস্য, আনাজ, তন্তু (পাট) প্রভৃতি চাষ করা হয়। আমের বন কিংবা কাঁঠালের বন প্রভৃতি এমন প্রকৃতির নয়। তাই আম-কাঁঠালের বাগান খেত নয়, বন। এজন্য রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন—  আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে- – -।  তিনি আমের খেত বলার সাহস পাননি।
 
সেহরি ও সেহরা
সেহরি:সেহরি আরবি উৎসের শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সেহরিঅর্থ— (বিশেষ্যে) রমজান মাসে উপবাসব্রত পালনের উদ্দেশ্যে সূর্যোদয়ের পূর্বে গৃহীত আহার্য।
 
সেহরা:সেহরা হিন্দি উৎসের শব্দ। (বিশেষ্যে) শব্দটির অর্থ— বিয়ের আসরে বরের পরিধেয় ফুল জরি প্রভৃতির তৈরি টোপর, টোপরবিশেষ।
 
ইফতার: আরবি ইফতার অর্থ (বিশেষ্যে) ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার পর খাদ্য গ্রহণ।
 
ইফতারি: ফারসি ইফতারি অর্থ (বিশেষ্যে) ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকার পর যে খাদ্যবস্তু গ্রহণ করা হয়।
 
গোয়েন্দা
গোয়েন্দা বাংলা শব্দ কি না?  গোয়েন্দা ফারসি উৎসের বাংলা শব্দ। এর অর্থ গুপ্তচর, রহস্যসন্ধানী, সত্যন্বেষী। ইংরেজিতে বলা হয় detective.
পুলিশ অফিসার প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় (১৮৫৫-১৯০৭) বাংলা সাহিত্যের ‘গোয়েন্দা গল্প রচনার’ পথিকৃৎ (বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও প্রধান, ড. মোহাম্মদ আমীন)।
মিয়া কি গালি? মিয়া অর্থ স্বামী
 
বউয়ের বোন শালি, বউয়ের ভাই শালা,
সহোদরের চেয়েও তারা অনেক বেশি ভালা।
শালা  খুব প্রিয় একটি স্বজন। আবার মারাত্মক বিশ্রী একটা গালি। পকেটমারকে হাতেনাতে ধৃত করার পর শালা ডাকা আর স্ত্রীর ছোটোভাইকে আদর করে শ্বশুরের হোটেল রুমে বসে  শালা ডাকা এক নয়। আবার বিরক্ত হয়ে বউয়ের ভাইকেও শালা ডাকা গালি-বকার চেয়ে বড়ো অপমানের হয়ে যেতে পারে। যার নই শালি, তার বুক খালি। কিন্তু, রাস্তাঘাটের শালি, ভয়ানক এক গালি। অতএব, সাধু সাবধান।  আপনি কী বললেন তা বিবেচ্য বিষয় নয়; কীভাবে কখন কোথায়  এবং কেন বললেন, সর্বোপরি উদ্দিষ্ট বক্তা তা  কীভাবে নিলেন  এগুলোই বিবেচ্য বিষয়। 
 
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, মিয়াঁ ফারসি উৎসের বাংলা শব্দ। বিশেষ্যে শব্দটির অর্থ নামের পূর্বে বা পরে ব্যবহৃত আখ্যা; সর্দার, মণ্ডল, মিয়াঁ (মিয়াঁ-বিবি) প্রভৃতি। দেখা যাচ্ছে অভিধানে মিয়া শব্দে গালির কোনো চিহ্ন নেই। শব্দটির সবকটি অর্থ শ্রদ্ধা আর মর্যাদার। কিন্তু প্রায়োগিকে এসে মাঝে মাঝে এমন শ্রদ্ধার মিয়াঁও বিড়ালের ম্যাও ম্যাও শব্দের মতো গালি হয়ে যায়। ঠিক শালা-শালির মতো। কিচ্ছু করার নেই। কথার বহর, জানোয়ারের আসর। বলার ভঙ্গিতেও শব্দের কথার রূপকতা কিংবা অর্থ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।
 
একটা কথা গালি না কি আদর, অভিশাপ না কি আশীর্বাদ; আদরামি না বাঁদরামি তা অর্থের ওপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে পরিস্থিতি আর গ্রহণ-অগ্রহণের ওপর। ভঙ্গি কিংবা অবস্থান আর  উদ্দেশ্যের ওপর। কাজের ছেলে বা কাজের মেয়ে কথা দিয়ে কেবল গৃহর্মী বোঝায় না; দক্ষ আর চৌকশ প্রিয়জনকেও কাজের ছেলে বা কাজের মেয়ে বলা হয়া। সত্যি, আমাদের আদুরে কন্যা রুমা একটা কাজের মেয়ে।  আমার এক খালাত ভাইয়ের নাম মিয়া। অনেকে মুরুব্বিদের সম্মান করে মিয়াভাই ডাকেন। আবার বিরক্তি প্রকাশেও মিয়া বলা হয় ধ্যাৎ মিয়া! ভণ্ডামি করার জায়গা পান না! আবার স্বামীও মিয়াঁ। মিয়াঁ বিবি রাজি, ক্যাঁয়া করেগা কাজি?
 
দায়রা জজ কথার দায়র অর্থ কী
দায়রা আদালত, দায়রা জজ প্রভৃতি শব্দ বা পদগুলো সঙ্গে আমরা প্রায় সকলেই পরিচিত । ”দায়রায় সোপর্দ করা হয়েছে” বাক্যও পত্রিকায় দেখা যায়। দায়রা আদালতে খুনোখুনি/ মারামারির বিচার হয় এবং দায়রা জজ এই ধরনের অপরাধের বিচার করেন । ইংরেজিতে দায়রা আদালতকে sessions court আর দায়রা জজকে sessions judge বলা হয় । আগে একটা বৈঠকেই বা সেশনে অভিযোগ, অভিযোগের শুনানি ও রায় ঘোষণা করা হতো।  এখন এমন হয় না । এ থেকেই নাম হয়েছে sessions court আর sessions judge । তাহলে দায়রা শব্দটার ব্যবহার কেন?  দায়রা আরবি শব্দ (ضَيْرَ) – এর অর্থ harm, injury, damage (ক্ষতি, আঘাত, অনিষ্ট ইত্যাদি)। যে আদালত এসব অপরাধের বিচার করে তা দায়রা আদালত নামে পরিচিত।
 
 
 
আড়-

১। সংস্কৃত অন্তরাল থেকে আসা আড়-এর অর্থ আড়াল, অন্তরাল
২। সংস্কৃত অরাল থেকে আসা আড়-এর অর্থ বাঁকা, ত্যারচা। আরেক অর্থ অর্ধেক, আধ
৩। দেশি শব্দ আড়-এর অর্থ প্রস্থ, চওড়া, পার্শ্ব, পাশ। আরেক অর্থ দীর্ঘ নিদ্রা বা বিশ্রামের পর দেহের আড়ষ্টতা। আবার আরেক অর্থ জিভের জড়তা। আরেক অর্থ কাপড় ঝুলিয়ে রাখার আলনা। আর শেষ অর্থ পাখি বসার দাঁড়
৪। আরেক দেশি শব্দ আড়-এর অর্থ ট্যাংরাজাতীয় আঁশবিহীন মিঠাপানির বড়ো মাছ, আইড়মাছ

আড়া-

১। দেশি শব্দ আড়া-এর অর্থ ডাঙা, কূল, পাড়, উঁচু তীর। আবার এর আরেক অর্থ রাস্তার ধারের নয়নজুলি
২। সংস্কৃত আকার থেকে আসা আড়া-এর অর্থ আকৃতি, ডৌল। এর আরেক অর্থ প্রকার। আবার ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে এর অর্থ বেঁকে যাওয়া, বিকল হওয়া
৩। সংস্কৃত আঢ়ক থেকে আসা আড়া-এর অর্থ শস্যাদির পরিমাপবিশেষ। আরেক অর্থ বাঁশ বা বেত দিয়ে বানানো ধামা। আর শেষ অর্থ মাচা
৪। সংস্কৃত অর থেকে আসা আড়া-এর অর্থ ঘরের ছাদের নিচে স্থাপিত প্রস্থবরাবর কাঠ (যা ছাদকে ধরে রাখে), কড়িকাঠ, joist। এর আরেক অর্থ কাপড় ঝুলিয়ে রাখার বা আলনা। আর শেষ অর্থ বস্ত্রের প্রস্থের দিক
৫। আরেক দেশি শব্দ আড়া-এর অর্থ করাত
 
শঙ্খ ঘোষ

আজ ২০২১ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে এপ্রিল করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন শঙ্খ ঘোষ। প্রয়াত শঙ্খ ঘোষের প্রতি রইল গভীর  শ্রদ্ধা। কবি, শিক্ষাবিদ, সাহিত্য সমালোচক ও রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ  শঙ্খ ঘোষের আসল নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। তিনি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের বর্তমান চাঁদপুরে জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মনীন্দ্রকুমার ঘোষ, মাতা অমলা ঘোষ। তিনি পিতার কর্মস্থল পাবনার চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বাংলায় স্নাতক এবং এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি বঙ্গবাসী কলেজ, সিটি কলেজ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, শিমলার ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ আডভান্স স্টাডিজ  এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।  ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  অবসর গ্রহণ করেন।

বাবরের প্রার্থনা কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার, ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের রবীন্দ্র পুরস্কার, ১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে দেশিকোত্তম পুরস্কার, ২০১১ খ্রিষ্টাব্দে পদ্মভূষণ পুরস্কার  এবং ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে  ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান জ্ঞানপীঠ পুরস্কার লাভ করেন। দিনগুলি রাতগুলি (১৯৫৬) তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ। কালের যাত্রা ও রবীন্দ্রনাটক (১৯৬৯) প্রথম গদ্যগ্রন্থ।  মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে, উর্বশীর হাসি, ওকাম্পোর রবীন্দ্রনাথ  প্রভৃতি তার বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ।

বিশ্ব বই দিবস

 আজ বিশ্ব বই দিবস। এটি বিশ্ব বই ও কপিরাইট দিবস কিংবা বইয়ের আন্তর্জাতিক দিবস নামেও পরিচিত।  অধ্যয়ন, প্রকাশনা এবং কপিরাইটবিষয়ক প্রচার ও এ বিষয়ক কার্যাবলির প্রসার দিবসটি পালনের লক্ষ্য।  ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল ইউনেস্কো প্রথমবারের মতো বিশ্ব বই দিবস উদ্‌যাপন করে। এরপর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর ২৩শে এপ্রিল বিশ্ব বই দিবস  পালিত হয়ে আসছে। 

 ভ্যালেন্সীয় লেখক ভিসেন্ত ক্লাভেল আন্দ্রেস বই দিবস পালনের উদ্যোক্তা। তিনি তাঁর প্রিয় লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেসকে সম্মান জানানোর লক্ষ্যে ৭ই অক্টোবর ওই লেখকের জন্ম দিনে বই দিবস পালনের প্রস্তাব  দেন। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ফেব্রুয়ারি রাজা ত্রয়োদশ আলফনসো স্পেনে স্পেনীয় বই দিবস পালনের জন্য ফরমান জারি করেন।  প্রথমে ৭ই অক্টোবর থের্ভান্তেসের জন্মদিনে দিবসটি পালন শুরু হলেও, পরে তা তাঁর প্রয়াণ দিবস ২৩শে এপ্রিল স্থানান্তর করা হয়। এখন দেখা যাক, ২৩শে এপ্রিল কেন?

১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কো সিদ্ধান্ত নেয় যে, বিশ্ব বই এবং কপিরাইট দিবস উদযাপিত হবে ২৩শে এপ্রিল। কারণ ২৩শে এপ্রিল   ইংরেজ  লেখক উইলিয়াম শেকসপিয়র, পেরুভীয় লেখক  ইনকা গার্তিলাসো দে লা ভেগা, এবং স্পেনীয় লেখক মিগেল দে থের্ভান্তেস-সহ আরো অনেক খ্যাতিমান লেখকের জন্ম বা মৃত্যুদিবস।  তাই ইউনেসকো ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিবছর ২৩শে এপ্রিল বিশ্ব বই এবং কপিরাইট দিবস  পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

প্রসঙ্গত শেক্সপিয়ার ও থের্ভান্তেস একই তারিখ (১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে এপ্রিল) মারা যান। তবে দিনটি একই ছিল না। কারণ  সে সময় স্পেনে গ্রেগরীয় পঞ্জিকা  এবং ইংল্যান্ডে জুলীয় পঞ্জিকা ব্যবহার করা হতো। সে হিসেবে; শেকসপিয়ার প্রকৃতপক্ষে থের্ভান্তেসের মৃত্যুর ১০ দিন পরে মারা যান। গ্রেগরীয় পঞ্জিকায় যা ৩রা মে। 

 

 

প্রতিদিন খসড়া-১

প্রতিদিন খসড়া-২

প্রতিদিন খসড়া-১ : https://draminbd.com/2020/12/27/প্রতিদিন-খসড়া/

প্রতিদিন খসড়া-২ : https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-২/

প্রতিদিন খসড়া: https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-৩/

https://draminbd.com/মাল্লা-মোল্লা-ও-মাঝিমাল্/৩/

শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
 
 
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
error: Content is protected !!