প্রতিদিন খসড়া-৪

 
ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রতিদিন খসড়-৪ সংযোগ: https://draminbd.com/প্রতিদিন-খসড়া-৪/

প্রতিদিন খসড়া-৪ — √
 
 
গায়ক গীতিকার শিল্পী ও সুরকার
যিনি গান করেন তিনি গায়ক। সংস্কৃত গায়ক (√গৈ+অক) অর্থ—   (বিশেষণ/বিশেষ্যে)  গান করে এমন, গানে পটু; গাইয়েন, গান করা যার পেশা। যেমন: হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একজন গায়ক। যিনি গীত বা সংগীত রচনা করেন তিনি গীতিকার। যেমন: গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার বাংলা গানের একজন কালজয়ী গীতিকার। সংস্কৃত শিল্পী (শিল্প+ইন্) অর্থ— (বিশেষ্যে/ বিশেষণে)  শিল্পদক্ষতাসম্পন্ন বা শিল্পে দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি, কারিগর।  চিত্রকর, গায়ক, বাদ্যযন্ত্রবাদক, নৃত্যশিল্পী, চিত্রশিল্পী প্রমূখ শিল্পী হিসেবে আখ্যায়িত। যিনি গায়ক তিনি শিল্পীও। যেমন: হেমন্ত মুখোপাধ্যায় একাধারে গায়ক, সুরকার ও গীতিকার।  সংস্কৃত সুরকার (সুর+√কৃ+অ) অর্থ— (বিশেষণে) গানের সুর রচয়িতা, সুরস্রষ্টা। যেমন: সুবল দাশগুপ্ত একজন বিখ্যাত সুরকার। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল উভয়ে একসঙ্গে গায়ক, গীতিকার, সুরকার এবং তাই শিল্পী।
 
আমি করব না করবো, খাব না খাবো?
প্রশ্নটি বারবার করা হয়। আমরাও যথাসম্ভব বারবার উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করি। যখন আপনি বা আপনারা কিছু— করবেন, খাবেন, ধরবেন, দেবেন, পাবেন, নেবেন, বলবেন, চলবেন, দেখবেন- – – তখন ক্রিয়াসমূহের শেষ বর্ণে ও-কার দেবেন না। সেক্ষেত্রে (উত্তম পুরুষে) ক্রিয়াসমূহের রূপ হবে যথাক্রমে— করব, খাব, ধরব, দেব, পাব, নেব, বলব, চলব, দেখব – – – ইত্যাদি। যেমন: আমি যাব; আমি হাসব, আমরা পড়ব।
নিমোনিক: উত্তম পুরুষ কাজ করতে গিয়ে ক্রিয়ায় ও-কার দিয়ে কাজের বোঝা বাড়ান না। কাজ যত হালকা হয় তত সুবিধা। তাই লিখুন— আমি করব, আমরা করব। খাবেন ভালো কথা, তবে বেশি খাবেন না।মনে রাখবেন— উনা ভাতে দুনা বল, বেশি ভাতে রসাতল। তাই লিখুন: আমি খাব, আমরা খাব।
 
আপনি মনে মনে ভাবছেন, ক্রিয়ায় ও-কার দেব না, কিন্তু গোরু, পটোল, বড়ো, ছোটো প্রভৃতি বানানে ও-কার দেব কেন?
এগুলো ক্রিয়া নয়। গরু বানানে ও-কার দিলে মোটাতাজা গোরু পাওয়া যায়। মোটাতাজা করলে ভালো দাম পাওয়া যাবে, মাংস পাবেন বেশি। তাই গরু এখন গোরু। তেমনি, পটোল বানানের; ট-য়ে ও-কার দিয়ে পেটটি মোটা করা হয়েছে। হাইব্রিড বা উচ্চ ফলনশীল সবজি—পেট তো একটু মোটা হবেই।
 
মনে করুন, বড় আর ছোট বানানেও অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়ে বড়ো আর ছোটো করা হয়েছে।
উৎস: নিমোনিক প্রমিত বাংলা বানান অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন।
 
 
বাংলা বানানে দীর্ঘস্বর
 
বাংলায় ধ্বনিমূলগত দীর্ঘস্বর নেই। হ্রস্ব ও দীর্ঘ উভয় স্বরের উচ্চারণ অভিন্ন। তাছাড়া এক ভাষার শব্দকে অন্য ভাষার বর্ণ দিয়ে অবিকল উচ্চারণানুগ শব্দে প্রকাশ করার প্রয়াস হাস্যকর। পৃথিবীর কোনো ভাষাতে এটি সম্ভব নয় এবং ভাষার স্বকীয় মর্যাদা বজায় রাখার জন্য এমনটি করাও হয় না। বিদেশি ভাষার কোনো শব্দ বাংলায় এলে তাকে বাংলা ভাষায় বিদ্যমান বর্ণ-চিহ্ন দিয়ে যতটুক পারা যায় কেবল ততটুকুই অতিথি ভাষার স্বকীয়তা অক্ষুণ্ন রেখে প্রতিপাদন করা হয়। বিদেশি কোনো শব্দকে বাংলায় এনে ওই ভাষার অনুরূপতা বজায় রাখার জন্য নিজ ভাষার স্বকীয়তা, ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যরাশিকে বিসর্জন দেওয়া অত্মমর্যাদা বিলিয়ে দেওয়ার তুল্য। বাঙালি ছাড়া আর কেউ, মাতৃভাষায় আগত অতিথি-শব্দকে মর্যাদা দিতে গিয়ে নিজের ভাষার সম্মান ও চরিত্র বিসর্জন দিয়ে দেয় না। মাতৃভাষার চেয়ে শ্রেষ্ঠ ভাষা আর কী হতে পারে! অবশ্য যে দেশের অনেকে, বিয়েশাদিসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের চিঠিপত্রে এখনও ইংরেজি ভাষার ব্যবহারকে মর্যাদাময় গণ্য করেন, সে দেশের মানুষের মাতৃভাষা প্রেম, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, স্বকীয় দ্যোতনা ও আত্মসম্মানবোধ কত ঠুনকো তা সহজে অনুমেয়।
– – – —
– – – – – –
বাংলা ভাষার শব্দে ব্যবহৃত দীর্ঘস্বরের কাজ অর্থদ্যোতনার ভিন্নতা আনয়ন।উচ্চারণ-দ্যোতনায় এর কোনো ভূমিকা নেই। যেমন : দিন/দীন, কুল/কূল, চির/চীর শব্দজোড়ের উচ্চারণ অভিন্ন। তাই ইভ ও ঈভ, পির ও পীর, ঈশ ও ইস, নিচ ও নীচ কিংবা মুল ও মূল, কুল ও কূল, দুর ও দূর প্রভৃতি শব্দে অর্থগত পার্থক্য থাকলেও উচ্চারণগত কোনো পার্থক্য নেই। তাই বাংলা বানানে সমতা আনয়নের জন্য এবং বাংলা ভাষার স্বকীয় মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য আদর্শিক নির্দেশনা আবশ্যক। এ নির্দেশনায় উচ্চারণগত কোনো সমস্যা স্বাভাবিক কারণে আসার কথা নয়। – – – বিশেষ কারণে নিপাতনে সিদ্ধ কথাটি খুব সীমিত মাত্রায় বিবেচনা করা যায়।তবে এটি করতে গিয়ে সমতা বিধানের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করা সমীচীন হবে না।
 
‘অসূর্য স্পশ্যা’ কথার অর্থ কী?
শুবাচে ‘অসূর্য স্পশ্যা’ নামের একজন সদস্য আছেন। আমি তাঁর নামের অর্থ জানতে চাইছি না। কারণ ব্যক্তির নাম ব্যক্তির অদ্বিতীয় পরিচয়, এজন্য নামের কোনো সাধারণ অর্থ নেই, ব্যক্তিই নাম এবং নামই ব্যক্তির পরিচিয়জ্ঞাপক অভিধা। তবু সবাই অর্থহীন শব্দ দিয়ে নাম রাখতে চায়। কিন্তু ‘অসূর্য স্পশ্যা’ এমন একটি নাম যা অর্থহীন শব্দ দিয়ে রক্ষিত।
 
 
প্রবাদ ও প্রবচনের পার্থক্য
‘প্রবাদ’ ব্যঞ্জননির্ভর কিন্তু ‘প্রবচন’ বাচ্যনির্ভর। এটিই উভয়ের মূল পার্থক্য। চয়নসূত্রে প্রবাদের একটি বাচ্যার্থ থাকে কিন্তু প্রবাদটি প্রকৃতপক্ষে সে অর্থে ব্যবহৃত হয় না; ব্যঞ্জনার্থেই ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ ‘ছাড় কড়ি মাখ তেল’- প্রবাদটির কথা বলা যায়। বাক্যটির সাধারণ অর্থ : ‘তেল গায়ে মাখতে হলে টাকা দিয়ে কিনতে হয়’। কিন্তু প্রবাদটি যখন বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন সাধরণ অর্থ লোপ পেয়ে গূঢ়ার্থই কেবল প্রকাশ পায়। এর গূঢ়ার্থ হচ্ছে : অর্থ ছাড়া কিছু হয় না বা টাকা ছাড়া সংসারে কিছুই পাওয়া যায় না।
প্রবচনে কটি কেন্দ্রীয় চরিত্র থাকে। ‘যম, জামাই, ভাগনা- এ তিন নয় আপনা।’ এটি একটি প্রবচন। যম মানুষের জীবন নিয়ে যায়, কাউকে কোনো অবস্থায় ছাড়ে না। অন্যদিকে গৃহে জামাতার আগমন কিংবা ভাগ্নের অবস্থান দারিদ্র্যপীড়িত সংসারে বোঝাস্বরূপ। তবু তাদের অবহেলা করা যায় না কিন্তু শত খরচ করার পরও কোনো প্রতিদান বা সুনাম পাওয় যায় না। এটি প্রবচন কারণ এর কোন রূপকধর্ম নেই, সরাসরি অর্থ আছে।
‘প্রবাদ’ ও প্রবচনের আর একটি পার্থক্য হলো, প্রবাদ অজ্ঞাত পরিচয় সাধারণ মানুষের লোক পরম্পরাগত সৃষ্টি। অন্যদিকে কবি, সাহিত্যিক ও চিন্তশীল বিজ্ঞজনই প্রবচনের স্রষ্টা। এককথায় প্রবাদ লোক-অভিজ্ঞতার ফসল, প্রবচন ব্যক্তি মনীষীর সৃষ্টি। সাধারণত প্রবাদের চেয়ে প্রবচন আকারে বড়ো হয়। তবে সবসময় যে বড়ো হবে এমন কথা নেই।
সূত্র : ড. মোহাম্মদ আমীন, বাংলা ভাষার প্রবাদ-প্রবচন।
 
শব্দার্থ ও পদ-মর্যাদা
 
বাক্যে বসে ‘পদ’-এর মর্যাদায় উপনীত না হওয়া পর্যন্ত একটি ‘শব্দ’ নানা অর্থ ধারণ করতে পারে। তাই সুনির্দিষ্টভাবে কোনো ‘শব্দ (word)- এর অর্থ জানার জন্য প্রশ্ন না করে বরং ওই শব্দের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্ট ‘পদ’ এর অর্থ জানার লক্ষ্যে প্রশ্ন করা সমীচীন। বাক্যে প্রযুক্ত করলে একটি ‘শব্দ’, ‘পদ’-এ পরিণত হয়।
আমরা সাধারণত শব্দার্থ জানার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও মূলত ‘পদ’ এর অর্থ জানতে চাই। তাই সবার উচিত শব্দটি বাক্যে প্রযুক্ত করে অর্থ জানার আগ্রহ প্রকাশ করা। তাহলে উত্তর দেওয়া অনেকটা সহজ হয়ে যায়।
‘বল’ শব্দের অর্থ হতে পারে, শক্তি, বলা, খেলা বা ফুটবল ইত্যাদি। তাই কেউ যদি ‘বল’ শব্দের অর্থ জানতে চান তাহলে তা যথাযথভাবে বলা সাধারণত সম্ভব হয় না। কিন্তু বাক্যে বসিয়ে ‘বল’ শব্দটিকে ‘পদ’-মর্যাদায় উন্নীত করলে তার অর্থ সুনির্দিষ্টভাবে বলা যায়।
যেমন : ‘বল’ খেলায় মোহন বাগান শিরোপা জিতেছে।
বল তো, এতদিন কোথায় ছিলি?
ছাগলের চেয়ে হাতির বল বেশি।

বানান রহস্য : ণত্ববিধান/১

(১) তৎসম শব্দে ক্ষ-এর পর সাধারণত মূর্ধণ্য-ণ হয়। যেমন: ক্ষণ, ক্ষীণ, ক্ষীয়মাণ, ক্ষুণ্ন, ক্ষুণ্নমনা ইত্যাদি। ‘ক্ষুণ্ন’, ‘ক্ষুন্নিবৃত্তি’ ও ‘ক্ষুন্নিবারণ’ শব্দের বানান লক্ষ করুন— ‘ক্ষুণ্ন’ শব্দের বানানে /মূর্ধন্য-ণ ফলা/ কিন্তু ‘ক্ষুন্নিবৃত্তি’ ও ‘ক্ষুন্নিবারণ’ শব্দের বানানে /দন্ত্য-ন/ এর দ্বিত্ব হয়েছে। কিন্তু কেন?
(২) ‘অন্তঃস্থ- র’ বর্ণের পর সাধরণত ‘মূর্ধন্য-ণ’ হয়। যেমন: করণ, বরণ, ধারণ ইত্যাদি। কিন্তু ‘ধরণ’ ও ‘দরুন’ বানানে দন্ত্য-ন কেন?
(৩) তৎসম শব্দের বানানে ‘রেফ’-এর পর ‘মূর্ধন্য-ণ’ হয়। তাই বানানে সাধারণত ‘রেফ’-এর পর ‘দন্ত্য-ন’ দেখা যায় না। কিন্তু অহর্নিশ, দুর্নাম, দুর্নিবার প্রভৃতি শব্দের বানানে ‘দন্ত্য-ন’ কেন?
(৪) আমরা জানি ‘র’-বর্ণের পরস্থিত তৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ‘মূর্ধন্য-ণ’ হয়। কিন্তু, /দুর্নীতি, দুরপনেয়, দুর্নাম, দুর্নিবার, দুরন্বয়/ ইত্যাদি তৎসম শব্দ হওয়া সত্ত্বেও ‘র’- বর্ণের পর ‘দন্ত্য-ন’ কেন?
৫. তৎসম শব্দে /র, ঋ বা ক্ষ/ প্রভৃতির পর ‘মূর্ধন্য-ণ’ হয়। /গণক, গণনা, গণিত, গণৎকার, গণনীয়, গণ্য, গণশক্তি, গণনায়ক/ প্রভৃতি শব্দে /র, ঋ, ক্ষ/ বা তাদের কোনো কার-চিহ্ন নেই; তবু বানানে মূর্ধন্য-ণ কেন?

বানান এবং অর্থ

সটীক অর্থ ব্যাখ্যাযুক্ত।
সঠিক অর্থ নির্ভুল।
সত্তম অর্থ সর্বোৎকৃষ্ট।
 
সন্তলন অর্থ গরম তেলে হালকা ভেজে নেওয়ার কাজ।
সন্ধিনী অর্থ ঋতুমতী গাভি।
সন্মিত্রা অর্থ অকপট বন্ধু।
 
সফেন অর্থ ফেনিল বা ফেনাময়।
সভর্তৃকা অর্থ স্বামী-সহ।
সমপঙ্‌ক্তিভোজ্য অর্থ সমমর্যাদাসম্পন্ন।
 
সসত্ত্বা অর্থ অন্তঃসত্ত্বা।
সহেলি অর্থ বান্ধবী বা সঙ্গিনী।
সাঁচা অর্থ সত্য বা খাঁটি।
 
সাদন অর্থ ধ্বংস বা বিনাশ।
সাধন অর্থ উপাসনা বা সাধনা।
সান্ত অর্থ সসীম বা অন্ত আছে এমন।

পূর্ণ ও পুন/পুনঃ

‘পূর্ণ’ ও ‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়) ব্যবহার
পূর্ণ’ (Full/Complete) শব্দটি সংশ্লিষ্ট শব্দের আগে বা পরে ‘ঊ-কার’ এবং ‘র্ণ’ যোগে ব্যবহৃত হবে। যেমন— পূর্ণরূপ, পূর্ণমান, পূর্ণদিন, সম্পূর্ণ, পরিপূর্ণ ইত্যাদি।
‘পুন’ (পুনঃ/পুন+রেফ/পুনরায়) শব্দটি সংশ্লিষ্ট শব্দের পূর্বে ‘উ-কার’ নিয়ে অন্য শব্দটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসবে।। যেমন— পুনঃপ্রকাশ, পুনঃপরীক্ষা, পুনঃপ্রবেশ, পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনঃপুন, পুনর্জীবিত, পুনর্নিয়োগ, পুনর্নির্মাণ, পুনর্মিলন, পুনর্লাভ, পুনর্মুদ্রিত, পুনরুদ্ধার, পুনর্বিচার, পুনর্বিবেচনা, পুনর্গঠন, পুনর্বাসন প্রভৃতি।
 
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

আদ্যক্ষর না কি আদ্যাক্ষর

আদিও আদ্য শব্দের সঙ্গে অক্ষর শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে যথাক্রমে আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর। আদি ও আদ্য অর্থ প্রথম। সংস্কৃত আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর অর্থ (বিশেষ্যে) প্রথম অক্ষর। সুতরাং, উভয় শব্দ সমার্থক। কিন্তু কোন শব্দটি শুদ্ধ?
 
পবিত্র সরকার প্রমুখ সংকলিত আকাদেমি বানান অভিধান অনুযায়ী আদ্যক্ষর (আদি+অক্ষর) এবং আদ্যাক্ষর (আদ্য+অক্ষর) উভয় বানানই ব্যাকরণসম্মত ও শুদ্ধ। তাই ওই অভিধানে আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর উভয় শব্দকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে কেবল আদ্যাক্ষর বানানকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এখন দেখা যাক কীভাবে উভয় বানান শুদ্ধ ও ব্যাকরণসম্মত হয়।
আদ্যক্ষর= আদি+অক্ষর। কারণ: ই/ঈ ছাড়া স্বরবর্ণ পরে থাকলে ই/ঈ-স্থানে য-ফলা হয় এবং সৃষ্ট য-ফলা শেষ পদের প্রথম স্বর নিয়ে প্রথম পদের শেষ বর্ণে যুক্ত হয়। এভবে গঠিত হয়েছে: আদি+অক্ষর= আদ্যক্ষর। অনুরূপ: অতি+অন্ত= অত্যন্ত, আদি+অন্ত= আদ্যন্ত, প্রতি+অহ= প্রত্যহ। প্রতি+আশা= প্রত্যাশা, ইতি+আদি= ইত্যাদি, অভি+উদয়= অভ্যুদয়, অতি+উচ্চ= অত্যুচ্চ, প্রতি+ঊহ্= প্রত্যূহ, প্রতি+এক= প্রত্যেক, যদি+অপি= যদ্যপি।
 
আদ্যাক্ষর= আদ্য+অক্ষর। কারণ: অ/আ-এর পর অ বা আ থাকলে উভয় বর্ণ মিলে আ হয় এবং সৃষ্ট আ পূর্ববর্ণে যুক্ত হয়। সেভাবে গঠিত হয়েছে: আদ্য+অক্ষর= আদ্যাক্ষর। অনুরূপ: অদ্য+অপি=অদ্যাপি; অদ্য+অবধি= অদ্যাবধি, অন্য+অন্য= অন্যান্য, কাব্য+অংশ= কাব্যাংশ, বাক্য+অতীত= বাক্যাতীত, মধ্য+অহ্ন= মধ্যাহ্ন; সাধ্য+অতীত= সাধ্যাতীত, কাব্য+অলংকার= কাব্যালংকার ইত্যাদি।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান অনুযায়ী, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত আদ্যাক্ষর= আদ্য+অক্ষর= (আদ্য্+অ)+অক্ষর। এই অভিধানে আদ্যক্ষর (আদি+অক্ষর) শব্দকে স্থান দেওয়া হয়নি। যদিও আদ্যন্ত (আদি+অন্ত) শব্দকে স্থান দেওয়া হয়েছে। আদ্যন্ত স্থান পেলে আদ্যক্ষর কী দোষ করল?
 
উপসংহার: ব্যাকরণিক গঠন অনুযায়ী আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর উভয় বানানই শুদ্ধ। তবে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে কেবল আদ্যাক্ষর শব্দকে স্থান দেওয়া হয়েছে। (অনুলিখন: PROMITA DAS LABONI)
 
 

কৌশল মানে ঘাস তুলতে পারার দক্ষতা

‘কৌশল’ শব্দের আভিধানিক ও প্রচলিত অর্থ— কুশলতা, দক্ষতা, নৈপুণ্য, ফন্দি, ছল, চাতুর্য, কারিগরি ইত্যাদি। ‘কুশল’ থেকে কৌশল শব্দের উদ্ভব। তবে বাংলা ভাষায় কুশল শব্দটি দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়।

প্রথমত, কুশল বলতে বোঝায় নিপুণ, দক্ষ, বিচক্ষণ প্রভৃতি। ‘‘কুশল’ থেকে কুশলী ও কৌশল শব্দের উদ্ভব। অন্যদিকে. ‘কুশল’ শব্দের আরেক অর্থ: মঙ্গল, শুভ, কল্যাণ, কল্যাণকর প্রভৃতি। তবে সংস্কৃতে ‘কুশল’ শব্দটি বাংলার মতো দু-রকম অর্থ বহন করে না।
সংস্কৃত ‘কুশল’ শব্দটি ‘কুশ’ হতে এসেছে। কুশ একজাতীয় তৃণ বা ঘাস। এটি অতি চিকন ও ধারালো এবং মাটির সঙ্গে শেকড় দিয়ে শক্তভাবে লেপটে থাকে। মাটি থেকে তুলতে গেলে হাত কেটে যায়। যে ব্যক্তি হাতকে অক্ষত রেখে দ্রুত ‘কুশ’ উত্তোলন করতে পারে সে হচ্ছে ‘কুশ’ এবং তার কার্যক্রম বা ভাবটা হচ্ছে কৌশল।
সুতরাং, দ্রুত কুশ বা ঘাস তুলতে পারার দক্ষতাই হচ্ছে কৌশল।
অন্যদিকে ‘কুশ’ তৃণটি পবিত্র বিবেচনায় যজ্ঞ ও পূজা-পার্বণের অনিবার্য উপকরণ। এটি ঔষধি হিসেবেও অত্যন্ত ফলদায়ক। এ কারণে ‘কুশ’ শব্দটি বাংলায় পবিত্র, মঙ্গল, কল্যাণ প্রভৃতি অর্থ পেয়েছে। তাই বাংলায় কুশল কথাটির অর্থ— কুশযুক্ত অর্থাৎ পবিত্র, শুভ, কল্যাণযুক্ত, কল্যাণকর ও মঙ্গলময়।
 
‘মিসিল’ শব্দের অর্থ
নবীনচন্দ্র সেন তাঁর লেখা ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ – – – গিরিশেখরস্থ ধর্ম্মাধিকরণের দ্বিতল গৃহ কলকণ্ঠে পরিপূর্ণ করিয়া মিসিল পড়িতে লাগিলেন; জজ টানা পাখায় আন্দোলিত শেখরজাত স্নিগ্ধ সমীরণে নাসিকা-ধ্বনি করিয়া নিদ্রা যাইতে লাগিলেন। ‘মিসিল’ পড়া তাঁহার এত দূর স্বভাবসিদ্ধ হইয়াছিল যে, অনেক সময় তাঁহাকে নিদ্রাতেও মিসিল পড়িতে শুনিয়াছি। মিসিল বন্ধ হইলে জজের নিদ্রাভঙ্গ হইল; পিতার প্রদত্ত হুকুম দস্তখত করিলেন; বিচারকার্য্য শেষ হইল।”***
উইলিয়াম ক্যারি সংকলিত এবং ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরামপুর থেকে প্রকাশিত A Dictionary of the Bengali Language পুস্তকে ‘মিসিল’ অর্থ লেখা হয়েছে, ‘File of papers’ বা ‘পত্রাদি গাঁথিয়া রাখণার্থে শিক মিসিল’। এই ‘মিসিল’ শব্দের সম্প্রসারিত অর্থ: ‘মামলা সংক্রান্ত নথি বা ব্রিফ’।
—————————
*** সূত্র: নবীনচন্দ্র-রচনাবলী, আমার জীবন (১ম খণ্ড), সম্পাদক সজনীকান্ত দাস, প্রকাশক বঙ্গীয়-সাহিত্য-পরিষৎ, দ্বিতীয় সংস্করণ: মাঘ ১৪১৯, পৃষ্ঠা: ১০]

গোগ্রাস, জিলাপি ও জিলিপি এবং গলগ্রহ

‘গোগ্রাস’ শব্দের অর্থ: বড়ো গ্রাস, ঘন ঘন গ্রাস। ‘গো’ ও ‘গ্রাস’ শব্দের মিলনে ‘গোগ্রাস’ শব্দের উদ্ভব। ‘গো’ মানে গোরু এবং ‘গ্রাস’ মানে লোকমা বা একবারে যে পরিমাণ খাদ্য মুখে পোরা যায়। সুতরাং গোগ্রাস মানে গোরুর লোকমা। গোগ্রাস শব্দের ব্যাকরণগত অর্থ গোরুর লোকমা হলেও এখন শব্দটি গোরুর খাদ্য বোঝাতে কেউ ব্যবহার করেন না। কোনো ব্যক্তি যখন অতি দ্রুত বেশি পরিমাণ খাদ্য মুখে দিয়ে তাড়াতাড়ি গিলতে থাকেন এবং গেলা শেষ হওয়া মাত্র আবার একই কায়দায় মুখে বড়ো গ্রাস ঢুকিয়ে দিতে থাকেন, তখন সেটাকে গোগ্রাস বলা হয়।
বিভিন্ন কারণে মানুষকে গোগ্রাসে গিলতে হয়। প্রচণ্ড ক্ষুধা নিয়ে অনেক দিন পর উপাদেয় খাবার পেলে মানুষ গোরুর গ্রাসের মতো গোরু+গ্রাসে গিলতে শুরু করে। আবার অনেকে তাড়াতাড়ি খেয়ে না-নিলে ভাগে কম পড়বে ভেবে এমনটি করে থাকে। আবার কারও কারও অভ্যাসই হচ্ছে গোগ্রাসে গেলা। আধুনিক যান্ত্রিক যুগে সময়ের অভাবের ফাঁদে পড়ে গোগ্রাসে গেলাটা অনেক বিত্তবানের করুণ কিন্তু অনিবার্য অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

বাঙালি রমণীর তেজ

[ছবি: সরহপাদের ব্রোঞ্জ মূর্তি।]
সরহ পা/সরহপাদ ছিলেন চর্যাপদের ২২, ৩২, ৩৮ এবং ৩৯ নম্বর পদের রচয়িতা। সরহপাদের একটি দোহায় আছে:
“বঙ্গে জায়া নিলেসি পরে
ভাগেল তোহর বিণাণা।”
অর্থ: “বঙ্গে (পূর্ববঙ্গে) যখন বিয়ে করেছিস তোর বুদ্ধিশুদ্ধি সব লোপ পেল বলে (বিণাণা = চিত্তবান অর্থাৎ সু-চেতনা)।”
বুঝেন, বউদির কেমন কঠোর শাসনে ছিলেন সরহ পা দা।
ভুসুকা পা/ ভুসুকপাদ (প্রকৃত নাম শান্তিদেব) সৌরাষ্ট্রের রাজপুত্র ছিলেন। বাঙালি বিয়ে করে বেচারার কী অবস্থা হয়েছে তা তাঁর নিজের লেখায় দেখুন। ভুসুকপাদ লিখেছেন:
‘আদি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী
ণিঅ ঘরণি চণ্ডালী লেলী।’
অর্থ: “ভুসুক বঙালিকে যেদিন নিজের গৃহিণী করলেন সেদিন তিনি বাঙালি বনে গেলেন অর্থাৎ বাঙালসুলভ ভ্রষ্টাচারের ফাঁদে পড়লেন।”
এ না হলে বাঙালি রমণী!
সরহ পা ও ভুসুক পা দুজনে বাংলাভাষী ছিলেন। তারপরও তারা বঙ্গ ও বঙ্গের মেয়ে নিয়ে এমন মন্তব্য করলেন কেন? জ্যোতিভূষণ চাকীর মতে উভয়ে ছিলেন ঘটি। মনে হচ্ছে, তাঁদের উভয়ের স্ত্রী বাঙালি ছিলেন এবং প্রকৃত বাঙালি রমণীর মতো করে দুজন ঘটি স্বামীকে ইচ্ছেমতো শাসন করেছেন।
জয় বাঙালি রমণী।
[মন্তব্য করার সময় আমি ভাবব আমার মাও একজন বাংলাভাষী।]
সূত্র:
রঙ্গরসে বাংলা বানান, ড. মোহাম্মদ আমীন, তৃণলতা।
বাগর্থকৌতুকী, জ্যোতিভূষণ চাকী।
ছবি প্রতিচ্ছবি মুখচ্ছবি
 
প্রতিকৃতি, চিত্র, আলেখ্য, প্রতিমূর্তি, আলোকচিত্র প্রভৃতি বোঝাতে ‘ছবি’ শব্দটি প্রয়োগ করা হয়। আরবি ‘শবিহ্’ শব্দ থেকে এই অর্থে ব্যবহৃত বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত ছবি শব্দের উদ্ভব। ‘শবিহ্’ অর্থ মুখের ছবি। বাংলায় যার অর্থ: চিত্র, প্রতিকৃতি, তৈলচিত্র, আঁকা-ছবি, তোলা-ছবি প্রভৃতি।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, আরবি ছবি অর্থ (বিশেষ্যে) প্রতিকৃতি, চিত্র, আলেখ্য; আভাস; চলচ্চিত্র, সিনেমা। ওই অভিধানে আর একটি ছবি আছে। সেটি সংস্কৃত ছবি। সংস্কৃত ছবি (√ছো+বি) অর্থ (বিশেষ্যে) কিরণ, দ্যুতি, দীপ্তি, প্রভা, শোভা, কান্তি, সৌন্দর্য।
 
দুই ছবি বলছে: মুখের ছবি আর মুখচ্ছবি এক নয়। মুখচ্ছবি অর্থ: মুখের সৌন্দর্য, দীপ্তি, ঔজ্জ্বল্য প্রভৃতি। যেমন: রবিচ্ছবি অর্থ: প্রভা, কান্তি, আলোময়, শোভা, সৌন্দর্য ইত্যাদি। এই ছবি সংস্কৃত ছবি। আর ‘মুখের ছবি’ অর্থ: মুখের প্রতিকৃতি, মুখের ছবি, মুখের তৈলচিত্র। এই ছবি আরবি ছবি।
 

পদের পরে -জীবী কেন হবে এবং কখন দেব

জীব বানানে ঈ-কার যুক্ত করলে হয় জীবী। সুতরাং যে কাজ জীবনধারণে সহায়তা করে এবং জীব এর জন্য আবশ্যক সেসব কাজ বা পেশার পরে জীবী হবে। জীবী পেশার সঙ্গে জড়িত। তাই সে একা বসে না। সর্বদা জীবিকার উপায় নামক প্রত্যয়টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে।
যেমন: কলমজীবী, কর্মজীবী, পেশাজীবী, চাকরিজীবী, মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী, উঞ্ছজীবী।
 

প্রফুল্ল: প্রফুল্ল অর্থ প্রকৃষ্টরূপে ফোটা ফুল

 
শব্দটির আভিধানিক অর্থ: হাস্যময়, উল্লসিত, প্রসন্ন, সহাস্য, আনন্দিত। ‘প্রফুল্ল’ শব্দের আদি ও মূল অর্থ: প্রস্ফুটিত। যে ফুল প্রকৃষ্টরূপে ফুটেছে তা প্রকাশে ‘প্রফুল্ল’ শব্দটি ব্যবহার করা হতো। একসময় শব্দটি ফুল ফোটার, ফোটা ফুলের বিবরণ প্রদান প্রভৃতি কাব্যিক অভিব্যক্তি হিসাবে বাগানে সীমাবদ্ধ ছিল। রবীন্দ্রনাথের গানেও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন: প্রফুল্লকদম্ব বন—।
প্রফুল্ল এখন বাগানে আর নেই। এখন প্রফুল্ল শব্দটি প্রসন্ন, সহাস্য, আনন্দিত এবং বদন, চিত্ত, মন প্রভৃতির আনন্দঘন প্রসন্নতা বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। যেমন: প্রফুল্লচিত্ত, প্রফুল্লবদন, শান্তিজুড়ে চিত্তবদন।
ফুল ও বাগানের সঙ্গে জন্মগত সম্পর্ক ছিন্ন করে আমাদের সেই দারুণ ‘প্রফুল্ল’ বাগান ছেড়ে মানুষের হৃদয়, মন ও চিত্ত-বদনকে উৎফুল্লময় করে দেওয়ার জন্য উঠে এসেছে।
প্রফুল্ল হয়তো বুঝতে পেরেছিল একদিন বাগানের সংখ্যা কমে যাবে। বাগান থাকলেও মানুষ আর বাগানে ফুল দেখতে যাবে না। বরং ফুলকে কেটে, জীবননাশ করে ঘরে এনে উপভোগ করবে। হায়রে প্রফুল্ল, তুমি বড়ো ভাগ্যবান; বাগান ছেড়ে দিয়ে বদন আর চিত্তে চলে আসায় ঘরে বসে তুমি ফুলের সুবাস নিতে পারছ।
 

দরদাম: মূল্য কেন দাম

মহাবীর আলেকজান্ডারের আমলে গ্রিকদের একপ্রকার রৌপ্যমুদ্রার নাম ছিল ‘দ্রাখ্‌মে’। তিনি ভারতে আসার পর উত্তর-পশ্চিম ভারতের বিশাল একটা এলাকা গ্রিক বা যবনদের দখলে ছিল। তখন ‘দ্রাখ্‌মে’ দিয়ে দ্রব্যাদির মূল্য পরিশোধ করা হতো। এ ‘দ্রাখ্‌মে’’ শব্দটির বানান ও উচ্চারণ কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে সংস্কৃতে ‘দ্রহ্ম’-রূপ ধারণ করে। এ ‘দ্রহ্ম’ শব্দ থেকে আসে দম্ম। দম্মের প্রাকৃত রূপের মধ্য দিয়ে আসে ‘দাম’। যার অর্থ মূল্য। আবার ‘দর’ শব্দের অর্থও মূল্য। ‘দাম’ শব্দের পূর্বে ‘দর’ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ‘দরদাম’। গ্রিক শব্দ হতে আগত ‘দাম’ এখন সংস্কৃত ‘মূল্য’ শব্দের চেয়ে অধিক জনপ্রিয়।
উৎস: ড. মোহাম্মদ আমীন, পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান।

দম্ভোদ্‌ভব: দাম্ভিক ও দম্ভোক্তির জন্মকাহন

‘দম্ভোদ্‌ভব’ মহাভারতে বর্ণিত একজন রাজা। নিজের শক্তি নিয়ে তাঁর প্রচণ্ড অহংকার ছিল। তিনি মনে করতেন, ব্রহ্মাণ্ডে তাঁর মতো শক্তিশালী রাজা আর কেউ নেই। নিজের শক্তি নিয়ে তিনি প্রায়শ অহমিকাপূর্ণ উক্তি করতেন। একদিন রাজ্যের ব্রাহ্মণগণ বললেন, “গন্ধমাদন পর্বতে সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বনে রত নর ও নারায়ণের শক্তির তুলনায় আপনার শক্তি অতি নগণ্য।” এ কথা শুনে দম্ভোদ্‌ভব অপমানিত বোধ করলেন এবং নিজের শক্তি প্রমাণের জন্য সৈন্যসামন্ত নিয়ে নর ও নারায়ণের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রওনা দিলেন।
প্রথমে নর ও নারায়ণ দম্ভোদ্‌ভবকে যুদ্ধ হতে নিবৃত রাখার চেষ্টা করলেন। নিজের শক্তির প্রতি অতিরিক্ত আস্থাশীল ও অহংকারী দম্ভোদ্‌ভব অনুরোধ অগ্রাহ্য করে যুদ্ধে অগ্রসর হওয়ার জন্য সৈন্যদের নির্দেশ দিলেন।
এ অবস্থায় নর ও নারায়ণ একমুঠো ঘাস তীরের মতো দদম্ভোদ্‌ভবের দলের দিকে নিক্ষেপ করলেন।নিক্ষিপ্ত ঘাসে পুরো আকাশ সাদা হয়ে গেল।দম্ভোদ্‌ভব-পক্ষের সৈন্যসামন্ত-সহ সবার চোখ, কান ও নাকে ঘাস প্রবেশ করতে শুরু করল। এ অবস্থায় দম্ভোদ্‌ভব নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা প্রার্থনা করে কোনোরকমে রক্ষা পেয়ে নিজ দেশে ফিরে আসেন।
দম্ভোদভবের এমন অহমিকাপূর্ণ কিন্তু অকার্যকর উক্তি থেকে দম্ভোক্তি শব্দের উদ্ভব। দাম্ভিক শব্দটিও দম্ভোদ্‌ভবের আচরণ থেকে সৃষ্ট।দম্ভোদ্‌ভবের মতো যার আচরণ তাকে বলা হয় দাম্ভিক।
উৎস: পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন।

কৌস্তুভ কী?

ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস গ্রন্থে আছে, “কৌস্তুভ সমুদ্রমন্থনের সময় উত্থিত মহামূল্য উজ্জ্বল মণিবিশেষ। বিষ্ণু ও কৃষ্ণ এই মণি বক্ষে ধারণ করতেন।”
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে বলা হয়েছে, “কৌস্তুভ (কুস্তুভ+অ) অর্থ (বিশেষ্যে) পুরাণে বর্ণিত মনিবিশেষ, কৃষ্ণের ভূষণ।” অবার অনেক গ্রন্থে আছে, কৌস্তুভ বিষ্ণুর ধারণকৃত মণি।
আসলে কোনটি?

খাণ্ডব, খাণ্ডবদাহ খাণ্ডবদহন

তাণ্ডব, আজ পাণ্ডব সম খাণ্ডব দাহ চাই।
খাণ্ডব, মহাভারতে বর্ণিত যমুনা নদীর তীরে (বর্তমান দিল্লির নিকট) অবস্থিত বনবিশেষ। অগ্নিকে সন্তুষ্ট করার জন্য কৃষ্ণ ও অর্জুন জীবজন্তুসহ পুরো খাণ্ডব বন দাহ করে ফেলে। কৃষ্ণার্জুনের খাণ্ডববন দাহ করার এই ঘটনাই হচ্ছে খাণ্ডবদাহ বা খাণ্ডবদহন।
অগ্নি পনেরো দিন ধরে খাণ্ডববন দগ্ধ করে। বনের প্রাণীর মধ্যে ময় নামক দানব, তক্ষক নাগের পুত্র অশ্বসেন ও চারটি মাত্র শর্ঙ্গক পক্ষী রক্ষা পায়। বাকি সব জীবজন্তু অগ্নির দহনে লয়প্রাপ্ত হয়। খাণ্ডববনের এই মহা দাহকে খাণ্ডবদাহ বলে। খাণ্ডবদাহ ও খাণ্ডবদাহন সমার্থক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা একাডেমি অনুযায়ী খাণ্ডবদাহ অর্থ শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সহায়তায় খাণ্ডববন দহন।
নজরুল লিখেছেন:
“ওই বন্দুক তোপ, সন্দুক তোর পড়ে থাক, স্পন্দুক বুক যায়!
নাচ তাতা থই থই তাতা থই –
থই তাণ্ডব, আজ পাণ্ডব সম খাণ্ডবদাহ চাই।”
(রণ-ভেরী:৪১; অগ্নি-বীণা)
সূত্র: পৌরাণিক শব্দের উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন।

নতুন/নূতন

‘নতুন’ ও ‘নূতন’ শব্দের বানান ভিন্ন হলেও অর্থ অভিন্ন। দুটোই প্রমিত। উভয় শব্দের ইংরেজি নিউ (new)। সংস্কৃত নূতন থেকে অতৎসম নতুন শব্দের উদ্ভব। ‘নতুন’ লিখলে ত-য়ে হ্রস্ব উ-কার, কিন্তু ‘নূতন’ লিখলে দন্ত্য-ন এ দীর্ঘ ঊ-কার দিতে হয়।
উৎস: বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন, ড. মোহাম্মদ আমীন।
 

যবন যবনিকা যবনকন্যা ও যবনরাজ

সংস্কৃত যবন (√যু+অন) থেকে যবনিকা। প্রাচীন ভারতে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার যবনরাজ হিসাবে পরিচিত ছিলেন । বেদ-বিশ্বাসী ভারতীয়দের কাছে বেদ-অবিশ্বাসী বিদেশি মাত্রই ছিলেন ‘যবন’। যবন-রাজ আলেকজান্ডার ভারত বিজয়ের পর উত্তর-পশ্চিম ভারতে গ্রিক তথা যবনরা বিশাল একটা এলাকা দখল করে শাসনকার্য পরিচালনা শুরু করে। এখানে গ্রিকদের নিজস্ব ব্যবসায়-বাণিজ্য, সাহিত্য-সংস্কৃতি, প্রশাসন ও রাজ্যপাট ছিল।
গ্রিক বা যবনদের নাট্যকলাকে দ্বিতীয় শতকে যিনি ভারতীয় সাহিত্যে স্থান করে দিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন অশ্বঘোষ। অশ্বঘোষই প্রাচীন ভারতের প্রথম নাট্যকার। প্রথম ভারতীয় নাটক: উর্বশী বিয়োগ। যবনরা তাঁদের নাটকে চিত্রপট ব্যবহার করতেন। অশ্বঘোষও তাঁর নাটকে চিত্রপট ব্যবহার করতেন। যবনদের কলাবিদ্যাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য তিনি চিত্রপটের নাম দেন ‘যবনিকা’।
মোহিনী চৌধুরীর কথায় কমল দাশগুপ্তের সুরে জগন্ময় মিত্র গেয়েছেন:
“মোদের প্রেমের দীপ্ত দীপক রাগে,
দিকে দিকে ওই সুপ্ত জনতা জাগে।
মুক্তি আলোকে ঝলমল করে আঁধারের যবনিকা
আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়, তুমি যে বহ্নিশিখা।”
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত যবনিকা অর্থ (বিশেষ্যে) পর্দা, আড়াল, রঙ্গমঞ্চের পটাবরণ, সমাপ্তি, যবনকন্যা।
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন, পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান।
 

বাংলা বানান: নিমোনিক

১. পরি উপসর্গের পর দন্ত্য-ন এলে তা মূর্ধন্য-ণ হয়ে যায়। তাই
নয় কিন্তু, পরিণয়।
নয়ন কিন্তু, পরিণয়ন।
নাম কিন্তু, পরিণাম।
নেতা কিন্তু, পরিণেতা।
২. পরি/প্র/নির/-এ তিনটি উপসর্গের পর ক-বর্গ/প-বর্গ/ঋ/র/র-ফলা/রেফ/ষ/ক্ষ/য/য়/হ/অনুস্বার-এই সব বর্ণের এক/একাধিক বর্ণ থাকে তারপরে ‘ন’ ধ্বনি থাকলে তা মূর্ধন্য- ণ হয়।
বহন কিন্তু, পরিবহণ।
বাহন কিন্তু, পরিবাহণ
যান কিন্তু, পরিযাণ।
পরিষ্কার কিন্তু, পরিষ্করণ।
৩. অভি/নি/পরি/প্রতি/বি-এই ৫টি ই-কারান্ত উপসর্গ এবং অনু ও সু দুটি উ-কারন্ত উপসর্গের পর সনজ্, সদ্, সিচ্,সিধ্,সেন্, সেব্, স্থা,স্বপ্ ধাতুর পরে ‘স’ স্থানে ‘ষ’ হয়।
অভিসার কিন্তু অভিষেক, অভিষিক্ত।
সঙ্গী কিন্তু, প্রতিসঙ্গী
প্রতিশোধ কিন্তু, প্রতিষেধক, প্রতিষেধ।
সেক কিন্তু, পরিষেক।
সেবক কিন্তু, পরিষেবক।
সেবা কিন্তু, পরিষেবা।
পরিসম্পদ ও পরিসম্পৎ কিন্তু, পরিষদ ও পরিষৎ।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন।
বানানগুলো দেখে নিতে পারেন একবার
অ্যাডভোকেট অ্যান্ড অ্যাম্বুলেন্স অ্যালবাম অ্যাসিস্ট্যান্ট
আগস্ট ইনস্টিটিউট কোম্পানি কর্নার কর্নেল
গভর্নর চিফ জানুয়ারি জরুরি ট্রেজারি
টেরিটরি নোটারি নমিনি পাশ (Pass) পিস(Piece)
রিকশা রেজিস্ট্রি রেনেসাঁ রেস্টুরেন্ট রেস্তোরাঁ
লাইব্রেরি লটারি স্কলারশিপ স্ট্যাম্প স্টার
স্টেশনারি স্টোর

বিকাল বিরুদ্ধ কাল ও রাক্ষসী কাল

সময়জ্ঞাপক ‘বিকাল’ শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত একটি বহুমাত্রিক শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ— দিনের শেষভাগ, অপরাহ্ণ। দুপুরের পর শুরু হয় বিকাল এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত তার স্থায়িত্ব। মানুষের জীবনেও আছে সকাল, দুপুর, বিকাল আর সন্ধ্যা। সন্ধ্যা দিনের অন্তিম প্রহর; তার পূর্বের প্রহর বিকাল হচ্ছে অন্তিম প্রহরের আগমন বার্তা। তাই বিকালকে কাব্যে যতই মধুরভাবে চয়ন করা হোক না কেন, বিকালের রোদ যতই মিষ্টি বা রুপোলি হোক না— বাস্তববাদীগণের কাছে এটি অন্যভাবে চিত্রিত।
‘বিকাল’ শব্দের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ— বিরুদ্ধ কাল।‘বিরুদ্ধ কাল’ মানে খারাপ কাল, বিপর্যস্ত সময়, সময়-খাদক কাল, সর্বনাশার সূচনা-কাল। বিকালকে ‘রাক্ষসী বেলা’ও বলা হয়।পৌরাণিক রাক্ষস যেমন সবকিছু দ্রুত ধ্বংস করে দেয় তেমনি বিকাল নামের সময়টা এলে জীবনের সময়টুকু দ্রুত শেষ হয়ে যায়। তাই দিনের শেষ অংশের নাম হয়েছে— বিকাল বা বিরুদ্ধ কাল বা রাক্ষসী কাল।
সূত্র: ড. মোহাম্মদ আমীন, বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, পুথিনিলয়।

বুদ্ধিশুদ্ধি

বুদ্ধিশুদ্ধি শব্দের অর্থ—বিচার-বিশ্লেষণবোধ, বুদ্ধির প্রখরতা, বিবেচনাবোধ প্রভৃতি। ‘বুদ্ধি’ ও ‘শুদ্ধি’ এ দুটো শব্দের সমন্বয়ে ‘বুদ্ধিশুদ্ধি’ গঠিত। বুদ্ধি অর্থ— বিচার-বিশ্লেষণ, বিবেচনাবোধ এবং শুদ্ধি অর্থ— যথার্থতা নিরূপণ। বুদ্ধি অনেকের থাকে বা থাকতে পারে এবং তার প্রখরতাও থাকতে পারে অসাধারণ, কিন্তু সে বুদ্ধি প্রয়োগে যদি বিবেচনাবোধ বা শুদ্ধি না-থাকে তা হলে ‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’র মতো অবস্থা হতে পারে। শুদ্ধিহীন বুদ্ধি প্রশিক্ষণবিহীন ব্যক্তির বিমান চালানোর মতো ভয়ংকর। বুদ্ধিতে যখন শুদ্ধি বা বিবেচনাবোধ আসে তখন তা সতর্কতাসমন্বিত প্রখরতায় রূপ নেয়। এমন বুদ্ধি সবার জন্য কল্যাণকর হয়। এর কোনো বিকল্প নেই। তাই বলা হয় ‘সাবধানের মার নেই’।
বুদ্ধি প্রয়োগের মাধ্যমে যথার্থ বিবেচনাবোধ ও বিচার-বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভালো-মন্দ যাচাই করে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করার অন্তর্নিহিত চেতনাবোধই ‘বুদ্ধিশুদ্ধি’। এটি কেবল তখনই দেখা যায় যখন কারও বুদ্ধিতে ‘শুদ্ধি’ থাকে। শুদ্ধিহীন বুদ্ধি পাগলের হাতে ধারালো অস্ত্র থাকার মতো ভয়ংকর হতে পারে।
– – –
সূত্র. ড. মোহাম্মদ আমীন, পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান।
বিদেশি শব্দের বানান
বিদেশি শব্দের বানানে সাধারণত ণ, ছ, ষ হয় না। যেমন— আনসার, আনারস, আসমান, অ্যাসট্রে, ইউনিভার্সিটি, কর্নার, কর্নেল, মাস্টার, স্টার, স্ট্যান্ড, ফটোস্ট্যাট, ইনসান, বেহেশত, হর্ন ইত্যাদি।
ব্যতিক্রম: খ্রিষ্টাব্দ, খ্রিষ্ট, খ্রিষ্টান।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
 
 
বিদেশি শব্দের বানান/২
বিদেশি শব্দের বানানে ই বা ই-কার হবে। যেমন— অফিস, অলি, আসমানি, আসামি, ইদ, ইংরেজি, ইতালি, ইমান, আইসক্রিম, কিডনি, ক্যাটাগরি, গ্রেডশিট, চিফ, জানুয়ারি, টেরিটরি, ট্রেজারি, ডিগ্রি, নমিনি, নোটারি, পার্টনারশিপ, প্রাইমারি, ফ্রেরুয়ারি, ফ্রেন্ডশিপ, ফ্রি, ফি, ফিস, ব্রিজ, মার্কশিট, রিটপিটিশন, লটারি, শিট, শিপ, সরকারি, স্টিমার, স্কিন, স্ক্রিন, স্কলারশিপ, সেক্রেটারি, স্টেশনারি ইত্যাদি।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
শব্দের প্রথমে ব্য ও ব্যা নিমোনিক
১. ব্যতিক্রান্ত ক্ষেত্র ছাড়া গ, ক্ত, জ, ঞ্জ, ত, থ, ব, ভ, ষ্ট, স্ত প্রভৃতির পূর্বে শব্দের প্রথমে সাধারণত ব-য়ে য-ফলা (ব্য) হবে। যেমন— ব্যগ্র, ব্যক্ত, ব্যক্তি, ব্যক্তিত্ব, ব্যঙ্গ, ব্যঞ্জন, ব্যতিক্রম, ব্যতিক্রান্ত, ব্যথা, ব্যতীত, ব্যবসায়, ব্যবসিক, ব্যর্থ, ব্যবস্থা, ব্যভিচার, ব্যষ্টি, ব্যস্ত, ব্যবহার, ব্যয় ইত্যাদি।
ক্ষেত্রবিশেষে ধ, প, য় বর্ণের আগেও ব্য হয়। যেমন: ব্যধিকরণ, ব্যপদেশ, ব্যপদিষ্ট, ব্যয় প্রভৃতি।
২. ক, খ, ঘ, দ, ধ, প, প্ত, স, হ প্রভৃতি বর্ণের পূর্বে ব-য়ে য-ফলা আ-কার (ব্যা) হবে। যেমন—ব্যাকরণ, ব্যাকুল, ব্যাকৃতি, ব্যাখ্যা, ব্যাঘাত, ব্যাধি, ব্যাপক, ব্যাপার, ব্যাপৃত, ব্যাপ্তি, ব্যাপ্য, ব্যাস, ব্যাসার্ধ ব্যাহত, ব্যাহরণ, ব্যাপী, ব্যাপারী, ব্যাপার ইত্যাদি।
দ্রষ্টব্য: ব, প, স, বর্ণের পূর্বে ব্য ও ব্যা ব্যবহারের কিছু ব্যতিক্রম রয়েছে। তবে এই ব্যতিক্রান্ত শব্দ বিরল।
৪. বিদেশি ও অতৎসম শব্দের বানানে ব্যা হবে। যেমন: ব্যাংক, ব্যাট, ব্যাজ, ব্যাজার, ব্যাটা, ব্যানার, ব্যারাক, ব্যারিস্টার, ব্যালট, ব্যাবসা প্রভৃতি।
স্মর্তব্য: এটি বানান নিমোনিক। ব্যতিক্রম অনিবার্য। তাই গণিতের মতো শতভাগ প্রযোজ্য হবে— এমনটি আশা করা সমীচীন নয়।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

ঘড়েল: ঘড়ি ও ঘটিকা

ঘড়েল শব্দের আভিধানিক অর্থ: ফন্দিবাজ, কুচক্রী, ধুরন্ধর প্রভৃতি। ঘড়া মানে বড়ো আকারের জলপাত্র বা বড়ো কলস। ঘড়ি বা ঘটি বা ঘটিকা মানে ছোটো আকারের জলপাত্র বা কলসি। প্রাচীনকালে মানুষ সময় জানার জন্য জলঘড়ি ব্যবহার করত। এ জলঘড়ির সময়রক্ষক পদবি থেকে ঘড়েল শব্দের উৎপত্তি। কিন্তু কীভাবে?
বড়ো একটা ঘড়া থেকে ঘটিকা বা ঘটিতে জল ফেলে সময় জানার জন্য বিশেষ কৌশলে জলঘড়ি তৈরি করা হতো। ঘড়ার নিচে থাকত ছিদ্র। সে ছিদ্র দিয়ে ঘড়ার নিচে রাখা ঘটিকায় বিন্দু বিন্দু জল পড়ত। ঘটি পূর্ণ হয়ে গেলে ঘণ্টা বাজিয়ে জানিয়ে দেওয়া হতো যে, এক ঘটিকা পূর্ণ হয়েছে। এরপর পূর্ণ ঘটিকা সরিয়ে আর একটি খালি ঘটিকা ঘড়ার নিচে রেখে দেওয়া হতো।
এরূপ যত ঘটিকা পূর্ণ হতো, সময় বলা হতো তত ঘটিকা। বর্তমান ঘটিকা শব্দটি এ ঘটি হতে এসেছে। ঘড়ি শব্দটি এসেছে ঘড়া হতে। কোনো সাধারণ লোকের বাড়িতে জলঘড়ি থাকত না। রাজা, জমিদার প্রমুখ বিত্তশীলদের বাড়িতে জলঘড়ি রাখা হতো। কেউ সময় জানতে চাইলে রাজবাড়িতে এসে তা জেনে নিত। রাজবাড়িতে জলঘড়ির পূর্ণ ঘটিকার হিসাব রাখার দায়িত্ব যার ওপর ন্যস্ত থাকত তার পদবি ছিল ‘ঘটিকাপাল’। এ ঘটিকাপাল শব্দটি ক্রম পরিবর্তন ও বিকৃতির মাধ্যমে ‘ঘড়েল’ শব্দে এসে স্থিতি পায়।
এখন একটা প্রশ্ন থেকে যায়, ঘটিকাপাল কীভাবে ফন্দিবাজ, কুচক্রী বা ধুরন্ধর হয়ে গেল? ঘটিকাপালকে ঘটিকা পূর্ণ হওয়া মাত্র ঘণ্টা বাজিয়ে ঘটিকার হিসাব জানিয়ে দেওয়ার জন্য সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো। এক মুহূর্তের অসতর্কতার জন্য সময়ের হেরফের হয়ে যেত। তাই সবসময় চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান ব্যক্তিকে ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের বেতনও ছিল অন্যান্য সম-মানের কর্মচারীদের তুলনায় অধিক। তাই চালাকচতুর ও বুদ্ধিমান বিশেষণগুলো ঘটিকাপাল হিসাবে নিয়োগের অন্যতম শর্ত হয়ে যায়। আর এ কথা কার না-জানা, যিনি বুদ্ধিমান ও চালাকচতুর তিনি সাধারণত ধুরন্ধর, ফন্দিবাজ ও কুচক্রীও হন!
উৎস: বাংলা শব্দের পৌরাণিক উৎস, ড. মোহাম্মদ আমীন
ড. মোহাম্মদ আমীনের পোস্ট: শুবাচ
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

বাংলার ক্যাক্সটন

স্যার চার্লস উইলকিন্স (১৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে – ১৩ ই মে ১৮৩৬) বাংলার ক্যাক্সটন। ভারতে প্রথম অক্ষরস্থাপক পুস্তক প্রকাশ এবং বাংলা ছাঁদ-হরফ তৈরির জন্য তাঁকে “বাংলার ক্যাক্সটন” বলা হয়। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা বর্ণমালার মুদ্রাক্ষর দ্বারা প্রথম ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেডের অ্যা গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল লেঙ্গুয়েজ বই মুদ্রিত হয়।
উইলিয়াম ক্যাক্সটন: ইংরেজ বণিক, কূটনীতিক ও লেখক উইলিয়াম ক্যাক্সটন (১৪২২-১৪৯১) ১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডে প্রথম ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ইংরেজি ভাষায় তিনিই প্রথম অক্ষরস্থাপক পুস্তক প্রকাশ করেন।

বিস্ময় চিহ্নের প্রথম ব্যবহার

চতুর্দশ শতকের শেষদিকে ইতালিয়ান কবি ইয়াকোপো আলপোলেইয়ো দা উরবিসাগলিয়া প্রথম বিস্ময় চিহ্ন ব্যবহার করেন। তিনি এই চিহ্নের নাম দিয়েছিলেন punctus exclamativus বা punctus admirativus। ইয়াকোপো ভাবাবেগপূর্ণ শব্দ বা বাক্যের শেষে এই চিহ্ন ব্যবহার করা শুরু করেন। তিনি বলেছিলেন, বিস্ময় চিহ্ন দিয়ে শেষ হওয়া শব্দ বা বাক্য একটু উচ্চৈঃস্বরে পড়তে হবে।

অ্যা গ্রামার অব সংস্কৃত ল্যাঙ্গুয়েজ

ইংরেজ মুদ্রাকর, প্রাচ্য ভাষাবিদ এবং কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য স্যার চার্লস উইলকিন্স(১৭৪৯ – মে ১৩, ১৮৩৬) ১৭৭৯ খ্রিষ্টাব্দে পাশ্চাত্যবাসীর ব্যবহারের জন্যে অ্যা গ্রামার অব সংস্কৃত ল্যাঙ্গুয়েজ রচনা করেন। ভারতীয় পণ্ডিতবর্গের সহযোগিতায় তিনি প্রথম ইয়োরোপীয় হিসেবে প্রাচ্য পাণ্ডুলিপি, উৎকীর্ণলিপি সংগ্রহ এবং পাঠোদ্ধার ও অনুবাদের প্রচেষ্টা করেন। সংস্কৃত লিপির বিশদ ব্যাখ্যা করার লক্ষ্যে তিনি ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে দিনাজপুরে পাল বংশীয় রাজা নারায়ণপালের বাদলস্তম্ভ লিপির পাঠোদ্ধার করেন।

ইংরেজি ভাষায় প্রথম ভগবত গীতা

ইংরেজ মুদ্রাকর, প্রাচ্য ভাষাবিদ এবং কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য স্যার চার্লস উইলকিন্স (১৭৪৯ – মে ১৩, ১৮৩৬) ১৭৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংসের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং পন্ডিত পঞ্চানন কর্মকারের সহায়তায় ইংরেজি ভাষায় প্রথম ভগবত গীতা অনুবাদ করেন।
সর্বজনীন বনাম সার্বজনীন
 
‘সর্বজনীন’ ও ‘সার্বজনীন’ দুটোই শুদ্ধ কিন্তু অর্থ ভিন্ন। একটি বিশেষ্য এবং অন্যটি বিশেষণ। অনেকে ‘সর্বজনীন’ অর্থে ‘সার্বজনীন’ লিখে থাকেন। অর্থ না-জানার জন্য এমন হয়ে থাকে। লেখার সময় কোনটি লিখবেন, এ নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হলে ‘সর্বজনীন’ লিখুন।তা হলে অন্তত ভুল হওয়ার আশঙ্কা বহুলাংশে কমে যাবে। কারণ, সাধারণত যে অর্থে ‘সার্বজনীন’ লেখা হয় নব্বই ভাগ ক্ষেত্রে সেটি ওই অর্থ-প্রকাশে যথোচিত নয়, বরং ‘সর্বজনীন’ শব্দই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উপযুক্ত।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেব ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘সর্বজনীন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ, সর্বসাধারণের জন্য অনুষ্ঠিত, বারোয়ারি, সর্বসাধারণের সহায়তায় কৃত, সকলের জন্য মঙ্গলকর বা কল্যাণকর, সবার জন্য হিতকর, সবার মঙ্গলের জন্য কৃত, সকলের জন্য উদ্দিষ্ট। যেমন : ভালোবাসা সর্বজনীন বিষয়। ফল সর্বজনীন খাদ্য। মানবাধিকার সর্বজনীন অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। কোনো ধর্মের অবতারই সর্বজনীন নয়।
বাক্যে বিশেষণ হিসেব ব্যবহৃত ‘সার্বজনীন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ ‘সবার মধ্যে প্রবীণ, জ্যেষ্ঠ’। যেমন: ‘ জিম্বাবুয়ের বর্তমান রাষ্ট্রপতি রবার্ট মুগাবে ( জন্ম ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ ফেব্রুয়ারি ) সার্বজনীন নেতা।’ [ কারণ ৯৪ বছর বয়সি এ রাষ্ট্রনায়কের চেয়ে অধিক বয়স্ক নেতা বিশ্বে আর কেউ নেই।]
অবশ্য প্রবীণ শব্দটি ‘শ্রেষ্ঠ’ অর্থ প্রকাশে ব্যবহার করা হলে সেক্ষেত্রে ‘সার্বজনীন’ শব্দের অর্থ সম্প্রসারিত হয়। যেমন : ‘নেলসন মেন্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার সার্বজনীন নেতা। কিন্তু ‘শ্রেষ্ঠ’ অর্থে ‘সার্বজনীন লেখা সমীচীন নয়। কারণ ‘শ্রেষ্ঠ’ প্রকাশের জন্য বাংলায় অনেক যুতসই ও বিকল্প শব্দ রয়েছে। ফলে, ‘নেলসন মেন্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বজনীন নেতা ‘ লেখাই বিধেয়। সবার জন্য প্রযোজ্য, সবার জন্য হিতকর প্রভৃতি অর্থে ‘সার্বজনীন’ লেখা ঠিক নয়।
‘সার্বজনীন দুর্গাপূজায় আপনাকে স্বাগত’। এর অর্থ সবার মধ্যে প্রবীণ বা সবার মধ্যে জ্যেষ্ঠ দুর্গাপূজায় আপনাকে স্বাগত। কথাটির যৌক্তিকতা কতটুকু তা পরের বিষয়। তবে এখানে ‘সার্বজনীন’ বলার চেয়ে, ‘সর্বজনীন’ বলাটাই যে উত্তম হতো – এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
বাকি অংশ : https://l.facebook.com/l.php…
সুত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.
শুদ্ধ, কিন্তু শুদ্ধীকরণ কেন?

করণ কৃত ভবন ভূত

আত্ত, কিন্তু আত্তীকরণ, আত্তীকৃত, আত্তীভবন, আত্তীভূত।
এক, কিন্তু একীকরণ, একীকৃত, একীভবন, একীভূত।
একত্র, কিন্তু একত্রীকরণ, একত্রীকৃত, একত্রীভবন, একত্রীভূত।
নির্মূল, কিন্তু নির্মূলীকরণ, নির্মূলীকৃত, নির্মূলীভূত।
ঘন, কিন্তু ঘনীকরণ, ঘনীকৃত, ঘনীভবন, ঘনীভূত।
 
শুদ্ধ, কিন্তু শুদ্ধীকরণ, শুদ্ধীকৃত, শুদ্ধীভূত, শুদ্ধীভবন।
তীক্ষ্ণ, কিন্তু তীক্ষ্ণীকৃত, তীক্ষ্ণীকরণ, তীক্ষ্ণীভবন, তীক্ষ্ণীভূত।
স্পষ্ট, কিন্তু স্পষ্টীকরণ, স্পষ্টীকৃত, স্পষ্টীভূত।
সম, কিন্তু সমীকরণ, সমীকৃত, সমীভবন, সমীভূত।
সরল, কিন্তু সরলীকরণ, সরলীকৃত, সরলীভবন, সরলীভূত।
 
সহজ, কিন্তু সহজীকরণ, সহজীকৃত, সহজীভূত, সহজীভবন।
সদৃশ্য, কিন্তু সদৃশীকরণ, সদৃশীকৃত, সদৃশীভবন, সদৃশীভূত।
ঋজু, কিন্তু ঋজূকরণ, ঋজূকৃত, ঋজূভবন, ঋজূভূত, ।
লঘু, কিন্তু লঘূকরণ, লঘূকৃত, লঘূভবন, লঘূভূত।
নিমোনিক: মনে রাখার কৌশল
(১) তৎসম শব্দের শেষে করণ, কৃত, ভবন, ভূত প্রভৃতি প্রত্যয় যুক্ত (চ্বি প্রত্যয়-সহ) হলে ঈ-কার আগম হয়।
নির্মূলীকরণ= নির্মূল+চ্বি+করণ।
নির্মূলীকৃত= নির্মূল+চ্বি+কৃত।
ঘণীভবন=ঘন+চ্বি+ভবন।
ঘনীভূত= ঘন+চ্বি+ভূত।
(২) মূল শব্দের শেষে উ-কার থাকলে ওই উ-কার করণ কৃত ভবন ভূত (+চ্বি)] প্রভৃতির প্রভাবে ঊ-কার হয়ে যায়। যেমন:
ঋজু+চ্বি+করণ= ঋজূকরণ।
ঋজু+চ্বি+কৃত= ঋজূকৃত।
ঋজু+চ্বি+ভবন= ঋজূভবন।
ঋজু+চ্বি+ভূত= ঋজূভূত।
অনুরূপ:
লঘু> লঘূকরণ, লঘূকৃত, লঘুভবন, লঘূভূত।
সুষ্ঠু> সুষ্ঠূকরণ, সুষ্ঠূকৃত, সুষ্ঠূভূত।
অনু থেকে অনূকরণ হলো না কেন? কারণ, ‘অনু’ বিশেষ্য বা বিশেষণ নয়- অব্যয় এবং পরে, পশ্চাৎ, সাদৃশ্য ও ব্যাপ্তি প্রভৃতিসূচক সংস্কৃত উপসর্গ। এসব বিষয়-সহ এরূপ প্রত্যয়াদি যুক্ত হলে পদের কী পরিবর্তন হয় তা বিস্তারিত জানতে চাইলে নিচের লিংক দেখতে পারেন:
 

সমগ্র লেখা একসঙ্গে দেখার জন্য ক্লিক করুন: করণ কৃত ভবন ভূত বিস্তারিত।

আদ্যক্ষর না কি আদ্যাক্ষর
 
আদি ও আদ্য শব্দের সঙ্গে অক্ষর শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে যথাক্রমে আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর। আদি ও আদ্য অর্থ প্রথম। সংস্কৃত আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর অর্থ (বিশেষ্যে) প্রথম অক্ষর। সুতরাং, উভয় শব্দ সমার্থক। কিন্তু কোন শব্দটি শুদ্ধ?
পবিত্র সরকার প্রমুখ সংকলিত আকাদেমি বানান অভিধান অনুযায়ী আদ্যক্ষর (আদি+অক্ষর) এবং আদ্যাক্ষর (আদ্য+অক্ষর) উভয় বানানই ব্যাকরণসম্মত ও শুদ্ধ। তাই ওই অভিধানে আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর উভয় শব্দকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে কেবল আদ্যাক্ষর বানানকে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে। এখন দেখা যাক কীভাবে উভয় বানান শুদ্ধ ও ব্যাকরণসম্মত হয়।
আদ্যক্ষর= আদি+অক্ষর। কারণ: ই/ঈ ছাড়া স্বরবর্ণ পরে থাকলে ই/ঈ-স্থানে য-ফলা হয় এবং সৃষ্ট য-ফলা শেষ পদের প্রথম স্বর নিয়ে প্রথম পদের শেষ বর্ণে যুক্ত হয়। এভাবে গঠিত হয়েছে: আদি+অক্ষর= আদ্যক্ষর। অনুরূপ: অতি+অন্ত= অত্যন্ত, আদি+অন্ত= আদ্যন্ত, প্রতি+অহ= প্রত্যহ। প্রতি+আশা= প্রত্যাশা, ইতি+আদি= ইত্যাদি, অভি+উদয়= অভ্যুদয়, অতি+উচ্চ= অত্যুচ্চ, প্রতি+ঊহ্= প্রত্যূহ, প্রতি+এক= প্রত্যেক, যদি+অপি= যদ্যপি।
আদ্যাক্ষর= আদ্য+অক্ষর। কারণ: অ/আ-এর পর অ বা আ থাকলে উভয় বর্ণ মিলে আ হয় এবং সৃষ্ট আ পূর্ববর্ণে যুক্ত হয়। সেভাবে গঠিত হয়েছে: আদ্য+অক্ষর= আদ্যাক্ষর। অনুরূপ: অদ্য+অপি=অদ্যাপি; অদ্য+অবধি= অদ্যাবধি, অন্য+অন্য= অন্যান্য, কাব্য+অংশ= কাব্যাংশ, বাক্য+অতীত= বাক্যাতীত, মধ্য+অহ্ন= মধ্যাহ্ন; সাধ্য+অতীত= সাধ্যাতীত, কাব্য+অলংকার= কাব্যালংকার ইত্যাদি।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত আদ্যাক্ষর= আদ্য+অক্ষর= (আদ্য্+অ)+অক্ষর। এই অভিধানে আদ্যক্ষর (আদি+অক্ষর) শব্দকে স্থান দেওয়া হয়নি। যদিও আদ্যন্ত (আদি+অন্ত) শব্দকে স্থান দেওয়া হয়েছে। আদ্যন্ত স্থান পেলে আদ্যক্ষর কী দোষ করল?
উপসংহার: ব্যাকরণিক গঠন অনুযায়ী আদ্যক্ষর ও আদ্যাক্ষর উভয় বানান শুদ্ধ। তবে বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে কেবল আদ্যাক্ষর শব্দকে স্থান দেওয়া হয়েছে।
বাকি অংশ ও অন্যান্য:
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পবিলেকশন্স লি.
———————————————–
 
চাষা চাষি ও চাষী
 
চাষা ও চাষি দুটোই বাংলা শব্দ। তবে চাষী ভুল বানান। শুদ্ধ বানান চাষি। চাষি অতৎসম শব্দ। অতৎসম শব্দের বানানে সাধারণত ঈ বা ঈ-কার হয় না। তাই চাষি বানানে ঈ-কার বিধেয় নয়।
—- —- —–
বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত চাষা ও চাষি সমার্থক। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, উভয় শব্দের অর্থ— যার পেশা চাষাবাদ বা ভূমি কর্ষণ, কৃষক। ইংরেজিতে farmer। চাষা শব্দটি চাষি শব্দের কাব্যিক রূপ হিসেবে নানা কবিতায় দেখা যায়। গদ্যে সাধারণত চাষি কথাটি ব্যবহৃত হয়, চাষা দেখা যায় না।
মাঝে মাঝে বিশেষ করে আঞ্চলিক ভাষায় ও কথোপকথনে চাষা শব্দটি নেতিবাচক গ্রাম্য, অশিক্ষিত, অভদ্র প্রভৃতি অর্থে গালি হিসেবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
প্রকৃতপক্ষে, প্রাচীনকালে শাসক, জমিদার কিংবা ভূস্বামী বা প্রভাবশালী ধনীরা বঞ্চিত, কিন্তু প্রতিবাদী ও বিদ্রোহী কৃষক-প্রজা এবং মজদুরদের চাষা বলে অবজ্ঞা করত। যা পরবর্তীকালে তুচ্ছার্থ ও অবজ্ঞাজ্ঞাপক গালিতে পরিণত হয়। কিন্তু সাহিত্যে চাষি শব্দের মতো চাষা শব্দটিও অভিন্ন অর্থদ্যোতক মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। চাষি কবিতায় রাজিয়া চৌধুরাণী লিখছেন—
“সব সাধকের বড়ো সাধক আমার দেশের চাষা,
দেশ মাতারই মুক্তিকামী, দেশের সে যে আশা।”
অতুল প্রসাদ সেন চাষাকে অতি সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করে লিখেছেন—
“কি জাদু বাংলা গানে,
গান গেয়ে দাঁড় মাঝি টানে,
গেয়ে গান নাচে বাউল,
গান গেয়ে ধান কাটে চাষা।
আ-মরি বাংলা ভাষা!”
অভিধানে চাষা শব্দটি গালি উল্লেখ করা হয়নি। তবে কথোপকথনে এবং মাঝে মাঝে সাহিত্যকর্মে নাটকে আর উপন্যাসের সংলাপে অনেক ক্ষেত্রে চাষা শব্দটি একই উদ্দেশ্যে গালি অর্থে ব্যবহার করে থাকে।
বাকি অংশ ও অন্যান্য বিষয় দেখার জন্য নিচের লিংক:
 

ড্যশ ()-এর ব্যবহার

ড. মোহাম্মদ আমীন
১. বাক্যে বিধৃত কোনো বিবৃতি সম্পূর্ণ করতে কিংবা বিশদ করতে ড্যাশচিহ্নের ব্যবহার করা হয়। ড্যাশ এবং হাইফেন একই রকম হলেও ড্যাশ হাইফেনের দ্বিগুণ লম্বা। সাধারণত বাক্যে সংশ্লিষ্ট উদাহরণ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনের জন্য ড্যাশ ব্যবহার করা হয়। যেমন: কাল তিন প্রকার, যথা— বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ।
২. প্যারেনথেসিসে কমা বা বন্ধনীর পরিবর্তে ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। যেমন: অফিসে— না, ক্লাবে যাবার পূর্বে দেখলাম— লোকটি মরে আছে।
৩. বাক্য অসম্পূর্ণ রাখলে ড্যাশ ব্যবহার করতে হয়। যেমন: মোদের গরব, মোদের আশা— . . .।
৪. ড্যাশ দিয়ে হাইফেন-এর মতো একটি শব্দ বা পদকে দ্বিখণ্ডিত করে কিংবা বিভক্তিকে পৃথক দেখানো হয় না। এটি বাক্যের অর্থ ও পরিবেশনা নির্দেশ করে। যেমন: কামাল—এরনয়, কামাল-এর
৫. লেখার সুবিধার্থে ড্যাশ-এর পূর্বে ফাঁক রাখা হবে না। ফাঁক রাখলে কম্পিউটারে লেখার সময় পঙৃৃক্তির শেষে স্বয়ক্রিয়ভাবে ড্যাশ ও পদ আলাদা হয়ে দুটি ভিন্ন পঙ্‌ক্তিতে চলে যায়। তাই ড্যাশকে, পূর্বের শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসানো সমীচীন। কিন্তু অব্যবহিত পরের শব্দের সঙ্গে ফাঁক রেখে বসবে। নইলে হাইফেন-এর নির্দেশনার মতো ড্যাশও সন্নিহিত দুটি শব্দ বা পদকে একীভূত নির্দেশক হয়ে যাবে। যেমন— আম, জাম, কলা, লিচু। সেদিন দেখলাম— তুমি জানি কোথায় যাচ্ছ।

বাঙালিয়ানার অর্থ

 
বাঙালিয়ানা, বাঙালিত্ব, আমি বাঙালি এই বোধ। আমার বাঙালি বলিয়া যে একটা সত্তা আছে, এই জ্ঞান। বেশি সংস্কৃত পড়িলে লোকে ব্রাহ্মণ হইতে চায়, ঋষি হইতে চায়। সেটা খাঁটি বাংলার জিনিস নয়; তাহার সঞ্চার পশ্চিম হইতে। বেশি ইংরাজি পড়িলে কী হয় তাহা আর বলিয়া দিতে হইবে না। – – –
বাঙালিয়ানার অর্থ এই যে, বাংলার যা ভালো তাহা ভালো বলিয়া জানা, আর যাহা মন্দ তাহা মন্দ বলিয়া জানা। ভালো লওয়া ও মন্দ না লওয়া তোমার নিজের কাজ। কিন্তু জানাটা প্রত্যেক বাঙালির দরকারি কাজ। জানিতে হইলে বুদ্ধিপূর্বক বাংলা দেশটা কী দেখিতে হইবে, বাংলায় কে থাকে দেখিতে হইবে, বাংলার আচার ব্যবহার, রীতি-নীতি, সমাজ-সংসার, উৎসব-আনন্দ, দুঃখ-শোক, কুস্তি লাঠিখেলা টোল পাঠশালা দেখিতে হইবে। ইহার গান গীতি পয়ার পাঁচালী, নাচ খেমটা, কীর্তন ঢপ যাত্রা কবি সব দেখিতে হইবে। মন প্রাণ দিয়া দেখিতে হইবে। আবার এখনকার কালে যাহা যাহা বদলাইতেছে, তাহাও দেখিতে হইবে। খবরের কাগজ, মাসিক পত্র, কনসার্ট, থিয়েটার, ইস্কুল, কলেজ, আপিস, আদালত সবই দেখিতে হইবে। বাংলার এবং বাঙালি জাতির সমস্ত জীবনটা ভালো করিয়া দেখিতে হইবে, তবেই তুমি বাঙালি হইবে।
— হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা সংগ্রহ, ২য় খণ্ড

ঋ কি স্বরধ্বনি

বাংলা একাডেমি বাঙলা উচ্চারণ অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৯৯)-এর নবম পুনর্মুদ্রণ (২০১৬)] লিখেছে:
“ঋ বাঙলা ভাষায় এ-বর্ণটির উচ্চারণ ‘রি’ (র্‌-এর সঙ্গে ই-স্বরধ্বনির সংযুক্তি)। সংস্কৃত ভাষায় ‘ঋ’ শুদ্ধ স্বরধ্বনির মর্যাদা পেলেও বাঙলা ভাষার প্রমিত উচ্চারণে এটাকে আর স্বরধ্বনিরূপে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।” এবং “ঋ/ঋ-কারকে বাঙলা ভাষায় স্বরধ্বনির মর্যাদা দেওয়া ঠিক নয়; কারণ সংস্কৃত ভাষার শুদ্ধ স্বরধ্বনির মতো এর উচ্চারণ আর অবশিষ্ট নেই। বাঙলায় এর উচ্চারণ পরিষ্কার ‘রি’ (‘র’-এর সঙ্গে সংযুক্ত ‘ই’)।
সংস্কৃত ভাষার অন্ধ অনুকরণে এটিকে এখনও বর্ণমালায় স্বরবর্ণের মধ্যে স্থান দেওয়া হয় এবং কতিপয় সংস্কৃত শব্দের বানানে এর লিখিত রূপ দেখা যায়।
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
— — — — — — — — — — — — — — — — —
Spelling and Pronunciation
HTTPS://DRAMINBD.COM/ENGLISH-PRONUNCIATION-AND-SPELLING-RULES-ইংরেজি-উচ্চারণ-ও-বান/
 
error: Content is protected !!