প্রতিদিন খসড়া-৫

 
 
প্রমিতার যযাতি থেকে
 

তরোয়াল ও তলোয়ার

অর্থগতভাবে তরোয়াল ও তলোয়ার সমার্থক। সংস্কৃত ‘তরবারি’ শব্দের মূল ও বিশুদ্ধ তদ্ভব রূপ ‘তরোয়াল’‘তরোয়াল’ বর্ণ বিপর্যয় হয়ে ‘তলোয়ার’ হয়েছে। সুতরাং, ‘তলোয়ার’ হচ্ছে তদ্ভব ‘তরোয়াল’ শব্দের বিপর্যস্ত বা বিকৃত বা অসংগত রূপ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘তরাবারি’ হতে উদ্ভূত ‘তরোয়াল’ অর্থ— (বিশেষ্যে) অসি, তরবারি, তলোয়ার। ‘তলোয়ার’ বাংলা শব্দ। যা ‘তরোয়াল’-এর অশুদ্ধ উচ্চারণ হতে সৃষ্ট।
 
 
অন্ধ বনাম কানা
 
অন্ধ: সংস্কৃত অন্ধ (√অন্ধ্ +অ) অর্থ (বিশেষণে)— দৃষ্টিহীন; অন্ধকারময়; মূর্খ, অজ্ঞান; বিচারবোধহীন।
 
কানা: সংস্কৃত কাণ থেকে উদ্ভূত কানা অর্থ— (বিশেষণে) একচোখ নেই এমন; (বিশেষ্যে) এক চোখ নেই এমন ব্যক্তি। ‘ফুটো’ বা ‘ছ্যাঁদা’ অর্থেও কানা শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন: একটা কানাকড়ি নেই, তার আবার ঘোড়া কেনার শখ! একেই বলে ঘোড়ারোগ।“তার একচোখ কানা।” এই বাক্যে একচোখ কথাটি বাহুল্য। কারণ, কানা শব্দের অর্থই একচোখ নেই এমন।
 
 
‘অন্ধ’ তৎসম শব্দ। ‘কানা’ খাঁটি বাংলা। অন্ধ শব্দের যতই সমার্থক বা প্রতিশব্দ থাকুক না, অন্ধ বলতে প্রধানত দৃষ্টিহীনকে দ্যোতিত করে। কানা বলতে নির্দেশ করা হয়— যার একচোখ নেই তাকে। অর্থাৎ, যার একচোখ নেই সে কানা। যার একটি চোখও নেই কিংবা চোখ থাকলেও দেখার ক্ষমতা নেই বা দৃষ্টিহীন তাকে বলা হয় অন্ধ। কানা দেখতে পায়, অন্ধ দেখতে পায় না।
প্রসঙ্গত, অভিধানে আর একটি কানা আছে। সেটি সংস্কৃত কর্ণ থেকে উদ্ভূত। সংস্কৃত কর্ণ থেকে উদ্ভূত কানা অর্থ— (বিশেষ্য) প্রান্তভাগ, কিনারা; পাত্রাদির মুখের বেড় বা ঘের। যেমন: কলসিটি কানায় কানায় পূর্ণ। হাঁড়ি কলসি প্রভৃতির ভাঙা অংশ। আলোচ্য লেখায় এ অর্থটি প্রাসঙ্গিক নয়।
 
 
 
আজানুলম্বিত আজানুলম্বিতবাহু
সংস্কৃত আজানু (আ+জানু) অর্থ— ( ক্রিয়াবিশেষণে) হাঁটু অবধি, জানু পর্যন্ত। লম্বিত অর্থ— প্রসারিত, বিস্তৃত। সুতরাং, আজানুলম্বিত (আজানু+লম্বিত) অর্থ— হাঁটু পর্যন্ত প্রসারিত, জানু পর্যন্ত বিস্তৃত।
আজানুলম্বিতবাহু: আজানুলম্বিতবাহু অর্থ— (বিশেষণে) হাঁটু পর্যন্ত প্রসারিত বাহুবিশিষ্ট, দীর্ঘবাহুবিশিষ্ট।
অনুরূপ একটি শব্দ— আজানুচুম্বিত। অর্থ— (বিশেষণে) জানুকে চুম্বন করেছে এমন, জনুস্পর্শী।
“জানু আমার কলিজা। প্রিয় জানু আমার তুমি কেমন আছ? বাক্য দুটির অর্থ কী জানতে চাই।”
সংস্কৃত বা তৎসম জানু (√জন্‌+উ) অর্থ— (বিশেষ্যে) হাঁটু, ঊরুসন্ধি। ইংরেজিতে knee। অর্থাৎ, মানুষ এবং কোনো কোনো মেরুদণ্ডী প্রাণীর ঊরু ও পায়ের সন্ধিস্থলকে জানু বলা হয়। সহজ ভাষায় জানু অর্থ— হাঁটু।
প্রসঙ্গত, বাংলা অভিধানে, হাঁটু জানু ছাড়া আর কোনো জানু নেই।
অতএব,
  • “জানু আমার কলিজা।” বাক্যের অর্থ—“হাঁটু আমার কলিজা।” ইংরেজিতে — “Knee is my heart.”
  • “প্রিয় জানু আমার তুমি কেমন আছ।” বাক্যের অর্থ— “প্রিয় হাঁটু আমার, তুমি কেমন আছ?” ইংরেজিতে— “My dear knee, how are you?”
জানু কৌতুক
অসুখ কার? ডাক্তার জানতে চাইলেন।
ছেলেটি বলল, আমার জানুর।
তাহলে, প্যান্ট খোলো। দেখি তোমার জানুর কী হয়েছে।
 
 ভূপতিত ও ভূপাতিত: ভূ পতিত ও পাতিত
 
 ভূ, পতিত ও ভূপতিত: তৎসম ভূ (ভূ+ক্বিপ্) অর্থ মাটি, স্থল, ভূমি, পৃথিবী (ভূপৃষ্ঠ), জমি, মাটির উপরিভাগ প্রভৃতি। সংস্কৃত পতিত (পত্‌+ত) অর্থ— (বিশেষণে) চ্যুত (ভূপতিত কাঁঠাল); ভ্রষ্ট, স্খলিত;  নিম্নগত; অনাবাদি (পতিত জমি); দুর্দশপ্রাপ্ত, পাপী; উপস্থিত (আগমনকালে পতিত, দৃষ্টিপথে পতিত)।  ভূ শব্দের সঙ্গে কেবল চ্যুত অর্থ নিয়ে সমাগত  পতিত শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ভূপতিত (ভূ+পতিত)। যার অর্থ— (বিশেষণে) মাটির ওপর পড়েছে এমন, ভূপৃষ্ঠে পতিত (ভূপতিত শিলা, ভূপতিত উল্কা, ভূপতিত বরফ, ভূপতিত উড়োজাহাজ)। প্রয়োগ: বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানের বিমানটি আকস্মিক ভূপতিত হলো পাকিস্তানের এক পাহাড়ে।
 
 
 ভূ, পতিত ও ভূপাতিত: সংস্কৃত পাতিত (পাতি+ত) অর্থ— (বিশেষণে)  নিচে ফেলা দেওয়া হয়েছে এমন। এর আর একটি অর্থ—  বকযন্ত্রের সাহায্যে শোধিত, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় distilled (পাতিত জল)। যেমন: পরীক্ষাগারে আমাদের পাতিত জল দিয়ে রাসায়নিক পরীক্ষা করতে হতো।  ভূ শব্দের সঙ্গে  নিচে ফেলে দেওয়া হয়েছে অর্থ নিয়ে আগত পাতিত শব্দ যুক্ত হয়ে গঠিত হয়েছে ভূপাতিত (ভূ+পাতিত)। সুতরাং ভূপাতিত অর্থ—  (বিশেষণে) মাটিতে ফেলা হয়েছে এমন। প্রয়োগ: মুক্তিবাহিনীর গোলার আঘাতে শত্রুপক্ষের  পাঁচটি যুদ্ধবিমান  ভূপাতিত হলো।
 
যা অন্য কোনো পক্ষের কার্যক্রম ছাড়াই আপনাআপনি কিংবা প্রকৃতিগতভাবে  মাটিতে পড়ে যায় তাকে বলা হয় ভূপতিত। যেমন: প্রবল সুনামির কবলে পড়ে উড়োজাহাজটি ভূপতিত হলো। কিন্তু যা  ইচ্ছা করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয় তা হলো— ভূপাতিত। জাপানির সেনার গোলার আঘাতে ব্রিটিশ বিমানটি ভূপাতিত হয়েছে।  প্রয়োগ:  পাঁচটি ভূপতিত পাকা আম দেখে শিশুরা গাছে ঢিল ছুড়ে দশটি আম ভূপাতিত করল। ম্যানুয়েল ত্রিপুরার বান্দরবানের তাজিংডং পর্বতের চূড়োয় একটি বিমান পড়ে আছে। এটি কী ভূপতিত না কি ভূপাতিত  তা অনুসন্ধান না করে বলা যাচ্ছে না।
 
 
তেহারি: গরিবের পোলাও
তেহারি বাংলা শব্দ। আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাংলা তেহারি অর্থ— (বিশেষ্যে) সরিষার তেল ও কুচি করে কাটা মাংস সহযোগে রাঁধা হালকা পলান্ন। অনেকে বলেন, তে মানে তিন এবং তেহারি মানে তিন আহারের সমাহার। এই তিন আহার হলো—  চাল, সরিষার তেল ও মাংস। এ তিন দিয়ে রান্না করা পলান্নই হলো তেহারি। প্রসঙ্গত, তৎসম পলান্ন (পল+অন্ন) অর্থ (বিশেষ্যে) মাংস প্রভৃতি সহযোগে ঘি দিয়ে পাক করা অন্ন, পোলাও। তেহারি পোলাওর চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম দামে বিক্রি হয়। তাই অনেকে তেহারিকে গরিবের পোলাও বলে।
 
নেহারি: নেহারি হিন্দি উৎসের বাংলা শব্দ। গোরু বা ছাগলের হাঁটু থেকে পায়ের নিচের অংশের হাড় সেদ্ধ করে রাঁধা ক্বাথ; ইংরেজিতে soup।
 
 
গড়ে,  গড়ে  গোরু, গড়ে বলদ এবং গড়ে মানুষ
বাংলায় দুটি গড়ে আছে। একটির উচ্চারণ গড়ে এবং অন্যটির উচ্চারণ গোড়ে। তবে বানান অভিন্ন— গড়ে। গড়ে উচ্চারিত গড়ে শব্দের অর্থ— (ক্রিয়াবিশেষণে) গড়পড়তায়। যেমন:  পাঁচ জন মানুষের মধ্যে ৩০টি আম ভাগ করে দিলে গড়পড়তায় ৬টি আম পাবে। গোড়ে উচ্চারণের গড়ে অর্থ— (বিশেষণে) অলসপ্রকৃতির, দীর্ঘসূত্রী। গড়ে মানুষের ‍উন্নতি সুদূরপরাহত।
 
গড়ে গোরু:  লাঙল টানতে টানতে শুয়ে পড়ে এবং সহজে উঠতে চায় না এমন গোরুকে গড়ে গোরু বলে। এদের গড়ে বলদও বলা হয়। কিছুক্ষণ কাজ করে যারা ফাঁকি মারে তাদের বলা হয় গড়ে মানুষ।
গণকবর
গণকবর: এটি একটি মিশ্র উৎসের বাংলা শব্দ। সংস্কৃত ‘গণ’ এবং আরবি ‘কবর’ মিলে গণকবর। অর্থ: বহুলোকের একত্র সমাধি। ইংরেজিতে যাকে বলা হয়: mass grave. এর সমার্থক: গণসমাধি, গণসৎকার।
বাংলায় গণ দিয়ে গঠিত বহুল শব্দ আছে। যেমন:
 
গণঅভ্যুত্থান, গণ আন্দোলণ, গণচেতনা, গণজমায়েত, গণজাগরণ, গণটোকাটুকি, গণতন্ত্র, গণদেবতা, গণনাটক, গণনায়ক, গণপতি, গণপরিষদ, গণপিটুনি, গণপ্রজাতন্ত্রী, গণপ্রহার, গণবিক্ষোভ, গণবিরোধী, গণভবন, গণভোট, গণমত, গণমাধ্যম, গণমানস, গণশক্তি, গণশত্রু, গণশিক্ষা, গণহত্যা প্রভৃতি।

মওলা, মওলানা, মৌলানা, মৌলবি, আলেম, আল্লামা, হুজুর

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, আরবি মওলা অর্থ (বিশেষ্যে) আল্লাহ, প্রভু। আরবি মওলানা, মৌলানা ও মৌলবি অর্থ (বিশেষ্যে) ইসলাম ধর্মবিষয়ে পণ্ডিত, আলেম।
আরবি আলেম অর্থ (বিশেষণে) ইসলাম ধর্মতত্ত্বজ্ঞ; পণ্ডিত (বিশেষ্যে) বিদ্বান ব্যক্তি। আরবি আল্লামা ও আলেম সমার্থক শব্দ। (বিশেষণে) আল্লামা অর্থ জ্ঞানী, পণ্ডিত। আরবি হুজুর অর্থ (বিশেষ্যে) প্রভু বা মনিবকে সম্বোধনে ব্যবহৃত শব্দ; মহাশয়, প্রভু, মনিব; জনাব।
 
মত মতন ও মতো
 
মত: মত (√মন্‌+ত) সংস্কৃত। বাংলায় তৎসম। বাক্যে বিশেষ্যে হিসেবে ব্যবহৃত মত শব্দের অর্থ—
  • মনের ভাব: এ বিষয়ে তোমার মত কী জানতে চাই?
  • সম্মতি: কমিটির মত ছাড়া কাজটি করা হয়েছে।
  • সিদ্ধান্ত: ঘনঘন মত পরিবর্তন করা উচিত নয়।
  • ধারা, পদ্ধতি: তার বিরুদ্ধে আইনমত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
  • বিধি, নিয়ম: ধর্মমতে তিনি কোনো পাপ করেননি।
মতো: মতো বাংলা শব্দ। বাক্যে শব্দটি বিশেষণ, ক্রিয়াবিশেষণ ও অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বিশেষণ হিসেবে মতো শব্দের অর্থ—
  • তুল্য, সদৃশ্য: তিনি আকাশের মতো বিশাল মনের মানুষ।
  • যোগ্য: মনে রাখার মতো একটি ছবি দেখলাম।
ক্রিয়াবিশেষণ হিসেবে মতো শব্দের অর্থ—
  • অনুযায়ী: বিধিমতো কাজ হবে।
অব্যয় হিসেবে মতো শব্দের অর্থ—
  • জন্য, সীমা: জন্মের মতো, চিরদিনের মতো।
মতন: মতন বাংলা শব্দ। বাক্যে (বিশেষণ) হিসেবে ব্যবহৃত মতন অর্থ—
  • মতো সদৃশ: মাতৃভাষা মায়ের মতন, অবহেলাই ভুলের কারণ।
  • তুল্য: রাতের মতন অন্ধকার হয়ে গেল দিনটা হঠাৎ।
  • সদৃশ: তোমার মতন প্রিয় আমার কে আছে গো আর/ তুমি ছাড়া জীবনটা তাই অসীম হাহাকার।
মতো ও মতন সমার্থক। তবে, মতো তৎসম এবং মতন বাংলা। বাক্যে যে-কোনো একটি ব্যবহার করা যায়। তবে মতন শব্দটির ব্যবহার গদ্যে তেমন একটা দেখা যায় না। কাব্যে এর অধিক ব্যবহার লক্ষণীয়।
“শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে
তোমারি সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে ॥ (রবীন্দ্রনাথ)
 
ভাতি ভাতিছ ও প্রদীপভাতি শব্দের অর্থ 
 
  • ভাতি (√ভা+তি) সংস্কৃত শব্দ। বাংলায় তৎসম। অভিধানমতে, তৎসম ভাতি শব্দের অর্থ— শোভা, উজ্জ্বল, দীপ্তি, কান্তি; প্রকাশ, উদয়, আবির্ভাব, আলোর দীপ্তি, প্রোজ্জ্বল।
  • ভাতিছ: ভাতিছ অর্থ— (ক্রিয়ায়) অর্থ জ্বলছ, শোভা পাচ্ছ, আলো ছড়াচ্ছ, উদয় হচ্ছ, আলো দিচ্ছ, উজ্জ্বলতা দিচ্ছ প্রভৃতি।
  • প্রদীপভাতি: প্রদীপভাতি অর্থ— (বিশেষ্যে) উজ্জ্বল বাতি, প্রজ্জ্বোল বাতি, আলো দিচ্ছে এমন বাতি।
“আমি যামিনী তুমি শশী হে
ভাতিছ গগন মাঝে।”
 
কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার অপব্যয়ের ফল কবিতায় লিখেছেন—
“যে জন দিবসে মনের হরষে
জ্বালায় মোমের বাতি,
আশু গৃহে তার দেখিবে না আর
নিশীথে প্রদীপভাতি।”
কবিতায় শব্দটি প্রদীপ ভাতি নয়, প্রদীপভাতি (সূত্র: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান, পৃষ্ঠা: ১০৪২)।
 
কুলীন ও কুলীনকুলসর্বস্ব
 
কুলীন: তৎসম কুলীন (কুল+ঈন) শব্দের তিনটি অর্থ (বিশেষণে) রয়েছে। যথা—
  • কল্পিত অভিজাত বংশে জাত,
  • আচার বিনয় বিদ্যা প্রভৃতি গুণসম্পন্ন এবং
  • বল্লাল (১০৮৩–১১৭৯ খ্রি.) সেন প্রবর্তিত কুল-মর্যাদার অধিকারী।
কুলীনকুলসর্বস্ব: কুলীনকুলসর্বস্ব (কুলীনকুল+সর্বস্ব) অর্থ— (বিশেষণে) বংশমর্যাদা ব্যতীত গৌরব করার কিছু নেই এমন।
‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নাটক: বাংলায় ‘কুলীনকুলসর্বস্ব’ নামের একটি নাটক আছে। রচয়িতা  রামনারায়ণ তর্করত্ন। নাটকটি ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।  এটি বাংলার প্রথম সামাজিক নাটক। নাটকটি লেখার পর রামনারায়ণ তর্করত্ন মহাশয় নাটুকে রামায়ণ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এটিই হয়ে যায় তাঁর ডাকনাম। তর্করত্ন রামনারায়ণের অ্যাকাডেমিক সনদ। আগে এভাবে সনদ প্রদান করা হতো। যেমন: তাঁর অগ্রজ প্রাণকৃষ্ণ বিদ্যাসাগর। তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন। রামনারায়ণের পিতা ছিলেন রামধন শিরোমণি। তিনি ছিলেন সেকালের একজন বিখ্যাত পণ্ডিত।
 
রামনারায়ণ তর্করত্ন ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দের ২৬শে ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার হরিনাভি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং  ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯শে জানুয়ারি ৬৩ বছর বয়সে মারা যান। তিনি ছিলেন বাংলার প্রথম মৌলিক নাট্যকার এবং হরিনাভি বঙ্গনাট্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা (১৮৬২)।  বাংলা ভাষায় প্রথম বিধিবদ্ধ নাটক রচনার জন্য তিনি ‘নাটুকে রামনারায়ণ’ নামে পরিচিত ছিলেন। কুলীনকুলসবর্বস্ব (১৮৫৪) তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ নাটক। এতে হিন্দুসমাজে বহুবিবাহ প্রথার কুফল সম্পর্কে বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়। তাঁর অন্যান্য রচনা: রত্নাবলী (১৮৫৮), নব-নাটক (১৮৬৬), বেণীসংহার (১৮৫৬), মালতীমাধব (১৮৬৭), রুক্মিণীহরণ (১৮৭১), কংসবধ (১৮৭৫) ইত্যাদি। পতিব্রতোপাখ্যান (১৮৫৩) তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ। এছাড়া তিনি যেমন কর্ম তেমনি ফল (১৮৬৩), উভয় সঙ্কট (১৮৬৯), চক্ষুদান প্রভৃতি প্রহসনও রচনা করেন। তাঁর অধিকাংশ নাটক ও প্রহসন বেলগাছিয়া রঙ্গমঞ্চ, কলকাতার অভিজাত ধনিকশ্রেণীর নিজস্ব মঞ্চ এবং জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি নাট্যশালায় বহুবার অভিনীত হয়। ‘দি বেঙ্গল ফিলহার্মোনিক আকাদেমি’ থেকে তিনি ‘কাব্যোপাধ্যায়’ উপাধি লাভ করেন। ১৮৮৬ সালের ১৯ জানুয়ারি স্বগ্রামে তাঁর মৃত্যু হয়।  তাঁর অগ্রজ প্রাণকৃষ্ণ বিদ্যাসাগরও সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক ছিলেন।
 

আম্মা শব্দের ইতিবৃত্ত জানতে চাই

আরবি উম্ থেকে উদ্ভূত আম্মা অর্থ (বিশেষ্যে) জননী, মাতা, আম্মাজান প্রভৃতি। প্রয়োগ: নীল সিয়া আসমান, লালে লাল দুনিয়া/ আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়। (নজরুল ইসলাম)। বাংলায় কন্যা বা কন্যাস্থানীয়াদেরও আদর করে আম্মা ডাকা হয়। তবে, আরাবি আম্মার থেকে উদ্ভূত আম্মার অর্থ নির্দেশদাতা, মন্ত্রণাদাতা, নির্মাণশিল্পী।

করণ কৃত ভবন ভূত

আত্ত, কিন্তু আত্তীকরণ, আত্তীকৃত, আত্তীভবন, আত্তীভূত।
এক, কিন্তু একীকরণ, একীকৃত, একীভবন, একীভূত।
একত্র, কিন্তু একত্রীকরণ, একত্রীকৃত, একত্রীভবন, একত্রীভূত।
নির্মূল, কিন্তু নির্মূলীকরণ, নির্মূলীকৃত, নির্মূলীভূত।
ঘন, কিন্তু ঘনীকরণ, ঘনীকৃত, ঘনীভবন, ঘনীভূত।
 
শুদ্ধ, কিন্তু শুদ্ধীকরণ, শুদ্ধীকৃত, শুদ্ধীভূত, শুদ্ধীভবন।
তীক্ষ্ণ, কিন্তু তীক্ষ্ণীকৃত, তীক্ষ্ণীকরণ, তীক্ষ্ণীভবন, তীক্ষ্ণীভূত।
স্পষ্ট, কিন্তু স্পষ্টীকরণ, স্পষ্টীকৃত, স্পষ্টীভূত।
সম, কিন্তু সমীকরণ, সমীকৃত, সমীভবন, সমীভূত।
সরল, কিন্তু সরলীকরণ, সরলীকৃত, সরলীভবন, সরলীভূত।
 
সহজ, কিন্তু সহজীকরণ, সহজীকৃত, সহজীভূত, সহজীভবন।
সদৃশ্য, কিন্তু সদৃশীকরণ, সদৃশীকৃত, সদৃশীভবন, সদৃশীভূত।
ঋজু, কিন্তু ঋজূকরণ, ঋজূকৃত, ঋজূভবন, ঋজূভূত, ।
লঘু, কিন্তু লঘূকরণ, লঘূকৃত, লঘূভবন, লঘূভূত।
নিমোনিক: মনে রাখার কৌশল
(১) তৎসম শব্দের শেষে করণ, কৃত, ভবন, ভূত প্রভৃতি প্রত্যয় যুক্ত (চ্বি প্রত্যয়-সহ) হলে ঈ-কার আগম হয়।
নির্মূলীকরণ= নির্মূল+চ্বি+করণ।
নির্মূলীকৃত= নির্মূল+চ্বি+কৃত।
ঘণীভবন=ঘন+চ্বি+ভবন।
ঘনীভূত= ঘন+চ্বি+ভূত।
(২) মূল শব্দের শেষে উ-কার থাকলে ওই উ-কার করণ কৃত ভবন ভূত (+চ্বি)] প্রভৃতির প্রভাবে ঊ-কার হয়ে যায়। যেমন:
ঋজু+চ্বি+করণ= ঋজূকরণ।
ঋজু+চ্বি+কৃত= ঋজূকৃত।
ঋজু+চ্বি+ভবন= ঋজূভবন।
ঋজু+চ্বি+ভূত= ঋজূভূত।
অনুরূপ:
লঘু> লঘূকরণ, লঘূকৃত, লঘুভবন, লঘূভূত।
সুষ্ঠু> সুষ্ঠূকরণ, সুষ্ঠূকৃত, সুষ্ঠূভূত।
অনু থেকে অনূকরণ হলো না কেন? কারণ, ‘অনু’ বিশেষ্য বা বিশেষণ নয়- অব্যয় এবং পরে, পশ্চাৎ, সাদৃশ্য ও ব্যাপ্তি প্রভৃতিসূচক সংস্কৃত উপসর্গ। এসব বিষয়-সহ এরূপ প্রত্যয়াদি যুক্ত হলে পদের কী পরিবর্তন হয় তা বিস্তারিত জানতে চাইলে নিচের লিংক দেখতে পারেন:
 

সমগ্র লেখা একসঙ্গে দেখার জন্য ক্লিক করুন: করণ কৃত ভবন ভূত বিস্তারিত।

ড্যশ ()-এর ব্যবহার

১. বাক্যে বিধৃত কোনো বিবৃতি সম্পূর্ণ করতে কিংবা বিশদ করতে ড্যাশচিহ্নের ব্যবহার করা হয়। ড্যাশ এবং হাইফেন একই রকম হলেও ড্যাশ হাইফেনের দ্বিগুণ লম্বা। সাধারণত বাক্যে সংশ্লিষ্ট উদাহরণ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপনের জন্য ড্যাশ ব্যবহার করা হয়। যেমন: কাল তিন প্রকার, যথা— বর্তমান, অতীত ও ভবিষ্যৎ।
২. প্যারেনথেসিসে কমা বা বন্ধনীর পরিবর্তে ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। যেমন: অফিসে— না, ক্লাবে যাবার পূর্বে দেখলাম— লোকটি মরে আছে।
৩. বাক্য অসম্পূর্ণ রাখলে ড্যাশ ব্যবহার করতে হয়। যেমন: মোদের গরব, মোদের আশা— . . .।
৪. ড্যাশ দিয়ে হাইফেন-এর মতো একটি শব্দ বা পদকে দ্বিখণ্ডিত করে কিংবা বিভক্তিকে পৃথক দেখানো হয় না। এটি বাক্যের অর্থ ও পরিবেশনা নির্দেশ করে। যেমন: কামাল—এরনয়, কামাল-এর
৫. লেখার সুবিধার্থে ড্যাশ-এর পূর্বে ফাঁক রাখা হবে না। ফাঁক রাখলে কম্পিউটারে লেখার সময় পঙৃৃক্তির শেষে স্বয়ক্রিয়ভাবে ড্যাশ ও পদ আলাদা হয়ে দুটি ভিন্ন পঙ্‌ক্তিতে চলে যায়। তাই ড্যাশকে, পূর্বের শব্দের সঙ্গে সেঁটে বসানো সমীচীন। কিন্তু অব্যবহিত পরের শব্দের সঙ্গে ফাঁক রেখে বসবে। নইলে হাইফেন-এর নির্দেশনার মতো ড্যাশও সন্নিহিত দুটি শব্দ বা পদকে একীভূত নির্দেশক হয়ে যাবে। যেমন— আম, জাম, কলা, লিচু। সেদিন দেখলাম— তুমি জানি কোথায় যাচ্ছ।

ঋ কি স্বরধ্বনি

বাংলা একাডেমি বাঙলা উচ্চারণ অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৯৯)-এর নবম পুনর্মুদ্রণ (২০১৬)] লিখেছে:
“ঋ বাঙলা ভাষায় এ-বর্ণটির উচ্চারণ ‘রি’ (র্‌-এর সঙ্গে ই-স্বরধ্বনির সংযুক্তি)। সংস্কৃত ভাষায় ‘ঋ’ শুদ্ধ স্বরধ্বনির মর্যাদা পেলেও বাঙলা ভাষার প্রমিত উচ্চারণে এটাকে আর স্বরধ্বনিরূপে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।” এবং “ঋ/ঋ-কারকে বাঙলা ভাষায় স্বরধ্বনির মর্যাদা দেওয়া ঠিক নয়; কারণ সংস্কৃত ভাষার শুদ্ধ স্বরধ্বনির মতো এর উচ্চারণ আর অবশিষ্ট নেই। বাঙলায় এর উচ্চারণ পরিষ্কার ‘রি’ (‘র’-এর সঙ্গে সংযুক্ত ‘ই’)।
সংস্কৃত ভাষার অন্ধ অনুকরণে এটিকে এখনও বর্ণমালায় স্বরবর্ণের মধ্যে স্থান দেওয়া হয় এবং কতিপয় সংস্কৃত শব্দের বানানে এর লিখিত রূপ দেখা যায়।
 
 
 
 
 
শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
— — — — — — — — — — — — — — — — —
প্রতিদিন খসড়া
আমাদের টেপাভুল: অনবধানতায়
— — — — — — — — — — — — — — — — —
Spelling and Pronunciation
HTTPS://DRAMINBD.COM/ENGLISH-PRONUNCIATION-AND-SPELLING-RULES-ইংরেজি-উচ্চারণ-ও-বান/
 
error: Content is protected !!