প্রমিত বাংলা বানান নিয়মকানুন

 এবি ছিদ্দিক

আমরা ইংরেজিতে কোনো কিছু লেখার সময় বানান ও ব্যাকরণের ব্যাপারে যতটুকু সচেতন থাকি, বাংলার বেলায় তার সামান্যটুকু সচেতনতা আমাদের মধ্যে কাজ করে বলে মনে হয় না। তাই অ্যাকাডেমিক শিক্ষার অনেক ওপরের ধাপ অতিক্রম করার পরও অনেকে বাংলাতে লিখতে গিয়ে নানান ভুল করে থাকেন। আমাদের অনেকেই করে থাকেন, এরকম কিছু সাধারণ ভুল যাতে এড়ানো যায়, তার লক্ষ্যে প্রমিত বাংলা বানানের কয়েকটি নিয়ম উল্লেখ করলাম—

১. সংস্কৃত ছাড়া অন্য কোনো উৎসের শব্দের বানানে ‘ঈ’, ‘ঊ’, ‘ী’, ‘ূ’, ‘ঋ’, ‘ৃ’, ‘ণ’ ও ‘ষ’ ব্যবহার করা যাবে না। তাই ‘পোষ্ট’, ‘ঠাণ্ডা’, ‘ ‘তীর'(বাণ বা শর অর্থে), ‘জরুরী’, ‘সূরা’, ‘ঈমান’, ‘মডার্ণ’, ‘এণ্ড’, ‘ষ্টোর’, ‘ফার্মেসী’ ইত্যাদি বানান যথাক্রমে লিখতে হবে— ‘পোস্ট’, ‘ঠান্ডা’, ‘তির'(বাণ বা শর অর্থে), ‘জরুরি’, ‘সুরা’, ‘ইমান’, ‘মডার্ন’, ‘অ্যান্ড’, ‘স্টোর’, ‘ফার্মেসি’ ইত্যাদি। তবে মুষ্টিমেয় অতৎসম শব্দে দীর্ঘ-‘ঈ’-কার ও মূর্ধন্য-‘ষ’ ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যেমন: ষাঁড়, ষাট, পোষা, ইউরোপীয় ইত্যাদি।
২. নিশ্চয়ার্থক ‘ই’ শব্দের সঙ্গে কার-চিহ্ন রূপে যুক্ত না-হয়ে পূর্ণ রূপে শব্দের পরে যুক্ত হবে। যেমন: এখনই, তখনই, আজই ইত্যাদি।
৩. না-বোধক ‘না’ শব্দের শেষে সমাসবদ্ধভাবে না-লিখে স্বতন্ত্র পদ হিসেবে এবং ‘নি’ সমাসবদ্ধভাবে লিখতে হবে। যেমন: করব না, যাব না, পারব না; করিনি, পড়িনি, যাইনি ইত্যাদি।
৪. কোনো শব্দের বানান সংক্ষিপ্তভাবে লিখতে হলে ডট ( . ) চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে। যেমন: মোহাম্মদ = মো.
বিশেষ দ্রষ্টব্য: = বি. দ্র.:
হুসাইন = হু.
ডাক্তার = ডা. ইত্যাদি।
৫. বিসর্গ ( ঃ ) কোনো বিরামচিহ্ন নয়। তাই শব্দ সংক্ষেপণে বা কোলন( : )-এর পরিবর্তে বিসর্গ ব্যবহার করা যাবে না।
উদাহরণ: ক. ‘যেমনঃ’ অশুদ্ধ, শুদ্ধ হচ্ছে ‘যেমন:’।
খ. ‘মোঃ’ অশুদ্ধ, শুদ্ধ হচ্ছে ‘মো.’।
গ. ‘উত্তরঃ’ বা ‘উঃ’ অশুদ্ধ, শুদ্ধ হচ্ছে ‘উত্তর:’ বা ‘উ.:’। ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, প্রমিত বাংলা বানানে শব্দের শেষে ‘বিসর্গ’ বর্জনীয়।
যেমন: মূলত (‘মূলতঃ’ ভুল), ক্রমশ (‘ক্রমশঃ’ ভুল), পুনঃপুন (‘পুনঃপুনঃ’ ভুল) ইত্যাদি।
৬. কি/কী: যেসব প্রশ্নের উত্তর কেবল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-তে দেওয়া যায়, সেসব প্রশ্নসূচক বাক্যে ‘কি’ বানান হ্রস্ব-‘ই’-কার এবং অন্য যে-কোনো ক্ষেত্রে ‘কী’ বানান দীর্ঘ-‘ঈ’-কার দিয়ে লিখতে হবে। যেমন—
ক. আপনি কি টম সম্পর্কে জানেন?
> ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’।
খ. আপনি টম সম্পর্কে কী জানেন?
> অনেক কিছু।…
গ. কী সুন্দর পাখি!

৭. কিছু শব্দ আছে, যেগুলোর অন্ত্য-‘অ’-এর সংবৃত (‘ও’-এর মতো) এবং হলন্ত উচ্চারণের জন্য অর্থ বদলে যায়। এধরনের শব্দের বানানে সংবৃত উচ্চারণ বোঝাতে অন্ত্যে ‘ও’-কার ব্যবহার করতে হবে। যেমন: ভালো, হতো, মতো, ইত্যাদি। তবে, যেসকল শব্দে ‘অ’-ধ্বনির সংবৃত কিংবা হলন্ত উচ্চারণের জন্য অর্থগত কোনো সমস্যা দেখা দেয় না, সেসকল শব্দে ‘ও’-কার
ব্যবহারের কোনো দরকার নেই; বিশেষ করে ক্রিয়াপদের শেষে। ভবিষৎ অনুজ্ঞাবাচক বাক্য ছাড়া অন্যান্য কালের ক্ষেত্রে ক্রিয়াপদের শেষে ‘ও’-কার বর্জন করাটাই যথার্থ।
উদাহরণ: ক. ‘ভাল’ শব্দটির অন্ত্য-‘অ’-এর উচ্চারণ সংবৃত (ভালো) হলে শব্দটি দিয়ে গুণ বোঝানো হয় এবং হলন্ত (ভাল্) হলে ‘কপাল’, ‘ভাগ্য’, ‘ললাট’ ইত্যাদি বোঝায়। তাই, ‘গুণ’ অর্থে ব্যবহৃত ভালো বানান অবশ্যই ‘ও’-কার দিয়ে লিখতে হবে।
খ. ক্রিয়া: কর, বল, পড়, হল, যাব, পড়ব ইত্যাদি বানান ‘ও’-কার ছাড়া লেখাটাই উত্তম। কারণ, বাক্যে উল্লেখ-করা শব্দগুলো ব্যবহার করলে ‘কর্’ (tax), ‘বল্’ (force), ‘হল্’ (hall) ইত্যাদি অর্থ ভাবার কোনো কারণ নেই। তবে হ্যাঁ, ভবিষৎ অনুজ্ঞাবাচক বাক্যগুলোতে ‘ও’-কার ব্যবহার করতে হবে। এধরনের বাক্যে চাইলে আদিতেও ‘ও’-কার ব্যবহার করা যাবে। যেমন:
ক. তুমি কাল হলেও কাজটি করো/কোরো।
খ. কখনো মিথ্যা বলো/বোলো না।

৮. অধিকন্তু অর্থে ব্যবহৃত ‘ও’ কার-চিহ্ন হিসেবে না-লিখে বর্ণ হিসেবে লিখতে হবে। যেমন: আরও, তোমারও, আপনিও, এখনও, আবারও, আজও, পরশুও ইত্যাদি।
৯. রেফের পর ব্যঞ্জনের দ্বিত্ব হবে না। যেমন:
ক. ‘কার্য্য’ না-লিখে লিখতে হবে ‘কার্য’।
খ. ‘ধর্ম্ম’ না-লিখে ‘ধর্ম’ লিখতে হবে।
একইভাবে, বর্ত্তমান > বর্তমান; অর্জ্জন > অর্জন; কার্ত্তিক > কার্তিক ইত্যাদি।
১০. পরা/পড়া: শরীরের কোনো অংশে পরিধানযোগ্য হলে ‘পরা’ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ‘পড়া’ লিখতে হবে। যেমন: কাপড় পরা, রিং পরা, জুতো পরা; বই পড়া, পিছলে পড়া, বৃষ্টি পড়া ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, ‘বিলম্বে’ অর্থে ‘পরে’ বানান ‘র’ দিয়ে লিখতে হবে। যেমন: আমি পরে (‘বিলম্বে’ বা ‘এখন নয়’ অর্থে) আসব।
১১. বিশেষণ পদ সর্বদা পরবর্তী পদ থেকে আলাদাভাবে লিখতে হবে। যেমন: ভালো ছেলে, লাল ফুল, টক দই ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, বাংলা স্ত্রীবাচক বিশেষ্যের বিশেষণ এবং বিধেয়
বিশেষণের লিঙ্গভেদ হয় না। মনে রাখতে হবে, যদি বিশেষণ, বিশেষিত পদের পরে
বসে, তবে তাকে বিধেয়
বিশেষণ বলা হয়।
এক্ষেত্রে, যদি স্ত্রীজাতীয় পদের বিশেষণ থাকে, তবে বিশেষণটির স্ত্রীলিঙ্গ না-হয়ে
পুংলিঙ্গবাচক রূপটি ব্যবহৃত হয়। যেমন:
ক. মেয়েটি খুব সুন্দর (সুন্দরী লিখলে অপপ্রয়োগ হবে)।
খ. দীপিকা অনেক বুদ্ধিমান। ইত্যাদি।

১২. চলিত রীতিতে ঘটমান বর্তমান কালের ক্ষেত্রে করতেছে, করতেছি; পড়তেছে, পড়তেছি; আসতেছে, আসতেছি; বলতেছে, বলতেছি; শুনতেছে, শুনতেছি; লিখতেছে, লিখতেছি ইত্যাদি রূপ শুদ্ধ নয়। লিখতে হবে— করছে, করছি; পড়ছে, পড়ছি; আসছে, আসছি; বলছে, বলছি; শুনছে, শুনছি ইত্যাদি। সাধু রীতিতে লিখতে চাইলে করিতেছি, পড়িতেছে, আসিতেছে, লিখিতেছি ইত্যাদি লেখা যাবে। এক-কথায়, চলিত রীতিতে ক্রিয়াপদের শেষে ‘-তেছ’, ‘-তেছে’, ‘-তেছি’, ‘-তেছেন’ ইত্যাদি যুক্ত করা যাবে না।
১৩. চাচ্ছি, গেছেন, গেছিলেন, যেয়ে, গাচ্ছি প্রভৃতি রূপও অশুদ্ধ। শুদ্ধ হচ্ছে— চাইছি, গিয়েছেন, গিয়েছিলেন, গিয়ে, গাইছি প্রভৃতি।
১৪. যেসকল ক্রিয়াপদের বানানের শেষে ‘ই’ এবং ‘য়’ উভয় শুদ্ধ, উত্তম পুরুষের (আমি, আমরা) ক্ষেত্রে সেসকল ক্রিয়াপদের বানান হ্রস্ব-‘ই’ দিয়ে লিখতে হবে। যেমন—
ক. আমি স্কুলে যাই।
খ. আমরা ভাত খাই।
গ. আমি লাল আমটি চাই। ইত্যাদি।
অপরদিকে, যেসকল ক্রিয়াপদের বানানের শেষে ‘ই’ এবং ‘য়’ উভয়ই শুদ্ধ, নাম পুরুষের (তারা, সে, টম ইত্যাদি) ক্ষেত্রে সেসকল ক্রিয়াপদের বানান ‘য়’ দিয়ে লিখতে হবে। যেমন—
ক. সে স্কুলে যায়।
খ. তারা পড়তে চায়।
গ. টম আম খায়। ইত্যাদি।
১৫. বাক্যের শেষে একাধিক যতিচিহ্নের (।।।, !!!!, ??? ইত্যাদি) ব্যবহার ব্যাকরণসিদ্ধ নয়। তাই, অকারণে একাধিক যতিচিহ্ন দেওয়া সমীচীন নয়।
১৬. বিদেশি শব্দের বানানে ক্ষেত্র-অনুযায়ী ‘এ’ বা ‘এ’-কারের জন্য ‘অ্যা’ বা ‘্যা’ লিখতে হবে। যেমন: অ্যাসিড, ক্যাট, ব্যাংক, ম্যাচ, অ্যান্ড (And), অ্যাকাডেমি ইত্যাদি।
১৭. করবা, পারবা, পড়বা, চলবা, মানবা ইত্যাদি রূপের ব্যবহার শুদ্ধ নয়। শুদ্ধ হচ্ছে করবে, পারবে, পড়বে, চলবে, মানবে ইত্যাদি। অর্থাৎ, ক্রিয়াপদের শেষে ‘-বা’ যুক্ত করা যাবে না।
১৮. নাই, দিব, লিখা, বুঝা, ভিতর, উপর, উঠা, উড়া, শুনা, ফিরা, জিতা প্রভৃতি রূপ কেবল সাধু রীতিতে ব্যবহার করা যাবে। চলিত রীতিতে বানানগুলো যথাক্রমে লিখতে হবে— নেই/নি, দেব, লেখা, বোঝা, ভেতর, ওপর, ওঠা, ওড়া, শোনা, ফেরা, জেতা ইত্যাদি।
১৯. টা, টি, গুলো, গণ, রা, সমূহ, বৃন্দ, মালা, সহ, সব ইত্যাদি নির্দিষ্টতা জ্ঞাপক ও বহুবচনবোধক শব্দ পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে ফাঁকা না-রেখে লিখতে হবে। যেমন: খাতাটা, বইটি, আমগুলো, শিক্ষকগণ, ছাত্ররা, উদাহরণসমূহ, অতিথিবৃন্দ, পর্বতমালা, ব্যাখ্যা-সহ, ভাইসব ইত্যাদি।
২০. ঊর্ধ্ব-কমা যথাসম্ভব বর্জন করতে হবে। যেমন:
ক. দুইটি > দুটি; দু’টি বর্জনীয়।
খ. কয়েকজন > কজন; ক’জন বর্জনীয়। ইত্যাদি।
২১. সম্মাননীয় ব্যক্তিদের (যাঁদের ‘আপনি’ বলে সম্বোধন করা হয়) সর্বনামে ‘ঁ’ ব্যবহার করতে হবে। যেমন: তাঁরা, যাঁরা, তাঁদের, তাঁর, ওঁকে ইত্যাদি।
উল্লেখ্য, অনুনাসিক বর্ণযুক্ত (ঙ, ঞ, ণ, ন, ম ইত্যাদি) সর্বনামে ‘ঁ’ যুক্ত করতে হবে না। যেমন: তিনি (‘তিঁনি’ ভুল), যিনি (‘যিঁনি’ ভুল), উনি (‘উঁনি’ ভুল) ইত্যাদি।
২২. জাতিবাচক শব্দের শেষে ও ভাষার নামের শেষে হ্রস্ব-‘ই’-কার লিখতে হবে। যেমন: বাঙালি, ইংরেজি, জাপানি, ফরাসি ইত্যাদি।
২৩. ‘আলি’ প্রত্যয়যুক্ত শব্দের বানান শেষে হ্রস্ব-‘ই’-কার দিয়ে লিখতে হবে। যেমন: সোনালি, মিতালি ইত্যাদি।
২৪. শেষে ‘-জীবী’ যুক্ত শব্দের বানান উভয় বর্ণের সঙ্গে দীর্ঘ-‘ঈ’-কার দিয়ে লিখতে হবে। যেমন: বুদ্ধিজীবী, শ্রমজীবী, কৃষিজীবী, কর্মজীবী ইত্যাদি।
২৫. বহুল ব্যবহৃত ‘স্বাগতম’, ‘শুধুমাত্র’/’কেবলমাত্র’, ‘সমসাময়িক’, ‘অর্ধাঙ্গিনী’ শব্দকটির ব্যবহার সংগত নয়। শব্দগুলোর সংগত রূপ যথাক্রমে— ‘স্বাগত’, ‘শুধু’/’মাত্র’/’কেবল’, ‘সামসময়িক’ ও ‘অর্ধাঙ্গী’।
২৬. ‘এত’ ও ‘কত’-যুক্ত শব্দের বানানে ‘ত’-এর সঙ্গে ‘ও’-কার হবে না। যেমন: এতদিন, এতক্ষণ, এতবার; কতদিন, কতক্ষণ ইত্যাদি।
২৭. অসম্পূর্ণ বোঝাতে ত্রিবিন্দু( … ) ব্যবহার করতে হবে। যেমন: তারপর আমি…
২৮. ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা, স্থান ইত্যাদির মতো নামবাচক বিশেষ্যের বানানে ভুল ধরা যাবে না। তাই, চাইলে যে-কেউ তাঁর বা তাঁদের নাম কিংবা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের নাম নিজের ইচ্ছে মতো লিখতে পারবেন।

আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম:

যুক্তবর্ণের পূর্ণ তালিকা : 

সূত্র : শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ)

error: Content is protected !!