প্রমিত বাংলা ভাষায় শব্দশ্রেণি: পদ: বিশেষ্য সর্বনাম বিশেষণ ক্রিয়া ক্রিয়াবিশেষণ যোজক অনুসর্গ ও আবেগ শব্দ

মর্তুজা আহমেদ বাবলা(Mortuza Ahmed Babla)

সংযোগ: https://draminbd.com/প্রমিত-বাংলা-ভাষায়-শব্দশ-2/ ‎

১.

প্রমিত বাংলা ভাষায় ‘শব্দশ্রেণি’

আমরা জানি যে, বাক্যে ব্যবহৃত শব্দকে পদ বলে। প্রথাগত ব্যাকরণে বাক্যে ব্যবহৃত এসব শব্দকে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন- বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া ও অব্যয়। প্রমিত বাংলা ব্যাকরণে বাক্যে ব্যবহৃত এসব শব্দকে বলা হচ্ছে শব্দশ্রেণি, আর শব্দশ্রেণির প্রকারভেদেরও পরিবর্তন করা হয়েছে। নিচে তা আলোচনা করা হলো-
প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ অনুযায়ী শব্দশ্রেণির প্রকারভেদ:
প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণে শব্দশ্রেণিকে আটটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা-
১) বিশেষ্য
২) সর্বনাম
৩) বিশেষণ
৪) ক্রিয়া
৫) ক্রিয়াবিশেষণ
৬) যোজক
৭) অনুসর্গ
৮) আবেগ শব্দ
প্রথাগত ব্যাকরণ ও প্রমিত ব্যাকরণে শ্রেণিবিন্যাসে তারতম্য:
প্রথাগত ব্যাকরণে বিশেষণের একটি শ্রেণিবিভাগ ক্রিয়াবিশেষণকে আলাদা শ্রেণিবিভাগে আনা হয়েছে। সমুচ্চয়ী অব্যয়কে নাম দেওয়া হয়েছে ‘যোজক’; পদান্বয়ী অব্যয়ের নাম দেওয়া হয়েছে অনুসর্গ; অনন্বয়ী অব্যয়ের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে ‘আবেগ শব্দ’।
শব্দশ্রেণির এই আটটি ভাগকে আবার দুইটি প্রাথমিক শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে।যথা- অর্থবাহী ও ব্যাকরণিক।
অর্থবাহী বলতে বুঝানো হয়- এ শব্দগুলোকে অর্থের প্রয়োজনেই বাক্যে ব্যবহৃত হয়। বাক্যে মূল অর্থ এই শব্দগুলোতে প্রকাশ পায়। এই অর্থবাহী শাখার মধ্যে দেখানো হয়েছে- বিশেষ্য, সর্বনাম, বিশেষণ, ক্রিয়া, ক্রিয়াবিশেষণ ও আবেগ শব্দ।
ব্যাকরণিক বলতে বুঝানো হচ্ছে, যেগুলো মূলত ব্যাকরণের প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। এদেরও অর্থ আছে, কিন্তু তাদের কাজ প্রধানত ব্যাকরণের। ব্যাকরণিক শাখার মধ্যে রয়েছে- যোজক ও অনুসর্গ।

২.

প্রমিত বাংলা ব্যাকরণে ‘বিশেষ্য পদ’

প্রথাগত ব্যাকরণ এবং প্রমিত ব্যাকরণে বিশেষ্য পদের সংজ্ঞার্থে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। প্রথাগত ব্যাকরণে বিশেষ্য বলতে বুঝি, ‘কোনো কিছুর নাম’। আর প্রমিত বাংলা ব্যাকরণ অনুসারে, কোনো ব্যক্তি, স্থান, দ্রব্যসামগ্রী, গুণ বা অবস্থার নাম।
বিশেষ্য পদ চেনার উপায়:
  • কোনো ব্যক্তি, বস্তু, স্থান, গুণ, অবস্থা ইত্যাদি নাম বুঝালে বিশেষ্য।
  • বাক্যে যেসব শব্দে -র/-এর বা -গুলি/গুলো ইত্যাদি বিভক্তি বা প্রত্যয় যুক্ত হলে তা বিশেষ্য। যেমন- পাখিগুলো, ঢাকায় ইত্যাদি।
  • বাক্যের উদ্দেশ্য বা কর্তা বা কর্ম অথবা পূরক হিসেবে ব্যবহৃত হলে তা বিশেষ্য।
বিশেষ্যের ব্যাকরণগত ভূমিকা:
বিশেষ্যের ব্যাকরণগত ভূমিকা বলতে বোঝানো হচ্ছে, বাক্যে বিশেষ্য পদ কোন কোন অবস্থানে থেকে কী কী ভূমিকা পালন করে।
বাক্যে বিশেষ্য পদ তিন ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে। যথা- কর্তা, কর্ম এবং পূরক হিসেবে। সাধারণত যে-কোনো ধরনের বিশেষ্যেই এইসব ভূমিকা গ্রহণ করতে পারে।
১) কর্তা হিসেবে: বিশেষ্য পদ বাক্যে কর্তা হিসেবে ভূমিকা পালন করে। যেমন- পাখিগুলো কিচির-মিচির করে। এই বাক্যে কাজ সম্পাদন করছে ‘পাখিগুলো’। সুতরাং ‘পাখিগুলো’ হচ্ছে কর্তা। তাই এটি বিশেষ্য পদ।
২) কর্ম হিসেবে: বিশেষ্য পদ বাক্যে কর্ম হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন- আমি মাছখেতে ভালোবাসি। এই বাক্যে ‘মাছ’ হচ্ছে কর্ম। তাই এটি বিশেষ্য।
৩) পূরক হিসেবে: ইংরেজিতে যাকে আমরা Complement বলে জানি, তার বাংলা নাম হচ্ছে পূরক। পূরক হিসেবে বিশেষ্য পদ ভূমিকা পালন করে। যেমন- শামসুর রাহমান এক অসাধারণ কবি। এখানে ‘এক অসাধারণ কবি’এই শব্দগুচ্ছ হচ্ছে শামসুর রাহমানের পূরক।

প্রমিত বাংলা ব্যাকরণে ‘বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগ’ (পর্ব ৩)

প্রমিত বাংলা ব্যাকরণে বিশেষ্য পদকে প্রাথমিক পর্যায়ে দুইভাগে ভাগ করা হয়েছে। যথা- সংজ্ঞা বিশেষ্য ও সাধারণ বিশেষ্য।
সংজ্ঞা বিশেষ্য (Proper Noun): যে বিশেষ্য দ্বারা নির্দিষ্ট বা বিশেষ ব্যক্তি, স্থান, দেশ, পত্রিকা, বই, মাস, দিন ইত্যাদির নাম বোঝায়, তাকে সংজ্ঞা বিশেষ্য বলে। যেমন- রবীন্দ্রনাথ (বিশেষ ব্যক্তি), বাংলাদেশ (নির্দিষ্ট দেশের নাম), ঢাকা, যমুনা, বৈশাখ, শুক্রবার ইত্যাদি সংজ্ঞা বিশেষ্যের উদাহরণ।
সাধারণ বিশেষ্য (Common Noun): যে বিশেষ্য নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি, স্থান বা জিনিসের নাম না বুঝিয়ে সাধারণ ও সামগ্রিকভাবে একটি শ্রেণিকে বোঝায়, তাকে সাধারণ বিশেষ্য বলে। যেমন- ‘মানুষ’ বলতে আমরা নির্দিষ্ট কাউকে না বুঝে সমগ্র মানব জাতিকে বুঝি। এখানে ‘মানুষ’ হচ্ছে সাধারণ বিশেষ্য। এরূপ- নদী, মাছ, পুকুর, গাছ ইত্যাদি। অর্থের দিক থেকে সাধারণ বিশেষ্য সংজ্ঞাবাচক বিশেষ্যের বিপরীত। কারণ, যখন আমরা ‘পদ্মা’ বলছি তখন একটি নদীর নাম নির্দিষ্ট হয়ে যাচ্ছে, অপরদিকে শুধু ‘নদী’ বললে তা আর নির্দিষ্ট হয়ে থাকছে না; সমগ্র নদীকে বোঝাচ্ছে।
সাধারণ বিশেষ্যের শ্রেণিবিভাগ (বাংলা একাডেমি ‘প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ’ গ্রন্থে এই শ্রেণিকে বলা হয়েছে ‘বিশেষ্যের অন্তর্গত শ্রেণিবিভাগ’):
বিশেষ্যের এই শ্রেণিবিভাগকে কয়েকটি মানদণ্ডে ভাগ করা হয়েছে। মানদণ্ডগুলো হলো-
১) ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা
২) গণনযোগ্যতা
৩) সজীবতা
৪) সাধিত
১. ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা অনুসারে শ্রেণিবিভাগ: ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা অনুসারে সাধারণ বিশেষ্যকে দুটি উপশ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
  • মূর্ত বিশেষ্য (Concrete Noun): মূর্ত বিশেষ্য বলতে এমন ভৌত বস্তুর নাম বুঝায় যা দেখা, স্পর্শ করা, ঘ্রাণ নেওয়া কিংবা পরিমাপ করা যায়। যেমন- পানি, টেবিল, গোলাপ ইত্যাদি।
  • ভাব বিশেষ্য (Abstract Noun): মূর্ত বিশেষ্য নয় এমন বিশেষ্যকে বলা হয় ভাব বিশেষ্য। অর্থাৎ, নির্বস্তুক অবস্থা, মনোগত ভাব বা গুণগত বৈশিষ্ট্য ইত্যাদির নাম বুঝায় তা-ই ভাব বিশেষ্য। যেমন- আনন্দ, ইচ্ছা, দুঃখ, পাপ, সাহস ইত্যাদি ভাব বিশেষ্য। কারণ এগুলো দেখা, স্পর্শ করা বা পরিমাপ করা যায় না।
২. গণনযোগ্যতা অনুসারে শ্রেণিবিভাগ: গণনযোগ্যতা অনুসারে সাধারণ বিশেষ্যকে তিনটি উপশ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
  • গণন বিশেষ্য (Count Noun): সংখ্যা দ্বারা গণনা করা যায় এবং যার বহুবচন হয়, এরূপ বিশেষ্যকে গণন বিশেষ্য বলে। যেমন- দিন (বহুবচন রূপ- পাঁচদিন, দিনগুলি), শিক্ষক (বহু.শিক্ষকবৃন্দ), গ্রন্থ (বহু. গ্রন্থাবলি) ইত্যাদি।
  • পরিমাণ বিশেষ্য (Mass Noun): সংখ্যার সাহায্যে গণনা করা যায় না, কিন্তু পরিমাপ করা যায়, এমন বিশেষ্যকে পরিমাপ বিশেষ্য বলে। যেমন- চাল, চিনি, তেল, পানি, মাটি ইত্যাদি।
  • সমষ্টি বিশেষ্য (Collective Noun): যে বিশেষ্য কোনো দল বা গোষ্ঠীর একক বা সমষ্টি বোঝায়, তাকে সমষ্টি বিশেষ্য বলে। যেমন- জনতা, পরিবার, বাহিনী, মিছিল, সংসদ, সমিতি ইত্যাদি।
৩. সজীবতা অনুসারে শ্রেণিবিভাগ: জীবন্ত ও সক্রিয় সত্তা কি না সে বিচারে সাধারণ বিশেষ্যকে দুটি উপশ্রেণিতে ভাগ করা যায়।
  • সজীব বিশেষ্য (Animate Noun): যে বিশেষ্য দ্বারা জীবন্ত ও সক্রিয় সত্তার সাধারণ শ্রেণিকে বুঝায়, তাকে সজীব বিশেষ্য বলে। যেমন- পুরুষ, পাখি, মাছ ইত্যাদি।
  • অজীব বিশেষ্য (Inanimate Noun): জীবন্ত নয় এবং নিজে চলাফেরা করতে পারে না– ধারণাযোগ্য ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য এমন কিছু সাধারণ নামকে বুঝায়। যেমন- আকাশ, মাটি, পানি ইত্যাদি।
৪. অন্য শব্দশ্রেণিজাত বিশেষ্য (বাংলা একাডেমি ‘প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ’-এ এই শ্রেণির নাম দেওয়া হয়েছে ‘সাধিত বিশেষ্য’:
অন্য শব্দশ্রেণিজাত বিশেষ্য বলতে বোঝায়, অন্য শব্দশ্রেণি থেকে রূপান্তরিত হয়ে বিশেষ্য রূপ ধারণ করে বা প্রয়োগ-বিশেষে বাক্যে অন্য শব্দশ্রেণি বিশেষ্য রূপে ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের বিশেষ্যকে তিনটি উপশ্রেণিতে ভাগ করা হয়। যথা-
  • ক্রিয়াবিশেষ্য (Verbal Noun): যে বিশেষ্য দ্বারা কোনো ক্রিয়া বা কাজের নাম বোঝায়, তাকে ক্রিয়া বিশেষ্য বলে। যেমন- করা, দেখা, খাওয়া, দেওয়া, ভোজন, দর্শন ইত্যাদি।
  • বিশেষণজাত বিশেষ্য: বিশেষণ পদের সাথে প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বিশেষ্য গঠিত হয়। এরূপ বিশেষ্যকে বলা হয় বিশেষণজাত বিশেষ্য। যেমন- ধীর + তা = ধীরতা, দুষ্ট + আমি = দুষ্টামি, শৌখিনতা ইত্যাদি।
  • প্রয়োগ-নির্ধারিত বিশেষ্য (প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ অনুসারে ‘অন্বয়গত বিশেষ্য’): বাক্যে প্রয়োগ অনুসারে অন্য শব্দশ্রেণি বা পদ (সাধারণত বিশেষণ পদ) বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন- তিনি একজন জ্ঞানী মানুষ। এখানে ‘জ্ঞানী’ বিশেষণ। জ্ঞানীরা বেশি কথা বলেন না। এখানে ‘জ্ঞানী’ বিশেষ্য পদ।
[আগামী পর্বে বিশেষ্য পদের শ্রেণিবিভাগ নিয়ে আলোচনা করা হবে।]

প্রয়োজনীয় সংযোগ

শুবাচ গ্রুপের সংযোগ: www.draminbd.com
শুবাচ যযাতি/পোস্ট সংযোগ: http://subachbd.com/
আমি শুবাচ থেকে বলছি
error: Content is protected !!