প্রমিত বানানে কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রমিত বানানে কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই

বিভিন্ন মাধ্যমে ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা’ গানের যে বাণী পাওয়া যায় তাতে গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের মূল বাণীর কিছু কিছু শব্দ বিকৃত এবং কিছু শব্দকে অশুদ্ধ বানানে লিখে প্রচার করা হচ্ছে। সে বানানগুলো গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের মূল বাণীর অনুরূপ শুদ্ধ করে নিচে প্রমিত বানানের কফি হাউজকে পরিবেশন করা হলো:

কথা: গৌরী প্রসন্ন মজুমদার
সুরকার: সুপর্ণ কান্তি ঘোষ
কণ্ঠ: মান্না দে
 
কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই,
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই,
আজ আর নেই- – – ।

নিখিলেশ প্যারিসে, মইদুল ঢাকাতে
নেই তারা আজ কোনো খবরে,
গ্র্যান্ডের গিটারিস্ট গোয়ানিস ডি সুজা,
ঘুমিয়ে আছে যে আজ কবরে।
কাকে যেন ভালোবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে,
পাগলা গারদে আছে রমা রায়;
অমলটা ধুকছে দুরন্ত ক্যান্সারে
জীবন করেনি তাকে ক্ষমা হায়।।

সুজাতাই আজ শুধু সবচেয়ে সুখে আছে
শুনেছি তো লাখপতি স্বামী তার,
হীরে আর জহরতে আগাগোড়া মোড়া সে,
গাড়ি-বাড়ি সবকিছু দামি তার।
আর্ট কলেজের ছেলে নিখিলেশ সান্যাল,
বিজ্ঞাপনের ছবি আঁকত;
আর চোখ ভরা কথা নিয়ে নির্বাক শ্রোতা হয়ে
ডি সুজাটা বসে শুধু থাকত।।

একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘণ্টা
চারমিনার ঠোঁটে জ্বলত,
কখনো বিষ্ণুদে কখনো যামিনী রায়,
এই নিয়ে তর্কটা চলত।
রোদ-ঝড় বৃষ্টিতে যেখানেই যে থাকুক,
কাজ সেরে ঠিক এসে জুটতাম;
চারটেতে শুরু করে জমিয়ে আড্ডা মেরে
সাড়ে সাতটায় ঠিক উঠতাম।।

কবি কবি চেহারা কাঁধেতে ঝোলানো ব্যাগ.
মুছে যাবে অমলের নামটা;
একটা কবিতা তার হলো কোথাও না ছাপা
পেল না সে প্রতিভার দামটা।
অফিসের সোস্যালে অ্যামেচার নাটকে
রমা রায় অভিনয় করত;
কাগজের রিপোর্টার মইদুল এসে রোজ
কী লিখেছে তাই শুধু পড়ত।।

সেই সাতজন নেই আজ, টেবিলটা তবু আছে
সাতটা পেয়ালা আজও খালি নেই;
একই সে বাগানে আজ , এসেছে নতুন কুঁড়ি
শুধু সেই, সেদিনের মালি নেই।
কত স্বপ্নের রোদ ওঠে এই কফি হাউজে,
কত স্বপ্ন মেঘে ঢেকে যায়;
কতজন এল-গেল কতজনই আসবে
কফি হাউজটা শুধু থেকে যায়।।
 
কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই, আজ আর নেই,
কোথায় হারিয়ে গেল সোনালি বিকেলগুলো সেই,
আজ আর নেই- – – ।
 

কয়েকটি পদ-কথার ব্যাখ্যা

হাউজ, হাউজ, হাউস

অনেকে লিখেন হাউস। এটি হাউস নয়। হাউজ। হাউজ দুটি। একটি আরবি হাউজ আর একটি ইংরেজি হাউজ। আরবি হাউজ অর্থ (বিশেষ্যে) চৌবাচ্চা, জলাধার। প্রয়োগ: হাউজে পানি নেই।
ইংরেজি ‘হাউজ’ (house) অর্থ (বিশেষ্যে) বসবাসের উপযোগী ভবন, বাসস্থান, দাপ্তরিক বা ব্যবসায়-বাণিজ্য চালানোর উপযুক্ত ভবন, সংসদ (হাউজ অব কমন্স)। প্রয়োগ: কফি হাউজের আড্ডাটা আজ আর নেই।
আঞ্চলিক শব্দ ‘হাউস’ অর্থ (বিশেষ্যে)— শখ, ইচ্ছা, বাসনা। প্রয়োগ: “সুন্দরী কলাবতী প্রাণ-সোনা আমার/ হাউস হইছে তোমার সাথে প্রেম করি একবার।”
 
 কোন খবরে ও গীটারিষ্ট, ধুক্‌ছে, আগা গোড়া, গাড়ী বাড়ি, আঁকতো থাকতো
 কোন খবরে নয়, হবে কোনো খবরে। গীটারষ্ট নয়; শুদ্ধ ও প্রমিত বানান গিটারিস্ট। বিদেশি শব্দের বানানে ঈ-কার ও মূর্ধন্য-ষ হয় না। ধুকছে বানানে ক-এর নিচে হসন্ত অনাবশ্যক।  আগাগোড়া এক শব্দ। গাড়ি ও বাড়ি বানানে ঈ-কার হবে না। এগুলো অতৎসম শব্দ। ক্রিয়াপদে অহেতুক ও-কার বিধেয় নয়। তাই আঁকতো ও থাকতো হবে না। শুদ্ধ ও প্রমিত বানান হবে আঁকত ও থাকত। ঘণ্টা বানানে ণ্ট= ণ্+ট।
 

চারমিনার

“একটা টেবিলে সেই তিন চার ঘন্টা চারমিনার ঠোঁটে জ্বলত,
কখনো বিষ্ণু দে কখনো যামিনী রায় এই নিয়ে তর্কটা চলত।”
 
গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা সুপর্ণ কান্তি ঘোষের সুরে মান্না দে-র গাওয়া ‘কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ গানের চারমিনার অর্থ কী? অনেকে মনে করেন, চারমিনার একটি স্থাপনা; মিনার বা সৌধ। কিন্তু মিনার কীভাবে ঠোঁটে জ্বলত? দৈত্যের মুখেও তো মিনার জ্বলতে পারবে না।
 
গানের চারমিনার আসলে তৎকালীনএকটি বিখ্যাত সিগারেটের নাম। বর্তমানে যেমন বেনসন অ্যান্ড হেজেস। হায়দ্রাবাদের ‘দি ভাযির সুলতান টোব্যাকো কোম্পানি লি.’-এর চারমিনার নামের সিগারেটটি ভারতে সেসময় খুব জনপ্রিয় ছিল। তখন ধূমপান ছিল পুরুষের জন্য পৌরুষিক ব্যক্তিত্বের উপস্থাপন। চলচ্চিত্রে নায়করা সিগারেট ঠোঁটে দিয়ে নায়িকাদের কাছে ধূম্র-ব্যক্তিত্ব নিয়ে হাজির হতেন । উত্তমকুমার ও ফেলুদা-সহ অধিকাংশ নায়কের পছন্দের ছিল চারমিনার।
 
গানে বলা হচ্ছে আড্ডার সময় মুখে চারমিনার সিগারেট জ্বলত। মিনার না হলেও সিগারেটটির নাম ভারতবর্ষে অত্যন্ত সুপরিচিত হায়দ্রাবাদের চারমিনার সৌধের অনুস্মৃতিতে রাখা হয়েছে। যেমন তাজমহলের নামে অনেক প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয়। সিগারেটের প্যাকেটে সৌধের ছবি দেখলে তা বুঝা যায়। প্রসঙ্গত, একটি প্রতিরূপ সিগারেটের সিলিন্ডারের দৈর্ঘ্য সাধারণত ১২০ মিলিমিটার এবং ব্যাস ১০ মিলিমিটার।
 
ভারতের তেলঙ্গানার হায়দ্রাবাদে চারমিনার নামের একটি মসজিদ আছে। ১৫৯১ খ্রিষ্টাব্দে স্থাপিত এই মসজিদ-সৌধটি ভারতের তালিকাভুক্ত একটি বিশ্বখ্যাত স্থাপনা। চারমিনার সৌধ পুরাতন হায়দ্রাবাদ শহরের মুসি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত।
কুতুব শাহি রাজবংশের পঞ্চম সুলতান মোহাম্মদ কুলি কুতব শাহ, মসজিদ ও মাদ্রাসা হিসেবে ব্যবহারের জন্য ‘চারমিনার’ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ২০১৯ খ্রিষ্টাব্দে এর কিছু অংশ ভেঙে পড়ে। উর্দু শব্দ চার ও মিনার নিয়ে গঠিত চারমিনার অর্থ Four Towers। স্থাপনাটিতে চারটি মিনার সংযুক্ত। তাই নাম চারমিনার। গানের চারমিনার, হায়দ্রাবাদের চারমিনার সৌধ নয়। কিন্তু নামে মিল আছে।
 
সোস্যালে অ্যামেচার
 অ্যামেচার অর্থ শৌখিন চিত্রশিল্পী, সংগীত বা নাট্যশিল্পী; অপেশাদার; আনাড়ি, ত্রুটিপূর্ণ। যারা ক্রীড়া-সহ নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে, কিন্তু কাজকে পেশা হিসেবে নেয় না; কেবল অন্যের কল্যাণ অথবা নিজের শখের জন্য করে থাকে তাদের অ্যামেচার বলা হয়।  সোস্যাল অ্যামেচার অর্থ সামাজিক কল্যাণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণকালী শৌখিন বা অপেশাদার ব্যক্তি।
 
 রোদ ঝড়, পেলো, কি লিখেছে, আজো, এলো গেলো
রোদ ও ঝড় সমাসবদ্ধ হয়ে গঠিত হয়েছে রোদঝড়। তাই এটি পরষ্পর সেঁটে বসবে বা মাঝখানে হাইফেন দিয়ে বসবে। যেমন: রোদঝড় বা রোদ-ঝড়। ক্রিয়াপদে অযথা ও-কার বিধেয় নয়। তাই পেলো, এলো এবং গেলো পদগুলো হবে যথাক্রমে পেল, এল ও গেল। অন্যদিকে,  কি লিখেছে কথার কি পদটি সর্বদা ঈ-কার দিয়ে লিখতে হবে। মূল গানেও কী আছে। কোনো প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া গেলে কেবল সেক্ষেত্রে কি হয়। অন্যত্র কী লেখা সমীচীন।
 
error: Content is protected !!