প্রাচীন বাংলা কবিতা: পুরানো দিনের কবিতা: চিরন্তন বাংলা কবিতা: শ্রেষ্ঠ বাংলা কবিতা: কালজয়ী বাংলা কবিতা

সম্পাদনায়: ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/প্রাচীন-বাংলা-কবিতা-পুরা/

জন্মভূমি

সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী
হউক সে মহাজ্ঞানী মহা ধনবান
অসীম ক্ষমতা তার অতুল সম্মান,
হউক বিভব তার সম সিন্ধু জল
হউক প্রতিভা তার অক্ষুণ্ণ উজ্জ্বল।
হউক তাহার বাস রম্য হর্ম্য মাঝে
থাকুক সে মণিময় মহামূল্য সাজে।
হউক তাহার রূপ চন্দ্রের উপম
হউক বীরেন্দ্র যেন সে, রোস্তম।
শত শত দাস তার সেবুক চরণ
করুক স্তাবক-দল স্তব সংকীর্তন;
.
কিন্তু যে, সাধেনি কভু জন্মভূমি হিত,
স্বজাতির সেবা যেবা করেনি কিঞ্চিৎ
জানাও সে নরাধমে জানাও সত্বর,
অতীব ঘৃণিত সেই পাষণ্ড বর্বর।
কবিপরিচিত: জন্ম ১৩ই জুলাই, ১৮৮০; সিরাজগঞ্জে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিকের মুসলিম লেখকদের অন্যতম। তার রচনাসমূহকে ইসলামি সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। কবি আবদুল কাদির মন্তব্য করেন, বঙ্কিমচন্দ্রের বৈশিষ্ট্যসূচক “উগ্র জাতীয়তাবাদ” মুসলমানদের মধ্যে সিরাজীর রচনাতে প্রথম দেখা যায়। ১৯২৩ খ্রিষ্টাব্দে সিরাজী ও মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর যুগ্ম সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক ছোলতান। সিরাজী বঙ্কিমচন্দ্রের দুর্গেশনন্দিনীর প্রতিক্রিয়ায় রায়নন্দিনী ও রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলির প্রতিযোগী হিসেবে প্রেমাঞ্জলি রচনা করেন। তবু সময়োপযোগী হওয়ায় তাঁর রচিত উপন্যাস ও কাবগ্রন্থ দুটোই জনপ্রিয়তা পায়। অনল-প্রবাহ তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এটি সরকার বাজেয়াপ্ত করে এবং কবিকে বন্দি করা হয়। মৃত্যু: ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জুলাই।
আমি কোথায় পাব তারে
গগন হরকার
সূত্র:  প্রবাসী (হারামনি), সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঠাকুর,  বৈশাখ ১৩২২ বঙ্গাব্দ (১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” গানটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গগন হরকরার ‘ আমি কোথায় পাব তারে’ গানের সুর ভেঙে রচনা করেছেন। কুষ্টিয়ার নিশান মোড়ে  গগন হরকরার একটি প্রতীকী ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ভাস্কর হচ্ছেন: শিল্পী ফয়সাল মাহমুদ। গানের সংযোগ: https://www.youtube.com/watch?v=9VEYgMfs8Os]
আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে,
আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে- – -।
হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে— দেশ- বিদেশে
আমি দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে;
কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে – – – ।।
.
লাগি সেই হৃদয়শশী, সদা প্রাণ রয় উদাসী,
পেলে মন হতো খুশি, দিবানিশি দেখিতাম নয়ন ভরে- – –
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে- – – – –
মরি হায়, হায় রে—
আমি প্রেমানলে মরছি জ্বলে, নিভাই কেমন করে- – –
ও তার বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
বিচ্ছেদে প্রাণ কেমন করে
দেখ না তোরা হৃদয়ে সে, দেখ না তোরা হৃদয় চিরে
কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে- – – ।।
.
দিব তার তুলনা কী, যার প্রেমে জগৎ সুখী,
হেরিলে জুড়ায় আঁখি, সামান্যে কি দেখিতে পারে তারে – – –
তারে যে দেখেছে সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে- – – – – –
মরি হায়, হায় রে—
তারে যে দেখেছে, সেই মজেছে ছাই দিয়ে সংসারে- – – – –
ও সে না জানি কী কুহক জানে, না জানি কী কুহক জানে,
অলক্ষে মন চুরি করে, কটাক্ষে মন চুরি করে,
কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে- – -।।
.
কুল মান সব গেল রে, তবু না পেলাম তারে,
প্রেমের লেশ নাই অন্তরে—
তাইতে মোরে দেয় না দেখা সে রে- – –
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায় গগন ভেবে মরে – – – – –
মরি হায়, হায় রে—
ও তার বসত কোথায় না জেনে তায়, গগন ভেবে মরে- – – –
ও সে মানুষের উদ্দিশ, যদি জানিস; মানুষের উদ্দিশ, যদি জানিস
কৃপা করে বলে দেরে, আমার সুহৃদ হয়ে বলে দেরে,
ব্যথার ব্যথিত হয়ে বলে দে রে
কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে- – – ।।
.
হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দেশে— দেশ-বিদেশে
আমি দেশ-বিদেশে বেড়াই ঘুরে;
কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে।।
কবিপরিচিত: কবি ও লোকসংগীতশিল্পী গগন হরকরা  আনুমানিক ১৮৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কসবা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পেশা ছিল শিলাইদহ ডাকঘরের চিঠি বিলি করা। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথের “যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক” এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত “আমার সোনার বাংলা” গান দুটি, গগন হরকরার যথাক্রমে “ও মন অসাড় মায়ায় ভুলে রবে”  এবং “আমি কোথায় পাব তারে” গান দুটির সুর ভেঙে রচিত। রবীন্দ্রনাথঠাকুর  “ডাকঘর  নাটক”টি গগন হরকরার জীবন-প্রভাবিত। নাটকের গগেন্দ্রনাথ ঠাকুর চরিত্রটি তার প্রমাণ। গগন হরকার ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে কুষ্টিয়ায় মারা যান। লেখাটি গান হিসেব নয়, কবিতা হিসেবে পরিবেশন করা হয়েছে।
বাঙ্গালীর মেয়ে (রচনাকাল ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)
ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত
লক্ষ্মী মেয়ে যারা ছিল
তারাই এখন চড়বে ঘোড়া চড়বে ঘোড়া!
ঠাঠ ঠমকে চালাক চতুর
সভ্য হবে থোড়া থোড়া!
.
আর কি এরা এমন কোরো (করে)
সাঁজ সেঁজুতির ব্রত নেবে?
আর কি এরা এমন কোরে (করে)
পিঁড়ি পেতে অন্ন দেবে?
.
কপালে যা লেখা আছে
তার ফল তো হবেই হবে!
(এরা) এ বি পোড়ে বিবি সেজে
বিলিতী বোল কবেই কবে!
.
(এরা) পর্দ্দা তুলে ঘোম্টা খুলে
 সেজেগুজে সভায় যাবে!
ড্যাম হিন্দুয়ানী বোলে
বিন্দু বিন্দু ব্রান্ডি খাবে।
.
আর কিছুদিন থাক্‌লে বেঁচে
সবাই দেখতে পাবেই পাবে!
(এরা) আপন হাতে হাঁকিয়ে বগী
গড়ের মাঠে হাওয়া খাবে!
কবিতাটির রচনাকাল: ১৮৫৮খ্রি.। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় বসুমতী সাহিত্য মন্দির থেকে প্রকাশিত “ঈশ্বরগুপ্তের গ্রন্থাবলীর (প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ একত্রে) কবিতাগুচ্ছ অধ্যায় থেকে গৃহীত। বানান অবিকাল ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মতো রেখে দেওয়া হয়েছে। প্রথম বন্ধনীতে আধুনিক বানান।

কবিপরিচিতি: জন্ম: ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই মার্চ। মৃত্যু: ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে জানুয়ারি। কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক । সংবাদ প্রভাকর (বা ‘সম্বাদ প্রভাকর’) এর সম্পাদক। ‘গুপ্ত কবি’ নামেও পরিচিত। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-সহ তাঁর পরবর্তী বহু সাহিত্যিকের ‘গুরু’। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষায় খাঁটি বাঙালি কবি। শ্রেষ্ঠ কীর্তি: ভারতচন্দ্র রায়, রামপ্রসাদ সেন, নিধুগুপ্ত, হরু ঠাকুর ও কয়েকজন কবিয়ালের লুপ্তপ্রায় জীবনী উদ্ধার করে প্রকাশ। তাঁর লেখা আমার প্রিয় কবিতা: পাঁঠা’, ‘আনারস’, ‘তোপসে মাছ’।

সংযোগ: https://draminbd.com/প্রাচীন-বাংলা-কবিতা-পুরা/
প্রার্থনা
অক্ষয় কুমার বড়াল
দুঃখী বলে—“বিধি নাই, নাইকো বিধাতা;
চক্রসম অন্ধ ধরা চলে।”
সুখী বলে, “কোথা দুঃখ, অদৃষ্ট কোথায়!
ধরনী নরের পদাতলে।”
.
জ্ঞানী বলে—“কার্য আছে, কারণ দুর্জ্ঞেয়
এ জীবন প্রতীক্ষা কাতর।”
ভক্ত বলে— “ধরণীর মহারাসে সদা
ক্রীড়ামত্ত রসিক-শেখর।”
.
ঋষি বলে— “ধ্রুব তুমি, বরেণ্য ভূমায়।”
কবি বলে— “তুমি শোভাময়।”
গৃহি আমি, “জীবযুদ্ধে ডাকি হে কাতরে
দয়াময়, হও হে সদয়।”
আমার মেঘ্‌না নদী 
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
 মেঘ্‌নার তীরে বাঁধিয়াছি বাসা ছোট একখানি নীড়
ফিরি করে’ আর ফিরি না পরাণ, নই আর মুসাফির।
আমার মেঘ্‌না নদী
শুকাইত ওর সাথে মোর আঁখিজল; না মিশিত যদি।
 ছোট গ্রামখানি লাজুক শ্যামল নববধূটির মত,
শূন্যতাভারে বিরহী আকাশ চুম্বনে অবনত।
 জেগে বসে’ মেঘগর্জন আর  জনকল্লোল শুনি,
শ্রান্ত শ্রাবণ নয়নে ও নভে নাই ফুল ফাল্গুনি।
.
নদী মাঝি মাটি ধান—
আপনার মাঝে শুনি সবাকার প্রাণধারণের গান।
 হে বিদেশি নাও কোথা যাও ভেসে
বারেক আসিবে হেথা,
তোমার কক্ষে যপিছে কে নিশি আমার মহাশ্বেতা?
.
 মেঘনা মেঘের প্রিয়া,
পরাণের সে যে নাই, এ যে মোর নয়নের আত্মীয়া!
তাহার শিয়রে রুপার প্রদীপ, মৃত্য শিয়রে মোর,
তাহার আকাশে ঊষা উদ্ভাসে;
হেথা যায় ঘনঘোর।
.
তাহার চন্দ্রহার,
 মোর আছে শুধু মেঘ্‌লা আকাশ; আর জল মেঘ্‌নার।
[(কল্লোল পত্রিকা, ১৩৩৪ ফাল্গুন মোতাবেক ফেব্রুয়ারি ১৯২৮ ) সংখ্যা থেকে গৃহীত।]

 

জীবন সঙ্গীত
হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
বলো না কাতর স্বরে, বৃথা জন্ম এ সংসারে,
এ জীবন নিশার স্বপন;
দারাপুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার,
ব’লে জীব করো না ক্রন্দন।
মানব-জনম সার, এমন পাবে না আর,
বাহ্যদৃশ্যে ভুলো না রে মন;
কর যত্ন হবে জয়, জীবাত্মা অনিত্য নয়,
ওহে জীব কর আকিঞ্চন।
করো না সুখের আশ, পরো না দুখের ফাঁস,
জীবনের উদ্দেশ্য তা নয়;
সংসারে সংসারী সাজ, করো নিত্য নিজ কাজ,
ভবের উন্নতি যাতে হয়।
দিন যায় ক্ষণ যায়, সময় কাহারো নয়,
বেগে ধায় নাহি রয় স্থির;
হয় সম্পদ বল্, সকলি ঘুচায় কাল,
আয়ু যেন শৈবালের নীর।
সংসার সমরাঙ্গনে, যুদ্ধ কর দৃঢ়পণে,
ভয়ে ভীত হইও না মানব;
কর যুদ্ধ বীর্য্যবান, যায় যাবে যাক্‌ প্রাণ
মহিমাই জগতে দুর্ল্লভ।
মনোহর মূর্ত্তি হেরে, ওহে জীব অন্ধকারে,
ভবিষ্যতে ক’রো না নির্ভর;
অতীত সুখের দিনে, পুনঃ আর ডেকে এনে,
চিন্তা করে হইও না কাতর।
সাধিতে আপন ব্রত, স্বীয় কার্য্যে হও রত,
একমনে ডাক ভগবান;
সংকল্প সাধন হবে ধরাতলে কীর্ত্তি রবে
সময়ের সার বর্ত্তমান।
মহাজ্ঞানী মহাজন, যে পথে করে গমন
হয়েছেন প্রাতঃস্মরণীয়;
সেই পথ লক্ষ্য করে, স্বীয় কীর্ত্তি ধ্বজা ধরে
আমরাও হব বরণীয়।
সময়-সাগর তীরে, পদাঙ্ক অঙ্কিত করে,
আমরাও হব হে অমর;
সেই চিহ্ন লক্ষ্য, করে অন্য কোন জন পরে
যশোদ্বারে আসিবে সত্বর।
করো না মানবগণ, বৃথা ক্ষয় এ জীবন,
সংসার-সমরাঙ্গন মাঝে;
সঙ্কল্প করেছ যাহা, সাধন করহ তাহা
রত হয়ে নিজ নিজ কাজে।
কবিপরিচিতি: কবিপরিচিতি: অখণ্ড ভারতবর্ষের প্রবর্তক হিসেবে প্রথম জাতীয় কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। মধুসূদন-পরবর্তী কাব্য রচয়িতাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। বাংলা মহাকাব্যে স্বদেশ প্রেমের জোয়ার সৃষ্টির পথিকৃৎ। অতি দরিদ্র পরিবারের সন্তন। বৃত্তির অর্থে অধ্যয়ন। ওকালতি করে প্রচুর অর্থ অর্জন। সব ব্যয় করে ফেলতেন আত্মীয়স্বজন আর বন্ধুদের মাঝে। সরকারি উকিল পদ থেকে অবসরের দিন পকেটে ওই মাসের বেতন ছাড়া আর কোনো অর্থ ছিল না। দিন দিন আর্থিক অবস্থা দুর্বল হতে হতে নিঃস্ব হয়ে যায়। বুড়ো বয়সের অসুখ, চিকিৎসা আর খাওয়া-দাওয়ার অর্থ নেই। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজন সবাই চলে যায়। এ অবস্থায় বিনাচিকিৎসায় মারা যান কলকাতার খিদিরপুরে ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৪শে মে। তাঁর বিখ্যাত কাব্য বৃত্রসংহার (১৮৭৫-৭৭ দুই খণ্ড)। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে এডুকেশন গেজেট পত্রিকায় তাঁর ‘ভারত সঙ্গীত’ কবিতাটি প্রকাশিত হলে তিনি সরকারের রোষানলে পড়েন।

লজ্জাবতীলতা

হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়)

ছুঁইও না ছুঁইও না উটি লজ্জাবতীলতা।
একান্ত সঙ্কোচ করে, এক ধারে আছে সরে,
ছুঁইও না উহার দেহ, রাখ মোর কথা।
তরু লতা যত আর, চেয়ে দেখ চারি ধার,
ঘেরে আছে অহঙ্কারে—উটি আছে কোথা!
আহা অই খানে থাক, দিও না ক ব্যথা।
ছুঁইলে নখের কোণে, বিষম বাজিবে প্রাণে,
যেইও না উহার কাছে খাও মোর মাথা;
ছুঁইও না ছুঁইও না উটি লজ্জাবতীলতা।

লজ্জাবতীলতা উটি অতি মনোহর।
যদিও সুন্দর শোভা নাহি তত মনোলোভা,
তবুও মলিন বেশ মরি কি সুন্দর।
যায় না কাহার পাশেমান মর্যাদার আশে,
থাকে কাঙ্গালির বেশে এক নিরন্তর—
লজ্জাবতী লতা উটি মরি কি সুন্দর!

 

নিশ্বাস লাগিলে গায়, অমনি শুকায়ে যায়,
না জানি কতই ওর কোমল অন্তর।
এ হেন লতার হয়, কে জানে আদর!

হায় এই ভূমণ্ডলে, কত শত জন,
দণ্ডে দণ্ডে ফুটে উঠে, অবনী মণ্ডল লুঠে,
শুনায় কতই রূপ যশের কীর্ত্তন!
কিন্তু হেন ম্রিয়মাণ, সদা সঙ্কুচিত প্রাণ,
পুরুষ রমণী হেরে কে করে যতন?
স্বভাব মৃদুল ধীর, প্রকৃতিটী সুগম্ভীর,
বিরলে মধুরভাষী মানসরঞ্জন;
কে জিজ্ঞাসি তাহাদের করে সম্ভাষণ?
সমাজের প্রান্ত ভাগে তাপিত অন্তরে জাগে,
মেঘে ঢাকা আভাহীন নক্ষত্র যেমন।
ছুঁইও না উহার দেহ করি নিবারণ;
লজ্জাবতী লতা উটি মানসরঞ্জন।

হও ধরমেতে ধীর
অতুলপ্রসাদ সেন
হও ধরমেতে ধীর                হও করমেতে বীর,
হও উন্নত শির, নাহি ভয়।
ভুলি ভেদাভেদ জ্ঞান                হও সবে আগুয়ান,
সাথে আছে ভগবান— হবে জয়।
নানা ভাষা নানা মত নানা পরিধান
বিবিধের মাঝে দেখ মিলন্ মহান
 দেখিয়া ভারতে মহাজাতির উত্থান—জগজন জাগিবে বিস্ময়
তেত্রিশ কোটি মোরা নহি কভু ক্ষীণ,
হতে পারি দীন, তবু নহি মোরা হীন;
ভারতে জনম, পুনঃ আসিবে সুদিন— ওই দেখো প্রভাত উদয়,ন্যায় বিরাজিত যাদের করে                   বিঘ্ন পরাজিত তাদের শরে;
সাম্য কভু নাহি স্বার্থে ডরে-              সত্যের নাহি পরাজয়।।

পাছে লোকে কিছু বলে

কামিনী রায়

করিতে পারি না কাজ
সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে,-
পাছে লোকে কিছু বলে।

আড়ালে আড়ালে থাকি
নীরবে আপনা ঢাকি,
সম্মুখে চরণ নাহি চলে
পাছে লোকে কিছু বলে।

হৃদয়ে বুদবুদ মত
উঠে চিন্তা শুভ্র কত,
মিশে যায় হৃদয়ের তলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

কাঁদে প্রাণ যবে আঁখি
সযতনে শুকায়ে রাখি;-
নিরমল নয়নের জলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

একটি স্নেহের কথা
প্রশমিতে পারে ব্যথা,-
চলে যাই উপেক্ষার ছলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

মহৎ উদ্দেশ্য যবে,
এক সাথে মিলে সবে,
পারি না মিলিতে সেই দলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

বিধাতা দেছেন প্রাণ
থাকি সদা ম্রিয়মাণ;
শক্তি মরে ভীতির কবলে,
পাছে লোকে কিছু বলে।

কত ভালবাসি

কামিনী রায়

জড়ায়ে মায়ের গলা শিশু কহে আসি,
“মা, তোমারে কত ভালোবাসি!”
“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।
“এ— ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।

“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”
মা বলেন, “মাপ তার আমি নাহি জানি।”
“তবু কতখানি, বল।”

“যতখানি ধরে
তোমার মায়ের বুকে।”
“নহে তার পরে?”

“তার বাড়া ভালবাসা পারি না বাসিতে।”
“আমি পারি।” বলে শিশু হাসিতে হাসিতে!

সুখ

কামিনী রায়

[“আলো ও ছায়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে। ]

নাই কিরে সুখ? নাই কিরে সুখ?—
      এ ধরা কি শুধু বিষাদময়?
যতনে জ্বলিয়া কাঁদিয়া মরিতে
      কেবলি কি নর জনম লয়?—
কাঁদাইতে শুধু বিশ্বরচয়িতা
      সৃজেন কি নরে এমন করে’?
মায়ার ছলনে উঠিতে পড়িতে
      মানবজীবন অবনী ‘পরে?
বল্ ছিন্ন বীণে, বল উচ্চৈঃস্বরে,—
      না,—না,—না,—মানবের তরে
আছে উচ্চ লক্ষ্য, সুখ উচ্চতর,
      না সৃজিলা বিধি কাঁদাতে নরে।
কার্যক্ষেত্র ওই প্রশস্ত পড়িয়া,
      সমর-অঙ্গন সংসার এই,
যাও বীরবেশে কর গিয়ে রণ ;
      যে জিনিবে সুখ লভিবে সেই।
পরের কারণে স্বার্থে দিয়া বলি
      এ জীবন মন সকলি দাও,
তার মত সুখ কোথাও কি আছে?
      আপনার কথা ভুলিয়া যাও।
পরের কারণে মরণের সুখ ;
      “সুখ” “সুখ” করি কেঁদনা আর,
যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে,
      ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার।
গেছে যাক ভেঙ্গে সুখের স্বপন
      স্বপন অমন ভেঙ্গেই থাকে,
গেছে যাক্ নিবে আলেয়ার আলো
      গৃহে এস আর ঘুর’না পাকে।
যাতনা যাতনা কিসেরি যাতনা?
      বিষাদ এতই কিসের তরে?
যদিই বা থাকে, যখন তখন
      কি কাজ জানায়ে জগৎ ভ’রে?
লুকান বিষাদ আঁধার আমায়
      মৃদুভাতি স্নিগ্ধ তারার মত,
সারাটি রজনী নীরবে নীরবে
      ঢালে সুমধুর আলোক কত!
লুকান বিষাদ মানব-হৃদয়ে
      গম্ভীর নৈশীথ শান্তির প্রায়,
দুরাশার ভেরী, নৈরাশ চীত্কার,
      আকাঙ্ক্ষার রব ভাঙ্গে না তায়।
বিষাদ—বিষাদ—বিষাদ বলিয়ে
      কেনই কাঁদিবে জীবন ভরে’?
মানবের মন এত কি অসার?
      এতই সহজে নুইয়া পড়ে?
সকলের মুখ হাসি-ভরা দেখে
      পারনা মুছিতে নয়ন-ধার?
পরহিত-ব্রতে পারনা রাখিতে
      চাপিয়া আপন বিষাদ-ভার?
আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
      আসে নাই কেহ অবনী ‘পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা,
      প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।

দিন চলে যায়

কামিনী রায়
[“আলো ও ছায়া” কাব্যগ্রন্থ থেকে ]

একে একে একে হায়!                 দিনগুলি চলে যায়,
কালের প্রবাহ পরে প্রবাহ গড়ায়,
সাগরে বুদ্বুদ্ মত                 উন্মত্ত বাসনা যত
হৃদয়ের আশা শত হৃদয়ে মিলায়,
আর দিন চলে যায় ।

জীবনে আঁধার করি,                 কৃতান্ত সে লয় হরি
প্রাণাধিক প্রিয়জনে, কে নিবারে তায়?
শিথির হৃদয় নিয়ে,                 নর শূণ্যালয়ে গিয়ে,
জীবনের বোঝা লয় তুলিয়া মাথায়,
আর দিন চলে যায় ।

নিশ্বাস নয়নজল                 মানবের শোকানল
একটু একটু করি ক্রমশঃ নিবায়,
স্মৃতি শুধু জেগে রহে,                 অতীত কাহিনী কহে,
লাগে গত নিশীথের স্বপনের প্রায় ;
আর দিন চলে যায়!

কামিনী রায় ১৮৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ই অক্টোবর বাকেরগঞ্জ; বর্তমান বরিশাল জেলার বাসণ্ডা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মৃত্যু: ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ শে সেপ্টেম্বর।  ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে পনেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ আলো ও ছায়া প্রকাশিত হয়। এ গ্রন্থটির ভূমিকা লিখেছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক ডিগ্রিধারী। বেথুন কলেজ হতে  ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মান-সহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ।  লেখক ছন্দনাম  “জনৈক বঙ্গমহিলা”।  পিতা চণ্ডীচরণ সেন ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী, বিচারক, ঐতিহাসিক লেখক ও ব্রাহ্মনেতা ছিলেন। ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে চণ্ডীচরণ ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষা লাভ করেন। পরের বছর তার স্ত্রী-কন্যাও  ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন। কামিনী রায়ের ভগিনী যামিনী সেন লেডি ডাক্তার হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে কামিনী রায়ের সঙ্গে স্টাটুটারি সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায়ের বিয়ে হয়।  বেথুন কলেজ হতে  ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের প্রথম নারী হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ। 
error: Content is protected !!