ফিনল্যান্ড (Finland) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

ফিনল্যান্ড (Finland)

ফিনল্যান্ড উত্তর-পশ্চিম ইউরোপে বাল্টিক সাগরের উপকূলে অবস্থিত একটি রাষ্ট্র। এটি ইউরোপের সবচেয়ে উত্তরে অবস্থিত দেশগুলোর একটি। ফিনল্যান্ড উত্তর দিক স্থলবেষ্টিত। এর উত্তরে নরওয়ে ও পূর্বে রাশিয়া, দক্ষিণে ফিনল্যান্ড উপসাগর এবং পশ্চিমে বথনিয়া উপসাগর। ফিনল্যান্ডের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সুমেরুবৃত্তের উত্তরে অবস্থিত। এখানে ঘন সবুজ অরণ্য ও প্রচুর হ্রদ রয়েছে। দেশটির বনভূমি এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ; যা ‘সবুজ সোনা” নামে পরিচিত। হেলসিঙ্কি ফিনল্যান্ডের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। ফিনল্যান্ডের ম্যাপ দেখতে তিমির মতো।

সুইডিশ বানানে ফিনল্যান্ড (Finland) শব্দের অর্থ ফিনসদের জমি বা ফিনসদের দেশ Land of the Finns)। ফিনস (Finns) হচ্ছে একটি প্রাচীন ও সমৃদ্ধ জাতিগোষ্ঠী। যারা ঐতিহ্যগতভাবে নিজেদেরকে সুপরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। রোমান ইতিহাসবেত্তা ও সিনেটর টেকিটাস (Tacitus) প্রথম শতকে জার্মানিয়া গ্রন্থে প্রথম ফেন্নি (Fenni) শব্দটি ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় শতকে টলেমি একই অর্থ প্রকাশে জিওগ্রাফিয়া (Geographia) গ্রন্থে পিন্নিও (Phinnoi) নামটি পুনরায় আলোচনা করেন। তবে ফিন (Finn) নামের অর্থ ও ব্যুৎপত্তি ঠিকভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, জার্মানিক ফিনিশ (Finnis), যার অর্থ বিল/জলাভূমি বা প্রোটো-জার্মানিক ফিনে (Finne), যার অর্থ ভ্রমণকারী বা শিকার করা লোকÑ শব্দদুটো হতে ফিন শব্দের উদ্ভব। ফিনল্যান্ড একটি নিম্নভূমি অঞ্চল। কয়েক হাজার বছর আগেও এটি বরফে ঢাকা ছিল।

বরফের চাপে এখানকার ভূমি স্থানে স্থানে দেবে গিয়ে হাজার হাজার হ্রদের সৃষ্টি করেছে।  দেশটির সরকারী নাম ফিনল্যান্ড প্রজাতন্ত্র। তবে ফিনীয়রা নিজেদের  দেশকে সুওমি বলে ডাকে। সুওমি শব্দের অর্থ হ্রদ ও জলাভূমির দেশ।

ফিনল্যান্ডের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে হাজার হাজার ক্ষুদে পাথুরে দ্বীপ আছে। তন্মধ্যে কতগুলোতে মনুষ্য বসতি আছে। এদের মধ্যে বথনিয়া উপসাগরের মুখে অবস্থিত অলান্দ দ্বীপপুঞ্জটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফিনল্যান্ডের মেরু অঞ্চলে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত প্রায় সবসময় দিন থাকে। এ অবস্থাকে মধ্যরাতের সূর্য বলা হয়। ‘মধ্যরাতের সূর্যের’ এই দিনগুলো ফিনল্যান্ডের প্রকৃতিকে অপূর্ব করে তোলে। এ সময় হাজার হাজার লোক নৌকা নিয়ে বেড়াতে আসে। ফিনল্যান্ডের মধ্যভাগের বনভূমিতে অনেক পর্যটক রোমাঞ্চকর অভিযানের টানে ছুটে আসে।

ফিনল্যান্ডের  মোট আয়তন ৩,৩৮,২২৪ বর্গকিলোমিটার বা ১,৩০,৫৯৬ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ১০%। ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, ফিনল্যান্ডের মোট জনসংখ্যা ৫৪,৮৯,০৯৭ এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১৮। আয়তন বিবেচনায় ফিনল্যন্ড পৃথিবীর ৬৪-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যা বিবেচনায় ১১৩-তম। অন্যদিকে জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি পৃথিবীর ২০১-তম জনবহুল দেশ। মাইলের পরম মাইল হাটলেও এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে কোনো লোকের দেখা পাওয়া যায় না। হেলসিংকি এর রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। দাপ্তরিক ভাষা ফিনিশ ও সুইডিশ এবং স্বীকৃত আঞ্চলিক ভাষা হচ্ছে সামি। লুথেরানিজম ও ইস্টার্ন অর্থোডক্সি এ দেশের জনগণের অধিকাংশ জনগণ অনুসরণ করে। ফিনল্যান্ডের অধিবাসীদের ফিনিশ বা ফিন বলা হয়।

১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে  ফিনল্যান্ড রাশিয়া সাম্রাজ্য হতে প্রথম স্বায়ত্তশাসন অর্জন করে। ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর সোভিয়েত ফেডারেল সোসাইলিস্ট রিপাবলিক হতে স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, ফিনল্যান্ডের মোট জিডিপি (পিপিপি) ২২৪.৭১৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ৪১,০৬৮ ইউএস ডলার। অন্যদিকে জিডিপি (নমিনাল) ২৩০.৬৮৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ৪২,১৫৯ ইউএস ডলার। মাথাপিছু আয় বিবেচনায় ফিনল্যান্ড পৃথিবীর কয়েকটি ধনী দেশের অন্যতম। মুদ্রার নাম ইউরো।

ফিনল্যান্ডকে সাধারণত স্ক্যান্ডিনেভিয়ার অংশ ধরা হয়। বহু শতক যাবৎ ফিনল্যান্ড বিরোধী শক্তি সুইডেন ও রাশিয়ার মধ্যে সীমান্ত দেশ হিসাবেই ছিল। ৭০০ বছর সুইডেনের অধীনে শাসিত হবার পর ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে  এটি রাশিয়ার অধিকারে চলে যায়। রুশ বিপ্লবের পর ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে  এটি এটি স্বাধীনতা লাভ করে।। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে  ফিনল্যান্ড ও রাশিয়া বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার একটি চুক্তি সম্পাদন করে এবং ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দেশ দুইটির মধ্যে সুদৃঢ় আর্থনীতিক বন্ধন ছিল। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের পরে ফিনল্যান্ড ইউরোপমুখী হয় এবং ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে  ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে। ফিনল্যান্ডের ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে  গৃহীত পতাকাটি কিছুটা পরিবর্তন করে ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দের পুনরায় গৃহীত হয়।

কপি পানে ফিনল্যান্ডবাসীর অবস্থান বিশ্বে শীর্ষে। প্রতি বছর গড়ে জনপ্রতি ১২ কেজি কপি পান করে। নানা রকম উদ্ভট আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠান করে থাকে। এখানে স্ত্রী-বহন, মশা-ধরা মোবাইল-নিক্ষেপ, জুতো-নিক্ষেপ, জলে ফুটবল খেলা, এয়ার-গিটার নিক্ষেপ, স্টিমবাথসহ আরও অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। স্ত্রী-বহন প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার হচ্ছে স্ত্রীর সমান ওজনের বিয়ার। সুইডেন ও ফিনল্যান্ড সীমান্তে একটি গলফ ক্লাব আছে। যার একাংশ সুইডেনে এবং অন্য অংশ ফিনল্যান্ডে।

শিক্ষার হার বিবেচনায় ফিনল্যান্ড বিশ্বে প্রথম। এ দেশে কেউ ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করলে তাকে একটি হ্যাট ও সোর্ড অব অনার প্রদান করা হয়। ফিনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, নরওয়ে, জার্মানি ও সুইডেনে ইংরেজি শেখার জন্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের বিনা বেতনে ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নের ব্যবস্থা আছে। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে  ফিনল্যান্ডে ইন্টারনেট প্রবেশাধিকারকে প্রথম বারের মতো আইনি অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।  ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জরিমানা ব্যক্তির আয়ের উপর নির্ভর করে।  ২০০২ খ্রিষ্টাব্দে  একজনকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের জন্য ১,১৬,০০০ ইউরো জরিমানা করা হয়েছিল। তার বার্ষিক আয় ছিল ৭ মিলিয়ন ইউরো। গাড়ি চালানোর সময় দিনেও, এমনকি প্রবল সূর্যালো থাকলেও হেডলাইন অন রাখতে হয়।

জুন ও জুলাই মাসে এখানে সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না। সারাদিন ও সারা রাত সূর্য আলো দেয় এবং উত্তরে সারা রাত সূর্যের আলো দেখা যায়। এজন্য ফিনল্যান্ডকে মধ্যরাত সূর্যের দেশ বলা হয়। শীতকালে সূর্য কখনও দিগন্তে পৌছায় না। ফিনল্যান্ডের ভৌগোলিক সীমার মধ্যে  ৫০০ বর্গমিটার আয়তনের বড় ১,৮৭,৮৮৮টি হ্রদ এবং ১,৯৭,৫৮৪টি দ্বীপ রয়েছে। ফিনল্যান্ডে প্রায় ২.২ মিলিয়ন স্টিমবাথ (saunas) রয়েছে। প্রতি ২.৫ জন লোকের জন্য স্টিম বাথের সংখ্যা ১টি। এ দেশে সাউনার সংখ্যা কারের চেয়ে অধিক। ফিনিশ সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার লিনাস টর্ভাল্ডস( Linus Torvalds) একটি ওপেন সোর্ট অপারেটিং সিস্টেম আবিষ্কার করেন। যেটি লিনাক্স (Linux) নামে পরিচিত। বিশ্ববিখ্যাত  টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি নকিয়ার সদর দপ্তর ফিনল্যান্ডের ইসফোতে (Espoo) তে অবস্থিত। এটি হচ্ছে মোবাইল ফোন নির্মাণে পৃথিবীর বৃহৎ কোম্পানিসমূহের একটি।

ফিনল্যান্ড, এস্তোনিয়া, লাতভিয়া ও পোল্যান্ড প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। যুক্তরাজ্য, ফিনল্যান্ড ও সুইডেনের ভিসা দ্বারা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ভিসার চেয়ে সবচেয়ে বেশি দেশে ভ্রমণ করা যায়। শুধু সস্তায় অ্যালকোহল ক্রয়ের জন্য স্টকহোম, হেলসিংকি, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের মধ্যে একটি ক্রুস জাহাজা যাতায়াত করে। ফিনল্যান্ডে ১০টি প্লাস্টিক বোতলের ৯টি এবং গ্লাস বোতলের শতভাগ রিসাইক্লিং বা পুনঃব্যবহার পদ্ধতির আওতাভুক্ত। প্রতিবছর ফিনল্যান্ডের আয়তন বরফ-বয়স হিমাবহের রিবাউন্ডিঙের কারণে ৭ বর্গকিলোমিটার করে বৃদ্ধি পায়।২০১০ খ্রিষ্টাব্দ হতে ফিনল্যান্ড জাতীয় ব্যর্থতা দিবস পালনের সূচনা ঘটায়। এর উদ্দেশ্য ভুল হতে শেখা এবং ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।


সাইপ্রাস (Cyprus) : ইতিহাস ও নামকরণ

চেক রিপাবলিক (Czech Republic) : ইতিহাস ও নামকরণ

ডেনমার্ক (Denmark) : ইতিহাস ও নামকরণ

এস্তোনিয়া (Estonia) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

error: Content is protected !!