বউ আর বসের কাছে মিউট থাকাই কিউট

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/বউ-আর-বসের-কাছে-মিউট-থাকাই/
ড. মোহাম্মদ আমীনের রায়োহরণ উপন্যাসের ত্রয়োবিংশ অধ্যায়ের কিয়দংশ
অনুলিখন: প্রমিতা দাশ লাবণী
 
আমরা ফারজানাকে এগিয়ে আনতে যাচ্ছি।
যাও।
আমরা মানে ঋধিতা এবং গৃহকর্মী রাবেয়া। তারা বের হয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর ইন্টারকম বেজে উঠে। ছেলেমেয়েরা পড়ছে। আমি লিখছি। তারা পড়া ছেড়ে উঠবে না। ইন্টারকম ধরবে না। আমাকেই উঠতে হবে। সন্তানরা মা-বাবার কাজে খুব কমই সহায়তা করে হোক শিশু বা যুবক।  মা-বাবা না হওয়া পর্যন্ত তারা মা-বাবার কাঁধে পা দিয়েই চলে। মা-বাবা হওয়ার পর বুঝতে পারে সন্তানের অবহেলা কত কষ্টের। তখন কষ্ট পাওয়া ছাড়া আর কোনো প্রতিকার থাকে না।
রিডিংরুম থেকে দৌড়ে গিয়ে ইন্টারকমের রিসিভার কানে দিলাম।
অপর প্রান্তে ঋধিতা, কিছু বলবে?
মাংসের ডেকিচটা চুলোয় বসিয়ে দাও। দশ মিনিট পর নামিয়ে রাখবে। কিচেনটা আবার এলোমেলো করে দিও না। তোমায় কোনো বিশ্বাস নেই। সুযোগ পেলে ঘরকে গোয়াল বানিয়ে ফেল। তুমি কিচেনে ঢোকা মানে কিচেনটাকে ভাগাড় বানিয়ে বের হওয়া।
বউয়ের কথা শিরোধার্য।
খুব সাবধানে কিচেনরুমে ঢুকে মাংসের  ডেকচিটা চুলোয় বসিয়ে দিয়ে আবার লেখালিখিতে মন দিলাম। কিচেনের পশ্চিম পাশে আমার রিডিংরুম। উত্তরে ডাইনিং এবং পূর্বে ড্রয়িংরুম। ঠিক দশ মিনিট পর ডেকচিটা  চুলো থেকে নামিয়ে আবার লিখতে শুরু করি। অন্য কারও বিষয় হলে সময় ঠিক রাখার কথা খেয়াল থাকত না। ঋধিতার বিষয় আলাদা। তার কোনো বিষয় আমি সহজে ভুলি না। যেমন অফিসে ভুলি না বসের বিষয়। জীবনানন্দের জন্য বস আর বউ দুটোকে সবচেয়ে বেশি সমীহ করতে হয়। নইলে জীবনানন্দ জীবনামন্দে পরিণত হয়।
দশ মিনিট পার হওয়ার কয়েক মিনিট পর ঋধিতা,  ফারজানাকে নিয়ে বাসায় ঢুকল। ফারজানা, আমার বন্ধু ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শিহাবের স্ত্রী। তাদের ছেলে ফয়সল আমার ছেলের সহপাঠী। তাই ফারজানা আমাদের দ্বৈত খাতিরের মেহমান। 
ফারজানা আমার রিডিংরুমে ঢুকে সালাম দিয়ে বলল, কেমন আছেন ভাই?
ভালো।
তুমি?
ভালো।
শিহাব কেমন আছে?
সে কেমন আছে জানি না। সকালে চলে যায়, রাতে দেখা হয়। মাঝখানের খবর জানা থাকে না কখনো। প্রতিদিন ত্রিশ মিনিটও একত্রে থাকা হয় না। বিয়ের দুই বছর পর থেকে এভাবে চলে আসছে। সংসার নয় ভাই, জীবন ছারখার।
চাকরি, সন্তান, টেলিভিশন, ইন্টারনেট, শখ, সাজগোজ, বাড়ি, পারিবারিক দায়িত্ব এবং দৈহিক ক্রিয়া পরিপালনের পর আধুনিক দম্পতিরা প্রতিদিন কেবল চার মিনিট একত্রে থাকার সুযোগ পায়। সে হিসেবে শিহাব অনেক বেশি সময় দেয়। বিয়ের দুই বছর পর দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের ভালোবাসা দশ ভাগ কমে যায় এবং ক্রমশ কমতে কমতে মাইনাসে চলে আসে। এজন্য একই ঘরে থাকলেও দুজন যেন দুই গ্রহের বাসিন্দা। অবশ্য অথর্ব বয়সের হিসাব আলাদা। তখন আর কাউকে না পেয়ে দুই অথর্ব ভালোবাসা নামক ছলনার জালে পরস্পরকে আটকে রাখে।
চুলোয় ডেকচিটা দিয়েছিলে? আমার কথা শেষ হওয়ার পর ঋধিতা বলল।
দিয়েছিলাম।
আমার জবাব শুনে ঋধিতা হেসে ফারজানাকে নিয়ে ডাইনিংরুমের দিকে চলে গেল। ডাইনিংরুম আমার রিডিংরুমের সবচেয়ে কাছের রুম। ঘনিষ্ঠ কেউ এলে ঋধিতা এখানেই আলাপ করে, ড্রয়িংরুমে যায় না। তার ডাইনিং, ড্রয়িংরুমের চেয়ে অনেক গোছানো। অবশ্য বাসায় উভয় রুমের মাঝে কোনো সীমান্তচিহ্ন নেই।
আমি রিডিংরুমে বসে রাইটিং করি। রিডিংরুমে রাইটিং করা আদৌ উচিত কি না জানি না। তবে আমি রিডিংরুমেই লিখে থাকি। আসলে আমার বাসায় কোনো রাইটিংরুম নেই। মার্ক টোয়েনেরও ছিল না। তিনিও আমার মতো রিডিংরুমে বসে রাইটিং করতেন। রবীন্দ্রনাথও নাকি রিডিংরুমে বসে রাইটিং করতেন। আমার রাইটিংরুম থাকুক বা না থাকুক আমি যে মার্ক টোয়েন বা রবীন্দ্রনাথ কারও কাছাকাছিও যেতে পারব না তা আমার জানা আছে।
গল্প করছে দুজন।
রিডিংরুমের দরজা খোলা থাকায় তাদের কথা পরিষ্কার কানে আসছে। 
“মামা, খাবার দেওয়া হচ্ছে। চলে আসুন।” রাবেয়ার কণ্ঠ শুনে লেখা না থামিয়ে জবাব দিলাম, আসছি।
দেরি করবেন না, খালাম্মা রেগে যাবেন কিন্তু।
আমি উঠতে যাব এ সময় ঋধিতা এসে আমার চেয়ার ঘেঁষে দাঁড়াল। তার চেহারা দেখে ভয়ে আঁতকে উঠি। চোখে-মুখে ক্ষোভ, ক্ষোভদল এমন কালো হয়ে আছে যে, হাসির লেশমাত্র দেখা যাচ্ছে না। কয়েক মিনিটের মধ্যে হাসি উধাও, মেঘ যেমন ঢেকে দেয় আকাশ। এজন্য ‘সান্দ্রা বুলক’ বলেছেন, উইম্যান আর লাইক ওভেনস। উই নিড ফাইভ টু ফিফটিন মিনিটস টু হট আপ।
কোনো সমস্যা? আমি কম্পিত গলায় প্রশ্ন করলাম।
ঋধিতা ছোটোখাটো মেঘের মতো গর্জন করে বলল, আমার কপালটা এত খারাপ কেন? বলো, কী করব আমি? তুমি তো বদ্ধ পাগল হয়ে গেছ।
কী হয়েছে? আমি সভয়ে প্রশ্ন করলাম।
তোমাকে না বলেছিলাম মাংসের ডেকচিটা চুলোয় চড়িয়ে দিতে।
দিয়েছি তো।
গরম হয়নি কেন?
আমি কী জানি? যতটা সম্ভব কোমল গলায় বললাম, “দশ মিনিটই তো রেখেছি চুলোর ওপর।”
চুলোর ওপর ডেকচি দিয়েছ, কিন্তু  আগুন জ্বালাওনি। তাই তো?
সবিস্ময়ে বললাম,  আগুন দেওয়ার কথা তো বলনি!
আমি বলিনি, না কি মনে ছিল না?
ঋধিতা আমাকে গাধা, রামছাগল, বেকুব, বোকা, অথর্ব, নির্বোধ, ক্ষীণমতি, গবা, মূর্খ, অর্বাচীন, কাপুরুষ প্রভৃতিসহ আরও কতিপয় কর্ণলতিকাকম্পক বিশেষণে খাসির মাংসের মতো টুকরো টুকরো করে বলল, তুমি একটা বলদ।
আমি চুপ।
চুপ কেন? ধমক দিল ঋধিতা।
কিউট হতে চাইছি।
মানে?
বউ এবং বসের কাছে মিউট থাকাই কিউট।
ঋধিতা ফারজানাকে বলল, ভাবি, বড়ো খারাপ কপাল আমার। এমন স্বামী যেন শত্রুরও না হয়। রাতদিন জ্বালিয়ে মারছে, একটা কাজ করতে পারে না। প্রত্যেক কাজে গোলমাল লাগিয়ে দেয়। এমন গর্দভ কীভাবে প্রশাসনে এত বড়ো চাকরি করে? এজন্যই তো প্রশাসনের এত দুরবস্থা। ফারজানা বলল, কী হয়েছে?
আমার স্বামীটা দিন দিন বলদ হয়ে যাচ্ছে।
ফারজানা ফিসফিস করে বলল, আপনার স্বামী বলদ হয়ে যাচ্ছে, আমারটা ভাবি বিয়ের রাতেই বলদ হয়ে গেছে। মানে বিয়ের রাতে বলদ করে দিয়েছি। আমার তো আপনার চেয়ে খারাপ অবস্থা। আমি কী করব বলুন তো? – – – 
 
error: Content is protected !!